পিছনে বইএর ব্যাগ,ডান কাঁধে ঝোলানো হ্যান্ডব্যাগ,বা হাতে কফির কাপ আর ডান হাতে চাবি।ঘরের দরজা বন্ধ করে গাড়ীর দরজা খুলল।একে একে সবকিছু গাড়ীতে রেখে নিজেকে মুক্ত করে বসল ড্রাইভিং সিটে।গাড়ীটি স্টার্ট দিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকতে হয়। পুরানো গাড়ী।কত যে সতর্কতা! হাত বাড়িয়ে কফি হোল্ডারে রাখা কফির কাপটাতে একটা চুমুক দিল।ব্যাগ থেকে বের করল মাশকারা, খুব যত্নের সাথে দুচোখেরই উপরের পাতায় লাগালো। তারপর নিচের দু’পাতায় কোনরকম লাগিয়েই রেখে দিল। হাত দিল গাড়ীর স্টীয়ারিং এ।পথে যেতে যেতে শেষ করল কফি, বিভিন্ন স্টপ সাইনে দু’গালে লাগালো হালকা ক’রে ব্লাশন , ঠোঁটে লিপস্টিক।পার্কিং লটে এসে দেখে এখনও পাঁচ মিনিট বাকি আটটা বাজতে।স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
লাইব্রেরীর দরজার সামনে আসতেই চিচিং ফাক। দরজা খুলে গেল শান্তার জন্য।এখানে এসেই এটা খুবই উপভোগ করেছে শান্তা।নিজেকে কেমন রাণী রাণী মণে হয়।অধিকাংশ দোকান পাট অফিস আদালতের দরজাই এমন। অটোমেটিক।তবুও প্রতিদিনই নতুন করে উপভোগ করে শান্তা। লাইব্রেরীতেই পার্ট টাইম কাজ় পেয়েছে শান্তা। সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা ক’রে।
ঃগুড মর্নিং টানুজা।
অধিকাংশ বাঙালীর মত শান্তারও ডাক নামের সাথে সাথে একটি ভালো নাম ও আছে। সেটা হ’ল তনুজা শারমিন(Tanuuja Sharmin). নামের বানানটা নিয়ে সে কি করবে বুঝতে পারেনা। এটা কি হওয়া উচিৎ ছিলনা ‘Tonuja’? এখন আর এসব ভেবে কি হ’বে? সমস্ত দলিল পত্র এই নামেই হ’য়ে আছে।
ঃমর্নিং প্যাট (PAT). প্যাট্রিসিয়ার সংক্ষিপ্ত করণ।
ঃহাউ ওয়াজ় ইয়োর উইক এন্ড? পঞ্চাশোর্ধ এই প্যাটের এখন ও কত প্রাণচাঞ্চল্য,কত স্বপ্ন, জীবন এখন ও কত রঙিন .প্রতিটি উইকেন্ডেই তার কিছু না কিছু করবার থাকে।সোমবার কাজে এসে কত খুশী মনে যে তার গল্প করে, শুনলেও প্রাণ ভরে যায়।বেচারী শান্তা!একঘেয়ে জীবন।বড় ক্লান্ত।এ যে কেবল তৃতীয় বিশ্বের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে সীমাবদ্ধতার মাঝে বেড়ে ওঠা বা গড়ে ওঠা অভ্যাস তাই শুধু নয়। সময় কোথায়?জীবন যখন যেমন।কাজ,ক্লাশ, হোমওয়ার্ক ,রান্না,খাওয়া,বাজার করা,ঘর পরিস্কার করা, মাঝে মাঝে উইকেন্ডে ও কাজ করা।ছকে বাঁধা, ব্যাস্ত ,একঘেয়ে জীবন।গল্প করার মত কিছুই নাই।
ভাবছে কাল রাতের ঘটণাটা মানে ফোনের গল্পটা করলে কেমন হয়। একটা ফোন কল কেমন করে বদলে দিল অর সমগ্র পৃথিবী,বলবে নাকি সে গল্পটা? মনে মনে ভাবছে আর হাসছে।ভাবছে বলে কি লাভ! বুঝবেনা।হয়তো বলবে,
ঃএতই যদি ভালোবাস, তাহ’লে তুমি এখানে কেন?
