খুব গোলমেলে, নিজেও ভাল জানি না। তবে আছে,এই ঢের।

জেগে আছে বাংলাদেশ

২৬ শে মে, ২০০৭ রাত ৯:৪৬

শেয়ারঃ
0 0

রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
চমকিয়া জাগে ঘুমন্ত বনভূমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
দুরন্ত অরণ্যা গিরি নির্ঝরিনী
রঙ্গে সঙ্গে লয় বনের হরিণী
শাখায় শাখায় ঘুম ভাঙায়
ভীরু মুকুলের কপোল চুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি



প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় টুটুকে দেখি৷ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়৷ কখনো বারান্দার থামে হেলান দিয়ে তো কখনো বা রেলিংএ ভর দিয়ে৷ এটা ওর রোজকার নিয়ম, যখন থেকে ও এখানে এসেছে, তখন থেকেই দেখছি ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে৷ না৷ টুটু সারাদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে না, আমি স্কুলে চলে গেলেই ও বাড়িরে ভেতরে চলে যাবে৷ নিজে কলেজে যাওয়ার জন্যে রেডি হয়ে বারান্দার নিচেই হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হিরো সাইকেলটা নিয়ে চলে যাবে কলেজে৷ আমি যখন স্কুল থেকে ফিরি তখনও আবার দেখি, ও এসে দাঁড়িয়েছে৷ কখন বাড়ি ফেরে কলেজ থেকে জানি না তবে আমি বাড়ি ফেরার আগেই ও ফিরে আসে আর এসে দাঁড়ায় বারান্দায়৷ এই দৃশ্যের সাথে এখন মোটমুটি সকলেই পরিচিত৷ সবাই জানে, টুটু কখন, কোন সময়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে৷ এই নিয়ে বেশ হেনস্থাও হয়েছে ওর, আম্মুই সেটা করেছে৷ ওদের বাড়ি গিয়ে বহুবার নালিশ করে এসেছে ওর খালার কাছে, কেন ও এভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে আমার স্কুলে যাওয়া-আসার সময়, আর বিকেলে খেলার সময়৷ নালিশ করার পর দু-একদিন বন্ধ থেকেছে ওর বারান্দায় এসে দাঁড়ানো, তারপর আবার যে কে সেই৷ মুর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের বারান্দার দিকে চোখ রেখে৷ এছাড়া আর কোন উত্পাত নেই৷ মোড়ের মাথায় আমি রিকশা থেকে নামার আগেই চোখ যায় ওদের বারান্দার দিকে৷ জানি ও দাঁড়িয়েই থাকবে তবু একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া৷ হুঁ, ও আছে, আমি এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে, স্কুলব্যাগ কাঁধে ঝোলানো, চশমাটা একবার শুধু-মুদুই খুলে আবার চোখে পরি, বুকের ওপরে পড়ে থাকা দুই বিনুনীর একটাকে হালকা ঝটকায় পাঠিয়ে দিই পেছনে, পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে ওর পানে একবারও না তাকিয়ে৷ অনুভব করতে পারি ওর নিষ্পলক চাউনি অনুসরণ করছে আমায়, হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও সোজা হয়ে দাঁড়লো, না তাকিয়েও টের পাই৷ সামনে তাকিয়ে দেখি আম্মু দাঁড়িয়ে আছে জানালায়, রোজ যেমন থাকে৷ দরজাটা খোলা, রোজ যেমন থাকে৷ বাতাসে পর্দাটা উড়ছে৷ ছোট্ট কাঠের গেট পেরিয়ে আমি ঢুকে যাই ভেতরে৷ আম্মু এগিয়ে এসে হাত বাড়ায় কাঁধের ব্যাগ নেবে বলে, রোজ যেমন নেয়৷

