তিনি চলে গেলেন। আর কোনদিনও আমাকে তাঁর অবসরে আড়ষ্ঠ কন্ঠে বিরামহীন বক্তৃতা শোনাবেন না। আর কোনদিনও বলবেন না ' যদি তুমি নিজের দেশকে ভালোবাসতে না পার, যদি তুমি নিজের দেশকে কিছু দিতে না পারো, তবে বুঝবে, এই দেশের কারো কাছেই কিছু পাবার কোন অধিকার তোমার নেই। বুঝবে, বিশ্বকে কিছু দেবার কোন যোগ্যতাও তোমার নেই। এরকম একজন মানুষ, তার জন্মই বা কেন? আর বেঁচে থাকাইবা কেন? আমি কিছু বুঝিনা।'
অনেকটা দার্শনিক এর মত করে কথা বলতেন বুড়ো। কিন্তু নিজেকে কখনও দার্শনিক ভাবতেন না, বলতেনও না। একজন সৈনিক, একজন ইংরেজ, একজন অতি সাধারন মানুষই বলতেন। সেরকম ভাবেই তুলে ধরতেন নিজেকে সব সময়। সেই বুড়ো আজ কিছুক্ষন আগে চলে গেলেন। তাঁর মৃত্যু আমাকে কাঁদিয়েছে, তেমন কোন কথা বলবনা। তবে তাঁর মৃত্যু আমাকে আহত করেছে। এটাকে, এই বাস্তবতাকে স্বীকার করতে আমার কোন কুন্ঠা নেই।
মানুষকে মরতে দেখা আমার দৈনন্দিন কাজের একটা অংশ। এক সময় খারাপ লাগত কিন্তু আজ ততটা খারাপ লাগেনা। তবে তার পরেও কোন কোন মানুষ মৃত্যুর পরেও আমার মনে অনেকদিন বেঁচে থাকেন, আছেনও। আজ যিনি চলে গেলেন তিনি সেই তাদেরই একজন হয়ে বেঁচে থাকবেন আমার স্মৃতীতে। তাঁর কথা আমার দীর্ঘদিন মনে থাকবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
অনেক কথাই বলে ফেললাম বটে কিন্তু তাঁর আসল পরিচয়টা এখন পর্যন্ত আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলোনা। যাঁকে নিয়ে এই লেখার সুত্রপাত, তিনি হলেন ডেভিড মিলবোর্ন, বিরাশি বৎসরের বুড়ো। এই ইংল্যন্ড এরই উত্তর পূর্ব এলাকার শহর নিউক্যসল এ তাঁর জন্ম, এখানেই বসবাস, এখানেই বেড়ে ওঠা। রয়াল এয়ার ফোর্স এর একজন প্যরাট্রুপার হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন মাত্র উনিশ বৎসর বয়সে, এর পরে মাত্র একটি বৎসর না যেতেই তাঁর ক্যারিয়ার শেষ।
দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহীনির বিরুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এক প্রত্যক্ষ যুদ্ধে আহত হন, একটি চোখ আর দুটি বাহুই হারান তিনি। কনুই এর উপর থেকে দুটি বাহুই কেটে ফেলতে হয় জীবন বাঁচাতে। সেই থেকেই তিনি আহত যোদ্ধা। আহত সৈনিক। জীবনের একেবারেই প্রারম্ভেই সেদিনকার সেই টগবগে যুবক ডেভিড মিলবোর্ন, যাঁকে আমরা 'ডেভ' বলে সম্বোধন করতাম, দুটি বহু হারিয়ে সারা জীবনের মত পঙ্গু , পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ডেভ এর সাথে আমার পরিচয় আজ থেকে প্রায় ছয়টি বৎসর পূর্বে। এক সুন্দর সকালে অফিসে বসে নিজের কাজ করছিলাম। এমন সময় সেক্রেটারি একটা টেলিফোন কল ট্রান্সফার করলেন। অপরপ্রান্তে কে লাইনে আছেন, সে কথা বলতে গিয়ে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বললেন, জিয়া, স্যরি তোমাকে বলতে ভূলে গিয়েছিলাম, এক সোস্যাল ওয়ার্কার গতকাল ফোন করেছিল তোমার সাথে কথা বলার জন্য, তুমি মিটিং এ ব্যস্ত ছিলে বলে লাইনটা তোমাকে দিতে পারিনি, আজ তিনিইআবার ফোন করেছেন। তোমার সা্থে কথা বলতে চান।
