বাংলাদেশ ক্রিকেটের নব জাগরনের সময়ে একদল প্রথম সারির ক্রিকেটার যোগ দিয়েছিল ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগে (আইসিএল) । তাদের মধ্যে ছিল শাহরিয়ার নাফিস, আফতাব আহমেদ, অলোক কাপালীসহ আরো কয়েকজন জাতীয় ক্রিকেটার । আমাদের চোখে তারা বিদ্রোহী, কারন তারা দলকে বিপদে ফেলে চলে গেছে । কিন্তু আমরা কখনো জানতে চেয়েছি কেন তারা এমন করল ? আজ আমি সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করব ।
যে সময় এসব তারকা ক্রিকেটাররা চলে যায় তখন আশরাফুলের অধিনায়কত্ব নিয়ে চারদিকে প্রশ্ন, অনেকে শাহরিয়ার নাফিসকে দেখছেন যোগ্য নেতা হিসেবে । কারন সে হাবিবুল বাশারের ডেপুটি ছিল, ক্যাপ্টেন তারই হবার কথা । একটা ভালো ইনিংস খেলে ৮-১০ ম্যাচ ডাব্বা মারা কেউ টেস্ট দলের নেতা হতে পারে না। এমন সময়ে আবির্ভাব আইসিএল নামক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের । তারা দলে টানতে লাগল বিশ্বের সেরা সব ক্রিকেটারদের । নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তানের অনেক তারকাই সেখানে ভিড় জমাতে লাগলেন । ছিলেন ব্রায়ান লারা, ম্যাকমিলান, শেন বন্ড, ইনজামামের মতো সুপার স্টাররাও । বাংলাদেশের প্রতিও তাদের চোখ । তারা যোগাযোগ করল আশরাফুল, মাশরাফির সাথে । তারা দেখলেন অভাবনীয় অর্থের হাতছানি। আইসিএল এজেন্টকে পরিচয় করিয়ে দিলো নাফিস, কাপালীর সাথে । আশরাফুল জানালো সেও আসছে, কাপালীরাও যাতে যোগ দেয় । মাশরাফিও তাই বলেছিল । কাপালী অস্ট্রেলিয়া ট্যুরের সময় প্রধান নির্বাচককে বিষয়টা জানায়, নির্বাচক বলে ব্যাকআপে প্লেয়ারের অভাব নেই । কাপালীকে যোগ দিয়ে রুটি-রুজির ব্যবস্থা নিতে বলে । শোনা যায় ঢাকা ওয়ারিয়র্সের আইডিয়া আশরাফুলের দেয়া ।
এরপরই সেই বিদ্রোহের চিত্র এবং আশরাফুলের ইংল্যান্ড পলায়ন । এসব স্টার প্লেয়াররা চলে যাওয়ায় কারা লাভবান হয়েছে আমরা ভেবে দেখেছি কখনো ? আশরাফুলের টালমাটাল অবস্থা চলে গিয়ে জায়গা আরো পোক্ত হয়, দলে জায়গা পায় আনকোরা কিছু তরুন । আমরা চরমভাবে ব্যর্থ হই টি-২০ বিশ্বকাপে শুধুমাত্র কোয়ালিটি প্লেয়ারের অভাবে।
প্রথম আলো সহ অন্যান্য দৈনিকে খবরটা আসলেও পরে তারা সেটাকে ধামা চাপা দিয়ে আশরাফুলকে নির্দোষ বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত হয় ।