বিকেলে এখন আর খেলতে মাঠে যাই না৷ আম্মুর অনেক বকাঝকা আর শাসনেও যা হয়নি ইদানিং নিজে থেকেই সেটা হয়েছে৷ এখন আর খেলতে যেতে ইচ্ছে করে না৷ বই নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকাটা বরং অনেক বেশি ভাল লাগে আজকাল৷ তবে বারান্দায় গিয়ে খুব যে একটা বসতে পারি তা নয়৷ পাশের বাড়ির টুটুর জন্যে,ঐ ছেলেটির জন্য আমি বারান্দায় বসতে পাই না, বারান্দাটা যেন আমার নয়, ওর৷ ও আমায় বিরক্ত করে না একদমই৷ কোন উটকো মন্তব্য তো ও আজ অব্দি করেনি আর সেই একবার এক চিঠি লেখা ছাড়া আর কোন চিঠিও লেখেনি৷ আম্মু সবই জানে, তবুও ঘুরে ফিরেই বারান্দায় আসবে নিজের ঘুম নষ্ট করে৷ আমি তাই সামনের এই বসার ঘরের সোফায় আধশোয়া হই, সাথে বই৷ মাঝে মাঝেই চোখ যায় সামনের বাড়ির বারান্দার দিকে, টুটু কি আছে? না! ওর এখন পড়াতে যাওয়ার সময়, এমন ভাবেই আমি জেনে যাই, সারাদিনে সে কি করে৷ বিকেলে দুটো টিউশনি করে টুটু৷ আমাদের এই হাউজিং এষ্টেটেরই দু'নম্বর রোডের কোথাও একটা পড়াতে যায় ও, সপ্তায় পাঁচদিন৷ আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এলেই ও বেরিয়ে যায় সাইকেলে চেপে, টিউশনিতে৷ আমি ওবাড়ির খালাম্মার কাছ থেকেই গল্প শুনেছি৷ টুটু তার বড় আপার ছেলে৷ টুটুর মা, বাবা গ্রামে থাকেন৷ যেখানে কোন কলেজ নেই৷ টুটু তার গ্রামের স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে খালার বাসায় এসেছে কলেজে পড়বে বলে৷ সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা৷ বছর তিন তো হবেই! টুটু আসার আগে আমি প্রায় রোজই যেতাম খালাম্মার কাছে, স্কুল থেকে ফিরে, ছুটির দিনে যখন তখন৷ টুটু আসার পরেও যেতাম৷ টুটু কখনই আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি৷ আমি প্রথম টুটুকে দেখে বেশ মজা পেয়েছিলাম৷ ফর্সা ভ্যাদভ্যাদে গায়ের রং, মাথার কোকড়ানো চুল তেল চুপচুপে, ছোট্ট একটা গোঁপও আছে৷ টুটুর অত ফর্সা গায়ের রং দেখে কী আমার হিংসে হয়েছিল! আমাকে যদিও কেউ কালো বলে না কিন্তু ফর্সাও কেউ কোনমতেই বলতে পারে না, বলে উজ্জ্বল শ্যাম! উজ্জ্বল শ্যাম না ছাই, আমি জানি, আমি কালো, খুব বেশি হলে শ্যামলা বলা যায় আমাকে৷ ঢ্যাঙা টুটু শার্টের সাথে লুঙ্গি পরে থাকে বাড়িতে, গোড়ালির উপরে সেই লুঙ্গির ঝুল৷ টুটু এত ঢ্যাঙা যে লুঙ্গি ওর নিচে আর নামে না৷ খালার বাসায় থাকতে আসার এক মাসের মধ্যেই টুটু আমায় চিঠি লেখে৷
" রুকু,
আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ তুমি আমার মন চুরি করেছ৷ আমি কি তোমার মন চুরি করতে পেরেছি?
যদি আমিও তোমার মনকে চুরি করতে পেরে থাকি তো আমার এই চিঠির উত্তর তুমি আমার বইয়ের ভেতরে রেখে যেও৷
তোমার চিঠির অপেক্ষায় রইলাম৷
তোমার,
জাহিদ৷'

আমি সেই প্রথম জানতে পারলাম যে ওর ভাল নাম জাহিদ৷ না৷ টুটুর চিঠির উত্তর আমি বইয়ের ভেতর রেখে আসিনি৷ উত্তর দেব এমনটাও ভাবিনি৷ চিঠিটা রেখে দিয়েছিলাম পড়ার টেবিলে৷ গল্পের বই পড়ছি কী না চেক করতে এসে সেই চিঠি বাজেয়াপ্ত করে আম্মু৷ ভাল মন্দ কোন কথা জিজ্ঞেস না করেই বিনুনী ধরে এক হ্যাচকা টান আর সপাট চড় দু"গালে৷ কোন দোষ না করেই আমি মার খেলাম সেদিন, টুটু আমাকে চিঠি লিখেছিল বলে৷ এক ছুটে আমি টুটুর খালার বাসায়, উলের গোলা কোলে নিয়ে সোয়েটার বুনছিলেন খালাম্মা, সারাদিনই তিনি বোনেন৷ ফোঁপাতে ফোঁপাতে ঘটনার বর্ণনা দিলাম আমি৷ খালাম্মা উঠে গিয়ে দরজার ওপাশ থেকে কান ধরে ঘরে নিয়ে এলেন টুটুকে৷ আমাকে আসতে দেখে নি:শব্দে দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল টুটু, খালাম্মা বললেন, দ্যাখ, কি করেছিস! প্রচন্ড রাগে আমি মুখ ফিরিয়ে ছিলাম টুটুর দিক থেকে , খালাম্মা আবার বললেন, তুই কাঁদছিস কেন, মার তো খেয়েছে রুকু৷ আমি জানলাম, আমি মার খেলে টুটুও কাঁদে৷ টুটু বলল, আর হবে না আম্মি৷ জানলাম, টুটু তার খালাকে আম্মি বলে ডাকে৷ দরজার ওপাশে আম্মুর গলা পেলাম, রুকু, উঠে এসো! তাকিয়ে দেখলাম গম্ভীর মুখে আম্মু দাঁড়িয়ে আছে দরজায়৷ খালাম্মা বললেন, আপা, আপনি রুকুকে কেন মারলেন? ও কি দোষ করেছে? আম্মু কোন কথার জবাব না দিয়ে হাত ধরে আমাকে বাড়ির দিকে এগোল৷ বেরুনোর সময় আমি তাকালাম টুটুর দিকে, গভীর কালো দুটো চোখ নিষ্পলক তাকিয়ে আমার দিকে, যেন বলছে, রুকু, আর হবে না! ঘরে ফিরে আমার বিনুনী খুলে দিল, ভিজে তোয়ালেতে মুখ মুছিয়ে দিল আর বলল, তুই ওকে চিঠি লিখিসনি তো? ঘাড় নেড়ে জানালাম, না, আমি লিখিনি৷ আম্মু তখন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আমাকে সামনে বসিয়ে তেলের বাটি আর চিরুণী হাতে নিয়ে আমার চুলে তেল দিতে বসল রোজকার মত আর আমাকে পাঠ দিল ছেলেদের সম্পর্কে, সেই আমি প্রথম জানলাম, ছেলেগুলো এরকমই হয়৷ মেয়েদের চিঠি লেখে, ফুসলায় আর তারপরে নষ্ট করে দেয়৷


