দৈন্যতা: বিত্তের বনাম চিত্তের এবং রমজান
বিশ্ব আজ ক্ষুধার জ্বালায় জর্জরিত। শুনতে অবাক লাগতে পারে। অবাক লাগতে পারে, কারণ বিশ্ব প্রতিটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান সহ সকল প্রকার মৌলিক চাহিদা পুরণের মত সম্পদ জোগান দিয়ে চলেছে, তার সে সামর্থ রয়েছে কিন্তু তার পরেও বিশ্ব আজ ক্ষুধার জ্বালায় জর্জরিত্। যে বিশ্ব জ্ঞান, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে, যে বিশ্ব আজ রোগ, শোক খরাকে জয় করেছে, যে বিশ্ব আটলান্টিকের গভীর তলদেশ থেকে শুরু করে সেই আকাশের চাঁদ পর্যন্ত জয় করেছে, যে বিশ্ব আজ আবার মঙ্গল গ্রহ জয়ের স্বপ্ন দেখছে, সে আয়োজনও করে চলেছে। সেই বিশ্বেই যদি ক্ষুধার জ্বালায় কাতরাতে হয় মানব সন্তানকে, তবে তাতে অবাক না হয়ে কি কেউ পারে?
কিন্তু আমরা অবাক হইনি। অতি স¤প্রতি যে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা তাদের এক রিপোর্টে বলছে যে, বিশ্বের প্রায় একশত কোটি বা এক বিলয়েন লোক অভূক্ত সময় কাটাচ্ছে, তাতে আমরা কোন রকম বিষ্ময় বোধ করিনি। বিশ্বের এরকম অবস্থা ক্রমান্বয়ে যে সৃষ্টি হয়ে চলেছে বিগত একটা শতাব্দী কিংবা তারও বেশী কাল ধরে, সেটা আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে, এখনও তা ঘটছে। রাজনীতি, জাতী সমুহের পারস্পরিক সহযোগিতা আর মুক্ত বানিজ্য, কিংবা মুক্ত বাজার অর্থনীতি, সুষম উন্নয়ন এর নামে যে বিশ্বের একটা গোষ্ঠি অপর দুর্বল গোষ্ঠিকে চুষে নিচ্ছে, শোষন করে যাচ্ছে দিনের পর দিন তাদের সম্পদ, তাতো সবার চোখের সামনেই ঘটে চলেছে। সম্পদের অসম বন্টনের একটা উদাহারণ দেই, এক বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু যে আয়, ব্রিটেনে একজন নাগরিকের আয় তার চেয়ে সত্তর গুন বেশী। কিন্তু তার পরেও এই ব্রিটেনের লোকজনও ক্ষুধা আর দারিদ্র থেকে নিস্তার পায়নি। এখানেও আমাদের চোখের সামনেই একলক্ষ লোক গৃহহীন হয়ে বসে আছে, আটত্রিশ লক্ষ শিশু দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করছে!
পুঁজিবাদ বিশ্বের অর্থনীতিকে এমনভাবে পোলারাইজ্ড করে ফেলেছে, এমনভাবে একটা বিশেষ গোষ্ঠির হাতে বিশ্বের সম্পদ আর বিত্তকে কুক্ষিগত করে ফেলেছে যে, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়। ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ভোগবাদ এর যে সীমাহিন বিকাশ আর বিস্তার, তা এর আগে কখনই এই বিশ্বে কল্পনাও করা যায়নি। আজকের বিশ্বে প্রায় একশত কোটি মানুষ দৈনিক এক মার্কিন ডলারের কম আয় করে থাকে। অথচ এই আমাদেরই চোখের সামনে কেউ কেউ প্রতি মিনিটে আয় করে চলেছেন অবিশ্বাস্য হারে অর্থ সম্পদ। একজন মানুষ কেবলমাত্র তার পেটে নুন্যতম খাবারটুকু জোগাড় করতে সারাদিন ধরে অমানুষিক পরিশ্রম করে যেখানে দিনে মাত্র ষাট টাকা আয় করছেন সেখানে উন্নত বিশ্বের কোন কোন মানুষ মাত্র একটি সপ্তাহেই ষাট হাজার পাউন্ড বা প্রায় বাহাত্তর হাজার মার্কিন ডলার আয় করে চলেছেন। গড়ে প্রতিদিন তারা আয় করছেন দশ হাজার মাকির্ন ডলার। আবার কেউ কেউ তার চেয়েও বেশী আয় করছেন। আয় এর এই বিরাট বৈষম্য বিশ্বকে এক নিদারুণ অপ্রিতিকর অবস্থায় ফেলে রেখেছে। তারই ফল আজ আমরা এক এক করে আমাদের চোখের সামনে ভেঁসে উঠতে দেখতে পাচ্ছি।্
