“খুঁজি উত্তরে আমি খুঁজি দক্ষিণে
খুঁজি পূর্বে আমি খুঁজি পশ্চিমে
তুমি আছ এই হদয়ের প্রতিটি পাতায়
প্রিয় তোমার দেখা আমি কেমনে বল পাই”।
আমার দু’বছরের মেয়ে দেখি সুর মেলাচ্ছে এই গানের সুরে সুরে। কথা ফোঁটেনি এখন ও । আধো আধো বোলে ঐ সুর আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।ইশ ! সময়টাকে যদি ধরে রাখা যেত! অন্ততঃ ভিডিও ক’রে হ’লেও।কি আর করা! গাড়ীর স্টিয়ারিং হাতে মা আমি , ডান হাত দিয়ে RPT BUTTON এ চাপ দিলাম।কিছুক্ষণের জন্য হ’লেও স্থায়ী ক’রে নিলাম আমার মেয়ের আনন্দ আর আমার সুখের সাগরে ভেসে যাওয়া।ভাসছি আর ভাবছি।ভাবছি আর ভাসছি।এই যে খোঁজাখুঁজি এর শেষ কোথায়?আমার ছোট্ট সোনামণি ও একদিন খুঁজবে।খুঁজবে আর ঘুরপাক খাবে অনন্ত কালের এই রহস্যের মায়া জালে।একবার যদি ভেদ করা যায় সেই রহস্যের বেড়াজাল,বের হয়ে আসে সেই জন যার হুকুম ছাড়া গাছের একটি পাতা ও নড়েনা,যার শুরু ও নেই শেষ ও নেই,যে নিজেই নিজেকে সৃষ্টি ক’রেছে, সীমাহীন সেই শক্তিকে।সীমার মাঝে চলে আসে যদি সেই অসীম।কেমন হ’তো?হাসছেন?খোঁজ যে কেউ পায়নি তা কিন্তু না।কি অদ্ভুত তাইনা?একই ধাতুতে গড়া মানুষ আমরা!তবে হ্যাঁ, ওঁরা সবাই অনেক বড় “খোঁজক” ছিলেন সে বিষয়ে যেমন সন্দেহ নেই ঠিক তেমনি সবাই অনেক মহৎ ছিলেন সেটাও সত্য।তা না হলে বলুন এমন সাত সমুদ্র সেঁচে পাওয়া সাত রাজার ধন মানিক কেউ কি অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেয়?উদ্দেশ্য মহৎ ই ছিল।তবে শিক্ষক হিসাবে ততটা সফল নন। কত শতাংশ ছাত্র উনাদের সমপর্যায়ের ডিগ্রী পেয়েছে? মানে খোঁজ পেয়েছে?যুগ যুগ ধরে আমরা শুধু খুঁজেই বেড়াচ্ছি।
এই যে খুঁজছি ।দিন নেই রাত নেই খুঁজছি।হন্যে হয়ে খুঁজছি,পাগলের মত খুঁজছি।দেশ দেশান্তরে খুঁজছি। ঈবাদতে বন্দেগীতে খুঁজছি।ধ্যানে জ্ঞানে তপস্যায় খুঁজছি । যাকে খুঁজছি সেই অদেখার কথা না হয় বাদই দিলাম,যে খুঁজছে তাকেই কি আমি জানি?কে সে? আপনি নিশ্চয়ই বলছেন। “হাসালে বন্ধু’’! আ মি ।আমিটাই বা কে?শুরু কোথায়? শেষ কোথায়? কোথা থেকে এসেছে? দেখতে কেমন?এবার নিশ্চয়ই বলবেন।‘আয়নার সামনে দাঁড়াও’।হ্যাঁ, ‘দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে”।তাহ’লে চলুন আমরা মাইক্রোস্কোপের নীচে গিয়ে আর একটূ ভালো ক’রে দেখি।আপনার শরীরের যে কোন একটি অংশ,হাত পা কিংবা অন্ত্রনালী ,হৃদযন্ত্র যা আপনার খুশী ,মাইক্রোস্কোপের নীচে নিয়ে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ক’রে দেখুন ।কি দেখছেন?হ্যাঁ, আপনি যা দেখছেন আমি তা স্কুল জীবনে ফিজিক্স বই এ পড়েছি।এখন ও মনে আছে কমলা রং এর একটি বই।পদার্থ বিদ্যা।পদার্থ নিয়েই যত আলোচনা এখানে।