আমাদের সমসাময়িক জীবন চলছে ইস্যুর উপর ভর দিয়ে। গরম গরম ইস্যু পরিবেশন করে আমাদের মিডিয়াগুলো। আর আমরা আম জনতারা সেই ইস্যুর ভোক্তা। ইস্যু নিয়ে আমরা মাতি, আমরা স্বপ্ন দেখি, এমনকি আমরা তর্ক বিতর্ক, ঝগড়া করি। তারপর কোন এক সকালে মিডিয়া আমাদের সামনে নতুন কোন এক ইস্যু নিয়ে হাজির হয়। আমরা ঘুম জড়ানো চোখ নিয়ে সেই ইস্যুর স্বপ্নে বিভোর হয়। মেতে যাই সেই নতুন ইস্যুটি নিয়ে। দেদারসে ভুলে যাই আগের ইস্যুটি। হোক তা অতি প্রয়োজনীয় কিংবা স্বল্প প্রয়োজনীয়!
বিশ্বায়ন এবং পুঁজিবাদের এই সময়ে মিডিয়া মানেই বিজনেস। সুতরা মিডিয়ার পেছনে যারা নেতৃত্বে আছেন তারাও এক অর্থে বিজনেসম্যান। বিজনেসম্যানদের কাছে স্বার্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে কি এই দাড়াচ্ছে না যে, ইস্যু যাই আমাদের সামনে আসছে সেখানে জড়িয়ে আছে কিছু স্বার্থ। হোক তা প্রচারের মাধ্যমে মিডিয়ার নাম ডাক বৃদ্ধি।
ইস্যুর ভুলে যাওয়া সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে প্রবল। আর এজন্যই মুক্তিযোদ্ধা আমান আলী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষীয় লোকদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়, তা আমরা ভুলে যাই। মিডিয়া যতোদিন আমাদের সামনে তা ইস্যুরূপে ধরে রাখে আমরা ততোদিন গলা ফাটাই। তারপর মিডিয়া নতুন ইস্যু পেয়ে যায়। নতুন রূপে প্রতিবেদন, মন্তব্য প্রতিবেদন, এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন নতুন কোন বিষয় নিয়ে। সেইসব প্রতিবেদন দেখে আগের বিষয়ে ভাবার এতো সময় কই আমাদের। তাই আমরা বেমালুম ভুলে যাই আমান আলীদের কথা। আমার আলী কেমন আছে, কোথায় আছে তা আমরা জানি না। এটি খুব সহজেই অনুমেয় যে বর্বর লোকটি মুক্তিযোদ্ধা আমান আলীকে লাঞ্ছিত করেছিল সে আমান আলী থেকে অনেক ভালো অবস্থায় আছে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি যখন মিডিয়ায় ইস্যু হিসেবে ছিল তখন রোজই নতুন নতুন বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন দেখতে পেতাম। তারপর মিডিয়া আরো অনেক অনেক ইস্যু পেয়ে গেছে। একটা ইস্যু শেষ হতেই অন্য আরেকটা ইস্যু এসে হাজির হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে এমনটা অনেকদিন ধরেই শুনে আসছি। সংসদে আইনের সংশোধনী পাস হয়েছে, ঐক্যমত্য প্রস্তাব পাস হয়েছে। বিচার শুরু হয় অবস্থা অনেক দিন আগে থেকেই দেখে আসছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অবস্থা এখনো অদেখা। কেবল নতুন কিছু অনুসঙ্গ যোগ হতে দেখি। কেউ কেউ বলেন বাইরের দেশের চাপের কথা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চাইলে কিছু দেশ থেকে চাপ আসবে এইটাতো আগে থেকেই জানা কথা। এ আর নতুন বিষয় কি! এই বিষয়টি মাথায় রেখেইতো বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে!
একটি বিষয় খুব জোরেশোরেই শুনতে পাই। আমার কাছে বিষয়টি নিছক মিথ মনে হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে নাকি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ সকল বাংলাদেশী শ্রমিকদের পাঠিয়ে দিবে। আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র নই, তাই হয়তো এই বিষয়ে জ্ঞান কম থাকতে পারে। তবে সাধারণ জ্ঞানে এইটুকু বুঝি যে এই একবিংশ শতাব্দীকে একটি রাষ্ট্রের বহিঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তির তুলনায় একটি রাষ্ট্রের প্রায়োরিটি অনেক অনেক বেশি।
এদেশীয় রাজাকার দোসরদের বিচার শুরু করতেই যদি এতো দ্বিধান্বিত অবস্থায় থাকতে হয় তাহলে দায়ী পাকিস্তানী হানাদারদের বিচার প্রক্রিয়ার কথা আমরা ভাববোই বা কিভাবে? আন্তর্জাতিক আইন বিষয়টি পড়তে গিয়ে অনেক মামলার উদাহরণ পড়ি। ক্ষতিপূরণের বেশ কিছু মামলা দেখলাম সেদিন। ভাবি, পাকিস্তানী হানাদাররা এই বাংলাদেশে কি তান্ডবলীলা চালিয়ে গেল, আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী সুস্পষ্টভাবে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও বিচার সম্পাদন হচ্ছে না। ক্ষতিপূরণ আদায়তো আরো দুরের বিষয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার বেশ আগে থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে নানা পর্যায় থেকে আন্দোলন হয়েছে। শুরুতে সংসদে বেশ কিছু উদ্যোগ আশাবাদী করে তুলেছিল আমাদের। পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কিছু তারিখ নির্ধারত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সবগুলো তারিখই পেরিয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা কবে শুরু হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার!
জানি আমরা ইস্যুর সংস্কৃতিতে আন্দোলিত হই। কিন্তু ভয় হয়, সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ থেকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে চারপাশ থেকে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল তা যেন হাজারো ইস্যুর চাপে স্থিমিত হয়ে যাচ্ছে। আর এটাই অনেক ভয়ের বিষয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ইস্যুভিত্তিক সংস্কৃতির শিকার না হোক এইটাই মনে প্রাণে চাওয়া। যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করতে পারলে জাতি হিসেবে আমরা দাড়াতে পারবো না। অনেক ধরণের আশ্বাস শুনছি। কিন্তু কেন যে এখনো ট্রাইব্যুনাল গঠনের নোটিফিকেশন জারী হচ্ছে না তাই বোধগম্য নয়!
যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ-এ দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করতেই হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



