ঘুমের ঘোরে তাড়াহুড়া করে ফোন ধরতে গিয়ে বিছানার পার্শ্বে রাখা পানির গ্লাশ ফেলে দিল নীচে।এই এক অভ্যাস শান্তার। পানির গ্লাশ রাখাই চাই পার্শ্বে, না হ’লে হয়তো ঘুমের ঘোরেই ও মারা যাবে, পানির অভাবে।মাঝে মাঝে যে হাত বাড়িয়ে নেয় না তা কিন্তু না। তবে তা কালে ভদ্রে।ফোনের ও পার্শ্বে পুরুষ নারীর মাঝামাঝি একটা কন্ঠ।মেয়েলী পুরুষ কণ্ঠ।‘May I talk to Shanta?”শান্তা বুঝে গেল,এটা বাংলাদেশ থেকে।বাবা মা বা বাসার কেউ নয়। ওরা জানে শান্তা একা থাকে, “হ্যালো, শান্তা” বললেই যথেষ্ঠ।এই মিনমিনে কন্ঠের অধিকারী যুবককে শান্তা চিনে ফেলল।আর মুহূর্তেই ওর সারা শরীরে বয়ে গেল আনন্দের শিহরণ, বিস্ময়ের বন্যা।আকাশ। এ শান্তার আকাশ।শান্তার সমগ্র পৃথিবী।শান্তা বরাবরই সুন্দর ভরাট কণ্ঠের অনুরাগী।কিন্তু এ কন্ঠের মুগ্ধতা ছাড়িয়ে দিল অমিতাভ কিংবা টম ব্রোক এর কণ্ঠকে।উপুড় হয়ে ফোনটা ধরেছিলো ।এবার খাটের পিছনে হেলান দিয়ে বসলো।কন্ঠে গোটা পৃথিবীর আনন্দ, বিস্ময় আর উচ্ছলতা নিয়ে বলল, “আকাশ তুমি?আমার নম্বর পেলে কোথায়?কেমন আছ তুমি? কোথায় তুমি?”
ঃ আমি চিটাগং এ শান্তা। তোমাকে আরও ফোন করেছিলাম।
ঃMessage রাখনি কেন?
ঃশান্তা, মানে... মিনমিন করছে আকাশ।
শান্তা অধীর হয়ে বলছে, “কি?বল আকাশ”। যেন মা তার শিশুর ভাষাহীন কান্না বোঝার চেষ্টা করছে।শান্তা বরাবরই এমন আকাশের জন্য।আকাশ সেটা জানে।
ঃআমার ফোন কার্ড প্রায় শেষ।
ঃতোমার নম্বর বল।
সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি কলম বের করল , এক টুকরো কাগজ়ের জন্য এদিক ওদিক তাকালো, হাত বাড়ালো, অবশেষে একটি বিলের কাগজ পেল।কি আর হবে! টেলিফোন বিল কিংবা ক্রেডিট কার্ডের বিল। তার এক কোণায় লিখে রাখলো বিশেষ যতনে।
ঃ ভালো থেকো।
ঃতুমিও।
বাকী পানিটুকু খেয়ে আলো নিভিয়ে দিল।কম্ফোর্টারে জড়িয়ে নিল নিজেকে।এটাও সেই ছোটবেলা থেকেই গড়া অভ্যাস। কাঁথায় জড়িয়ে আদর ছড়িয়ে দেয়া।ঘুমানোর চেষ্টা করছে।না ফাকিঁ দিচ্ছে ঘুমকে। এই একটু সময় দিচ্ছে সে নিজেকে। ভাবছে নিজেকে নিয়ে।মনে হলো কত যুগ। যাওয়া হয়না নিজের কাছে, কথা হয়না নিজের সাথে!ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা। ছোটা আর ছোটা।ক্লান্ত এ দেহটা বিছানায় এলিয়ে দেয়া মাত্রই ঘুমের ঘোরে অচেতন।স্বপ্ন টপ্ন ও দেখে বলে মনে হয়না।যদি ও বা দেখে স্বপ্নের মানুষগুলো এখন ইংরেজীতই কথা বলে বেশী।