অপরপ্রান্তে এক সোস্যাল ওয়ার্কার, ডোনা আর্চার, জানালেন তাঁর আওতাধীন এক রুগী আছেন, যিনি আলজাইমার্স, ডিমেনশিয়া সহ নানান শারীরিক উপসর্গ ও পঙ্গত্বে ভূগছেন। কনসালটেন্ট এর পরামর্শ অনুযায়ি তাঁকে একটা স্পেশালাইজড সেন্টার এ রাখতে হবে। আমাদের কোন বেড খালি আছে কিনা এবং থাকলে আমরা তাঁকে আমাদের এই সেন্টার এ নিতে প্রস্তুত আছি কিনা, সেটাই তিনি জানতে চান আমার কাছে।
এরকম একটা ষ্পেশালাইজড সেন্টার এর উপপরিচালক হিসেবে ডোনা আর্চার এর রুগীর সাইকিয়াট্রিক এসেসমেন্ট করে নেওয়া বা না নেওয়ার স্বিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেয়া আমারই দ্বায়িত্ব। তাই উক্ত সোস্যাল ওয়ার্ককারকে বললাম, তুমি তোমার রুগীর ডিটেইলডস আমাকে ফ্যক্স করে দাও, তোমাকে পরে জানাচ্ছি।
তিনি তাই করলেন। আমিও দীর্ঘ তের পৃষ্টার ছোট খাটো একটা জীবন বৃত্তান্ত এবং তার বর্তমান মানসিক অবস্থা বিচার করে স্বিদ্ধান্ত নিলাম তাকে আমাদের এখানে ভর্তি করিয়ে নেব।
তবে তার আগে প্রথা অনুযায়ি সরেজমিনে তাঁকে একবার দেখে আসতে এবং তাঁর অনুমতি নিতে হবে। তাই পরের দিন সেক্রেটারিকে বললাম সোসাল ওয়ার্কার এর সাথে যোগাযোগ করে ডেভিড মিলবোর্ন কে দেখতে যাব, তার প্রি-এ্যডমিশন এসেসমেন্ট করতে যাব, তার একটা এ্যপয়েন্টমেন্ট এর ব্যবস্থা করে যেন আমাকে তিনি জানান। সেমতই একদিন দুপুরে স্থানীয় রয়াল ভিক্টোরিয়া হাঁসপাতালে গিয়ে ডেভিডকে দেখেছি, তার প্রি এ্যডমিশন এসেমেন্টটাও করে এসেছিলাম।
সেই থেকেই ডেভিড এর সাথে আমার পরিচয়। এর পরে তিনি যথাসময়ে আমার হাঁসপাতালে এসেছেন লং টার্ম রিহাবিলিটেশন এর জন্য। এখানেই তিনি ছিলেন বিগত প্রায় ছয়টি বৎসর। আজ এখানেই তিনি তাঁর জীবনের শেষ নিশ্বাসটা ত্যাগ করলেন। একটু আগেই তিন তলা থেকে ফ্লোর নার্স ইন্টারকমে আমাকে তা জানালেন।
ক''দিন ধরেই তাঁর অবস্থাটা করুন যাচ্ছিল। তিনি যে এ যাত্রা আর সেরে উঠবেন না, এটা মোটামুটি সকলেই একরকম ধারনা করে নিয়েছিলেন। কাজেই তার মৃত্যুটা আমাদের কারো কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিলনা। তার পরও এই প্রত্যাশিত মৃত্যুর কথা শুনেই আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। খারাপ হবার কারন, ডেভ এর সাথে আমার একটা বন্ধুত্ব ছিল। বয়সের বিরাট ব্যবধান থাকা সত্তেও তা আমাদের বন্ধুত্ব গড়তে কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