তাছাড়া বিসিবির টীম সিলেকশনের অস্বচ্ছতাও প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল । একটা ইনিংস ভালো খেলার পরে যেখানে আশরাফুল ডাব্বা মেরেও চান্স পেত সেখানে ভারতের সাথে ১১৫ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলার পরেও কাপালীকে চুক্তি থেকে বাদ দেয়া হয় । সব প্লেয়ারকে ভাবতে হয় ভালো ইনিংসের জন্য, সেখানে আশরাফুলের কোন চিন্তা নাই । সে দলে থাকবেই, অথচ বাজে ফর্মের জন্য কত সহজে ছাঁটাই করে ফেলা হয় আকরাম, বুলবুলদের। কি এমন খুঁটির জোর এই আশরাফুলের ? ভাগ্যগুনে পাওয়া শতরান দিয়ে সে দলের বোঝা হিসেবে রয়ে গেছে । তার মত সুযোগ কি আমরা মোশাররফ রুবেল, অলক কাপালীদের দিয়েছি ? মোহসীন কামালের যুগে অলক কাপালী ছিল অন্যতম আবিস্কার , যার ব্যাটিং দ্যুতি দেখে ক্রিকেট পন্ডিতরাও তার প্রশংসা করেছেন । আফতাবের ব্যাটিংও ক্রিকেট প্রিয়দের জন্য দর্শনীয় । অস্ট্রেলিয়ার সাথে শাহরিয়ার নাফিসের সেই শতরান কি সহজে ভোলা যায় ? আশরাফুল যত সুযোগ পেয়েছে এবং পাচ্ছে এদের তার অর্ধেক সুযোগও কি দেয়া হয়েছে ?
এখন সময় এসেছে সব ভুলে দেশের ভালোর জন্য কিছু করার, সামনের বিশ্বকাপে কেমন ফল হবে তা ভেবে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে । সময় থাকতেই সঠিক দল দাঁড় করাতে হবে, লুসিং কম্বিনেশন ভেঙ্গে বানাতে হবে ফাইটিং কম্বিনেশন ।
ক্রিক ইনফো থেকে পাওয়া কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরলাম :
শাহরিয়ার নাফিস
টেস্ট - ১৫ (৩০ ইনিংস) রান ৮১০ (গড় ২৭.০০ / স্ট্রাইক রেট ৫৪.০৩) , ১০০- ১ , ৫০ - ৪
ওয়ানডে - ৬০ (৬০ ইনিংস) রান ১৮৫৭ (গড় ৩৩.৭৬ / স্ট্রাইক রেট ৬৯.৬৮) , ১০০ – ৪ , ৫০ - ১০
আফতাব আহমেদ
টেস্ট - ১৪ (২৭ ইনিংস) রান ৫১৪ (গড় ২১.৪১ / স্ট্রাইক রেট ৫০.৩৯) , ১০০- ০ , ৫০ - ১
ওয়ানডে - ৮০ (৮০ ইনিংস) রান ১৮৭৪ (গড় ২৫.৩২ / স্ট্রাইক রেট ৮৫.৫৪) , ১০০ – ০ , ৫০ – ১৪
অলোক কাপালী
টেস্ট - ১৭ (৩৪ ইনিংস) রান ৫৮৪ (গড় ১৭.৬৯ / স্ট্রাইক রেট ৪৮.৬২) , ১০০- ০ , ৫০ - ২
ওয়ানডে - ৬৫ (৬২ ইনিংস) রান ১১৭০ (গড় ১৯.৮৩ / স্ট্রাইক রেট ৬৮.৭৮) , ১০০ – ১ , ৫০ – ৫
আশরাফুল
টেস্ট - ৫০ (৯৭ ইনিংস) রান ২১৪৯ (গড় ২৩.১০ / স্ট্রাইক রেট ৪৫.৮৬) , ১০০- ৫ , ৫০ - ৭
ওয়ানডে - ১৫৬ (১৪৯ ইনিংস) রান ৩২৬১ (গড় ২৩.৯৭ / স্ট্রাইক রেট ৭১.৮৫) , ১০০ – ৩ , ৫০ – ২০
