এলো খূশীর ঈদ। হ্যাঁ, দীর্ঘ এক মাসের কঠোর সিয়াম সাধনার পরে আমাদের মাঝে এসেছে খূশীর ঈদ। কবি নজরুল এর ভাঁষায় রমাজান এর ঐ রোজা শেষে এল খূশীর ঈদ। সেই ঈদ আমাদের মাঝে এসেছে। সেদিন এই লেখা সূধী পাঠকের হাতে গিয়ে পৌছুবে সেদিনই এই ঈদ। সারা বিশ্ব জুড়ে আজ বা কাল মুসলমানরা যথাযথ খূশী আর ধর্মীয় ভাব গাম্ভির্য সহকারে ঈদ উদযাপন করবে। রামাদ্বান কেবল একটা সামাজিক উৎসবই নয় বরং এটা ইসলামের একটা ঈবাদাতও বটে। যদিও এখন আজকের এই মুসলমানদের মধ্যে সেই ঈবাদাত এর চেতনার চেয়ে সামাজিক একটা উৎসব ক্ষা রেওয়াজ এর চেতনাতেই এটা উদযাপিত হয়ে থাকে। বা তেমনটাই হচ্ছে। যাহোক সেটা আমাদের আলোচনার বিষয় বস্তু নয়। আর সে বিষয়ে আমি কোন কথা লিখতেও চাচ্ছিনা। আজ সে বিষয়ে কিছু লেখার ইচ্ছাও নেই আমার।
আজ বরং ঈদ নিয়েই কিছু লিখব। একটা প্রশ্ন করব, নিজের কাছেই নিজেদের কাছেই, সূধী পাঠকের কাছেও। প্রশ্নটা হলো ঈদ কি সত্যিই সবার কাছেই এসেছে? এসেছে কি সবার ঘরে? সত্যিই কি ঈদ এসেছে সেইসব হতভাগাদের ঘরে, যে সব হতভাগা হতভাগীনি ক’দিন আগে বি ডি আর বিদ্রোহে আপন জন হারিয়েছেন কেউ হারিয়েছেন তার স্বামী, কেউ বা হারিয়েছেন তার বাবা, কেউবা হারিয়েছেন তার আদরের সন্তান, কেউবা ভাই, আবার কেউবা বোন। আজ এই বৎসরের দিনটিতে সত্যিই কি তাদের বাড়ীতে ঈদ এসেছে? তারা কি সত্যিই কেউ ঈদ এর খূশী নিয়ে উদ্বেলিত হতে পারবেন? পারবেন কি ঈদের আনন্দে হাঁসতে?
ঈদ কি এসেছে সেই সব হতভাগাদের ঘরে, যে সব হতভাগা এই ডিজিটাল সরকারের মাত্র আট মাসের মেয়াদ কালে সরকারের পেটোয়া বাহিনীর হাতে আত্বীয় স্বজন হারিয়েছেন! কিছুদিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা গেল যে, এই সরকারের মাত্র এই ক’মাস শাসন কালে প্রায় আঠাশ শত লোক নিহত হয়েছেন। যারা নিহত হয়েছেন, তারা জানেনও না তাদের কি অপরাধ ছিল? তবে আমরা জানি, তাদের একটা মাত্র অপরাধ, আর তা হলো, তারা সরকার এবং তার দলীয় লোকদের সাথে রাজনৈতিক ও আদর্শিক দিক থেকে ভিন্ন মত অবলম্বন করতেন। তারা রাজনৈতিক বিবেচনায় বিরোধি শিবিরের লোকজন। এই আঠাশ শত হতভাগা যারা নিহত হয়েছেনর হারিয়েছেন তাদের প্রান, তারা তো মরেই বেচেছেন। কিন্তু সেই তাদের আত্বীয় স্বজন, তাদের স্ত্রী, পুত্র, পরিবার পরিজন, তাদের সন্তান সন্ততি, তাদের ঘরে আজকের এই খূশীর দিনে কি সত্যিই কোন খূশী এসেছে? এসেছে কি তাদের ঘরে ঈদ? তারা কি পাারবে স্বজন হারানোর বেদনা আর তার বিচার না পাওয়া জুলুম এর শোক ভুলে ঈদ এসেছে, সে কথাটা ভাবতে?