প্রফেশনাল সম্পর্ক ছাড়াও তাঁ সাথে অনেকটা মানসিক সম্পর্কও আমার তৈরী হয়ে গিয়েছিল দীর্ঘ ছয়টি বৎসরে। এটা ছাড়াও তাঁর কোন কোন আচরনে আমি মুগ্ধ ছিলাম। প্রায়ই ফাঁক পেলে ডেভ এর রুমে এক কাপ কফি হাতে গিয়ে বসেছি। তাঁর কাছ থেকে তার জীবনের গল্প শুনেছি। শুনেছি দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধের কথা। ছোটকালে খনী দুর্ঘটনায় তারা বাবার মৃত্যুর কথা, বাবা হারিয়ে তাঁর মা কতটা কষ্ট করে তাঁকে মানুষ করেছেন, সে কথা। তিনি মন খুলে কথা বলতেন, আমাকে একজন নীরব শ্রোতা পেয়ে।
আমার মুগ্ধতা সে কারনে নয় বরং আরও একটা কারনে ছিল তার প্রতি। আর সেটাই বলার জন্য এই লেখার অবতারনা। আমাদের হাঁসপাতাল প্রতিটি রুগীর জন্যই একটা নির্ধারিত ফিস নিয়ে থাকে। বেশীর ভাগ রুগীর সমস্ত খরচ বহন করে সরকার এর সোস্যাল সার্ভিস। অবশ্য কেউ কেউ তার নিজের খরচ নিজের অর্থ দিয়েই চালান। যে ভাবেই সেই খরচ চালানো হোকনা কেন, আমরা আমাদের ফিস এর অর্থ পেয়ে থাকি সরকারের সোস্যাল সার্ভিস এর মাধ্যমে। রুগীর নিজের এ্যকাউন্ট বা তার আত্বীয় স্বজন কিংবা সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব পেনশন এন্ড ওয়ার্কস থেকে রুগীর খরচ বাবদ আমাদের প্রাপ্য টাকা আদায় করে দেন সোস্যাল ওয়ার্কার রা।
এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন ডেভ। তিনি তাঁর সমস্ত খরচ নিজেই ব্যবস্থা করে দিতেন তাঁর সলিসিটর এর মাধ্যমে নিজ একাউন্ট থেকে। তাঁর সেরকম আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল। কাজেই সেটাও আমার কাছে নতুন কোন বিষয় নয়। আমার কাছে যে বিষয়টা আশ্চর্জজনক ছিল তা হলো, সরকারের একজন যুদ্ধাহত সৈনিক হিসেবে তাঁর সমস্ত খরচ দেবার কথা সরকারের। সরকার তা দিতেনও।
কিন্তু ডেভ তা নিজের খরচের জন্য না নিয়ে, নিজের একমাত্র কন্যা, লিন্ডা, যিনি তাঁর স্বামী, সন্তান, সংসার, আর চাকুরী নিয়ে স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন, তাঁকে না দিয়ে, মাসে মাসে সরকার থেকে প্রাপ্য সকল টাকা ভাগ করে দিতেন বিভিন্ন সেবা বা চ্যারিটি সংস্থায়।
স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন ক্যান্সার এ, ডেভ ব্রিটিশ ক্যান্সার সোসাইটিকে তাদের ক্যন্সার গবেষনা ফান্ডে নিয়মিত টাকা দিতেন। নিজে যুদ্ধে আহত হয়ে সারা জীবন পঙ্গু ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি এরকম আহত সৈনিকদের মর্মবেদনা বুঝতেন। আর বুঝতেন বলেই তাঁর মাসিক পেনশনের একটা অংশ তিনি যুদ্ধাহত ব্রিটিশ সৈন্যদের কল্যান তহবিলে দিতেন। তাঁর একটা প্রিয় কুকুর ছিল, সেটাও অনেক বৎসর আগে মারা গেছে। ডেভ তাঁর পেনশনের একটা অংশ পরিত্যক্ত পশু, বিশেষ করে, পরিত্যক্ত, মালিকবিহিন কুকুর'দের পূনর্বাসনে নিয়োজিত একটা চ্যারিটি সংস্থায় দিতেন প্রতি মাসেই।
অদ্ভূত এ বিষয়টা জানার পরে একদিন ডেভকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম সুযোগ বুঝে, 'ডেভ, তুমি তোমার সব টাকাই এদিক ওদিক দিয়ে দাও, তোমার একটা মেয়ে আছে শুনেছি, তাকে কিছু দাওনা কেন?