তামিম ইকবাল
টেস্ট - ১২ (২২ ইনিংস) রান ৬০৮ (গড় ২৭.৬৩ / স্ট্রাইক রেট ৪৬.২৩) , ১০০- ১ , ৫০ - ২
ওয়ানডে - ৭০ (৭০ ইনিংস) রান ২০০২ (গড় ২৮.৬০ / স্ট্রাইক রেট ৭৫.০৯) , ১০০ – ২ , ৫০ – ১২
ইমরুল কায়েস
টেস্ট - ৬ (১২ ইনিংস) রান ১৬১ (গড় ১৩.৪১ / স্ট্রাইক রেট ৩৮.৭০) , ১০০- ০ , ৫০ - ০
ওয়ানডে - ৭ (৭ ইনিংস) রান ১৭১ (গড় ২৪.৪২ / স্ট্রাইক রেট ৬১.৯৫) , ১০০ – ০ , ৫০ – ১
জুনায়েদ সিদ্দিক
টেস্ট - ১২ (২৩ ইনিংস) রান ৫২৬ (গড় ২২.৮৬ / স্ট্রাইক রেট ৪১.৮৪) , ১০০- ০ , ৫০ - ৪
ওয়ানডে - ২৯ (২৮ ইনিংস) রান ৪৮৮ (গড় ১৭.৪২ / স্ট্রাইক রেট ৬০.৮৪) , ১০০ – ০ , ৫০ – ২
রকিবুল হাসান
টেস্ট - ৫ (১০ ইনিংস) রান ২২৯ (গড় ২২.৯০ / স্ট্রাইক রেট ৪৪.১২) , ১০০- ০ , ৫০ - ১
ওয়ানডে - ৪০ (৩৯ ইনিংস) রান ১০১৮ (গড় ২৯.৯৪ / স্ট্রাইক রেট ৬১.৯৫) , ১০০ – ০ , ৫০ – ৬
এর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই । তবুও না দিয়ে পারলাম না ।
মুশফিকুর রহিম
টেস্ট - ১৬ (৩১ ইনিংস) রান ৬৭৯ (গড় ২৩.৪১ / স্ট্রাইক রেট ৪২.৮৬) , ১০০- ০ , ৫০ - ৪
ওয়ানডে - ৬৩ (৫৫ ইনিংস) রান ১০০২ (গড় ২২.৯৬ / স্ট্রাইক রেট ৬২.৭৪) , ১০০ – ০ , ৫০ – ৪
দেখা যাচ্ছে যে রকিবুলকে নিয়ে এত কথা তার পারফরম্যান্স তেমন আহামরি কিছু নয় । আফতাব, অলোক কাপালীর গড় ছাড়া বাকী সব তার চেয়ে ভাল । আর শাহরিয়ার নাফিস যে তামিমের চেয়ে ভাল পারফরমার তা রেকর্ডই বলে দিচ্ছে । এসব দেখে আমি একটা দল অনুমান করলাম ।
ওপেনার : শাহরিয়ার নাফিস, তামিম ইকবাল , ইমরুল কায়েস
মিডল অর্ডার : আফতাব আহমেদ, অলোক কাপালী, সাকিব আল হাসান
লেট মিডল-অর্ডার : রিয়াদ , মুশফিক রহিম
পেসার : রাজিব , নাজমুল , মাহবুবুল, ডলার মাহমুদ
স্পিনার : এনামুল হক জুনিয়র , আব্দুর রাজ্জাক , মোশাররফ রুবেল
স্ট্যান্ড বাই : আশরাফুল , রকিবুল , নাইম ইসলাম, ধীমান ঘোষ
সবশেষে ক্রিকেটপ্রমী যারা আছেন তাদের প্রতি অনুরোধ আপনারাও স্ব স্ব ক্ষেত্র থেকে প্রতিবাদ করুন বিসিবির স্বেচ্ছাচারিতার । আমরা চাইনা ক্রিকেটের অবস্থাও ফুটবলের মত হোক । শুধুমাত্র এ খেলাই পারে আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে, তাই কোন প্রতিভাকে নষ্ট হতে দেয়া যাবেনা ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