সরকার আর তাদের পোষ্য বাহিনীর রোষানলে পড়ে হাজার হাজার নিরিহ তরূন, যুবক গ্রাম ছাড়া, ঘর ছাড়া। জীবনের ভয়ে বাড়ী ফিরতে পারছেন না। কত লোক নিজেদের বাড়ী ঘর ছেড়ে দেশের আনাচে কানাচে আশ্রয় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন! কত লোক হয়েছেন দেশান্তর। আবার সরকার দলীয় ক্যাডারদের ঈশারায় ‘হরফুন মাওলা’ সকল কাজের কাজী, মহাক্ষমতাধর পুলিশ বাহিনীর কারসাজিতে কত নিরিহ লোক বিনা দোষে জেল খাটছেন, পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তি এভাবে মাসের পর মাস ধরে জেল এর ঘানী টানছেন, আর এদিকে তার পরিবার পরিজন, তাদের স্ত্রী পুত্র, সন্তান সন্ততি, বাবা মা অনাহারে, অর্ধাহারে মানবেতর ভাবে দিন কাটাচ্ছেন। এইসব হতভাগাদের ঘরে কি সত্যিকার অর্থে ঈদ এসেছে? ঈদ কি তাদের কাছে এক অর্থহীন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে নিদারুণ বিদ্রুপ হয়ে দেখা দেবেনা?
পত্রিকায় দেখলাম, দেশের শত শত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিকদেÍ কোন বেতন হয়নি, বোনাস তো দুরের কথা। এইসব শ্রমিকদের পরিবার পরিজন আছে, তাদেরও আছে ঘর সন্তান। তাদেরও জীবন আছে, আছে জীবনের দায়। সেই দায় মেটানোর তাড়াও আর কারো চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। আজ এই ঈদ এর আগে তাদের বেতন বোনাস না েিদয় যে গার্মেন্সটস গুলো বন্ধ করে দেয়া হলো, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া হলো এতগুলো জীবন, সেই তাদের ঘরে ঈদ এর আনন্দ আসবে কি? তারা কিসের উপরে ভিত্তি করে ঈদ এর আনন্দে মেতে উঠবেন?
ক’দিন আগেকার এক খবরে জানা গেল বাংলাদেশের নিলফামারি জেলায় অনাহারে, না খেয়ে না খেয়ে, অভূক্তাবস্থায় থেকে থেকে এক লোক শেষ পর্যন্ত মারাই গেছে। একটা মাত্র মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ করেছে পত্রিকা ওয়ালারা। এরকম কত লোক দেশের আনাচে কানাচে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, কে তার খবর রাখে? কত লোক দেশের আনাচে কানাচে বিনা চিকিৎসায়, বিনা পথ্যে অসুস্থাবস্থায় যন্ত্রনায় পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছেন তার খবর কে রাখে? সেই সব হতভাগা যারা পেটের খাবারই জোগাড় করতে পারেনি, যারা রোগে শোকে ঔষধটুকুও জোগাড় করতে পারেনি, তারা কি করে ঈদ এর আনন্দে মেতে উঠতে পারবেন? আমরা কেউ কি তাদের কাছে ডেকে বলতে পারব, আজ ঈদ, এসো ঈদের আনন্দে মেতে ওঠ? যে আমরা অভূক্ত প্রতিবেশীকে খাবার না দিয়ে কবরে ঠেলে দিতে পরেছি, সেই আমরা কি আসলেই তাদেরকে ডেকে নিতে পারব ঈদ এর আনন্দটা ভাগ করে নিতে?
