ধর্মব্যবসা একটা ঘৃনিত কাজ। সকলেই সেকথা জানেন। মানেন আর না মানেন, অন্তত মানার ভান করেন। করেন কারণ এই কাজটা কেউই ভালো চোখে দেখেন না। আর তা দেখার কোন কারণও নেই। ধর্ম মানবতার বৃহত্তর কল্যানের পথনির্দেশ করে। নারী, পুরুষ, জাত, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলের সর্বোচ্চ কল্যান নিশ্চিত করাটাই হলো ধর্মের উদ্দেশ্য। কোন ধর্ম কতটা সক্ষমতার সাথে সে উদ্দেশ্যটাকে নিশ্চিত করতে পারে বা পেরেছে, সেটা এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়।
আজ যে কথাটা বলতে বসেছি, সেটা হলো ধর্মকে ভিত্তি করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠির সংকীর্ণ স্বার্থ উদ্ধার করা, আর সে কাজে ধর্মকে নিজের বা নিজেদের সুবিধামত ব্যবহার করাটা নিতান্তই একটা হীন কাজ। এটা প্রকৃত ধার্মিক লোকের কাজ হতে পারেনা বরং ‘বক ধার্মিক’ ‘ভন্ড’ বা ‘মোনাফিক’ যে নামেই ডাকুক না কেন, তাদের কাজ এটা। আমরা আমাদের চারিপাশে বিভিন্ন সময় এরকম লোকদের উপস্থিতি দেখতে পাই। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়েই এরকম ব্যক্তি বা গোষ্ঠির উপস্থিতি প্রায় প্রতিটি সমাজেই দেখতে পাওয়া যায়।
যায় বটে, তবে সবচেয়ে বেশী দেখতে পাওয়া যায় দূর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামি সমাজের মধ্যেই। এর একমাত্র কারণও এটাই যে, একমাত্র ইসলামই সবচেয়ে বেশী, সর্বোচ্চ মানে এবং প্রকৃত কল্যান নিশ্চিত করতে পারে মানুষের জীবনে। আর এটাইতো স্বাভাাবিক যে, যেখানে কল্যান আর সুবিধার হাতছানি, সম্ভাবনা বেশী, সেখানে তার প্রত্যাশীর সংখ্যাও বেশী হবে। এই কারণেই আমরা ইসলামের ছত্রছায়ায় বিশ্বের সবেচেয় বেশী সংখক বনী আদমকে যেমন দেখতে পাই, তেমনি দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সমাজেই সবচেয়ে বেশী ধর্মব্যবসায়ী ভন্ডের উপস্থিতিও বিদ্যমান।
ইসলামে ধর্মব্যবাসায়ী চেনার বেশ কতগুলো উপায় আছে। সবচেয়ে বড় কয়েকটির মধ্যে অন্যতম হলো, এদেরকে ক্ষমতার কাছাকাছি ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়। ক্ষমতার কাছে কোন আলেম ওলামার উপস্থিতিই তাকে ধর্মব্যবসায়ী বানিয়ে দেয়না, বরং তাকে চিনতে হয় ক্ষমতাসীণদের সাথে তার সম্পর্ক, তাদের কর্মকান্ডের প্রতি তার বা তাদের পোষিত দৃষ্টিভংগীকে বিচার করে। ক্ষমতাসীণ সরকারের বিভিন্ন অনৈসলামিক কর্মকান্ডকে ইসলামি পরিচিতি দিতে এÍা সাহায্য করে যেমনি, তেমনি এরাই মূলত একটি ইসলাম বিরোধি সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান স¤প্রদায়ের কাছে ইসলামের খাদেম হিসেবে তুলে ধরতে, তাদেরকে সেভাবে পরিচিতি দিতে তৎপর থাকে। এর পেছনে অবশ্যই সরকারের ভূমিকা থাকে। সরকার আলেম নামধারী কিছু ধর্মব্যাবসায়ীর পিছনে বিনিয়োগ করেন, মাল পানি ছাড়েন। কিছু খুদ কুঁড়ো ছিটান। এসব উচ্ছিষ্ঠ ভক্ষনের লোভে সারমেয়রূপী কিছু আলেম নামধারী হামলে পড়ে!
