শুক্রবার দিনটাতে টিএসসি এলাকায় এতো ভীড় হয় আগে জানা ছিল না। অবশ্য এমন করে বলা ঠিক না। লোকজন শুনলে হাবলা ভাববে। অতি মুখচড়া দুই একজন বলে বসতে পারে, আরে মিয়া তাইলে এতো বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কি ঘোড়ার ঘাস কাইটা বেড়াইছো? টিএসসি এলাকায় শুক্রবার ভীড় হয় তা জানো না! সুতরাং এইসব বিষয় চিন্তা করে ভীড়ের বিষয়টি নিজের ভিতরেই চেপে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই চেপে রাখা যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বুঝতে পারলাম যখন আমার পাশে বসেই অনিমা হাসি হাসি মুখে বললো-
দেখছো কত্তো মানুষ! দেখতেই ভালো লাগছে।
আমি অবশ্য কত্তো মানুষের মধ্যে ভালোলাগার কোথায় কি আছে ঠিক বুঝলাম না। অবশ্য এই বিষয় নিয়ে তর্ক করা যে সুবিধাজনক না, এটাও আমি দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বুঝে গেছি। অনিমার হল খুবই কাছে। ন্যূনতম কথা কাটাকাটি হলেও যে হলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে তা কোন ভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই চুপচাপ বসে চারপাশ অবলোকন করাই শ্রেয় মনে করলাম। কেবল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম।
ক্যাম্পাসে আর আগের মতো নিয়মিত আসা হয় না। চারপাশে তাকিয়ে পরিবর্তনগুলো দেখতে লাগলাম। তখনি অনিমার প্রশ্ন- ‘ক্যাম্পাস আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে না?’
কোন সময় থেকে বদলে গেছে তা চিন্তা না করেই হুমম বলে দিলাম। এইবার বিষয়টা অনিমার দৃষ্টি এড়ালো না। একগাদা কথা শুনতে হলো।
“কি ব্যাপার তোমাকে অমনোযোগী মনে হচ্ছে! নাকি সব কথাই মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছো? অবশ্য আজকে তোমাকে বেশি কিছু বলবো না। আজকে মুডটা খুবই ভালো। তোমার সাথে তর্ক করে মুডটা নষ্ট করতে চাই না।”
কি ব্যাপার! হঠাৎ মুড এত্তো ভালো! কারণটা কি জানতে পারি জনাবা?
জ্বী! জনাব কারণটা আপনাকে জানাবো বলেই আপনার মূল্যবান সময় থেকে অ্যাপয়েন্ট চেয়ে কিছু সময় চেয়েছি। আপনিতো আবার ইদানিং খুব ব্যস্ত লোক হয়ে পড়েছেন।
খোঁচা সহ্য করলাম। হাসি হাসি মুখ করে বললাম-
“তা জনাবা! কখন আপনার সেই কারণ শুনে আমার কর্ণকুহর ধন্য হবে?”
কথা শুনে অনিমা হেসে দিলো। হাসতে হাসতে গায়ে হেলান দিল। সন্ধার আবছা অন্ধকারে অনিমার ঘায়ের ঘ্রাণ গাঢ় হয়ে যেন লেপ্টে গেলে আমার সাথে। কতো পরিচিত এই ঘ্রাণ! মুগ্ধতা নিয়ে বেসুরো গলাতেই গেয়ে উঠলাম – চোখের আলোয় দেখেছিলাম, চোখের বাহিরে...।
আইনস্টাইনের থিওরী অব রিলেটিভিটি’র সুন্দরীর পাশে বসে থাকার গল্পকে সত্যি করতেই যেন সময় দ্রুত কেটে যেত লাগলো। টিএসসির সড়ক দ্বীপের রাস্তায় তখন গাঢ় অন্ধকার। রিক্সাগুলো টুং টাং শব্দে চলে যাচ্ছে শহীদ মিনারের দিককার রাস্তায়, উল্টোটাও হচ্ছে।
কি ব্যাপার? সুখবরটা শোনার কোন আগ্রহ নেই? অনিমার কথায় সম্ভিত ফিরলো। খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম- হ্যা অবশ্যই। কখন বলা শুরু করবা? আমার অপ্রস্তুত ভঙ্গি অনিমার দৃষ্টি এড়ালো না। পরমুহূর্তেই গম্ভীর কন্ঠ- আমার কোন কথাই তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনছো না, বলি মন কোথায় থাকে? উত্তরটা আমার কাছে তৈরিই ছিল- মন তো থাকে তোমার মনের কাছে, পাশাপাশি লেপ্টে!
“থাক থামো থামো, আর ন্যাকামি করতে হবে না। সুখবরটা হলো আমার একটা চাকরী হয়েছে। আগামি মাসেই জয়েন করবো।”
“ওয়াও! তাই নাকি? এখন এই খুশির খবর উপলক্ষে পার্টি দিচ্ছো কখন?”