অপদার্থ নিয়ে একটি কথা ও নেই।চুন থেকে পান খসলেই আমরা যে কেন নিজেদেরকে অপদার্থ ভাবি কিংবা অন্যকে তা আজ ও বুঝলামনা। কেননা অপদার্থ বিদ্যা একটি ও আমার হাতে এসে পৌঁছেনি।সবই পদার্থ।জড় পদার্থ(ইটপাথর,পানি বাতাস) জীব পদার্থ(মানুষ,গরু,পাখি)।ধর্ম,বর্ণ,কর্মের ওপর ভিত্তি ক’রে এদের ও আছে শ্রেণীবিভাগ। তা সে যে শ্রেণীভূক্তই হোক না কেন জাতিতে তারা সবাই পদার্থ।“ভিতরে সবার সমান রাঙা”।মাইক্রোস্কোপের নীচে আপনার হাত,এক টুকরা ইট কিংবা অথই সাগরের পানি সবই দেখতে একরকম। কেবলই কোষের সমাহার।এক একটি কোষকে আবার ভেঙে ফেলুন দেখবেন প্রতিটি কোষ গঠিত হ’য়েছে অণু পরমানু নিয়ে।তাদেরকে ও ভেঙে ফেলুন ,দেখতে চান কি আছে অন্তরে?পাবেন প্রোটন,নিউট্রন Energy.হ্যাঁ শক্তি। এটাই হ’লো সব কথার শেষ কথা এবং সেরা কথা। আপনি, আমি এ বিশ্ব এ মহাবিশ্ব সবই শুধু এনার্জিরই সমষ্টি।একে অন্যের সাথে ওতোপ্রতো ভাবে জড়িত । এই এনার্জিটাই বা কি? হ্যাঁ এনার্জি—“এ ছিল আছে এবংথাকবে।এ সব জায়গায় বিদ্যমান।একে সৃষ্টি ও করা যায়না ধ্বংস ও করা যায়না।কেবল রূপান্তরই সম্ভব” । এই এনার্জি কে? আপনি,আমি।ভাবতেই ভালো লাগছে।“আমি আছি থাকব”।আর হ্যাঁ আপনি যে ধর্মেরই অনুসারী হোননা কেন,আপনার স্রষ্টা-“ছিল, আছে এবং থাকবে।সে সব জায়গায় বিদ্যমান।তাকে সৃষ্টি ও করা যায়না,ধ্বংস ও করা যায়না। এবং আমাদের সবার মাঝেই বিদ্যমান”।দেখলেন তো, যে লাউ সে ই কদু।শুধু নামকরণেরই যা পার্থক্য।
“আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে”। নিজ়েকে ছোট করে দেখার কোনই কারণ নেই।কিংবা কারণ নেই অযথা অন্যের থেকে বড় করে বা আলাদা করে দেখার । কারণ সবাই আমরা একই ধাতুতে গড়া, একই সুত্রে গাঁথা। মহাবিশ্ব নামক বিরাট এক মালার এক একটি ফুল আমরা সবাই।যে যার মত সুন্দর এবং সম্পূর্ণ।আমাদের সবার মাঝেই আছে আসীম ক্ষমতা।এক একটি এনার্জি ফিল্ড।আমি আপনি আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব,আমাদের স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি,আমাদের সন্তান সন্ততি,চিন্তা চেতণা সবই এনার্জি।যা কখন ও ধ্বংস হবার নয়।শুধু রুপ বদলায়।আমরা একে অন্যের সাথে যুক্ত। দুঃখ কষ্ট ভালবাসা হাসি আনন্দ প্রতারণা যাই আপনার এনার্জি ফিল্ড থেকে নিঃসৃত হবে, ফেরত আসবে আপনারই কাছে আপনাকে পূর্ণ করতে। বেতার যন্ত্র কিভাবে কাজ করে তা আমরা জানি।ইথারের মাধ্যমে।মানুষের মুখের কথা।ধরা পড়ে এন্টিণায়। টেলিভিশন চ্যানেল গুলো ও একই ভাবে কাজ করে। কিংবা সেল ফোন ।বড় বড় টাওয়ারগুলো কি করছে?বিভিন্ন উৎস্য থেকে পাওয়া ভিন্ন ভিন্ন ফ্রিকোয়ান্সিগুলোকে ট্রান্সমিট করছে ।