এসব আলেম নামধারী আপদরাই যে একমাত্র ধর্মব্যবাসীয় তাই নয়, এর চেয়েও বড় ধর্মব্যবসায়ী হলো স্বয়ং সেই সরকার, যে সরকার জনগনের ইসলামি আবেগ আর জজবাকে নিজেদের অনৈসলামিক, রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর ফন্দি ফিকির করে। তারা খুঁজে খুঁজে এমন কিছু জ্ঞানপাপী লোককে বের করে, পৃষ্ঠপোষকতা দান করে, যারা হাদিস আর কুরআনের দু’চারটা বানী শিখেই তা নিয়ে সরকারের ফরমায়েশ মত ফতওয়া দিতে মাঠে নেমে পড়ে।
এমন একটি সরকার, আওয়ামি লীগের সরকার। দু:খজনক এবং দূর্ভাগ্যজনকভাবে এরাই এখন দেশটার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে, ইতিহাসের এক কলংকজনক প্রতারণার মাধ্যমে। ক্ষমতায় আসতে এরা ইসলামি ঐক্যজোট এর সাথে ‘ক্ষমতায় গেলে ইসলাম বিরোধি কোন স্বিদ্ধান্ত নেয়া হবে না’ মর্মে যেমন চুক্তি করতে পারে, তেমনি আবার রাম-বাম’দের বিরোধিতার মুখে সেই চুক্তিই মাত্র কিছুদিনের মাথায় বেমালুম উল্টেও দিয়েছেন। একেবারে পুরো জাতির চোখের সামনে। ‘ধর্মব্যবসায়ী’ অপবাদ দিয়ে ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে ইসলামি আদর্শধারী রাজনীতিবিদদের যেমন মাঠে ময়দানে গালাগাল করতে পারেন, তেমনি আবার ক্ষমতার প্রয়োজনে সেই তাদের কাছেই করজোড়ে সরকার গঠনের সমর্থন চেয়ে দূতও পাঠাতে পারে! ধর্ম ও ধার্মিক গোষ্ঠিকে নিয়ে এমন নির্লজ্জতা একমাত্র এবং কেবলমাত্র একটি গোষ্ঠিই বাংলাদেশে দেখাতে পেরেছে। সেটাই হলো ‘ আওয়ামি লীগ’ আজকের বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন যারা!
সেই এরাই আবার আজ ক’দিন হলো, ক্ষমতায় আসার পরে থেকে বিভিন্ন ‘আলেম’দের ধরে এনে আলোচনা সভার আয়োজন করে চলেছেন, তাদের দিয়ে ফতওয়া দেয়াচ্ছেন। জাতিকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন, দেশের ইসলামপ্রিয় জনগনের ভাবাবেগকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার মাধ্যমে নিজেদের জনসমর্থনকে সংহত করতে ন্যাক্কারজনক ও ঘৃন্য কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন। এই লক্ষ্যেই ক’দিন আগে তারা ‘মুফতি পরিষদ’ নামে এক ভূঁই ফোঁড় সংগঠনের নামে ক’জন তথাকথিত আলেম(!) নিয়ে এক আলোচনা সভা করেছেন বা করিয়েছেন। আর সেখানে এক ফতওয়াও আদায় করিয়ে নিয়েছেন তাদের থেকে। ফতওয়া’র ভাঁষাটা পুরোপুরি এই মহুর্তে মনে না থাকলেও তার মূল ভাবার্থ হলো এই যে, মরহুম শেখ মুজিবকে জাতির পিতা না মানলে কিংবা তার অবদানকে অস্বীকার করলে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে’। তথাকথিত এইসব মুফতিরা এর স্বপক্ষে আবার আল কুরআন এবং হাদিসের উদ্ধৃতিও দিয়েছে!
