somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৪২৯ হিজরীর হজ্ব উপলক্ষ্যে আরাফার ময়দানে প্রদত্ত খোতবা অনুবাদ (তৃতীয় পর্ব)

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৫:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রিয় মুমিন ভাই,
নিঃসন্দেহে এই পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে- ঈমান। বরঞ্চ তা অমূল্য রতন। কারণ এই ঈমান আপনাকে কুফরী ও ভ্রান্তি থেকে মুক্তি দেয়। আপনাকে আপনার রবের নৈকট্যে পৌঁছিয়ে দেয় এই ঈমান। এই ঈমান আপনাকে মহাবিশ্ব সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এই ঈমান আপনাকে আপনার অতীতের সাথে সম্পৃক্ত করে এবং মৃত্যুর পরের ভবিষ্যত সম্পর্কে অবহিত করে। সঠিক ঈমান এমনই হয়ে থাকে। ছয়টি স্তম্ভের উপর আল্লাহ্ তাআলা এই ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এক: আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান। আল্লাহ্‌র রুবুবিয়্যাতের প্রতি ঈমান: তিনি এ মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রণকর্তা – এই বিশ্বাস পোষণ করা। তিনি ছাড়া আর কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। তিনি ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এই ঈমান আনা যে, একমাত্র তিনি ইবাদত (উপাসনা, পূজা, আরাধনা) পাওয়ার উপযুক্ত। এছাড়াও তাঁর সুমহান নাম ও গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনা। “তিনি আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক। তিনি ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই।”[সূরা আনআম ৬:১০২] “তোমাদের উপাস্য একজন। তিনি ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। তিনি হচ্ছেন অতি দয়ালু ও পরম করুণাময়”[সূরা বাকারা ২:১৬৩] “আল্লাহ্‌র অনেকগুলো সুন্দর নাম রয়েছে। তোমরা সেগুলো দিয়ে তাকে ডাক।”[সূরা আরাফ ৭:১৮]

দুই: আল্লাহ্ তাআলার ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনা। তাদের অস্তিত্বের প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁরা যেসব কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেসব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা।“নিশ্চয় তোমাদের উপর নিযুক্ত আছে তত্ত্বাবধায়করা (ফেরেশতারা)। (তারা হচ্ছেন) সম্মানিত (আমলনামা) লেখকবৃন্দ। তোমরা যা কিছু কর তারা সব কিছু জানেন।”[সূরা ইনফিতার ৮২:১০-১২] “মানুষ একটা শব্দ উচ্চারণ করুক না কেন (তা রেকর্ড করার জন্য) একজন প্রহরী তার কাছে সদা প্রস্তুত আছে।”[সূরা ক্বাফ ৫০:১৮] এছাড়াও এ ঈমান আনা যে, তারা (ফেরেশতারা) আল্লাহ্ তাআলার সম্মানিত বান্দা। তারা আল্লাহ্ তাআলার আগ বাড়িয়ে কথা বলে না। বরঞ্চ তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে যায়। বিরতিহীনভাবে সকাল-সন্ধ্যা তারা আল্লাহ্ তাআলার গুণকীর্তন (তাসবীহ) করে।

তিন: পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনা। এই ঈমান রাখা যে, আল্লাহ্ তাআলা কিছু কিতাব এবং কতগুলো লিপি নাযিল করেছেন মানুষকে সঠিক পথপ্রর্দশন করার জন্য। এই ঈমান আনতে হবে যে, এই কিতাবগুলো আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। ঐ সকল কিতাবের যে সকল সংবাদ সঠিক বর্ণনাসূত্রে কোনরূপ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ব্যতিরেকে আমাদের কাছে পৌঁছেছে সেসবের প্রতিও ঈমান আনা। তার সাথে এই ঈমান আনা যে, কুরআনে কারীম তার পূর্ববর্তী সকল কিতাবকে রহিত করে দিয়েছে। কিন্তু ঐসব কিতাবের যাবতীয় মর্মকথা কুরআনের মধ্যে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং এই কুরআন সেসব কিতাবের উপর সাক্ষীস্বরূপ। “আসলে আমরাই আপনার প্রতি কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যে কিতাব পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সাক্ষী।”[সূরা মায়েদা ৫:৪৮]

চার: পূর্ববর্তী রাসূলদের প্রতি ঈমান আনতে হবে। এই ঈমান বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, আল্লাহ্ তাআলাই তাদেরকে প্রেরণ করেছেন। তিনি কোনো কোনো রাসূলের ঘটনা আমাদেরকে অবহিত করেছেন। আর কোনো কোনো রাসূলের ঘটনা আমাদেরকে অবহিত করেননি। তাদের সকলের প্রতি আমাদেরকে ঈমান আনতে হবে। তারা আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত এবং তাদেরকে যে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল তারা তা পুরোপুরিভাবে আদায় করেছেন। তাদের সকলের প্রতি ঈমান আনতে হবে। তাদের একজনকে অস্বীকার করা মানে তাদের সকলকে অস্বীকার করার নামান্তর। যে ব্যক্তি মুসা (আঃ) এর রাসূল হওয়াকে অস্বীকার করে অথবা ঈসা (আঃ) এর রাসূল হওয়াকে অস্বীকার করে সে যেন সকল নবীকে অস্বীকার করল। আর যে ব্যক্তি মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ্‌র রাসূল হওয়াকে অস্বীকার করে সে যেন সকল নবীকে অস্বীকার করল। “নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলদেরকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলদের মাঝে (ঈমান আনার ক্ষেত্রে) তারতম্য করতে চায় (আল্লাহ্‌কে মানি; রাসূলদেরকে মানি না) এবং বলে আমরা কতককে মানি, কতককে মানি না। এভাবে তারা মাঝামাঝি একটা পথ গ্রহণ করতে চায়, প্রকৃতপক্ষে তারা কাফের। আমি কাফেরদের জন্য লাঞ্চনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি।”[সূরা মায়েদা ৫:৪৮-৪৯]

