একটা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরকে কেন্দ্র করেই এবারের লেখা। ‘দৈনিক আমার দেশ’ এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়, রংপুর চিড়িয়াখানা ও সূরভী উদ্যানে বোরখা ছাড়া আপত্তিকরভাবে চলা ফেরা করায় ১৯ জন যুবক যুবতীকে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরে অবশ্য আটককৃতদের অভিভাবকরা এসে মুচালেকা দিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। বিষয়টা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু না, তা হয়নি। বরং বিষয়টাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একটা নাটকের পরিসমাপ্তিতে, একটা পরিণতির দিকে।
পরিণতিটা হলো, উক্ত সামান্য ঘটনাটিকেই প্রচার, প্রোপাগান্ডায় ‘অসামান্য’ করে ইসলাম বিরোধি তৎপরতার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। নাগরিক অধিকার এ পুলিশের হস্তক্ষেপ অভিহিত করে একজন আঈনজীবি আদালতের দৃষ্টিতে ঘটনাটি আনেন।
আদালত বোরখা না পরার কারণে কাউকে হয়রাণী না করার নির্দেশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট ডিবি পুলিশকে হাইকোর্ট বেঞ্চের সামনে উপস্থিত হয়ে কেন তাদের বিরুদ্ধে আঈনগত ব্যবস্থা নেয়া হবেনা, তার কারণ দর্শাতে বলেন। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর এ নির্দেশ দেন।
বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন আছে, তাই এ নিয়ে বেশী কথা বলা সঙ্গত হবেনা। বলবও না। তবে আমরা সাধারন মানুষ। বুঝিও খুবই সাধারণ। অসাধারণ কোন ঘটনা আমাদের মাথায়ও আসেনা, তাই একজন সাধারণ মানুষ, সাধারণ মুসলমান হিসেবে ঘটনাটি একটু বিচার করে দেখব। এই যে ঘটনা, তা নিয়ে এমন অস্বাভাবিক রি-এ্যকশন, এর মধ্যে কি কোন আলামত আছে নিকট ভবিষ্যতের জন্য? এটা কি আদৌ কোন বার্তা বহন করে এই জাতিসত্তার আগামি প্রজন্মের জন্য?
আমারতো মনে হয় একটা বিরাট আলামত রয়েছে এ ঘটনার মধ্যে। বাংলাদেশের একটা বিভাগীয় শহরে এক পুলিশ কর্মকর্তা আঈন শৃংখলা রক্ষায় স্ব উদ্যোগি হয়ে তার দায়িত্ব পালনের করেছেন। সারা দেশে নারী পুরুষ, বিশেষ করে, এক শ্রেনীর উশৃংখল তরুণ যুবক, বেশীর ভাগই ছাত্রলীগের ‘সেঞ্চুরিয়ান সোনার ছেলে’রা, সাধরণের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে জোড়া জোড়া মিলে অশালীন পোষাকে আপত্তিকরভাবে চলা ফেরা করে।
এটা বাংলাদেশে প্রচলিত আঈনে অপরাধ কিনা জানিনা, তবে স্বাভাবিক মানবিক দৃষ্টিকোন বিচারে অবশ্যই কাম্য নয় এবং ঘোরতর ভাবে আপত্তিকর, অন্ততপক্ষে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা বিবেচনায় নিলে। আর তা দেশের আঈনে কোন অপরাধ না হলেও অনেক অপরাধের রাস্তা খুলে দিতে খুব বেশী ভূমিকা রাখে, সেটাতো অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।
রাস্তা ঘাটে স্কুল কলেজগামী ছাত্রী , বিভিন্ন প্রয়োজনে চলা ফেরারত নারীদের যে ভাবে এক ধরণের কুলাংগার কর্তৃক উত্যক্ত করা হয়, তাঁদের মান সম্মান নিয়ে টানাটানি করা হয়, তা অনেক সংসার যেমন নষ্ট করে, তেমনি অনেক জীবনও অকালেই ঝরিয়ে দেয়! এই তো ক’দিন আগেই বাংলাদেশে যশোহর, ইশ্বরদী, খোদ ঢাকা শহরসহ দেশে আনাচে কানাচে বখাটেদের সীমাহীন উৎপাত এ অতিষ্ঠ হয়ে বেশ ক’জন স্কুল কলেজ ছাত্রী, তরুনী যুবতী আত্বহত্যা পর্যন্ত করেছে।