সামান্য খুদ কুঁড়ো ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে সম্ভবত হাইকোর্টের বারান্দা কিংবা রমনা পার্কে ছেঁড়া চট গা’এ দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা কোন অশিক্ষিত ফকিরের সামনে অথবা ঈমান বিক্রি করতে তৎপর কোন ভন্ড’র সামনে। আর ওমনি এইসব ভণ্ড, তথাকথিত ‘মুফতি’ সাহেবরা হাজির হয়েছে, কে কাফের আর কে মুসলমান সে ফতওয়া জারি করতে। দু:খ হয়, রাগও হয় এইসব মুফতী সাহেবদের দূর্গতি দেখে, তাদের অধ:পতন দেখে বিবেকবান প্রতিটি মুসলমানের মনেই ক্ষোভ জন্মে ওঠে। ইসলাম আল কুরআন আর হাদিসের নুন্যতম জ্ঞান আছে, এমন যে কোন মুসলমানের মাথা নত হয়ে আসে লজ্জা আর ক্ষোভ এ।
এর পাশপাশি মনের কোন আরও একটি প্রশ্ন দেখা দেয়। শতকরা আশি ভাগ (সত্যিই নাকি?) ভোট পেয়ে যে আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় এসেছে, সেই আওয়ামি লীগের ক্ষমতারোহনের মাত্র নয়টি মাসের মধ্যেই কেন দেশবাসীকে এমন একটা ফতওয়া দেবার প্রয়োজন পড়ল? আওয়ামি লীগের পক্ষ থেকে যেসব আঁতেলরা এই ফতওয়ার অর্ডার দিয়ে তা সরবারাহের ব্যবস্থা করেছেন, তাদের মাথা যে নিরেট গোবর ভর্তি, তা বোধ হয় পুরো দেশবাসীই এখন বুঝে উঠেছেন। আয়োজকরা বোধ হয় ভেবেছিলেন যে, এরকম দু’চার টাকায় কেনা ভন্ড ফকিরদের মুফতি সাঁজিয়ে, তাদের মুখ থেকে ফতওয়া আদায় করে দেশবাসীকে ‘সাচ্চা মুসলমান’ বানানোর নামে আওয়ামি লীগের সমর্থক বানানো যাবে!
পাগল আর কাকে বলে? ফতওয়ার আয়োজকরা দু’চার কল্কি টেনে তারপরই ফতওয়ার আয়োজন করতে মাঠে নেমেিেছলেন! কল্কির বদৌলতে মাথা গরম না হলে তারা একটু চিন্তা করে দেখতেন যে, বিরোধি দলে থাকতে, ক্ষমতার বাইরে থাকতে যে আওয়ামি লীগের এমন একটা ফতওয়ার দরকার পড়লনা, সেই একই আওয়ামি লীগের কেন ক্ষমতারোহনের মাত্র নয় কিংবা দশ মাসের মাথায় এমন ফতওয়ার প্রয়োজন পড়ে? সে প্রশ্ন সচেতন দেশবাসী ঠিকই তুলবেন। ওদিকে তেমনি সেইসব ‘মুফতি’ সাহেবরাও বোধ হয় খুদ কুঁড়ো ছিটাতে দেখেছেন যেসব আব্বা হুজুরদের, তাদের পদাংক অনুসরণ করে কয়েক কল্কি টেনেই তার পরে ফতওয়া দিতে তাদের মাথা ঘামিয়েছেন। হাইকোর্ট এর বারান্দা কিংবা রমনার বটমুলে ভেজাল ‘মাল’ খেতে অভ্যস্ত হুজুররাই আব্বা হুজুরদের সাপ্লাই করা ‘খাঁটি মাল’ খেয়ে মাথার গরম গরম ভাবটা সামাল দিয়ে উঠতে পারেন নি। তা না হলে তারা ভেবে দেখতেন, কোন বিষয়ে তারা কি বলতে যাচ্ছেন? কোন বিষয়ে মুখ খুলছেন।