কি ক’রে ওকে বিশ্বাস করাবে বা বোঝাবে প্লেন যখন আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছিল কে যেন শান্তার কানে কানে বলছিল
ঃ কি করছ শান্তা,এ সুযোগ আর আসবেনা। এখনই ঝাঁপিয়ে পড়।
শান্তা কাল বিলম্ব না করে ঝাঁপিয়ে পড়ল।চারিদিকে পানি আর পানি।অথৈ সমুদ্র। পাড় হচ্ছে শান্তা। দু হাত দিয়ে প্রাণ পণে সরিয়ে দিচ্ছে একের পর এক ঢেউ,সামনে যাচ্ছে শান্তা,চোখে মুখে পানির ছটা, তবু ও সামনে যাচ্ছে শান্তা,ওপাড়ে সে যাবেই।ওখানে যে আকাশ।তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে তার আকাশ।কিন্তু না। ধ্যান ভাঙল তার বিমানবালার মিষ্টি ডাকে। আকাশ নেই। তার অপাক্ষায় আকাশ নেই। তবে কি সে ভুল। আকাশ তাকে কখনোই ভালোবাসেনি? তা কি করে হয়। শান্তা নিজে ওকে জিজ্ঞেস করেছে,
ঃতুমি আমাকে কতটা ভালবাস আকাশ?
ঃতুমি যতটা মনে কর তার থাকে অ নে ক বেশী।
তবু ও আকাশ তাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেনি। বলেনি থেমে যেতে। সবার সুরে সুর মিলিয়ে বলেছে, ‘সামনে যাও’, ‘কত ভাগ্য তোমার’।
ঃএত কিছু আমি চাইনা। আমি শুধু তোমাকে চাই। আমার স্বপ্নকে চাই। একবার শুধু আমি জানতে চাই স্বপ্নের সাথে বসবাস। এ কেমন অনুভূতি?এমন কি আমার ঢাকাতে থাকারও কোন দরকার নেই।তোমার সাথে আমি মফস্বলে গিয়ে থাকব। তুমি বোঝ এসব? ঃবুঝি। ঃতাহলে? ঃআবার পাগলামী শুরু করেছ? ঃআমার একটা বিয়ে হ’য়েছে ,তোমার খুব খারাপ লাগছে ,তাইনা? বলেই নীচের দিকে তাকাল শান্তা। ঃছি ছি এসব কি আজে বাজে কথা বলছ তুমি! তুমি তো তুমি। আমার কখন ও মনে ও হয়না ওসব কথা।তুমি বিশ্বাস কর।এ তোমাকে ছুঁয়ে বলছি আমি। ঃতো? ঃআমার বাবা মা বুড়ো হ’য়ে গিয়েছেন শান্তা।এখন তখন অবস্থা!সবকিছু আগের মত হ’লে তো কোন সমস্যাই ছিলনা।এখন এত কমপ্লিকেটেড সবকিছু।ওঁরা ধাক্কাটা না সামলাতে পারলে, কিছু একটা হ’য়ে গেলে!আমি ভাবতে পারছিনা শান্তা।কেন যে এমন হ’লো! মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা ক’রে !