একদিন হঠাৎ রহিমার মাকে অনর্গল ইংরেজীতে কথা বলতে দেখে তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে উঠে বসে পড়ল , পানি খেল, ঘটনাটা বুঝতে চেষ্টা করল।তারপরই ভেঙে পড়ল অট্টহাসিতে।মনে পড়ল কাঁকনের কথা।ফার্ষ্ট ইয়ার কমন রুমে থাকত সবাই ,একদিন রাতে কাঁকনের সে কি অট্টহাসি!আজ ও মাঝে মাঝে ভাবে কি হ’য়েছিল ওর! স্বপ্ন দেখার কথা তখন না ।কেবল শুয়েছিল সবাই। কী এমন সুখের স্মৃতি ওর মনে পড়ে গেল যা কারো সাথে শেয়ার করতেও চাচ্ছিলনা।মানুষের মন! বড় অদ্ভুত তার গতিবিধি।শান্তা ও এখন জ়েগে জ়েগে একটি স্বপ্নের কথা ভাবছে। দেখছে একটি মেয়ে খুবই সাধারণ বেশ ভূষা কিছুটা এলোমেলো, ক্লন্তি,বিষণ্ণতা আর বিধ্বস্ততার ছোঁয়া সারা চোখে মুখে।পাড় হচ্ছে এক সাঁকো। ছোট্ট একটি নদী ,ছোট্ট চিকন বাঁশের এক সাঁকো।একটি বাঁশে তার দু’টো পা টলমল করছে আর একটি বাঁশে তার হাত ।ধরে ধরে খুব সাবধানে সে যাচ্ছে।নদীর ওপাড়টাও আহামরি তেমন কিছুইনা।এপাড়ের মতই।ফাঁকা ফাঁকা , ঘাষ টাষ নেই বললেই চলে।মাটি গুলো ও কেমন এবড়ো থেবড়ো উঁচু নীচু। উঁচু উচু ,প্রায় ডালপালা শূণ্য কয়েকটি গাছ।গাছগুলোর রং ও কেমণ ধূলো ধূলো সাদা।সবুজ কোথাও নেই। তবুও শান্তা যাচ্ছে। সাঁকোর ওপাড়েই দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক।বাদামী রং এর জুতা,অফ হোয়াইট প্যান্ট আর হালকা আকাশী রং এর ফুল হাতা শার্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে অসাধারণ রুপবান এক যুবক।নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে আছে শান্তার দিকে।এক পা দু’পা করে এগুচ্ছে শান্তা।এই তো আর একটু...।জীবনের একটা কঠিন সময়ে বেশ কয়েকদিন সে এ স্বপ্নটি দেখেছে। তারপর একদিন যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে আকাশের সাথে শান্তার আবার দেখা হলো আকাশ এসেছিল বাদামী রং এর জুতা,অফ হোয়াইট প্যান্ট আর হালকা আকাশী রং এর ফুল হাতা শার্ট পড়ে দাঁড়িয়েছিল কর্মজীবি গার্লস হোস্টেলের গেষ্টরুমের বারান্দায়। ঠিক একই ভংগীতে। বুকের কাছে বাঁধা দু’হাত।শান্তার বুকের মাঝে ঝির ঝির করে ঝরে বৃষ্টি, তির তির করে ব’য়ে যায় ছোট্ট নদী,চাঁদের মিষ্টি আলো তার সারা মুখে আর সূর্য্যের উজ্জ্বলতা তার চোখে, হাসিতে।কথা প্রসঙ্গে লজ্জ্বায় রাঙা হ’য়ে সে স্বপ্নের কথা সে একবার বলেছিল ও আকাশকে।আকাশ ও তেমনি নির্বিকার ভাবে তাকিয়েছিল ওর মুখের দিকে। তা ও কিছু বলুক আর না বলুক ঐ স্বপ্নটাই ছিল শান্তার শক্তি, শান্তার ঘুম পাড়ানিয়া গান।