বাবু তুমি বড় হয়ে কি হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ বাবুরাই হইত উত্তর দেবে- ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট কিমবা এ জাতীয় নামি এবং দামি কোন পেশার কথা। যেটা তার জন্য বলা খুবই সহজ। কিন্তু, কিছুটা বড় হয়ে জীবনের বাস্তবতায়- যখন বাবুটার জন্য এ জাতীয় পেশায় যাওয়াটা আর সহজ থাকে না, তখন বাধ্য হয়েই তাকে অন্য কোন পেশা গ্রহণ করতে হয়।
আর পেশা গ্রহনের ক্ষেত্রে ১ম মাপকাটি গুলোর মধ্যে অন্যতম বিষয় হিসাবে থাকে টাকা পয়সা আর সম্মান। তবে, মানতে না চাইলেও চুরান্তভাবে যে বিষয়টার উপর পেশা নির্বাচন নির্ভর করে তা হল সামর্থ। আর যারা কোন নামি দামি পেশা গ্রহন করতে পেরেছে- তাদের কথা বাদ দিয়ে, অনান্যদের দিকে তাকালে আমরা অবশ্যই দেখতে পাবো, সবাই তার সামর্থের মধ্যে টাকা পয়সাওয়ালা পেশা পাবার জন্য কত কষ্ট স্বীকারে রাজী। এজন্যই আমাদের দেশের ছেলেরা প্লেনের চাকার সাথে অথবা উত্তাল সমুদ্রে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে হলেও যেতে চায় কোন স্বগীয় ভীনদেশে। আবার কেও কেও হইতবা জীবন যুদ্ধ শুরু করতে চাই ব্যবসা দিয়ে, সামর্থের মধ্যের এজাতীয় ব্যবসায় মোটামুটি টাকাপয়সা থাকলেও সন্ত্রাসীদের সম্মান অন্তত অনান্য অনেক পেশার থেকে অনেক বেশি। আর সেজন্যই যারা সাহসী তাদের অনেকেই আবার সন্ত্রাসকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নেয়।
কিন্ত, এসবের কোনটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেবার সামর্থ ছিল না আবুল কাশেমের। কারণ আবুল কাশেম যখন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র, তখন অজানা এক রোগে তার দুই হাত আংশিক এবং দুই পা পুরোপুরিভাবে অবশ হয়ে যায়।
১৯৯৮ সালের কথা, আর কয়েকটা সাধারন ছেলের চাইতে মনে হয় একটু বেশিই গুনের অধিকারী ছিল আবুল কাশেম। যেমন, ছেলেবেলায় মঞ্চে লালনের গান গেয়ে ৪৫০০টাকা পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ টাইফয়েড না কি যেন জ্বরে ৫মাস ভোগার পর, একদিন রাতে আবুল কাশেমের বাড়ীর মানুষ তাকে মৃত মনে করে দাফনের প্রস্তুতি পর্যন্ত গ্রহণ করে। তখনই পাশের বাড়ীতে অন্য এক রোগী দেখতে এসেছিলেন স্থানীয় এক ডাক্তার। কান্নাকাটি দেখে আবুল কাশেম এর বাড়ীতে এসে ঐ ডাক্তার বুঝতে পারেন তিনি তখনো মারা যান নি। পরবর্তিতে ঐ ডাক্তারের চিকিৎসায় জীবন রক্ষা পেলেও চির জীবনের জন্য পঙ্গুত্তকে বরণ করে নিতে হয় আবুল কাশেমকে ।
