চট্টগ্রামের বঙ্গোপসাগর উপকূলে ৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত 'জাহাজ ভাঙা শিল্প' এখন বন্ধ হওয়ার পথে। গত পাঁচ মাসে এখানকার চালু ৫৫টি ইয়ার্ডে পুরনো (স্ক্র্যাপ) জাহাজ এসেছে মাত্র দুটি। অথচ ২০০৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সবচেয়ে বেশি জাহাজ কিনতেন বাংলাদেশের ইয়ার্ড মালিকরা। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে পুরনো জাহাজ আমদানি এবং আমদানির পর ভাঙা বন্ধ রয়েছে।
ইয়ার্ড মালিকরা এ শিল্প বন্ধের জন্য বিদেশি চক্রান্তকে দায়ী করছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমাদের দেশের এই শিল্প বন্ধ করার জন্য
বিদেশিদের ষড়যন্ত্র আছে। তারা এর জন্য এখানে প্রচুর টাকাও খরচ করে।'
ব্যবসায়ীদের এ অভিযোগ সম্পর্কে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, 'বিদেশি ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি।' এ শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'আমরা চাই পরিবেশ রক্ষা করে এই শিল্প টিকে থাকুক। নীতিমালা তৈরি হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে আবেদনকারীরা পরিবেশ ছাড়পত্র পাবে। এই শিল্পে এখন যে অচল অবস্থা, সেটি আদালতের আদেশের কারণে।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা জানান, যাঁরা পুরনো জাহাজ শিল্প নিয়ে অতি সচেতন, তাঁরা পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প নিয়ে কোনো কথা বলেন না। কারণ এ ট্যানারি শিল্প নিয়ে কথা বললে বিদেশ থেকে টাকা পাওয়া যাবে না।
চালু ইয়ার্ডগুলোতে বর্তমানে দুই লাখ টন লৌহজাত সামগ্রী আছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় বাজারে বাড়ছে পুরনো লোহার দাম। ১০ দিনের ব্যবধানে ৩৩ হাজার টাকা টনের লোহা গতকাল বিক্রি হয়েছে ৩৭ হাজার টাকায়।
ইয়ার্ড মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিএ) কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছর এ শিল্পে সাত হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এখান থেকে সরকার প্রায় ৮০০ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক পায়। রি-রোলিং মিলের মাধ্যমে সরকার পায় আরো দেড় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। প্রতিবছর দেশে যে ৩২ লাখ টন লৌহজাত সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে, এর মধ্যে ২২ লাখ টন সরবরাহ করা হতো এ জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে। ১৯৮০ সালে দেশে প্রথম এ ব্যবসা সীমিত আকারে শুরু হয়েছিল। বাণিজ্যিকভাবে পুরোমাত্রায় এ ব্যবসা চালু হয় ১৯৮৫ সালে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মাদামবিবিরহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত বিস্তৃত সাত কিলোমিটারজুড়ে ১১৯টি ইয়ার্ডের অবস্থান। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এতে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের।
আদালতের নির্দেশে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ১৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের যে কমিটি গঠন করেছে, তাতে রাখা হয়নি এ শিল্পের প্রতিনিধিদের। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচটি বৈঠকের তিনটিতে জাহাজ ভাঙা শিল্পের কেউ ছিলেন না। পরিবেশ মন্ত্রণালয় সচিবের অনুরোধে শেষের দুটি বৈঠকের একটিতে যোগ দিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে বিএসবিএর উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আনাম চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, '৩০ বছরের পুরনো এই শিল্প রক্ষায় সরকারেরও মাথা ব্যথা নেই। আমেরিকা থেকে শুরু করে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও জাহাজ ভাঙা শিল্পের ব্যবসা রয়েছে। পরিবেশ রক্ষার নামে আমাদের এখানে মামলা করে পদে পদে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে বিভিন্ন এনজিও। এগুলোর মধ্যে বেলা (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি) অন্যতম। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এনজিও গ্রিনপিস ও আন্তর্জাতিক আরেক এনজিও বেসেল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (বেন) হয়ে কাজ করে এই বেলা। ২০০৫ সাল থেকে বেলা আমাদের এই শিল্প যাতে বিকশিত না হয় সে জন্য কাজ করছে। এর আড়ালে রয়েছে বিদেশিদের স্বার্থরক্ষা। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নিয়ম মেনে জাহাজ আমদানি করতে হলে ১১০ দিনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে একজন ব্যবসায়ীকে। পৃথিবীর কোনো দেশে এই নিয়ম নেই।'
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সম্পর্কে বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রেজওয়ানা হাসানের (দালাল)সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'জাহাজ ভাঙার এই শিল্পে যারা মানুষ মারে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের আইন বলবৎ আছে। যারা আইন মেনে ব্যবসা করবে না, তাদের দায়দায়িত্ব তো নিতেই হবে।'
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মুনির চৌধুরী বলেন, 'রাতারাতি এ শিল্পের পরিবেশের উন্নতি ঘটানো যাবে না। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জাহাজ ভাঙা শিল্পের ইয়ার্ড পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে সময় দিতে হবে। অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে এ
ধরনের ব্যবসা বন্ধ করা কারো উদ্দেশ্য হতে পারে না। এসব কথা আমি বেলার কর্মকর্তাদেরও বলেছি।'
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