(চলবে)

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): গল্প ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার গল্প  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে নভেম্বর, -০০০১ রাত ১২:০০ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২৬ শে মে, ২০০৭ রাত ১০:০২
মোহাম্মদ আলী আকন্দ বলেছেন: কবিতাটি তো নজরুলের।
নীচের লেখাটি আপনার নিজের?
২. ২৬ শে মে, ২০০৭ রাত ১০:০৫
শ্যাজা বলেছেন: গানটি কাজী নজরুল ইসলাম'এর।
লেখাটা আমার।
৩. ২৬ শে মে, ২০০৭ রাত ১০:১০
মোহাম্মদ আলী আকন্দ বলেছেন: গানটি আমার খুব প্রিয় একটি গান।
আপনার লেখার সাথে গানটির কি সম্পর্ক?
আপনার লেখাটা সুন্দর হচ্ছে।
আপনার আরো লেখা পড়ার আশায় রইলাম।
৫. ২৭ শে মে, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৫৯
শ্যাজা বলেছেন: পড় :-)

আমি একটা চিঠি পাইসিলাম রশ্মি। এক ছোটো বোনে লিখসে। খুব সাধাঁ কিন্তু ভীষণ মায়ায় ভরা। কিছু স্বপ্ন, কিছুটা বাস্তবতার ছোঁয়া চিঠির ছত্রে ছত্রে।

ভাবছি চিঠিটা ব্লগে দিয়ে দেব।
৮. ২৭ শে মে, ২০০৭ রাত ৮:১১
শ্যাজা বলেছেন: থিকাছে রশ্মি, দেব চিঠিটা।
তোর জন্যে।
৯. ২৭ শে মে, ২০০৭ রাত ৮:১৪
প্রজাপতি বলেছেন: খুব মায়াময় একটা লেখা... অনেক দিন পরে যেন এমন কিশোরবেলায় ভীষণ ভালো লাগা আবেশময় কিছু পড়লাম। অনেক অনেক ভালো লাগলো সত্যি।
১০. ২৭ শে মে, ২০০৭ রাত ৯:০০
অমিত আহমেদ বলেছেন: প্রজাপতির মতই বলব লেখার ধরনটা খুব মায়াময়, খুব ভালো লেগেছে। এক্ষুনি পরের পর্বে যাচ্ছি।
---
তবে আপনার শ্রেষ্ঠ প্রশংসাটি করেছেন আকন্দ চাচু। তিনি সম্ভবত ভেবে বসেছিলেন লেখাটাও মনে হয় কবি নজরুলের। হাঃ হাঃ হাঃ
---
অন্যের চিঠি অনুমতি ছাড়া ব্লগে দেয়াটা কি ঠিক?
১১. ২৯ শে মে, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৬
শেখ জলিল বলেছেন: শ্যাজা,
পেশাগত ভিন্নতার জন্য কলকাতায় আমাদের টিমের সাথে যেতে পারলাম না। আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক ছড়াকার এখলাস উদ্দিন আহমেদ এবং গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচলক এনামুল হক সাহেব এখন কলকাতা অবস্থান করছেন।
১২. ৩১ শে মে, ২০০৭ বিকাল ৩:০২
শ্যাজা বলেছেন: কোথায় আছেন ওঁরা এখানে?
জানলে দেখা করা যাইত।

 

মোট সময় লেগেছে ২.৮৬৫৬ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আমি লিখি আবার লিখি না।
আমি শাহজাদী কিন্তু হাতি ঘোড়া নেই।
ঘুমোতে ভালবাসি, তবে জেগে জেগে।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