বাংলাদেশ গরীব হতে পারে গরীব হবার কারণে এখানকার জনগন পেটের দায়ে ঈমান ও আর্দশ বিরোধি কাজ করতে বা করাতে পারে বটে কিন্তু তার পরেও এই দেশটার ঘরে ঘরে কুরআন, হাদিস, এর হাফেজ আছেন। এমনকি অনেক মুদীখানার দোকানদার কিংবা রাস্তা ঘাটে ফেরী করে বেড়ানো ফেরীওয়ালার কাছেও রয়েছে আল কুরআনের স্বচ্ছ, সলীল জ্ঞান। এখানে তাদের ঐ ফতওয়া আর কিছুই নয়, কেবলমাত্র হাঁসির খোরাকই জোটাবে। আর জুটিয়েছেও তাই। তবে কেবল হাঁসিই নয় বরং ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছে এই ফতওয়া।
আলেম নামধারী এই ক’জন ভন্ডের ফতওয়া শুনে কোন এক বিখ্যাত মনীষির রচিত একটি বিখ্যাত চরণ মনে পড়ে গেল। এরকম ধর্মব্যবসায়ী ভন্ড আলেমদের কর্মকান্ডই তিনি মাত্র দুটি লাইনে অত্যন্ত সুন্দর করে বিবৃত করেছেন। উক্ত মনীষি যে চরণটি রচনা করেছেন, তার বাংলা মমার্থ হলো এরকম;
“ পন্ডিত ভায়া মশালধারী, কথা বানায় ও বলে,
পরকে দেখায় আলো, কিন্তু নিজে আঁধারে চলে।”
আসলেই ইসলাম সন্মন্ধে, আল কুরআন আর আল্লাহর প্রিয় হাবিব ( সা: ) এর পবিত্র মুখ নিসৃত বানী সন্মন্ধে যাঁদের বিন্দু মাত্র জ্ঞান আছে, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, যে এই সব আলেম নামধারী ভন্ডরা নিজেদের জায়গা কোনখানে স্থীর করে নিলেন, এমন একটা ফরমায়েশি ফতওয়া প্রদানের মাধ্যমে।
আর অপরদিকে রাজনীতির খবরাখবর একটু আধটু যাঁরা রাখেন, বিচার বিশ্লেষন করতে পারেন, নিরীক্ষন করেন এর গতি প্রকৃতি, তাঁরা ঠিকই বুঝে উঠেছেন মাত্র নয় মাসের ক্ষমতাকালে টেন্ডার বাজী, চাঁদাবাজী, অস্ত্রবাজী, ডান্ডাবাজী, স্বজনপ্রীতি আর দূর্ণীতির সয়লাবে গা ভাঁসিয়ে দেয়া আওয়ামি লীগ, ফতওয়াবাজীর বিরুদ্ধে বার বার বিষোদ্গার করা, তার বিরুদ্ধে কার্যত জেহাদ(!) ঘোষনাকারী আওয়ামি লীগ আবার সেই ফতওয়াবজাীর মাধ্যমেই নিজেদের গনসমর্থন টিকিয়ে রাখার এই ঘৃন্য আয়োজন করতে গেল? এটা আর কিছুই নয়, সরকারের পদতল থেকে যে মাটি সরে যেতে শুরু করেছে, আর স্বয়ং সরকারই যে বিষয়টি বুঝতে পেরে মরীয়া হয়ে উঠেছে, সে বিষয়টিই পরিস্কার করে দেয় মাত্র। কাজেই উক্ত ফরমায়েশী ফতওয়া আর কিছু পারুক বা না পারুক, আওয়ামি লীগ যে দেউলিয়াত্বের দোরগোড়ায়, সে ফতওয়াটা ঠিকই দিয়ে গেছে! তাদের নিজেদের অলক্ষেই!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