এ বাস্তবতাকে দৃষ্টি সীমার মধ্যে রাখলে দেশের কোন বিবেকবান নারী পুরুষেরই মনে স্বস্তি থাকে না। থাকতে পারেও না। ঘরে সোমত্ত কন্যা, বোন আছে, এমন কোন বাবা মা, কোন ভাই ব্রাদার বা অভিভাবকই শান্তিতে ঘুমুতে পারেন না। আর একজন পুলিশ অফিসারতো এই দেশেরই মানুষ, এ দেশের কাছেই তাঁর দায়বদ্ধতা, এ সমাজেই তাঁকে বাস করতে হয়, তিনি যদি তাঁর এলাকায় এ রকম অনাচার বন্ধে কোনরকম ব্যবস্থা নেন, তাতে দোষের হলোটা কি, তা আমাদের বুঝে আসেনা।
যে সব তরুন তরুনী, যুবক যুবতীদের থানায় আনা হয়েছিল, তাদের নাকি নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। হয়ত হয়েছে, কার কতটুকু নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে, তা অবশ্য আমার জানা নেই , বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে হয়ত প্রমান হবে।
তবে একটা কথা এখানে না উল্লেখ করলে মহাপাপ হবে বলে বোধ করি। ক’দিন আগে বদরুন্নেসা মহিলা কলেজে বোরখা পরা ছাত্রীদের ধরে ধরে এনে যে শারীরিকভাবে অত্যাচার করা হলো, এর পরে তাদের ছাত্রী হল থেকে উচ্ছেদ করা হলো, কেবলমাত্র বোরখা পরার অপরাধে? সেটা কি নাগরিক অধিকার খর্বের ঘটনা ছিল না?
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমপ্রধান দেশে এ ঘটনা কি কল্পনাও করা সম্ভব? তখন তো কোন আঈনজীবি স্বপ্রনোদিত হয়ে আদালতে এইসব হতভাগীনি ছাত্রীদের মানবিক অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসেন নি? কেউ যেন প্রতিবাদটুকু করার কোন প্রয়োজন মনে করেন নি!
পিরোজপুরে তিন মাদ্রাসা ছাত্রীকে কেবলমাত্র বোরখা পরার অপরাধে ধরে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো, তাদেরকে আটক রাখা হলো জেলখানায় দিনের পর দিন! সমাজে তাদেরকে অপরাধী হিসেবে কলংকিত করা হলো!! কই তখনতো কোন আঈনজীিিব আদালতে স্বপ্রনোদিত হয়ে যান নি এই তিন পর্দানশীন ছাত্রীর ধর্মীয় ও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষায়! সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায়! কেউ তখন কোন প্রতিবাদটুকুও করেন নি।
উল্টো বরং ছাত্রীদের অভিভাবকদের নাজেহাল করা হয়েছে। ভয়, ভীতি দেখানো হয়েছে আদালতে বিচার চাইবার কারণে! আর অনেক আঈনী লড়াই করার পরে পুলিশ যখন কোনই প্রমান হাজির করতে পারলনা এই তিন ছাত্রীর বিরুদ্ধে, আনতে পালনা কোনই তথ্য, তখন আদালত এইসব ছাত্রীদের জামিন দিলে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র!!
আদালত কেন তাদের জামিন দিল? আদালতের এই অপরাধে(!)র প্রতিবাদে সোনার ছেলেরা, মানবতাবাদী গ্র“পগুলোর সামনে, এমনকি খোদ সরকারের চোখের সামনেই গাড়ী ভাংচুর করল, মিছিল করল, আদালতের বিরুদ্ধে শ্লোগানও দিল। তখন কোথায় ছিলেন আজকের এইসব আঈনজীবিরা? তখন কেন তারা নিশ্চুপ বসে ছিলেন? কেন কোন প্রতিবাদটুকুও করেন নি?