বিভিন্ন চ্যানেলগুলোর জন্য নির্ধারিত # টিপলেই সেই নির্ধারিত (একই) ফ্রিকোয়েন্সিকে আকর্ষণ করে। আমরা ও কাজ় করছি ঠিক একই ভাবে।আমাদের কথার মত কর্ম এমনকি চিন্তা থেকে উৎসরিত এনার্জি বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে ছড়িয়ে দিচ্ছি এ মহাবিশ্বে।ওরা আকর্ষণ করছে একই ফ্রিকোয়েন্সির যা কিছু আছে এ মহাবিশ্বে ফিরিয়ে আনছে আমাদেরই কাছে।ঠিক এজন্যই আমরা শুনে এসেছি “অবশ্যই কর্মফল নিয়্যতের ওপর নির্ভরশীল”।কিংবা ‘যা তুমি চিন্তা করতে পার তা তুমি করতে ও পার”।জুতা আবিস্কার থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ আবিষ্কার পর্যন্ত যাই বলুননা কেন কেউ না কেউ চিন্তা করতে পেরেছিল প্রথমে।কিংবা আমাদের দেশে গর্ভবতী মায়ের ঘরে টানিয়ে রাখা হয় সুন্দর মুখের ছবি,কাংখিত শিশুর ছবি ।মা দেখবে চিন্তা করবে এবং এই চিন্তাই বিশাল মহাবিশ্ব থেকে জন্ম দেবে তার শিশুর।কিংবা ধরেন আপনার পরিচিতদের মধ্য থেকে কোন একজন কি কখন ও কি বলেনি , ‘জান,এই গানটা সেই ছোটবেলা থেকেই আমার এত প্রিয়!আজ় দেখ এ গানই আমার জীবন হ’য়ে গিয়েছে।এ শুধু আমারই কথা বলছে’।বুঝুন তাহলে ,উনি এমন ভাবেই না গানটিকে হৃদয়াংগম করেছেন, মানে চিন্তায় ও চেতনায় ঠাঁই দিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন মহাবিশ্বের কাছে যে মহাবিশ্ব ও কার্পণ্য করেনি। নিয়মের ব্যাতিক্রম করেনি(কখনোই করেনা)।ঘটনা হয়ে ফিরে এসেছে তার জীবনে। এগুলো পুরানো কথা। আমরা সবাই জানি ।
অনেক বড় বড় দার্শনিক এবং মণিষীরা একথা জানতেন। তবে কি আমাদের ধর্ম প্রবর্তকরা কথা জানতেন না?তা কেন হবে?ওনারা বুঝতেন এনার্জির রহস্য।হয়তো জ়ানতেননা সঠিক প্রমাণ,ব্যাখ্যা।এ মহাবিশ্বের কোন কিছুই বাইরের থেকে বেড়াতে আসেনা।সবই আছে।শুধু বহিঃপ্রকাশের অপেক্ষা। “আমি তখনও ছিলাম যখন আদমের সৃষ্টি হয়েছিল” কিংবা তার ও আগে থেকে।কিংবা সমগ্র রূহু বা আত্মাগুলো একই সময়ে একই স্থানে ছিল আবার একই স্থানে জাগ্রত হবে। পরকালে। যে কাল কখনোই শেষ হবেনা।কিংবা এখন ও মৃত্যুই হয়নি। উঁনি বিধাতার কাছে আছেন আবার ফিরে আসবেন।এসব কি ওনারা বলেননি? বলেছেন।কেননা ণূরের সৃষ্টি। ণূর মানে আলো ।আলোই হ’লো শক্তি ,এনার্জি যা কি না অবিনশ্বর অনেকে হয়তো ভাবছেন আমি ধর্মকে বিজ্ঞান সন্মত করার চেষ্টা করছি এবং প্রফেটদেরকে বিজ্ঞাণী বানানোর।তা কিন্তুনা।আমি বিজ্ঞানকে মিউজিয়াম থেকে বের করে, আমার দাদী নানিদের পানের বাটায় (সাধারনের নাগালে) আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি মাত্র।আর প্রফেটদেরকে নিয়ে আমি মোটেই চিন্তিত না।ওরা এখন কোথায় আমি জানিনা। আমি চিন্তিত আমাকে আপনাকে আর আমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে।তবে শুধু অন্ধকার দিকটা তুলে ধরলেই তাঁদের প্রভাব থেকে মুক্ত হ’য়ে যাবনা।তাহ’লে আজ শুধু একটি ধর্মেরই অস্তিত্ত্ব থাকত। ওনারা একে অন্যের বিরুদ্ধে কম কাদা ছোঁড়াছুড়ি করেননি।।তবে কেন এত ভেদাভেদ ?এত রক্তপাত? এত কানামাছি খেলা? এ বড় কঠিন প্রশ্ন! হ’তে পারে তখন দরকার ছিল জুজুবুড়ির (দো্যখ,নরক) ভয় দেখানোর বা ক্যান্ডির (স্বর্গ, বেহেশত)লোভ দেখানোর।কিংবা রাজনৈতিক চাল।রাজনীতি আর ক্ষমতার লোভ এক বিরাট অংশ জুড়ে আছে ধর্মপ্রবর্তণের শুরুর ইতিহাসে। এখণ ও কি তাইনা? ধর্ম, রাজনীতি আর ক্ষমতার লোভ মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে এখন।
অনেকেই অবশ্য মনে করেন দো্যখের ভয় থাকা দরকার আছে।কিন্তু ক্ষমা চাইলেই বা স্বীকার করলেই কিংবা প্রতারণার অর্থ দিয়ে দান খয়রাত বা হজ়্ব করে এলেই তো এ ভয় কেটে যায় ।তার থেকে কি আমি যতটুকু নেগেটিভ এনার্জি বের করে দিব ততটুকুই ফেরৎ আসবে আমার কাছে এ ভয় থাকা বেশী দরকার না? আপনি কি চান? আপনার সন্তান কিংবা আপনার প্রতিবেশীর কোন ভয়টি থাকুক?আর স্বর্গের লোভ?কোনটি থাকা ভাল বলুন তো?হতাশ হ’য়ে স্বর্গের আশায় বসে থাকা না কি নিজের হাতেই নিজের স্বর্গ গড়ে নেয়া?হ্যাঁ, স্বর্গ আপনারই হাতে। আপনি যা চান মন থেকে, তা ই আপনি পাবেন। তবে হ্যাঁ।নিজ়ের চারপাশে তার প্রতিফলন ঘটাণোর মত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্যই প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে মন দিয়ে(আবার পুরানো কথা)।আপনিই সব শক্তির উৎস।আপনার চিন্তা থেকে উৎসরিত রশ্মি এ মহা বিশ্বে গিয়ে ঘটাবে ঘটনা। যার প্রতিফলণ ঘটবে আপণার জীবনে। আপনার চিন্তারই ফলশ্রুতি আপনার এ জীবন এবং যাপন। রবীন্দ্রনাথের “আমি” কবিতার কয়েকটি লাইন না বালেই পারছিনা---
আমারই চেতনার রঙে পান্না হ’লো সবুজ,
চুনী উঠলো রাঙা হ’য়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে---
জ্বলে উঠল আলো
পূবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম “সুন্দর”—
সুন্দর হ’লো সে।
............।
বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে???
যুগ যুগান্তর ধরে;
প্রলয় সন্ধ্যায় জপ করবেন-
বলবেন –“কথা কও,কথা কও”,
বলবেন- “বল ,তুমি সুন্দর”
বলবেন –“বলো, আমি ভালোবাসি”?
আর না ।গন্তব্যে পৌছেঁ গিয়েছি ।গাড়ী বন্ধ, গান বন্ধ। পিছনের সীটে তাকিয়ে দেখি মেয়ে আমার হাসছে।কণ্ঠে তার এখন ও সেই সুর।কার সীট থেকে বের করে কোলে তুলে নিলাম।আদর দিলাম ওর ছোট্ট নরম তুলতুলে গালে আর ওর সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠলাম
“তুমি আছ এই হৃদয়ের প্রতিটি পাতায়”।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