এ নিয়ে কারও কোন প্রকৃত মাথা ব্যাথা নেই, তবে হৈ চৈ আছে বটে। সভা সমিতি আছে, গলাবাজী আছে, আছে প্রতি বৎসর নামে বেনামে চটকদার আয়োজন। কিন্তু তার পরেও কেউ এ কথাটা জোর গলায় বলতে পারছেন না যে, এর পেছনে আসলে দায়ী কারা, কাদের কর্মকান্ড আজ বিশ্বকে এই অবস্থায় টেনে এনেছে? যদিও অনেক বিশ্ব নেতাই মাঝে মাঝে এই দারিদ্রতা নিয়ে রাজনীতি করেন। এই না পারার পেছনে একমাত্র কারণ হলো, ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের অন্ধ মোহ। মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে, বিনা চিৎিসায় মানুষ পথে ঘাটে মরছে, তার পরেও কেউ সাহস করে প্রকৃত কারণটি বলবেন না, প্রকৃত অপরাধীদের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেবেন না, এ এক নিদারুণ মানবিক দৈন্যতাই বটে!
আর এদিকে এনজিও নামের এক আপদশ্রেনীতো ধনীদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে গরীব শ্রেনীকে সাহায্যের নামে আর এক ধরনের ঘৃন্য ব্যবসা আর বানিজ্য এবং একই সাথে রাজনীতি ফেঁদে বসেছেন। (এ বিষয়টি নিয়ে তথ্য প্রমান সহ আর একদিন কোন এক লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করব বলে আশা রাখি আল্লাহ চাহেন তো।) জি এইট শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা আগামি তিন বৎসরে বিশ্বে ক্ষুধা নিবারণে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। এরকম প্রতিশ্র“তি তারা বার বার দিয়ে এসেছেন, কিন্তু সেই প্রতিশ্র“তির কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি। প্রতিশ্র“তি অনুযায়ি অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। আবার যাওবা হয়েছে, তার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের বিষয়টি। এখানে মানবিক কল্যান আর প্রকৃত ক্ষুধার্তদের ক্ষুধা নিবারণের কোন উদ্দেশ্য যেমন ছিল না, তেমন ছিলনা কোন আন্তরিক উদ্যোগও।
অথচ কি আশ্চর্জ বিষয় দেখুন, এই নেতারাই বিশ্বে মানুষের ধংস সাধনে মারনাস্ত্র উদ্ভাবন ও তা বিস্তারের কাজে ব্যয় করে চলেছেন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। একমাত্র ২০০৬ সালেই বিশ্ব কেবলমাত্র অস্ত্র উৎপাদন খাতে ব্যায় করেছে ৫৬১ বিলিয়ন ডলার! রাশিয়া এবং আমেরিকার প্রায় ৭,৫০,০০০ (সাড়ে সাত লক্ষ) বিজ্ঞানী দিনরাত নিয়োজিত রয়েছে অস্ত্র উদ্ভাবন আর এর উন্নয়ন কাজে, গবেষনায়। একটি পারমানবিক শক্তিধর সাবমেরিণ বানাতে যে খরচ হয়, তা দিয়ে ১৬০ মিলিয়ন বা ষোল কোটি শিশুর খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে স্কুল খরচ পর্যন্ত হয়ে যায়।