তা কী কেবল এই কারণে যে, ঐ তিন ছাত্রী ছিলেন বোরখা পরিহিতা? কেবলই কি এই কারণে যে, ঐ তিন ছাত্রী ছিলেন প্র্যাকটিসিং মুসলমান? মানবাধিকার এবং সংবিধানিক অধিকার তবে কি কোন নিষ্ঠাবান প্র্যাকটিসিং মুসলমান এর বেলায় প্রযোজ্য নয়?
এসব নিয়ে গত ক’দিন ধরে মনটা বড়ই ব্যকুল হয়ে আছে। নিরন্তর বসে বসে এইসব প্রশ্নের উত্তরটাই খুঁজছি। তা পেয়েও গেলাম। পেলাম মাত্র ক’দিন আগে, পত্রিকার পাতায় একটা খবর পড়ে।
গেল ৪ঠা মার্চ দৈনিক ‘প্রথম আলো’তে একটা ছোট্ট(?) খবর প্রকাশিত হয়েছে। চমকপ্রদ কিন্তু দু:খজনক খবর। জাতিয় পার্টির সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের উপরে আনিত ধন্যবাদ প্রস্তাবে আলোচনা করতে গিয়ে একটা কথা বলেছেন। কথাটা যে তার নিজেরই মনের ইচছাটাই প্রকাশ করেছে তাই নয় বরং তার কথাটা পুরো মহাজোট, বর্তমান সরকারের প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান আর গোষ্ঠিরই খায়েশ, এবং তাদের শাসনামলে বর্তমান বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্রই প্রকাশ করে দিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা এবং এর মঞ্জিল, এর পরিচয় তুলে ধরেছে।
তিনি কি বলেছেন? পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে প্রকাশ, তিনি বলেছেন ‘ইসলামের কথা ও ভারত বিরোধিতার রাজনীতি এখন শেষ হয়ে গেছে’ তিনি আরও বলেন ‘ইসলাম কোন জাতি নয়, ইসলাম জাতি হলে ইরাক আর আফগানিস্থান এর মধ্যে কোন সীমানা থাকত না। ’
সোজা কথায় যতটুকু বুঝি, বাংলাদেশে ইসলাম এর দিন শেষ হয়ে গেছে। এখানে আর ইসলামের কথা বলা যাবেনা। ইসলাম মেনে চলা বা চলতে বলা যাবেনা। সেটাই তার কথায় পরিষ্কার হয়ে গেছে।
প্রিয় রাসুলুল্লাহ সা: এর এক মামা হযরত সা’দ (রা
এর পরে রাজনৈতিকভাবে ইসলাম আর মুসলমান কর্তৃত্ব নিয়ে এই বাংলায় জেঁকে বসে, সেতো সেই এরকমই এক মার্চ মাস এর কথা। যে মার্চ মাস বাংলাদেশীদের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব আদায়ে নামার মাস, সকল অপশাসন আর অন্যায় এর বিরুদ্ধে এই জাতিসত্তার প্রতিটি সদস্য, সদস্যা প্রান হাতে করে ঝাঁপিয়ে পড়ার মাস, সেই মার্চ মাসেরই এক শুভলগ্নে এই বাংলায় এসেছিল ইসলাম, একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে।
আজ হতে প্রায় আট শত বৎসর আগেকার কথা! সেই ১২০৩ সালের মার্চ মাস, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী ভারত জয় করেন। ইসলামকে এখানে একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এর পরের ইতাহাস হলো কেবলই ভাগ্য পরিবর্তনের ইতিহাস। এর পরের ইতিহাস হলো, কেবলই মুক্তির ইতিহাস। স্বাধীনতা আদায়, আর রক্ষা করার ইতিহাস। সে পথে আত্বত্যাগের ইতিহাস।
এ ইতিহাস হলো, মুসলমানদের ভারত বিজয়ের কারণে বর্ণবাদী হিন্দু স¤প্রদায়ের হাত থেকে মানবতার মুক্তির ইতিহাস, একটা বিষ্ময়কর ভারত গড়ার স্বর্ণোজ্জল ইতিহাস। পুরো বিশ্ব ইতিহাসের গতী পথই পাল্টে দেবার ইতিহাস!
