ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত সিলেট বিভাগের অন্যতম বাণিজ্যিক ও চা শিল্পাঞ্চল শ্রীমঙ্গল। পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত এ নগরী দিন দিন হয়ে উঠছে বসবাসের অনুপযোগী। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহল একের পর এক নির্মাণ করছে বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। অভিযোগ উঠছে, হাতেগোনা কয়েকটি ভবন ছাড়া অধিকাংশ ভবন নির্মাণে সরকারের বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে না। তাছাড়া দালান নির্মাণ ও তদারকি সংস্থার এক শ্রেণীর প্রকৌশলী ও কতিপয় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে যে যার মতো করে একতলা ভবনকে বাড়িয়ে চারতলা ও পাঁচতলা পর্যন্ত বর্ধিত করছেন। আর এসব ভবনে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন অসংখ্য মানুষ। শ্রীমঙ্গল শহর ও শহরতলীর মানুষ ভূমিকস্প ঝুকির মধ্যে বসবাস করলেও সরকারী দপ্তরগুলো কিংবা স্থানীয় সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। অথচ শ্রীমঙ্গল শহর তথা মৌলভীবাজার জেলার অধিকাংশ উপজেলার বাসিন্দারা তেল ও গ্যাসের খনির মধ্যে ভাসছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহর ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিয়ন গুলোর অভ্যন্তরে মুল্যবান খনিজ সম্পদ গ্যাস ও তেল ভরপুর রয়েছে। তেল ও গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টাকালে ১৯৯৭ সনে মাগুরছড়া ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। অগ্ন্কিান্ড ঘটলেও খনিজ সম্পদ গ্যাস উত্তোলনের প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি। শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মাগুরছড়ার তস্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র গ্যাস উত্তোলনের কূপ খনন করা হয়। উপজেলার মাগুরছড়া ছাড়াও কালাপুরসহ প্রায় ৪টি কুপ থেকে প্রতিদিন গ্যাস উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। ভূগর্ভস্থ গ্যাস উত্তেলনের মাধ্যমে ক্রমশ ঝুকির দিকে এগুচ্ছে শ্রীমঙ্গল উপজেলাসহ আশপাশের এলাকাগুলো। অথচ শ্রীমঙ্গলে ভুমি কম্প নিরোধক কোন পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরী হচ্ছে বহুতল ভবন, মার্কেট, শপিংমল। এছাড়া শ্রীমঙ্গল শহর ও শহরতলীতে ব্রিটিশ শাসনামলের পুরাতন ভবনগুলোতে চালানো হচ্ছে ব্যবসা বানিজ্য। শূধু তাই না, ওই সব ডেমিজ ভবনের উপরে কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে আবারও নতুন ভবন নির্মান করা হচ্ছে। বসবাসরত বাসিন্দারা জানান, অর্থাভাবে নতুন ভবন তৈরি করতে না পেরে জীবনের ঝুঁকি ও আতঙ্ক নিয়ে তারা সেখানে বসবাস করছেন। অপরদিকে, শহরের পশ্চিম ও উত্তর দিকে অবস্থিত ভানুগাছ রোড, কালিঘাট রোড, সিন্দুরখান রোড, হবিগঞ্জ রোড, কলেজ রোড, স্টেশন রোড, মৌলভীবাজার রোড, সেন্ট্রাল রোড ও চৌমুহনা এলাকায় একের পর এক গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, সরকারি নিয়মনীতি উপো করে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একটি ভবনের গা ঘেঁষে আরেকটি ভবন তৈরি করায় দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। আর এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে শহরের ব্যস্ততম স্টেশন রোডকে ঘিরে। জরুরি প্রয়োজনে কোন কোন স্থানে সড়ক ও গলিপথে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপক গাড়ি, এম্বুলেন্সসহ জরুরি যানবাহন পর্যন্ত ঢুকতে পারছে না। সরকারের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী পৌরসভা ও শহর এলাকায় নির্মিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের সয়েল টেস্ট করে ভবনের সর্বাধিক উচ্চতা, দু’টি ভবনের মধ্যকার দূরত্ব, গাড়ি পার্কিং ও অগ্নিনির্বাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার বিধি-বিধান থাকলেও এসব ভবনের মালিকরা তা মানছেন না। প্রশাসনের বা প্রকৌশল বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই অপরিকল্পিত ভবন নির্মান করার ফলে শ্রীমঙ্গলের মানুষ ভূমিকম্প ঝুকিপূর্ণ এলাকায় আতঙ্কে রয়েছে। বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নতুন ভবন নির্মানের জন্য গণপূর্ত বিভাগ, প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন সাপেে করার নিয়ম থাকলেও শ্রীমঙ্গলে কিছুই মানা হচ্ছে না। খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ শ্রীমঙ্গলে ভুমিকম্প হলে ধসে যাবে গোটা উপজেলা শহর। এসময় উদ্ধার করারও সুযোগ কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ারও ব্যবস্থা থাকবে না। ভূতথ্যবিদরা বার বার দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের ব্যাপারে সতর্ক করছে। সিলেট বিভাগের মধ্যে সব চেয়ে বেশী ঝুকির মধ্যে রয়েছে শ্রীমঙ্গল। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে এসবে তেমন মাথা ব্যথা নেই। কে, কখন, কিভাবে ভবন তৈরী করছে, শপিং মল, মার্কেট নির্মান করছে, এসবের কোন তদারকি নেই। ফলে যে ভোবে পারছে, নিজেদের মত করে বিল্ডিং করে নিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী নতুন ভবন তৈরীর জন্য সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তপ বা ইউপি চেয়ারম্যানের অফিসে নকশাসহ আবেদন করতে হয়। আবেদনের প্রেেিত নকশা যাচাই এবং সয়েল টেষ্ট করে প্রকৌশল দপ্তর থেকে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক অনুমতি পত্র দেওয়া। শূধু অনুমতি দিয়েই শেষ নয়, বিল্ডিং নির্মানের সময় মাটির গভীরে শক্তমটিতে ভিত স্থাপিত হয়েছে কিনা, সিমেন্ট, বালু আর কনস্ট্রাক্টশন সরঞ্জামাদি সঠিক ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তদারকি করতে হবে। কিন্তু শ্রীমঙ্গলে এসবের কোন কিছুই করা হচ্ছে না। শুধূ মাত্র বিল্ডিং তৈরীর অনুমতি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। অপর দিকে ইউনিয়ন পরিষদে কোন প্রকৌশল দপ্তর না থাকায় বিল্ডিং কোডের নিয়ম রা কিংবা তদরকি করার কোন ব্যবস্থা নেই। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী মাটি পরীার ভূগর্ভস্থ সিসমিক জরিপ করতে হয়। যতন পর্যন্ত শক্ত মাটির অস্থিত্ব মিলবে না ততন পর্যন্ত খনন করতে হবে দালানের ভিতের জন্য। কিন্তু শ্রীমঙ্গলে বিল্ডিং কোড মেনে আদৌ কোন দালান নির্মান হয়েছে বলে জানা নেই।
বিল্ডিং কোডে উল্লেখ রয়েছে, ভূমি কম্প প্রতিরোধ করা যাবে না, তবে সচেতনতা অবলম্বন করে ভবন নির্মান করা হলে জানমালের তি থেকে রা পাওয়া যেতে পারে। ১৯৯১ সালের পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে বিল্ডিং কোড প্রনয়নের কাজ শুরু করা হয় এবং ১৯৯৩ সালে ১২৫ টি সংস্থার ১৮৫ জন বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে বিল্ডিং কোড প্রনয়ন করা হয়। ওই বিল্ডিং কোডে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের ঝুকিতে থাকা এলাকাগুলোতে ভবন ও অবকাঠামো তৈরীর েেত্র ভূমিকম্প প্রতিরোধক ভিত (ফাউন্ডেশন) নির্মান করতে হবে। পাশাপাশি ভবনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। ভবন নির্মানের ফলে জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও সচ্ছ পরিবেশ যাতে বিঘিœত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বিল্ডিং কোডের মধ্যে ব্যবহার যোগ্যতার বিবেচনায় ভবনগুলোকে ১০ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এ, বি, সি, ডি, ই, এফ, জি, এইচ ও আই ক্যাটাগরী। বিশেষ করে এ ক্যাটাগরীর মধ্যে আবাসিক ভবন, বি ক্যাটাগরীর মধ্যে শিা প্রতিষ্ঠান, সি ক্যাটাগরীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ডি ক্যাটাগরীতে হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রের ভবন, ই ক্যাটাগরীতে অডিটোরিয়াম, এফ ক্যাটগরীতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট ইত্যাদি, জি ক্যাটাগরীতে শিল্প প্রতিষ্ঠান, আই ক্যাটাগরীতে বিষ্পোরক বা রাসায়নিক পদার্থ সংরনের ভবন এবং অন্যান্য ভবনকে জে ক্যাটাগরীর মধ্যে রাখা হয়েছে।
জাতীয় বিল্ডিং কোডের নীতিমালার মধ্যে রয়েছে- (ক) ভবনের কাঠাম্ োলোডের অনুপাত অনুসারে হতে হবে। রিইনফোর্সমেন্ট ব্যতিত ভার বহন করা ভবন ৬ তলার বেশী করা যাবে না। (খ) উচ্চতা ও লোডের অনুসারে ভবনের ভিত্তি দিতে হবে। নরম মাটিতে ভবন নির্মান করা যাবে না। তবে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে বিল্ডিং করতে হলে ভিত্তি (ফাউন্ডেশন) শক্ত মাটি পর্যন্ত যেতে হবে। (গ) এমএস রড ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। (ঘ) দরজা-জানালাসহ দেয়ালের আগাগোড়া লিন্টেল দেওয়া প্রয়োজন। (ঙ) ভবনের নকশা, কলাম ও বিম ডিজাইনের সময় ভবনটি সিসমিক লোড ও উইন্ড লোডের জন্য সহনীয় হয়, সেদিকে ল্য রাখতে হবে। (চ) কংক্রিট প্রস্তুত করার সময় খোয়া, সিমেন্ট, বালুর উপযুক্ত অনুপাত বজায় রাখতে হবে। (ছ) পাহাড়ী এলাকায় ভবন নির্মানের েেত্র আগেই মাটির বোরিং টেষ্ট করে নিতে হবে। ভবনের পাশে পাহাড় বা পানি থাকলে মাটির সমান্তরাল লোড বিবেচনায় নিতে হবে। (জ) জনবহুল বা শহরে ভবন নির্মানের েেত্র অন্য ভবন থেকে কমপে ৬ ফুট দুরত্বে করতে হবে। মাঝারী কিংবা বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ব্যাপক ধ্বংস লাঘবে ভবনের ভূ-কম্পন সহনশীলতা বাড়াতে বিল্ডিং কোড মেনে নেওয়া জরুরী।
ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে ২ লাধিক মানুষ
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।
সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল
দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।