পাঁচ: শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা। সৃষ্টি ও পূনরুত্থানের প্রতি ঈমান আনা। “যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব।”[সূরা আম্বিয়া ২১:১০৪] “এরপর নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কেয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে।”[সূরা আল মুমিনূন ২৩:১৫] হাশরের মাঠে হিসাব গ্রহণ ও প্রতিদান পাওয়ার উপর ঈমান আনা। “আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি যুলুম করা হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।”[সূরা আম্বিয়া ২১:৪৭,৪৮] “নিশ্চয় তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। অতঃপর তাদের হিসাব-নিকাশ আমারই দায়িত্ব।”[সূরা গাশিয়াহ্ ৮৮:২৫-২৬] জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি ঈমান আনা। ঠিক যেভাবে আল্লাহ্ তাআলা তার কিতাবে তুলে ধরেছেন এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) হাদীস শরীফে বর্ণনা করেছেন।

ছয়: আল্লাহ্ তাআলার জ্ঞান পরিপূর্ণ এবং সবকিছুই তার জ্ঞানের পরিধির ভিতরে, কোন কিছুই তার জ্ঞানের বাইরে নয়- এই ঈমান আনা। বান্দার প্রকাশ্য আমল অথবা গোপন আমল, স্থূলকর্ম অথবা সূক্ষ্মকর্ম সবকিছুই আল্লাহ্ তাআলা জানেন। সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করার পঞ্চাশ বছর আগে আল্লাহ্ তাআলা তাঁর ইলম অনুযায়ী সবকিছু লিখে রাখেন। বান্দা যা পাওয়ার তা সে পাবেই। আর যা না পাওয়ার তা সে কোনভাবেই পাবে না। “পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিপর্যায়ে তোমাদের উপর যে বিপদ আসুক কেন তাকে অস্তিত্বশীল করার আগেই কিতাবে (লওহে মাহফুজে) তার কথা লিখিত আছে। নিশ্চয় তা করা আল্লাহ্‌র জন্য খুব সহজ।”[সূরা হাদীদ ৫৭:২২]
এই হল মুসলিম উম্মাহর আকীদা (ধর্মবিশ্বাস)। এটা একটি পূর্ণাঙ্গ আকীদা। এতে কোন দিক বাদ পড়েনি। এই আকীদা হল সুস্পষ্ট, এতে কোন অস্পষ্টতা নেই। এই আকীদা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্‌র কুরআন ও রাসূলের (সাঃ) সুন্নাহ্ নির্ভর। এ আকীদাতে কোন ঘাতটির অপবাদ তোলা অবান্তর। এই আকীদাতে কোন কিছু সংযোজনের চেষ্টা করা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত। এই আকীদার এমন কোন ব্যাখ্যা দেয়া যে ব্যাখ্যা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের ব্যাখ্যার বিপরীত তা গ্রহণীয় নয়, বরং প্রত্যাখ্যাত।

মুসলিম উম্মাহ্,
জেনে রাখুন ইসলামের ভিত্তিগুলো এবং ঈমানের রুকনগুলো মুসলমানদের অন্তরে মজবুত করা গেলে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা লাভ করবে। “যারা ঈমান এনেছে, কিন্তু তাদের ঈমানের সাথে যুলুম (শির্ক) মিশ্রিত হয়নি তাদের জন্যই নিরাপত্তা। আর তারাই হল সুপথপ্রাপ্ত।”[সূরা আনআম ৬:৮২] বাস্তবে নিরাপত্তা এবং সুস্থ জীবন কোন অবস্থায় লাভ করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে রব্ব (প্রতিপালক) হিসেবে স্বীকৃতি না দিবে, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ না করবে এবং মুহাম্মদ (সাঃ)কে নবী ও রাসূল হিসেবে না মানবে। “যে নর বা নারী ঈমান থাকা অবস্থায় কোন সৎকর্ম করে আমি তাকে ভাল জীবন দান করব।”[সূরা নাহল ১৬:৯৭] “আর যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মুহাম্মদের প্রতি অবতীর্ণ সত্যে বিশ্বাস করে, আল্লাহ্ তাদের মন্দ কর্মসমূহ মার্জনা করেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দেন।”[সূরা মুহাম্মদ ৪৭:২]
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×