আমার এই গল্পটি এ বছররে অমর একুশে বইমলোয় ঝড়ের শেষে নামক গল্পের বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের গল্পটি পুনঃপ্রকাশ করা হল।
মাতৃক্রোড়ে
পারভেজ রানা
মোরশেদ তন্ময় হয়ে শুনছিল মেয়েটির আবৃত্তি। কিছুটা অস্ট্রেলিয় আর কিছুটা বাংলা মিশ্রিত উচ্চারণ ভঙ্গি। তার আন্তরিকতা স্পষ্ট। বিদেশ বিভুঁইয়ে তার মাতৃভাষায় আবৃত্তি শুনতে পেয়ে মনটা উদাস হচ্ছিল বার বার দেশের টানে। কিন্তু মেয়েটি কী অস্ট্রেলিয় নাকি বাংলাদেশী, অস্ট্রেলিয়ায় বড় হয়েছে? তার মনের মধ্যে ক্রমশ প্রশ্নটা জোরালো হয়ে উঠছিল। অস্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশীদের একটা সংগঠনের অনুষ্ঠান। মেয়েটি কি সদস্যা? অনুষ্ঠান শেষে মোরশেদ গিয়ে সাবেরকে ধরল, মেয়েটি সম্বন্ধে জানতে। সাবের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। সাবের জানালো, মেয়েটি তাদের সদস্যা নয়। নাম নির্ঝরা। বাংলাদেশ সম্বন্ধে তার কৌতুহল আছে। বাংলা জানে। মাঝে মাঝে অনুষ্ঠান হলে আসে। ঘটনায় মোরশেদ আগ্রহী হলো মেয়েটির প্রতি, তার এই আগ্রহের কারণ কী? সে সাবেরের কাছ থেকে মেয়েটির ফোন নম্বর সংগ্রহ করল।
‘আপনার কবিতা আবৃত্তি আমার ভালো লেগেছে। অনুষ্ঠানে অনেকের মাঝে কথাটা বললে খেলো শুনাতো, তাই ফোনে বলছি। আপনি বাঙালী না হয়ে কী করে এত ভালো আবৃত্তি করলেন’? মোরশেদ জিজ্ঞেস করল।
নির্ঝরা হেসে ফেলল। মোরশেদ অপ্রস্তুত। হাসছেন কেন?
আমি বাঙালী, তাই।
আপনার কথা শুনে তা মনে হয়নি। আর আমরা জানি আপনি একজন অস্ট্রেলিয়।
ঠিকই জানেন। আমার বাবা একজন অস্ট্রেলিয়, কিন্তু মা বাংলাদেশী।
আপনার উচ্চারণে অস্ট্রেলিয় টান আছে। বাঙালীরা বাংলা ওভাবে উচ্চারণ করে না।
ঠিকই বলেছেন, আমিও আপনার মত বাঙালীদের বাংলা উচ্চারণ করতে পারতাম, যদি আমার মা আমাকে বাংলা শেখাতেন।
তিনি কোথায় এখন?
পরপারে, আমাকে একা করে অনেক আগেই চলে গিয়েছেন।
আমাকে মাফ করবেন, না জেনে কষ্ট দিলাম।
না ঠিক আছে। বিষয়টি এতই পুরোনো ওটা আমাকে আর কষ্ট দেয় না। আচ্ছা আপনি কবিতা লিখতে পারেন?
পারি। কেন?
আমাকে আপনার কবিতা দেবেন? আবৃত্তি করব।
মোরশেদ নির্ঝরাকে তার লেখা সমসাময়িক একটা কবিতা পাঠায়। কলেজ জীবন থেকেই মোরশেদের লেখালেখির অভ্যাস ছিল। কবিতা লিখতে সে আরাম বোধ করে। কবিতা পেয়ে নির্ঝরা ফোন করে।
আমাকে মা করবেন, আমি বাংলা পড়তে পারি না।
তা হলে, কবিতা আবৃত্তি করেন কী করে?
বাংলা শুনে শুনে ইংরেজী অরে বাংলা লিখে নিই।
আপনার মায়ের ভাষা আপনি জানেন না!
মা তো শেখাতে পারেননি। আপনি আমাকে শেখাবেন?
মোরশেদ রাজী হয়। ক’দিনেই নির্ঝরা বাংলা লিখতে, পড়তে শিখে ফেলে। লেখা শিখে নির্ঝরা প্রথম যা লেখে তা হলো, ‘তোমাকে ভালোবাসি’। মোরশেদ গুরুত্ব দেয়নি। তারপর আপনি থেকে তুমি। অতঃপর....
মোরশেদ কিছুই বুঝতে চায়নি।
তারপর একদিন নির্ঝরা তার মাতৃভূমিকে দেখতে চায়। তার বাবাও তাকে অনুমতি দেন। তার মায়ের কবর স্থান বাংলাদেশে। কর্ম সূত্রে বাংলাদেশে গিয়ে প্রেম, পরিণয়। তারপর একসময় অকালে তাদেরকে ছেড়ে চলে গেল। নির্ঝরার বাবাও পাড়ি দিলেন নিজের দেশে। মোরশেদের স্কলারশিপ-এর মেয়াদ শেষ হয়ে এসে ছিল। সে দেশের পথে রওনা দিলো। নির্ঝরা তার সঙ্গী হলো। তার বাবা মোরশেদের সাথে তার সম্পর্কের ব্যাপারটা আগেই আঁচ করেছিলেন। মেয়ের স্বাধীকারকে সম্মান করেছেন। মোরশেদ ব্যাপারটা বুঝলেও আমলে নেয়নি।
নির্ঝরা তার মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করল মোরশেদের সাথে। নির্ঝরা তার মায়ের কবর জিয়ারত করতে গেল তার নানা বাড়িতে। মোরশেদও তার সঙ্গী হলো। মোরশেদ তাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতি সৌধ, চার নেতার কবর, রায়ের বাজার বধ্যভূমি প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান দেখালো। নির্ঝরা বাংলাদেশের জন্য তার ভিতরে ব্যাপক টান অনুভব করল। নির্ঝরার ফেরার দিন ঘনিয়ে এলো। নির্ঝরা সিদ্ধান্ত নিলো যাবে না। মোরশেদ তাকে বুঝালো, সে না গেলে তার বাবা একা হয়ে যাবে। নির্ঝরা বলল, ‘আমি আমার মাতৃভূমি ছেড়ে কোথাও যাবো না। তুমি ভেবো না তোমার কারণে আমি এখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি ব্যাপারটা পছন্দ না করলে, আমি ভেবে নেবো তোমার অনুভুতি বলতে কিছু নেই। তোমার প্রতি আমার এতদিনের যে উন্নত ধারণা ছিল তুমি তাতে চিঁড় ধরিয়ো না’।
নির্ঝরা তার বাবাকে চিঠি লিখেছে সে তার মাতৃভূমিতে বসত গড়বে। তার বাবা কি তার কাছে ফিরে আসবে? যেমনি করে তার মাকে ভালোবেসেছিল তেমনি করে এ দেশকে ভালোবাসবে?
গল্পটি নিয়ে পরবর্তীতে নাটক করার পরিকল্পনা আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