দরীদ্র পরিবারের পঙ্গু সদস্যের জন্য ভিক্ষা বৃত্তিই হতে পারত সামর্থ্যের মধ্যে সব চাইতে সহজ পেশা। হইত সম্মান নেই, কিন্তু বেশ ভাল মানের টাকা পয়সা আয়ের সহজ একটা পথ ভিক্ষা বৃত্তি। কিন্তু অজানা রোগটি শারীরিক ভাবে পঙ্গু করতে পারলেও মানসিক ভাবে কখনই অসুস্থ করতে পারেনি আবুল কাশেমকে। তাইতো ভিক্ষা বৃত্তিকে পেশা হিসেবে না নিয়ে, পরিবার ও এলাকাবাসীর সহযোগীতায় গত ১২ বছর ধরে শিলাইদহের কুঠি বাড়ীর গেটের সামনে ছোট্ট মুদিখানার দোকান দিয়ে ব্যবসা করছিলেন তিনি। শ্রমজীবি ৫ভাই আর ২ বোনের গরীব পরিবারে বাস্তবিক কারনেই সারা জীবন আবুল কাশেমের দেখাশোনার ভার তার ভাই বোনদের পক্ষে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই বছর দশেক আগে বিয়ে করেন তিনি। ২মেয়ে এবং ১ ছেলেসহ এখন তার ৫ জনের পরিবার। শিলাইদহ কুঠিবাড়ীর রিসোর্ট এর পাশের ছোট্ট মুদিখানার দোকান দিয়ে বেশ ভালভাবেই পরিবারের ভরণপোষন করছিলেন তিনি। আবার ছোট বেলা থেকেই ধর্মীও চেতনা বেশ পাকা পোক্তভাবে আশ্রয় পেয়েছিলি আবুল কাশেমের মনে। তাইতো গত রোজার দুই সম্পাহ আগেও ৩ দিনের তাবলীগ জামাতে গিয়েছিলেন তিনি এবং তখনই এক রাতে তার অরক্ষিত দোকানের সকল মালামাল কে যেন চুরি করে নিয়ে যায়। এমন একজন পঙ্গু মানুষের দোকানে কে চুরি করতে পারে তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না কেউ। আবার তার মতন সামান্য মানুষের ছোট্ট দোকানে চুরির ফলে সার্বিক আইন শৃঙ্খলার সূচকে নূন্যতম পরিবর্তনও হয় না। কাজেই এ চুরির বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ের বা জেলা পর্যায়ের আইনশৃখ্যলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাথা ব্যাথাত দূরের কথা, সামান্য চিমটির ব্যাথা অনুভবেরও কোন কারণই থাকতে পারে না।
চুরির ফলে তার একমাত্র আয়ের পথটা বন্ধ হয়ে গেলেও শিলাইদহ বাজারের সাধারণ মানুষের সহযোগীতায় ৪০০/৫০০ টাকা পুজি জোগার করে আবুল কাশেম তার হুইল চেয়ারটাকেই একটা মোবাইল সপ বানিয়ে গত ৪/৫ দিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন লালনের আখড়ায়। এই সামান্য ৪০০/৫০০ টাকার পুজির ব্যবসায় যে ৫জনের পরিবারের ভরণপোষন কখনই সম্ভব না তা আবুল কাশেম নিজেও জানেন। তবে জীবন ধারনের জন্য কারো কাছে হাত পাততেও প্রচন্ড অনিহা তার। এই অনিহা আর কতদিন ধরে রাখতে পারবেন তা নিয়ে তিনি নিজেও যথেষ্ঠ সন্দিহান। হইত জীবনের প্রয়োজনেই বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত ভিক্ষা বৃত্তিই গ্রহণ করতে হতে পারে তাকে। আমরাও জানি না আবুল কাশেমের একার পক্ষে তার ব্যবসাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিতে আনা আদতে সম্ভব হবে কিনা। তবে আমরা এতটুকু বিশ্বাস করি সমাজের সামর্থবানদের একবারের জন্য সহযোগীতা পেলে আবুল কাশেম আবারো ব্যবসার মাধ্যমে পূর্বের মতন নিজের পরিবার নিজেই চালাতে সক্ষম হবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে নভেম্বর, ২০১০ রাত ২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