প্রশ্নটা শুনে ডেভ আমার দিকে তাকিয়ে একটু সময় নিলেন, তার পরে বলেছিলেন, 'তাকেও একটা মোটা অংকের টাকা দিয়ে রেখেছি। তবে তাকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত পড়িয়েছি, সে ভালো চাকুরী করে। তার কোন অভাব নেই। আমি তাকে বিলাসিতার মধ্যে ভাঁসিয়ে দিতে চাইনা। আমার মেয়ে সেটা বোঝে।
আমি যা করেছি, তা তার সাথে আলোচনা করেই করেছি। তার প্রয়োজন এর চেয়ে এই দেশটার প্রয়োজন অনেক বেশী। এই দেশ, যে দেশ আমাকে তার বুকে লালন করেছে, যে দেশ আমার মেয়েকে একজন শিক্ষিতা সুনাগরিক বানিয়েছে, যে দেশ এর বুকে আমার পূর্বপুরুষরা শায়িত আছেন, যে দেশ এর বুকে আমার নাতী নাতনিরা প্রতিদিন দৌড়ে বেড়ায়, আমার সম্পদ এর উপরে সেই দেশ এর চেয়ে আর কার বেশী দাবী থাকতে পারে?
আমি হতবাক। বুড়ো আড়ষ্ট কন্ঠে তার 'প্রস্থেটিক' যান্ত্রিক হাত দুটির যে অংশ বেরিয়ে আছে, তা নেড়ে নেড়ে কথা বলছেন। এক বিষ্ময়ের ঘোরে তার কথা শুনেই চলেছি। এক সময় তিনি বলে উঠলেন সেই কথাটি, 'যদি তুমি নিজের দেশকে কিছু দিতে না পারো, তবে বুঝবে, এই দেশের কারো কাছেই কিছু পাবার কোন অধিকার তোমার নেই।' তিনি আর কি বলেছিলেন ত এই মহুর্তে মনে নেই। মনে নেই কারন, আমি তা শুনিনি, আমার মনের কোনায় তখন বয়ে চলেছে এক ঝড়!
নীরব ঝড়, চোখের সামনে ভেঁসে চলেছে বাংলাদেশের চিরচেনা দৃশ্য। আমরা সবাই দেশ এর কাছ থেকে কেবল নেবার ধান্দায় দিন রাত ব্যস্ত। জোর করে নিতে হলেও, চুরি করে নিতে হলেও আমরা নিতে ব্যস্ত। কিন্তু দেশকে দেবার কথা আমরা কখনও ভাবিনা। দেশকেও যে দিতে হয়, সে কথাটাই বোধহয় আমরা জানিনা।
আমার চিন্তায় ছেদ পড়ল ডেভ এর ডাকে। তিনি আমাকে প্রশ্ন করছেন 'তুমি কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জেফারসন এর নাম শুনেছ? মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' সূচক জবাব দিলে তিনি বললেন 'তিনি তাঁর এক বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন
The tree of liberty must be refreshed from time to time with the blood of patriots and tyrants. It is its natural manure.
হ্যাঁ, দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ত্যাগ দিয়েই একটা দেশ তার স্বাধীনতাকে সংহত করে। যে দেশের লোক তার দেশের জন্য ত্যাগ করেনা, করতে চায়না, পরাধীনতাই হয় তাদের নিয়তি।
সেদিনের এই আলোচনার পরে ডেভ এর প্রতি আমার এক ধরনের শ্রদ্ধা আর দূর্বলতা ছিল বরাবরই। আজ তিনি মারা গেলেন। তবে আমাকে শিখিয়ে গেছেন, 'যে দেশকে কিছু দিতে পারেনা তার কোন অধিকার নেই দেশ এর কাছ থেকে কিছু নেবার!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