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ণবাদী হিন্দুত্বের হাতে নিষ্পেষিত, নির্যাতিত, নিগৃহিত ভারতবাসী মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমেই তাদের বহু কাংক্ষিত মুক্তির স্বাদ লাভ করে। এটা কি আমার আবেগ আর অন্ধ ধর্মানূভূতীর কথা? তা নয়, বরং এটা হলো একজন প্রখ্যাত হিন্দু গবেষক ও ঐতিহাসিক শ্রী এম এন রায় এর কথা, তিনি তাঁর এক গবেষনা গ্রন্থে লিখেছেন;
‘ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা ভারতীয় জনগনের সমর্থন লাভ করল। তার কারণ তার পিছনে জীবনের যে দৃষ্টিভংগি ছিল, হিন্দু দর্শনের চাইতে তা ছিল শ্রেয়; কেননা হিন্দু দর্শন সমাজ দেহে এনেছিল বিরাট বিশৃংখলা, আর ইসলামই তা থেকে ভারতীয় জনাসাধরণকে মুক্তির পথ দেখায়।( সুত্র: ‘ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান’ লেখক; এম এন রায়, পৃষ্ঠা ৬২)
এর পরের ইতিহাস সবার জানা। এর পরে বখতিয়ারের সেই বিখ্যাত সতেরো ঘোড়সওয়ারই কেবল ইসলামের কথা বলে যান নি, বরং এরপরে পুরো ভারতবাসী কেবলই ইসলামের কথা বলে চলেছেন। কেউ বলেছেন মুক্তির আনন্দে, আর কেউবা প্রসাদ হারানোর বেদনায়, কেউবা গাত্রদাহের অহর্ণীশ যন্ত্রনায়! কিন্তু তারা সকলেই বলেছেন ঐ ইসলামেরই কথা!
বলতে বাধ্য হয়েছেন। নিজেরা দলে দলে এসে ইসলামের কথা বলার জন্য, ইসলামের ছায়া তলেই আশ্রয় নিয়েছেন। হাঁসতে হাঁসতে এসে আত্বসমর্পণ করেছেন কিন্তু পরাজিত হননি। ছোট হন নি, হয়েছেন মহিমান্বিত, গৌরাবান্বিত, ধন্য। ইসলামের কারনেই পুরো ভারতবাসী তাদের পরিচয়টাকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, আত্বসচেতন হয়েছে। আরও একজন হিন্দু লেখকের উদ্ধৃতি দিচ্ছি, দেখুন তিনি কি বলেন;
‘ইসলামের বলিষ্ঠ ও সরল একেশ্বরবাদ এবং জাতিভেদহীন সাম্যদৃষ্টির কাছে ভারতীয় জীবনধারা ও সং®কৃতির.. ... এ পরাজয় রাষ্ট্রশক্তির কাছে নয়, ইসলামের উদার নীতি ও আত্বসচেতনতার কাছে। কারণ ইসলাম কোন জাতির ধর্ম নয়, প্রচারশীল ধর্ম। ইহা অন্যকে জয় করেই ক্ষান্ত হয়না, কোলে তুলে নেয়’ (সং®কৃতির রুপান্তর, লেখক: গোপাল হালদার, পৃষ্ঠা ১৯৬)
হ্যাঁ, ইসলাম ভারতে এসে এখানকার নিগৃহীত মানুষকে কোলে তুলে নিয়েছে পরম মমতায়। ভারতে যারা ছিল ‘অচ্ছুত’! ইসলাম সেই তাদেরই মানুষ হিসেবে সমমর্যাদায় উন্নীত করেছে। আজ সেই তাদেরই বংশধররা দেশের সংসদে প্রকাশ্যে ইসলামের বিরোধিতা করে! তাও আবার এইসব মুসলমানের ভোটে নির্বাচিত হয়ে, তাদের নেতা সেজে, তাদেরই টাকায় নিজের পেটের ভাত জুগিয়ে খেয়ে!! নেমক হারাম আর কাকে বলে? (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


