somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সমাজ ভাবনা: গরীব মানুষ কোথায় যাব?ে

২৩ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ৮:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সপ্তাহখানেক আগে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের হয়ে বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণের জন্য ঢাকার উপকণ্ঠে মেরাদিয়া, দাসেরকান্দি এসব এলাকায় গিয়েছিলাম। আমরা রামপুরা থেকে ট্রলারে করে গিয়ে দ্বীপের মত জেগে থাকা বাড়িগুলোর পানিবন্দি মানুষকে সামান্য ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছিলাম। আমাদের ট্রলার দেখেই চোখের পলকে চারদিক থেকে অগুনতি নারী-পুরুষ-শিশু ছোট ছোট নৌকায় করে আমাদের দিকে ছুটে আসে। সেদিন আমাদের সাথে ছিল কেবল চাল আর মুড়ি। সেটা নেবার জন্য মহিলাদেরও কী প্রাণান্তকর চেষ্টা! নৌকা ডুবে যাবার ভয় নেই, লক্ষ্য কেবল এক প্যাকেট ত্রাণসামগ্রী। হাতে পেলেই তাদের সাফল্যের হাসি। কত অল্পতে তৃপ্ত আমাদের দেশের গরীব মানুষেরা। আমরা যেসব এলাকায় গেছি, সেখানকার বাড়িঘর ও মানুষের চেহারা দেখে মনে হয়েছে এরা হতদরিদ্র নন। নিম্ন আয়ের মানুষ, বন্যার কারণে অসহায় হয়ে বাড়িয়ে দিয়েছেন হাত একটুখানি ত্রাণের আশায়। সহজেই যাওয়া যায় বলে অনেক সংস্থাই গেছে এসব এলাকায় ত্রাণ বিতরণে। কিন্তু দেশের দুর্গম প্রত্যন্ত এমন অঞ্চলও আছে যেখানে বন্যার এক সপ্তাহ পরও কোন ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। কল্পনাও করতে পারি না, সেসব এলাকার মানুষ কিভাবে বেঁচে আছেন? তবে অনুমান করতে পারি তাদের জীবন সংগ্রামের কথা, লাখো সালাম জানাই তাদের দুর্জয় মনোবল আর সাহসের প্রতি। কারো সাহায্যের অপেক্ষা না করেই তারা বেছে নিয়েছেন নিজেদের বাঁচার পথ।

সামরিক বাহিনী সমর্থিত বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকাতে আমরা দেখেছি অবৈধ জায়গা থেকে বস্তি উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজধানীর একটা বিরাটসংখ্যক নিম্নবিত্ত ও হতদরিদ্র মানুষ বস্তিতে বাস করেন। তাদের বিকল্প বাসস্থানের কথা চিন্তা না করেই ভেঙে দেয়া হল এসব বস্তি। রিকশা আরোহী আমার এক বন্ধুকে ক্ষতিগ্রস্ত রিকশাওয়ালা বলেছিল, স্যার আমার পাঁচ দিনের বাচ্চা নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব? তার এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে? আমার আপনার মত তার কি এদেশে খেয়ে-পরে কোনমতে বেঁচে থাকার অধিকারও নেই? আমরা কেবল প্রশ্নই করতে পারি। সদুত্তর দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই।

ফুটপাত পরিষ্কারের নামে হকার উচ্ছেদ করা হল। আমরা কি এ সিদ্ধান্ত নেবার আগে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যাপারটাকে বিবেচনা করেছি? দেশের অর্থনীতির সাথে এদের সম্পর্কের কথা ভেবেছি? কত পরিবার এদের আয়ের উপর নির্ভরশীল তাকি আমরা হিসাব করেছি? সাতদিন রাস্তাঘাটে জিনিসপত্র বিক্রি করে যে রোজগার হত, তা কি একদিন বিকল্প জায়গায় পসরা সাজিয়ে তা উপার্জন করা সম্ভব? এসব উচ্ছেদ হওয়া অনেক হকার বিকল্প জীবিকার পথ বেছে নিয়েছে- যা সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। চুরি-ছিনতাই বেড়ে যাবার কারণ কি? সবচেয়ে বড় কথা গরীব মানুষকে আমাদের রাষ্ট্র যখন ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করতে পারে না, তখন এ ধরনের অমানবিক পদক্ষেপ নেবার আগে দশবার চিন্তা করা প্রয়োজন।

গত মার্চে আমি সড়কপথে নোয়াখালী গিয়েছিলাম। পথে যেতে যেতে রাস্তার পাশে অনেক বাজারেই দেখলাম দোকানঘর ভেঙে পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। গ্রামের ছোট ছোট বাজারেরও একই দশা। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের একটা মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগানো হয়েছে। সরকারের কি এ ধরনের কোন সিদ্ধান্ত ছিল? মনে হয় না। কারণ কয়েকদিন পরই দেখলাম প্রধান উপদেষ্টা সম্ভবত জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। বাজারের এসব দোকান ভেঙে কি বিরাট অর্জন হল আমাদের? ক্ষুদ্র দোকানীদের যে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেল, সেটা কি একবারও আমরা ভেবে দেখেছি?

মধ্য আয়ের মানুষদেরই যখন আজ দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তখন আমাদের দেশের গরীব মানুষেরা কিভাবে জীবনধারণ করছে এ ব্যাপারে আমরা উদাসীন। অন্যকে নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় ও মানসিকতা আমাদের নেই। আমরা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু ত্রাণ বিতরণ করেই আমরা সন্তুষ্ট থাকি যে, আমরা দুঃখী মানুষের জন্য আমাদের কর্তব্য সম্পন্ন করেছি। দেশের নীতি-নির্ধারক থেকে শুরু করে আমরা সবাই গর্ব করে বলি, আমাদের দেশে কেউ না খেয়ে মারা যায় না। কিন্তু যে জীবন মানবেতর, কেবল দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য নিরন্তর যে সংগ্রাম তা কখনো একটা দেশের জন্য সম্মানের হতে পারে না। দেশের সংখ্যালঘু বিত্তবান মানুষ সংখ্যাগুরু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন সংগ্রামের প্রতি উদাসীন থাকবে- এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। সরকারকে হতে হবে মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন গরীবের আশ্রয়স্থল। বিত্তবানদের ভাবতে হবে বিত্তহীনদের জন্য। আমাদের সমাজে দিনে দিনে ধনী-গরীবের ব্যবধান যে বেড়েই চলেছে তা একটা বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। সময় থাকতে এ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা দরকার। সরকারের বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রয়োজন যাতে আমাদের দেশের গরীব মানুষেরা তাদের ন্যূনতম চাহিদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। সংস্কার কেবল রাজনীতি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও সংস্কার প্রয়োজন।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×