somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জেগে আছে বাংলাদেশ - ৩

২৮ শে মে, ২০০৭ সকাল ১১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের বাড়িতে এমনিতে টুটুর আসার কোন চান্স নেই, কিন্তু ভাইয়া এলে মাঝে মাঝে টুটু চলে আসে ৷ নিজে থেকে আসে না অবশ্য, ভাইয়াই ধরে নিয়ে আসে তবে সেও খুব কম ৷ আম্মুর মুখ ভার হয়ে যায় টুটু এলেই যদিও মুখে কিছু বলে না , ভাইয়া আম্মুকে খুব একটা ঘাঁটাতে চায়ও না ৷ তাই বেশির ভাগ দিনেই ভাইয়া টুটুর ঘরে গিয়েই আড্ডা জমায় সন্ধ্যের পর৷ টুটুর ঘরটা এক মজার জায়গা ৷ বারান্দার এক মাথায় ছোট্ট এক রুম, ভেতরবাড়ির সাথে যার কোন সংযোগ নেই ৷ যতক্ষণ খালাম্মাদের বসার ঘরের দরজা খোলা থাকে ততক্ষণই ঐ ঘরের সাথে যোগাযোগ নইলে এ এক বিচ্ছিন্ন ঘর ৷ রুনা আপু একদমই টুটুর ঘর মাড়ায় না, কেন কে জানে ৷ আমি নিজে কখনও টুটুর ঘরে যাইনি ৷ আমাদের বাড়ির পরের বাড়িটাই টুটুদের, মাঝে একটা হাফ দেওয়াল৷ বারান্দা থেকে টুটুর ঘরের সবটুকুই দেখা যায় যদি ওর জানালা খোলা থাকে ৷ এমনিতে এই জানালা খুব একটা খোলে না টুটু কিন্তু ভাইয়া যদ্দিন বাড়ি থাকে টুটুর ঘরের এই জানালা সারাক্ষণই খোলা ৷ আমি জানতাম না যে টুটু ছবি আঁকে ৷ না ৷ রং তুলি দিয়ে ক্যানভাসে ছবি আঁকে না টুটু, ওর আঁকা আঁকি সব খাতার পাতায়, ঘরের সাদা দেওয়ালে পেন্সিল দিয়ে ৷ আমি কখনও দেখিনি টুটুর আঁকা ছবি ৷ ভাইয়া বলে, টুটু শুধুই স্কেচ বানায়, পেন্সিলের আঁচড়ে আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলে নানা ছবি, সাদা পাতায় কালো পেন্সিলের দাগে ৷ অন্য কোন রং নেই ৷ জ্যামিতিক সব নকশা আঁকে টুটু, ঐ নকশায় কি ফুটিয়ে তোলে টুটু, ছবির মধ্যে দিয়ে কি বলতে চায়, সে শুধু টুটুই জানে৷ এই জ্যামিতিক ছবি ছাড়া আর যা আঁকে টুটু সেগুলো মানুষের মুখ ৷ একটা মেয়ের মুখ ৷ লম্বা চুলে দুই বিনুনী করা এক মেয়ের মুখ ৷ একটাই মুখ, বিভিন্ন ভঙ্গীর ৷ প্রতিটা ছবিতেই নাকি সেই মুখ খানিকটা করে বদলে যায়, সে নিজেই স্বীকার করে, এই যে মুখটা একটু করে বদলে যায়, এ নাকি তার আঁকার দোষ, যেদিন সে ঠিকঠাক আঁকতে পারবে সেদিন থেকে এই মুখ আর একটুও বদলে যাবে না ৷ ভাইয়া বলে, টুটু নাকি পড়াশোনাতেও খুব ভাল ৷ একথা অবশ্য খালাম্মাও বলে, রুনা আপুও বলে ৷ রুনা আপু নিজেই তো টুটুর কাছে পড়ে ৷ আগে রুনা আপুর একজন টিউটর ছিল কিন্তু রুনা আপু সেই টিউটরের কাছে এখন আর পড়ে না ৷ টুটু নাকি অংকে খুব ভালো ৷ এই কথাটা অবশ্য ভাইয়াও বলে ৷ ভাইয়া ছুটিতে এসেও অংকের বই খাতা নিয়ে টুটুর কাছে যায় ৷ ভাইয়া যে ক'দিন থাকে সে ক'দিন টুটুরও যে বেশ আনন্দ সে আমি বেশ বুঝতে পারি ৷ ইচ্ছে হলে ও আমাদের বাড়ি আসতে পারে, ওর ঘরের জানালা সারাদিন খুলে রাখতে পারে যা এমনিতে একেবারেই সম্ভব নয়৷ ভাইয়াটা বেশ পাজি ৷ আমাকে মাঝে মাঝেই বলে, কিরে, টুটুভাইকে তোর পছন্দ? ও কিন্তু তোকে খুব ভালবাসে! আমি অবাক হই, টুটু তাহলে ভাইয়াকে এসব বলে! রাগ হয় বেশ ৷ মুখ গোমড়া করে ভাইয়াকে বলি, যাও, তোমার আর ফোঁপরদালালী করতে হবে না টুটুর জন্যে ৷