এইতো মাত্র একটি সপ্তাহ আগে আমাদের প্রতিবেশী ভারত ঘোষনা দিল সদর্পে যে, তারা তাদের নৌ বাহিনীতে প্রথমবারের মত পারমানবিক শক্তিচালিত সাবমেরিণ সংযোজন করেছে। সেই ভারত, যেখানে ইউনিসেফ এর হিঁসাব মতে সত্তর কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি পায়না পান করতে! আর এক তথ্যে দেখা যায় যে, ভারতে শতকরা আশি জন নাগরিক দারিদ্রসীমার মধ্যে বসবাস করছে এবং শতকরা ৪৫জনই চরম দাারিদ্রসীমার নীচে বাস করছে। অপুষ্ঠি ও বিনাচিকৎসায় শিশুমৃত্যুর হার বিশ্বে সর্বাধিক যে সব দেশে, সেই তালিকায় ভারতের নামটি আজও জল জল করছে, যে ভারতে শতকরা চল্লিশ জনই নিরক্ষর, যেখানে পাঁচ কোটি পথশিশু রাস্তা ঘাটে পড়ে আছে, অথচ যে টাকা দিয়ে ভারত সরকার পারমানবিক শক্তিধর সাবমেরিণ বানিয়েছে, তার মাত্র এক তৃতিয়াংশ টাকা হলেই এই পাঁচ কোটি শিশুর আহার, বাসস্থান, আর শিক্ষার ব্যবস্থা হয়ে যেত! এই প্রকৃত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে উক্ত হতভাগা পাঁচ কোটি মানব শিশুকে মানবেতর অবস্থায় ফেলে রেখেই ভারত সরকার যখন সদর্পে পারমানবিক শক্তিধর সাবমেরিণ সংযোজনের কথা প্রচার করেন, তখন বাস্তবিকই দু:খ হয় বটে।
এটা কেবলমাত্র ভারতের বেলাতেই নয় বরং পুরো বিশ্বেরই এ এক দু:খজনক, কালচার রাজনৈতিক কালচার এ পরিণত হয়েছে। মানুষকে অবজ্ঞা করে বরং তার ধ্বংস সাধনে অস্ত্র আয়ত্ত করাটাই হলো আজকের বিশ্বে ‘উন্নত’ ও ‘আধুনিক’ হবার মানদন্ড বোধ হয়। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আর শক্তিধর আধুনিক রাষ্ট্র আমেরিকার অবস্থাও একই রকম।
এক আমেরিকাই প্রতি মিনিটে ৫ লক্ষ ডলার খরচ করে চলে অস্ত্র খাতে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে, প্রতি দিনে, মাত্র চব্বিশ ঘন্টায় এই বিশ্বে না খেয়ে কিংবা বিনা চিকিৎসায় ৩৫০০০ জন শিশু মারা যাচ্ছে। এক আমেরিকাতেই কিনা প্রতি দিন গড়ে সোয়া দুই কোটি মানুষ, (এক কোটি শিশু সহ ) অভুক্তাবস্থায় বিছানায়া যায়! প্রতি বৎসরে এইভাবে অনাহারে না খেয়ে ধুকে ধুকে বিনা চিকিৎসায়, বিনা যতেœ অকালে কোটি কোটি শিশু মারা যাচ্ছে। মাত্র ৬৫ মিলিয়ন ডলার হলেই এইসব শিশুদের এই অকাল মৃত্যুকে রোধ করা যেত, প্রতি বৎসর প্রায় আট লক্ষ শিশু ভিটামিন এ’র অভাবে অন্ধ হয়ে যায়। কারণ, তাদের খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমান ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার থাকেনা। খাবার থাকেনা, কারণ পর্যাপ্ত পরিমান খাবার জোগাড় করাটা তাদের সাধ্যে কুলোয়না।
অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার এক রিপোর্টে (২০০২) এ বলা হচ্ছে, বিগত ত্রিশ বৎসর আগে বিশ্ব যে পরিমান খাদ্য উৎপাদন করত, তার চেয়ে আজ এই বিশ্ব এতটা বেশী খাদ্য উৎপাদন করে যে, তা দিয়ে বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকের প্রয়োজনীয় পুষ্ঠির চেয়েও ১৭ ভাগ বেশী ক্যালরি উদ্ধৃত থাকবে। তার মানে হলো এই যে, বিশ্বে খাদ্যের কোন ঘাটতি নেই।