“তোমার কাছে শুধু খাওয়া কথা!”
“হুমম...তা কিছুটা। কনগ্রাচ্যুলেশনস!”
“অবশেষে....”
অনিমা ইকোনমিক্স এর ছাত্রী। আমার দুই ব্যাচ জুনিয়র। অনার্স শেষ করেই চাকরী জুটিয়ে নিল। আর আমি ল’তে মাস্টার্স করে বসে আছি। কোর্টে গিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করতে পারতাম। ওসবে আমার পোষাবে না মনে করে কখনোই কোর্টে যাওয়া হয় নি। মাঝেমধ্যে ফ্রিল্যান্স কিছু কাজ করি। তাছাড়া ঘুরে ফিরে বেড়ানো, বাসায় ঝিম ধরে বসে থাকাই আমার ফুলটাইম কাজ।
“তোমার কথা সেদিন মা জিঞ্জেস করছিলো।” অনিমা বললো।
কি বললেন উনি? আমি ইতস্তত হয়ে বললাম।
না মানে জিজ্ঞেস করলো তুমি কোথাও চাকরীতে জয়েন করেছো কিনা? জানোতো আমি বাবামার একমাত্র মেয়ে। দ্বিতীয় জীবনের সুব্যবস্থার জন্য বাবামা চিন্তিত হয়ে পড়ছেন।
আস্তে করে কেবল বললাম- হুমমম। এই হুমমম বলাটা আমার অভ্যাসের মতো। যখন কারো কথা শুনে যাই তখন হুমমম কথাটা এতো বেশি বলি সবাই কেমন করে জানি আমার হুমমম বাতিক ধরে ফেলে।
কিছুতো একটা করো। নতুন কোন জায়গায় অ্যাপ্লিকেশন করেছো? নাকি বিদেশে যাওয়ার প্ল্যান করছো?
দ্বীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। জবাব দিতেই হবে তাই বলা- তুমি তো জানোই আমি ইউনিভার্সিটি থেকে ডাক পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। চেয়ারম্যান ম্যাডামের সাথে দেখা করেছিলাম। উনিতো বললেন মাস ছয়েকের মধ্যেই নতুন শিক্ষক নিবে।
তুমি আছো ইউনিভার্সিটির টিচার হওয়া নিয়ে। তোমাকেই যে নিবে তা তুমি নিশ্চিত কিভাবে? নাওতো নিতে পারে।
রেজাল্ট অনুযায়ী তো আমাকেই নেওয়ার কথা।
সবসময় যদি নিয়ম মেনে সব কিছু হতো তাহলে জীবনটা আরো অনেক সহজ হয়ে যেতো ডিয়ার!
বাদ দেও এইসব আলোচনা। এখন তোমার খুশির খবর উপলক্ষে কি খাওয়াচ্ছো তাই বলো।
আমাকে বসিয়ে রেখে অনিমা রাস্তা পার হয়ে গেলে ডাস ক্যাফেটারিয়ার দিকে গেল। একা একা বসে ভবিষ্যতের কথা ভাবছি; তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। প্রত্যয়ের ফোন। প্রত্যয় আমার ইউনিভার্সিটির খুব ভালো বন্ধু। ইউনিভার্সিটি লাইফ শেষে যে কয়জন ক্লাসমেটের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে প্রত্যয় তাদের মধ্যে একজন। প্রত্যয়ের কাছে হয়তো আমি খুব বিশ্বাসযোগ্য একজন, তাই তার সবকিছুই আমার সাথে শেয়ার করে। ফোনের ওপান্ত থেকে ভেসে আসলো-
কিরে কি খবর? সন্ধ্যার পর কি তুই ফ্রি আছিস?
হঠাৎ? দরকারি কিছু?
আজকে রাতটা আমার বাসায় থাকবি। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে।
সারপ্রাইজের কথা শুনেই নড়েচড়ে বসলাম। যাওয়ার খুব চেষ্টা করবো শুনে ফোন রেখে দিল প্রত্যয়। আর তখনই খাবার নিয়ে অনিমার আগমন। চোখ বাকিয়ে জিজ্ঞেস করে বসলো-
কি জনাব কার সাথে কথা হচ্ছিল? আমি আসাতেই একদম কথা বন্ধ হয়ে গেল।
রহস্য করে বললাম- আছে একজন!
অনিমা আমার উত্তরে কটমট করে আমার দিকে তাকালো। হঠাৎ হাসি পেয়ে গেল। প্রত্যয়ের কথা জানিয়ে খাবারের দিকে হাত বাড়ালাম।
চলবে.....
(অনেকদিন পর কিছু একটা লেখার চেষ্টা করলাম। কি যে লেখলাম...!)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