আমি টুটুকে ভাই কিংবা ভাইয়া কিছুই বলি না ৷ আজ অব্দি তো কথাই বলিনি ওর সাথে! টুটু না কী ভাইয়াকে বলেছে, তোর বোনের খুব অহংকার! ইশশ! আবার অহংকার বলা হচ্ছে! না, না, আমার একটুও অহংকার নেই৷ কেন হবে? টুটুটা সত্যিই কী বোকা ৷ আমি টুটুকে পছন্দ অপছন্দ কিছুই করি না৷ ভালবাসা? না ৷ সে আমি বুঝতেই পারি না, ভালবাসা বস্তুটা কী৷ তবে যেটুকু বুঝি, টুটু যদি সকালে, বিকেলে আর আমি যতক্ষণ বাড়ি থাকি ততক্ষণ ঐ বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে না থাকে তবে আমার ভাল লাগবে না, লাগে না ৷ কোনদিন এরকম হয় না যে আমি স্কুলে যাচ্ছি, স্কুল থেকে ফিরছি অথচ টুটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেই ৷ বছরে একবার টুটু বাড়ি যায় ৷ ওর কলেজ তখন বেশ কিছুদিনের ছুটি থাকে৷ কিসের ছুটি অতশত আমি জানি না৷ কিন্তু ও যায় ৷ এবারেও গেছে ৷ কিন্তু এখন কি কলেজের ছুটিতে গেছে? ছুটিতে তো এই কিছুদিন আগেই একবার ঘুরে এল, আর এখন তো সবার পরীক্ষা সামনে! তবে? এই কয়েকদিন আমার খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে ৷ সকাল ঘুম থেকে উঠে স্কুল যাওয়া অব্দি বারে বারেই ঘুরে ফিরে বারান্দায় আসি, ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই জেনেও৷ বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় তিন নম্বর রোডের মুখ থেকেই টুটুদের বারান্দায় চোখ যায়, টুটু নেই ৷ কবে আসবে? কে জানে! কাওকে জিজ্ঞেস করব সেই উপায়ও নেই ৷ রুনা আপুকে জিজ্ঞেস করতেই পারি কিন্তু রুনা আপু এমন হই হই করে উঠবে যে সে এক কান্ড হবে৷ বরং খালাম্মার উলের বোনাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলে খালাম্মাই রাজ্যের গল্প করবে আর সেই গল্পের ফাঁক দিয়ে টুটুর কথাও আসবেই, কিচ্ছুটি জিজ্ঞেস করার দরকারই পড়বে না ৷ আমি নিজের ঘরের ভেতর বসেই সোয়েটার বুনি ভাইয়ার জন্যে, বারে বারে ঘর পড়ে যায়, ডিজাইনে ভুল হয়৷ জানি খালাম্মার কাছে গেলে উনি সুন্দর করে দেখিয়ে দেবেন৷ কিন্তু আমি যাই না ৷ কি হবে গিয়ে? এর আগেও আমি দুটো সোয়েটার বুনেছি ভাইয়ার জন্যে ৷ কিন্তু সেগুলো নাকি ছোট সব ৷ ভাইয়া প্রতিবার বাড়ি ফিরলে টের পাই সে দু-তিন ইঞ্চি বেড়েছে , কিন্তু তাই বলে ছোট? রুনা আপু বলে শহরের ফ্যাশান না কি আলাদা তাই ভাইয়া নেয় না! এগুলো সব পুরোনো ডিজাইন ৷ খালাম্মা কেন পুরানো ডিজাইন বোনেন? টুটুকে বললেই তো সে নতুন ডিজাইন এঁকে দেয়, তার এমন হাত! ভাইয়া অবশ্য ফ্যাশনের কথা স্বীকার করে না, বলে শহরে নাকি শীতই পড়ে না, তুই অন্য কারো জন্যে বোন ৷ আমি আর কার জন্যে বুনতে পারি? প্রতিবারই ভাবি আর বুনব না , তবু বুনি ভাইয়ার জন্যে ৷ আগের উল খুলে নতুন ডিজাইন তুলি খালাম্মার কাছে ৷ কিন্তু ঘরে ফিরলেই সেই গোলমাল ৷