সিডর আর আইলার আঘাতে বিপর্যস্থ পর্যুদস্থ বিপন্ন উপকুলবাসী আজ দীর্ঘ একটা বৎসর কাল ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছে খোলা আকাশ এর নীচে। তাদের পেটে যেমন খাবার নেই, তেমনি নেই রাতের আশ্রয়টুক, পরণে নেই বস্ত্রটুকুও। সরকার বা সমাজ, কেউই আমরা এইসব লোকদের পূনর্বসানে এক বাগাড়াম্বর ছাড়া কাজের কাজ আর কিছুই করিনি। খোলা আকাশের নিচে দিন রাত অর্ধহারে, অনাহারে থাকা এইসব বিপন্ন মানুষের ঘরে ঈদ এর কোন আনন্দটুকু আসবে? তারা কি আদৌ জানতে পারবে যে, ঈদ এসেছিল? ঈদ বলে কিছু একটা এসেছিল? আমরা কি তাদেরকে ডেকে ঈদ এর আনন্দটুকু ভাগ করে নেব? নিতে পারব কি? সেই মুখ কি আমাদের এই সমাজ, আর এই দেশের আছে?
শুনেছি এখন, এবারের ঈদ সামনে রেখে ঢাকার গুলশান এ হীরার দোকান গুলোতে নাকি তিরিশ লাখ টাকা মুল্যের হীরার হার বিক্রি হচ্ছে হর হামেশা! এতটাই বিক্রি হচ্ছে যে, সেলসম্যান এর কথা বলারও সময় নেই! সেই দেশেই যখন এক মুঠো ভাত খেতে না পেয়ে, দিনের পর দিন অভূক্ত থেকে মানুষ মারা যায়, তখন বুঝতে আর বাঁকি থাকেনা, ঈদ এর প্রকৃত তাৎপর্য কোন অবস্থায় রয়েছে আমাদের দেশে, আমাদের এই ভূখন্ডে! যে দেশে ঈদ আর রামাদ্বান বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা এইরকম সেই দেশে ঈদ উদযাপন এর ধরণটা যে কেমন হবে, তা বোধ করি আর বেশি ব্যাখা করে বলার কোন দরকার পড়েনা।
আর কেবল মাত্র আমাদের দেশের কথাইবা বলি কেন? সারা বিশ্ব জুড়ে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে যাদের ঘরে ঈদ আসার কথা, সেই আফগানিস্থান, সেই ঈরাক, সেই পাকিস্থান, সেই কাশ্মীর, সেই চেচনিয়া, বসনিয়া, সেই ইয়েমেন এ কি এসেছে কোন ঈদ? সত্যিকার অর্থে সেই সব জায়গায় কি ঈদ এর আনন্দ বলে কিছু আছে? আফগানিস্থান এর প্রতিটি ঘরে ঘরে আজও বেজে চলেছে শোক এর মাতম, স্বজন হারানোর কান্না, প্রতিটি কোনে কোনে বিধবাদের চাপা কান্না, সন্তান হারা পিতা বা মা’র রোদন, পাহাড়ি জনপদের একটা কোনা থেকেও শুকোয়নি রক্তের দাগ! গোর খোদকরা দিন রাত জুড়ে বিরামহীনভাবে খুঁড়ে চলেছে কবর! মৃত্যুপূরীর প্রতিটি ঘরে ঘরে আজ এতিম শিশুদের কান্না!
নাইজার, সুদান, ইথিওপিয়া বিশ্বের দুর্ভিক্ষ পিড়িত এইসব দেশ গুলোতে যত্র তত্র আদম সন্তানরা অভূক্তাবস্থায় দিন কাটাতে কাটাতে এক সময় ঝরে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। প্রতিদিনই সেখানে প্রতিটি মহুর্তে ঝরে যাচ্ছে প্রান, অকালে ক্ষুধা, আর রোগে, শোকে, বিনা চিকিৎসায়। ফিরে দেখার কেউ নেই। যেন কারো কোন দায়ও নেই এইসব মুসলমানদের প্রতি। বিলাসি শেখরাতো মজে আছেন তাদের বিলাস বসনে! বিপুল বিত্তের উত্তাপে তাদের চিত্ত যেন এক একটা পাথর, সেখানে মায়া, দয়া কিছু নেই! নেই এসবের কোন তীল মাত্র নমূনা! ঈদ এর সামাজিক চেতনা আর আদর্শিক দায়বোধ আসবে কোথা থেকে?