আবার যদি কখনো দেখা হয় লজ্জ্বায় রাঙা হ’য়ে শুনাবে আর এক ঘুম পাড়ানিয়া গানের গল্প।যা কিনা সে এখনই গাইবে।সেও এক মজ়ার কাহিনী।শান্তার এক নিরব প্রেমিক বড় ভাই, অন্য এক স্টেট থেকে ফোন করেন শান্তাকে, মন ভালো করিয়ে দেবার জন্য।এত পয়সা খরচ ক’রে ছাত্র মানুষ প্রায় প্রতিদিনই ফোন করে্ন।মিথ্যে অজুহাত নয়, সত্যিই শান্তার কথা বলার মত কিংবা গল্প করার মত মনের অবস্থা কখনোই থাকেনা। একদিন উনি পণ করে এসেছেন, আজ় শান্তার মন ভালো করেই দিবে।এ তথ্য, এ পথ্য, টুকিটাকি তুকতাক যা জানলেন সবই প্রয়োগ করলেন।কাজ কিছুতেই হ’লোনা।এরপর যা করল কাজ করল যাদুর মত।বললেন ,ঃ চোখ বন্ধ কর শান্তা।
ঃ হুম করলাম।
ঃসব কিছু ভুলে যাও। সুন্দর কিছু চিন্তা কর। সুন্দর কোন মুখ, সুন্দর কোন স্থান ,সুন্দর কোন স্মৃতি ......।সুন্দরতম কিছু, যা তোমার মন ভালো করে দেয়।
তারপর একটু সময় নিলেন।বেশ খানিকটা। তারপর বললেন ঃকি ভালো লাগছে?
ঃএকটূ মুচকি হেসে, হ্যাঁ, একটু একটু।
ঃএবার বল, তুমি কি ভাবলে! ঃ আশ্চর্য! আপনাকে কেন বলব? ঃআহা বলই না!
ঃভারী নাছোড় বান্দা তো আপনি!আচ্ছা শুনুন। ভেবেছি এবং দেখেছি একটি ছোট্ট বাচ্চার মুখ।ফুটফূটে ছোট একটি বাচ্চা।হ’লো? খুশী? যান এখন ঘুমাতে যান। গুড নাইট।
ফোন রেখে দিয়ে শান্তা তার টূকিটাকি কিছু কাজ সারল।তারপর শুয়ে পড়ল পরম নিশ্চিন্তে।পেয়ে গেছে সে তার আশ্রয়।রোদ বৃষ্টি ঝড়ে এতটুকু আশ্রয়।নিজেকে জড়িয়ে নিল কম্ফোর্টারে।বাম দিকে কাত হ’য়ে ডান হাত দিয়ে জড়িয়ে নিল একটি বালিশ।বন্ধ করল চোখ।আবার ফিরে গেল সেই স্বপ্নের জগতে...উত্তরা, এয়ারপোর্টের কাছে সেই লেক!এখন আর সন্ধ্যা নয়, বেশ ভালোই রাত হ’য়েছে।নেই সন্ধ্যার সেই কোলাহল। লোকেলোকারণ্য চিত্রটি আর নেই। এদিকে সেদিকে ছড়াণো ছিটান দু’একজন। লেক ঘেষে দাঁড়াণো রেষ্টুরেন্টটাও খালি।নৌকাগুলো একপাশে পড়ে আছে।দুলছে নিজের মত।একটি মেয়ে আর একটি ছেলে আছে দাঁড়িয়ে।নিজের অজান্তেই চুম্বকের মত চলে আসছে কাছাকাছি।খুব কাছাকাছি।ছেলেটির দু’হাতের মাঝ চলে এল মেয়েটির মুখ।ঠোঁটের কাছে ঠোঁট।তারপর স্বর্গ আর স্বর্গ...............।
শুরু সেই রাতে। তারপর কত হাজার বার যে ও ওখনে ফিরে গিয়েছে,নিয়েছে জ়ীবনের সুধা !আবার যদি কখনো আকাশের সাথে দেখা হয় বলবে এ কথা।না না তা কি ক’রে হয়!লজ্জ্বায় মরে যাবে ও।এমন কত শত চিন্তা! সুখ সুখ অনুভূতি!আবার ফিরে আসে সেই স্বর্গ...ঘুম ঘুম ঘুম।
চলবে...
;

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