আর নেই বলেই অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহন কারো কারো সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। কারো কারোইবা বলি কেন? বরং অনেকেরই জন্য বাহুল্য খাদ্য গ্রহনটা একটা সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। একদিকে আফ্রিকা সহ তৃতিয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ খেতেই পাচ্ছেনা যেখানে, সেখানে আমেরিকার শতকরা ৩১ জন, মেস্কিকোর শতকরা ২৪, ব্রিটেনের শতকরা ২৩ জন, গ্রীস ও অস্ট্রেলিয়ায় শতকরা ২২ জন নাগিরক অতিরিক্ত খাবার গ্রহনের কারনে মেদবহুল হয়ে পড়েছেন। আরব বিশ্বে দেখেছি বেহিসেবি খেয়ে খেয়ে এক এক জন ‘জাবাল আল লাহাম্’ বা ‘মাংশের পাহাড়’ হয়ে গেছেন। প্রতিদিন অকল্পনীয় পরিমান খাবার অপচয় করে ‘বিন’ এ ফেলে দেয়া হচ্ছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধুয়ো তুলে যারা বিশ্বের কোন কোন অঞ্চলে খাদ্যাভাবকে যুক্তিযুক্ত বলে প্রমান করতে চান, তারা আসলে না জেনেই, সমস্যার গভীরে না গিয়েই তাদের মন্তব্য প্রকাশ করেণ, আর না হয় একেবারে অজ্ঞতার পরিচয় দেন। আসলে আমরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছি যে, জনসংখার সাথে পাল্লা দিয়ে যেমন খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে কৃষিকাজে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তির ব্যবহার। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। ফলে খাদ্যাভাবের কারণ এটা নয় যে, খাদ্য শস্যের অভাব। বরং খাদ্যাভাবের প্রকৃত কারণ হলো, সম্পদের অসম বন্টন আর শোষন, দারিদ্রতা, অবিচার আর জুলুম, এবং সর্বোপরি মানবিক মুল্যবোধের অবক্ষয়।
হ্যাঁ মানবিক মুল্যবোধের অবক্ষয়ই আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বড় সমস্যা। মানুষ, ধমর্, বর্ণ নির্বিশেষ সকল মানুষকে ‘মানুষ’ বলে ভাবতে আর মানতে প্রস্তুত নয়। তেমন শিক্ষাও আমরা মানুষকে দিতে পারছিন্,া দিচ্ছিনা। ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার বিকাশ হচ্ছে, বিস্তৃতি হচ্ছে দ্রুত। আমার সবাই জেনে বা না জেনে ভোগবাদীতার সয়লাবে নিজেদের ভাঁসিয়ে দিচ্ছি। আত্বকেন্দ্রিকতার মোড়কে নিজেদের মুড়িয়ে নিয়েছি। নিজেরা বাস করছি নিজেদেরই গড়া এক মেকী ভূবনে, যেখানে ‘আমার’ ছাড়া আর ‘কারো জন্য’ কোন চেতনা নেই। কারো জন্য কোন অনুভূতি নেই, নেই কোন স্থান। ব্যক্তিসত্তার মন আর মানসিকতায় এই সংকীর্ণতা আর যাই হোকনা কেন, বৃহত্তর মানবিক চেতনায় কোনরকম কল্যানের ইংগিত দেয়না, বরং দৈন্যতা আর বিপর্যয়কেই শুধু তুলে ধরে মাত্র।
আমাদের চেতনার জগতে এই মানবিক দৈন্য ও সংকীর্ণতার মধ্যেই আজ রামাজান এসে হাজির। আর মাত্র কটি দিন, এর পরেই শুরু হবে পবিত্র রমাজান এর রোজা। যদিও ক্ষুধার জ্বালা উপলব্ধীর জন্য আমরা রোজা রাখিনা, তার পরেও এবাদাত এর পাশাপাশি এই একটা মাস ক্ষুধার জ্বালা কতটুকু, কি নির্মম? সেটা উপলব্ধীর চেষ্টা করি আসুন। এই উপলব্ধীই হয়তো আমাদের চিত্তের দৈনতা দুর করবে, তেমনটা করতে সহায়তা করবে। আমরা হয়ত বুঝে উঠতে পারব যে, বিত্তের নয় বরং চিত্তের দৈন্যতাই মানবতার কল্যানের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