আমি কিন্ত টুটুর কথা জানার জন্যে আমি খালাম্মার কাছে গিয়ে বসি না, রুনা আপুর ঘরে গিয়ে তার বিছানায় বসে থাকি ৷ রুনা আপু মন দিয়ে পড়ছে পরীক্ষার পড়া ৷ পড়া না ছাই! কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে নজরুলগীতি শুনছে , আজকাল যে রুনা আপু সন্ধ্যাবেলায় হারমনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় না,
বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে,
মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জনে৷৷
বা
ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয় ৷
সেটা অবশ্য পরীক্ষার জন্যে নয় ৷ আম্মুই গিয়ে খালাম্মাকে বলে তার গানে অন্য ঈশ্বরের কথা আছে, সেই গান গাওয়া ঠিক নয় ৷ খালাম্মা হাসি মুখে মেনে নিয়েছেন, আগের মাষ্টার ছাড়িয়ে দিয়েছেন ৷ পরীক্ষার পর নতুন মাষ্টার আসবেন নজরুলগীতি শেখাতে৷ একমাœ টুটুই প্রতিবাদ করেছিল কিন্তু ধোপে টেকেনি ৷ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমস্ত ক্যাসেট জলে ফেলে দিয়ে নজরুলগীতির ক্যাসেট কিনে আনা হয়েছে ৷ পরীক্ষার পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এখন সেগুলোই শোনে রুনা আপা ৷
হেথায় নিমেষে স্বপন ফুরায়,
রাতের কুসুম প্রাতে ঝ'রে যায়,
ভালো না বাসিতে হদৃয় শুকায়,
বিষ-জ্বালা-ভরা হেথা অমিয় ৷৷
আর মুখের সামনে ধরে রেখেছে খোলা একটা খাতা ৷ উঁকি দিয়ে দেখলাম সেও পড়ার খাতা কিছু নয়, রুনা আপুর লেখার খাতা ৷ রুনা আপু কবিতা লেখে ৷ কবিতা ছাড়া আর যা লেখে সে ঠিক গল্পও নয় আবার কবিতাও নয় ৷ তবে রুনা আপুর লেখা কবিতার চাইতে তার এই না কবিতাগুলো ই আমার বেশি ভাল লাগে৷ কান থেকে থেকে ওয়াকম্যান নামিয়ে রেখে রুনা আপু বলে, কীরে, মন খারাপ? টুটুভাইয়ের জন্যে? বলে নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ে ৷ আমার মন আরও খারাপ হয়ে যায় ৷ এর মধ্যে এত হাসার কী হল! খানিক হেসে টেসে নিয়ে রুনা আপু ধীরে সুস্থে বলল, দেশে খালাম্মার শরীর খুব খারাপ, ঢাকায় নিয়ে গেছে অপারেশনের জন্যে, গলব্লাডার স্টোন৷ অনেকদিন ধরেই ভুগছে এবার বাড়াবাড়ি হওয়াতে অপারেশনের জন্যে ঢাকায় নিয়ে গেছে ৷ খালুজীর সরকারী চাকরী, বেশিদিন ছুটি নেওয়ার উপায় নেই, তাই টুটু পড়াশোনা, টিউশনি আর বারান্দায় হাজিরা দেওয়া সব বন্ধ করে ঢাকায় গেছে মায়ের চিকিত্সা করাতে ৷

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০০৭ রাত ১২:২২
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×