আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে
সেলিমা তাসনীম ছন্দা
প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনে,ডিনারের পর বাসার সবাই মিলে একসাথে বসে টিভি দেখা,একমাত্র এবং অন্যতম প্রধান বিলাসিতা। আর তা যদি হয় বাংলাদেশের কোন চ্যানেল!দেশ। দেশের নদী নালা পথ ঘাট,রিক্সা, বাস যানজট ।এবং মানুষ। কথা বলছে বাংলায়।এ যে কী অনুভূতি!জীবিকার তাড়নায়, জীবনের তাগিদে নিজের নাড়ীর বন্ধন ছিঁড়ে পাড়ি জমিয়েছে সাত সমুদ্র তের নদীর পাড়ে, হ’য়েছে প্রবাসী, সে ই শুধু জানে। আজ ও বসেছি টিভির সামনে। খবর শুরু হলেই আমার আড়াই বছরের মেয়ে বিরক্ত করতে শুরু করে প্রায়ই কোথা ও গান হচ্ছে কিনা খুঁজে দেখতে হয়। কিন্তু আজ আমার চোখ আটকে গেল একটি সংবাদে, খগড়াছরি গ্রামে কহিনূর নামের এক গৃহ বধুকে তার স্বামী য়ৌতুকের জন্য তালাক দিতে চায় এবং শারিরীক নির্যাতনের এক পর্যায়ে গায়ে কেরোসিন জ্বালিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।পাড়াপড়শি মহিলার আর্তনাদ শুনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।ডাক্তার তাকে গুরুতর ভাবে আহত বলে ঘোষণা দিয়েছেন।অত্যাচারী স্বামী দ্বারা গৃহবধু নির্যাতন এমনকি খুন নতুন কোন ঘটণা নয়। পৃথিবীর সব দেশেই কম বেশী এমন ঘটনা শোনা যায়।তবু ও আমি নির্বাক মূর্তির মত বসে আছি।বিদগ্ধ মেয়েটিকে দেখাচ্ছে।এখন পর্দায় সংবাদ পাঠক .পড়ছেন , ‘লোকাল থানার কর্মকর্তারা বলেছেন,এব্যাপারে কোণ উদ্যোগই নেয়া হয়নি কেননা কোন মামলা করা হয়নি’।আমার হাজব্যান্ড আমার পাশেই ছিল, কি ভাবছিল তখন জানিনা। তবে আমি ভাবছিলাম, ‘ও মাই গড!,আমার যদি এমন হয় কি হবে? এই প্রবাসে?’ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমার জানে পানি এল। আমার এমন হ’লে এখানকার ডাক্তারই পুলিশে খবর দিবে। এবং সাথে সাথে পুলিশ এসে কেস হাতে নিবে।না কোন মানবিক কারণে নয়।একজ়ন চিকিৎসক আইনগত ভাবেই বাধ্য যে কোন ধরণের নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘট্না পুলিশকে জানাতে।না হ’লে তার লাইসেন্স চলে যাবে।অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তির পাশাপাশি কাউন্সেলিং দিয়ে মানসিক ভাবে ও সাহায্য করা হয় যাতে ভবিষ্যতে এ ধরণের কোন অঘট্ন সে না ঘটায়।সরকারই সব করে। বেচারী কোহিনূর। ও ই ওর এ পরিণতির জন্য দায়ী। কে বলেছে ওকে দেশে থাকতে! লেখা পড়া শিখে কিম্বা ডিভি নিয়ে বিদেশে চলে আসবে। ওকে কেউ না করেছে? আমরা তো বলতে গেলে বিনা পয়সায় লেখা পড়া করেছি আরও উপরি হিসাবে বৃত্তি ও পেয়েছি এবং বিদেশে সব বিদ্যা কাজে লাগাচ্ছি। জীবণের নিরাপত্তা পেয়েছি।গণ্য মান্য, দেশের সব মাথাদের ছেলেমেয়ে কেউ কি দেশে আছে? সরকারের আর খেয়ে দেয়ে কোন কাজ় নেই এসব কোহিনূরদের জীবণের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববে!ঘূমাতে গেলাম।মাথার কাছেই ফোন কোন অসুবিধা হ’লেই 911 কল করব।সাথে সাথে পুলিশ,এম্বুলেন্স এসে হাজির হ’বে। আমি নিশ্চিন্ত আমার নিরাপত্তার জন্য কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেবার দরকার নেই।তবু ও ঘুম আসছেনা। বার বার ভেসে আসছে সে ই মুখ,আরো হজার হাজার মুখ। আমারই মত দেখতে।আমারই মত ভাত মাছ খায়।কিম্বা তেঁতুলের আঁচার, কাশূন্দি।কথা বল্ গান গায় ,স্বপ্ন দেখে আমারি মত বাংলায়।আমি এমন বিদেশ বিঁভূই এ এসে ও এত নিশ্চিন্ত , নিরাপদ । ওরা মায়ের কোলে থেকে ও কত অসহায়। যে দেশের মন্ত্রি মিনিষ্টার জজ় ব্যারিষ্টার সর্বত্রই মেয়েদের পদচারণা। সে দেশের মেয়েদেরই কেন আজ়ো বলতে শুনি,
‘ আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে
সৃষ্টি কর্তা পুরো সময় দেন নি
আমাকে মানুষ করে গড়তে
রেখেছেন আধাআধি করে’
(বাঁশিওয়ালা,রবীন্দ্রনাথ ঠাকূর)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