একদিন মদীনার গলীতে এক এতিম শিশুকে কাঁদতে দেখে প্রিয় নবীজি স: হাত ধরে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের বাড়ীতে, ঠাঁই দিয়েছিলেন নিজের পরিবারে। আজ সেই নবীর উম্মত এর দাবীদারদের কাছে এইসব এতিমরাই সবচেয়ে উপেক্ষিত, সবচেয়ে অবহেলিত। আজ আর কেউ এতিমের দু:খটাকে বুঝতে চায়না। কেউ আর এতিমের দিকে চোখ তুলেও তাকাতে চায়না। কেউ খোঁজ নিতে চায়না, একজন বিধাব মা তার সন্তান সন্ততি নিয়ে কতটা দু:খ, আর কতটা যাতনার মধ্যে নীরবে, নিভৃতে, গুমরে গুমরে কাঁদেন! এক মাস রোজা রেখেও কেউ বুঝতে চায়না, বিশ্বের কোটি কোটি অভূক্তদের পেটে দিনরাত ক্ষুধার জ্বালা সারাটা বৎসর ধরে কতটা প্রখর, কতটা তীব্রতর হয়ে জ্বলে!
কবি নজরুল এর ভাাঁষায় যে সব হতভাগা সারাটা বৎসরই রোজা রাখতে বাধ্য হন, সারাটা বৎসরই অভূক্ত থাকতে বাধ্য হন, সেই সব হতভাগাদের অভূক্ত রেখে আমরা, আমাদের মত এইসব মুসলমানদের ঘরে ঈদ আসে কেমন করে? আমাদের এই ঈদ এর সার্থকতাইবা কি? মুসলমানের তো তখনই ঈদ স্বার্থক হয়, যখন তার বাস্তব কোন অবদান থাকে, এমন একটা সমাজ বিনির্মানে, যে সমাজ প্রিয় রাসুল স: এর যুগের সেই মদীনার সমাজ এর মত করে পথ থেকে এতিম’কে তুলে নিয়ে পূনর্বাসন করে একজন পরিপূর্ণ মানুষের মর্যাদায়। যে সমাজ একজন বিধবাকে, একজন অসহায় নারীকে দেয় তার প্রাপ্য সামাজিক মর্যাদা। দেয় নিরাপত্তা, দেয় একজন ক্ষুধার্থকে অন্ন, আর বস্ত্রহিনকে পরিয়ে দেয় বস্ত্র। আশ্রয়হীনকে যে সমাজ দেয় মাথা গোঁজার ঠাঁই।
যে মুসলমান এই রকম একটা সমাজ বিনির্মানে তার সাধ্য আর শক্তিমত কাজ করে যান, রেখে যান অবদান, তিনিই কেবল জানেন ‘ঈদ’ এসেছে। তিনি তা টের পান কেবলমাত্র সামাজিক রসম আর রেওয়াজের মাধ্যমেই নয়, বরং ঈদ এর আদর্শিক আর আধ্যাত্বিক চেতনায়। প্রতিটা ঈদই তার কাছে নিয়ে আসে নতুন অংগীকার, প্রেরণা দেয় তাকে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করে যাবার, একটা সূখী, সমৃদ্ধশালী সমাজ গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাবার। একটা মদীনার সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তাঁকে করে তোলে আরও বেশী নিবেদিতপ্রান। আরও বেশী তৎপর।
আজ আমাদের মাঝে আবার ঈদ এসেছে। আজ সেই ঈদ। যাদের কাছে ঈদ এসেছে, আসুন, আমরা বুঝি, বোঝার চেষ্টা করি তাদের মর্মযাতনাটুকু, যাদের ঘরে ঈদ আসেনি, ঈদ এর আনন্দটুকু আসেনি। আমরা চেষ্টা করে যাই আগামিতে তাদের সাথে ঈদ এর আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নেবার মাধ্যমে একটা ‘সত্যিকার ঈদ’ উদযাপন করার। এই সবিনয় নিবেদনটুকু রেখেই সকল পাঠককে জানাই ঈদ মোবারক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



