থ্রি কমরেডস আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়া এক উপন্যাস। জীবনবোধশূন্যতা আর মানুষের মানবিক-আবেগিক দিকগুলো তুলে ধরে নব উপলব্ধি আনা এক গ্রন্থ। যতোবারই আমি থ্রি কমরেডস-এর কিছু নির্দিষ্ট লাইন পড়ি, তখনই ফিরে যাই অদ্ভুত শূন্যতায়, জীবনবোধের নতুন আত্মোপলব্ধিতে।
থ্রি কমরেডস মূলত জার্মান ভাষায় রচিত একটি কালজয়ী উপন্যাস। বিংশ শতাব্দীর অমর জার্মান লেখক এরিক মারিয়া রেমার্কের একটি মাস্টারপিস এটি। লেখকের আরো কিছু উপন্যাসের সঙ্গে এদেশি পাঠকরা পরিচিত - অল কোয়ায়েট অন দি ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, দি রোড ব্যাক তারই সৃষ্টি। এরিক মারিয়া রেমার্কের জন্ম জার্মানির একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার বয়স যখন আঠারো, স্কুলে পড়া তখনো শেষ হয়নি, এমন সময় বেজে ওঠে প্রথম মহাযুদ্ধের দামামা। স্কুল ছেড়ে দিয়ে কিশোর রেমার্ককে তৎক্ষণাৎ যোগ দিতে হয় সেনাবাহিনীতে। সোজা চলে যান ফ্রান্সে, যেখানে ফ্রন্ট লাইন পশ্চিম রণাঙ্গন। চার বছর অক্লান্ত, বিষাদময়, যন্ত্রণাদায়ক যুদ্ধ শেষে রেমার্ক ধ্রুব বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন তার পরিচিত বন্ধু-বান্ধব আর কেউই বেচে নেই, দৈববলে তিনি বেচে আছেন কিন্তু বড় নিঃসঙ্গ, বড় একা। ফিরে এসে তার জীবনবোধকে হাতিয়ার করে তিনি একটির পর একটি উচ্চাঙ্গের উপন্যাস লিখতে শুরু করেন যা তাকে এনে দেয় গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা। থ্রি কমরেডস বিংশ শতকে ত্রিশের দশকের জার্মানির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক চিত্রের প্রতিরূপ, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল রাষ্ট্রযন্ত্র, অসার শাসন ব্যবস্থা জার্মানিদের মধ্যে এনে দেয় সর্বগ্রাসী ভাঙন। এখানে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আমি মিল খুজে পাই। পৃথিবীতে যতো চরমপন্থার জন্ম হয়েছে তার সূতিকাগার হলো এ ধরনের আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
রবার্ট লোকাম্প, ফ্রেডরিক লেনতস, অটো কোস্টার যুদ্ধ ফেরত তিন কমরেড, চারদিকে ভাঙন এ পরিস্থিতিতেও তারা স্বপ্ন দেখে নতুন করে বাচার। গতানুগতিক জীবন থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু ভাবার। তারা স্বপ্ন দেখে, তারা স্বপ্ন আনে, তারা শুধু যুদ্ধের নয়, চিরকালেরই যোদ্ধা। এর মধ্যে প্রধান চরিত্র বব (রবার্ট লোকাম্প) এর জীবনে আসে প্রেম - প্যাট্রিসিয়া। বব-এর ভাষায় প্যাট। বব জীবনের নতুন সুরে তরঙ্গায়িত হয়, কারো জন্য তাকে বাচতে হবে, বাচার মতো বাচা। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত প্যাট এক সময় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলে। বন্ধুর এ দুঃসময়ে এগিয়ে আসে অকৃত্রিম দুই বন্ধু। তাদের শেষ সম্বল জীবন ধারণের একমাত্র হাতিয়ার গারাজ বিক্রি করে বন্ধুর হাতে অর্থ তুলে দেয় নিঃসঙ্কোচে।
বইটিতে আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় তিনজনের বন্ধুত্ব। আমি শিখেছি বন্ধুত্ব কি? কেন এটা মানুষের জীবনে দরকার?
বব আর প্যাটের প্রেমও আমাকে নাড়া দেয়। সব আশা হারানো, সব পথ হারানো একজন মানুষও প্রেমের কারণে কতোটা মোটিভেটেড হয়, কতোটা সৃজনশীল হয়, কতোটা স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে এ বইটিই আমাকে শেখায়। বইটির যে সমাজের চিত্র লেখক একেছেন তার সঙ্গে আমি মিল পাই আমাদের দেশের পরিস্থিতির। এতো হতাশা, এতো যন্ত্রণা, এতো আশাভঙ্গ, এতো বিশ্বাসঘাতকতা, এরপরও এ দেশবাসী বেচে আছে নতুন কোনো সূর্যোদয়ের, নতুন কোনো স্বপ্নোদয়ের আশায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