শান্তা মুখে কিছুই বললনা। লেকের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকল।আর মনে মনে বলল, ‘আকাশ, তুমি তো কোনদিন কিছুই বলনি।এমন কি একটিবার বলেও যাওনি। পাশের বাসার রাজপূত্রের মত ছেলেটি হঠাৎ ক’রে একদিন উধাও।কেউ কিছু জানেনা।কিছুদিন পর তোমার সেই আত্মীয় ও উধাও।কি যে কষ্ট কি যে কষ্ট!বুক ফেঁটে যায়।সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখি তুমি উঠে আসছ,একটু থমকে দাঁড়াই।হাসি।ছাদে যাই, রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছ তুমি।কালো রঙের একটি হাওয়াই শার্ট।বাতাসে নড়ছে। কি যে সুন্দর লাগছে তোমাকে!মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি আমি।আমার এ চোখকে তুমি চেন,এ চোখের ভাষা তুমি বোঝ।সেই তুমি আমাকে ও না বলে চলে গেলে।আমি ভাবতেই পারিনা।তারও বেশ কিছুদিন পরে, বুকের ভিতর অনেক সাহস আর আশা নিয়ে গেলাম সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে।বহু কষ্টে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে খুঁজ়ে বের করলাম তোমার এক বন্ধু,মাঝে মাঝে বাসায় আসত। একদিন ছাঁদেই আলাপ হ’য়াছিল, নামটা যেন কি?হ্যাঁ মনে পড়েছে, শাহীন।শাহীনকে।তোমার থেকে ওর সাথেই আমার কথা হ’য়েছে বেশী। মাঝে মাঝে ও যখন আসত,দেখা হ’ত ছাদে। ওর সুবাদে তোমার সাথে ও কথা হ’ত।ব্যাচমেট হ’লেই ও বন্ধু হ’য়ে যেত।ওর স্কুল কলেজ যে কোথায় মনে নেই। ঃআরে কি ব্যাপার, শান্তা যে হঠাৎ কি মনে ক’রে? ঃতুমি কি ক্লাশে যাচ্ছ? ঃআরে না না। কেমন আছ তুমি? চল ক্যান্টিনে গিয়ে বসি। এখানে তো মধুর ক্যান্টিন নেই,বায়োকেমিষ্ট্রির মত রশালো কিছুই নেই।আছে যত হাড্ডি গুড্ডি।তারই আবার পরীক্ষা সামনে।তুমি এসছ খুব ভাল লাগছে। ঠিক তখনই ক’টা মেয়ে গেল করিডোর দিয়ে।শাহীন হাত নাড়ল ওদের উদ্দেশ্যে।আমি তো ভয়েই মরে যাই। আমাদের ব্যাচের কারো সাথে আবার দেখা না হ’য়ে যায়।আমাদের সাথে পড়ত এমন বেশ কয়েকটা মেয়ে সলিমুল্লাহ মেডিকেলে এসেছে।তাই তাড়াতাড়ি ক’রে বলেই ফেললাম,
ঃআমার এক পরিচিতার ডাক্তার দেখান দরকার।উনি আর কি চাচ্ছিলেন আকাশ থাকলে ভাল হ’ত।পরিচিত তো তাই আর কি!ও তো প্রায়ই চিটাগং চলে যায়,তাছাড়া যে চুপচাপ।কজনেই বা ওকে চেনে! তাই তোমাকেই খুঁজে বের করলাম।তুমি তো দেখছি মহা পপুলার। ঃতোমরা ও জ়াননা কিছু? ঃকেন কি হ’য়েছে? ঃনা ওর খবর কেউ জানেনা।
ঃহ’লে থাকেনা? ঃকেউ কেউ বলে আমেরিকা চলে গিয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। মেডিসিন তেমন একটা পছন্দ করতনা তো।খুবই দুঃখজনক।আরে বাদ দাও।এসব পোলাপান!আমি ওনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। তুমি কোন চিন্তা ক’রনা।
ঃনা তোমার পরীক্ষা।দরকার নেই।তেমন জরুরী কিছু হ’লে জানাব। ধন্যবাদ।ভালো থেক। ঃতুমি ও ।এনিটাইম শান্তা। বান্দা হাজির হ’য়ে যাবে।
আমার নিজের কানকে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি।দিন যায়, মাস যায়,বছর যায়।এক বছর যায় দুবছর যায়।আমার অনার্স ফাইনাল হ’য়ে গিয়েছে।আমার এক কাজিন এসেছে আমেরিকা থেকে।ও আবার আমাদের সমবয়সী কয়েক কাজিনদেরকে নিয়ে গেল কক্সবাজার ঘুরতে।কত পয়সার মালিক ও ।ও দেখচ্ছে আমরা ও দেখছি।ঢাকার বাইরে বলতে গ্রামের বাড়ীতেই গিয়েছি এতকাল। এই প্রথম সত্যিকারের বেড়াতে আসা।
চলবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

