কর্ডোভা আর সেভিল ছিল একটি শান শওকতপূর্ন সভ্যতা, আজকের স্পেন এরই অংশ। সে যখন জ্ঞান বিজ্ঞান, সফলতা, প্রগতি আর সমৃদ্ধির শীখরে, তখন ইউরোপ ছিল আমাবশ্যার গাঢ় আঁধারে ঢাঁকা! ছিল অজ্ঞানতার আঁধারে নিমজ্জিত একটি ভূখন্ড! জ্ঞান বিজ্ঞানের জগতে পড়ে ছিল তীমিরে, সমাজ ছিল সামন্তপ্রভূ আর দস্যূ তস্করদের অভয়ারণ্য! মূর্খ পাদ্রীরাই সমাজের হর্তা কর্তা, কিং মেকার! দু’চারজন বিদোৎসাহী ব্যক্তি, আর যাঁদের রক্তে ছিল ভ্রমনের নেশা, কালে ভদ্রে যেতেন ইউরোপের বাইরে!
তাদেরই দু’একজন, এবং কিছু বনীকই গিয়ে পৌছেন মুসলিম স্পেন এ, সভ্যতার সোনালী শীখরে আসীন ভূখন্ড কর্ডোভা, আর সেভিল এ। হঠাৎ করে আঁধার থেকে আলোতে বেরিয়ে এলে প্রথমে যেমন সারাটা চোখ জুড়ে থাকে একধরণের অস্পষ্ঠতা, ঠিক তেমনি এইসব আগন্তকদের চোখেও কর্ডোভার শানশওকত বা আলহামরার রুপ, তাদের মন, দৃষ্টি, আর চেতনাকে অবশ করে দিয়েছিল!
বিষ্ময়ে হতবাক এইসব নবাগতরা এক ধরণের ঘোরের মধ্যেই পড়ে যেতেন স্পেন এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক ব্যবস্থা. প্রাশাসনিক রুপ আর জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি, আধুনিক জীবন যাত্রা দেখে!
এই ‘আজব দুনিয়া’র কথা কল্প কাহিনীর মত তাদের মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ ব্যাপি! কর্ডোভা, আন্দালুস ছিল মুসলমানদের জ্ঞান, বিজ্ঞান আর সামাজিক অগ্রযাত্রায় কতটা উন্নত পর্যায়ে পৌছেছে, তারই একটা জলন্ত চাক্ষুস প্রমান।
আর এই মুসলমানদের পতনও শুরু হয়েছিল ঐ কর্ডোভা থেকেই। আমরা ভাবি যে, ফার্ডিনান্ড আর ইসাবেলার আক্রমন্ আবু আব্দুল্লাহÍ মত কিছু গাদ্দার এর কারণে আমরা স্পেনে পতনের মুখোমুখি হয়েছি। হ্যাঁ, ফার্ডিন্যন্ড এর সামরিক আক্রমন একটা কারণ ছিল বটে, তবে সেটা ছিল কফিনের গায়ে শেষ পেরেক।
ফার্ডিনান্ড আর ইসাবেলার নেতৃত্বে ইউরোপীয় বাহিনীর কাছে সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় বরণ করার অনেক আগে থেকেই কর্ডোভার মৃত্যু শুরু হয়েছে। ইতিহাস সন্মন্ধে একটু সচেতন হলেই বিষয়টা চোখে পড়ে।
একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে যাঁরা ইসলামকে জানেন কিংবা জানার চেষ্টা করেন, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, কোন বিশেষ ভূখন্ডে ইসলাম টিকে থাকে কেন ও কিভাবে? কিংবা কোন একটি ইসলামি সমাজ কিভাবে অমরত্ব লাভ করতে বা কতদিন সেই অবস্থায় থাকতে পারে? ( বিষয়টা নিয়ে আমার ‘ইসলাম; সভ্যতার শেষ ঠিকানা’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি, বিধায় এই স্বল্প পরিসরে তার পুনরাবৃত্তি করলাম না।)
ইসলামের আভ্যন্তরিণ শ্িক্ত আছে, সেই শক্তিই ইসলামকে টিকিয়ে রাখে। নিজের অভ্যন্তর হতেই তাকে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়ে চলে। সেই শক্তির নাম হলো ইজতিহাদি শক্তি। ইসলাম কেন পুরানো হয়না? এ প্রশ্নের উত্তরও সেটিই। ইজতিহাদ-ই ইসলামের প্রানশক্তি।
যাহোক, বলছিলাম কর্ডোভার পতনের কথা। কর্ডোভার সামরিক পতনের আগে সেখানে শুরু হয়েছে যে মুল প্রানশক্তির উপরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রতিষ্ঠিত থাকে, সেই প্রানশক্তির পতন পর্ব।
ইসলাম জ্ঞানকে ফরজ করেছে। জ্ঞান আহরণের পথ, সঠিক পন্থা কি? ইসলাম একজন শিক্ষার্থিকে বিষয়ের গভীরে যেতে উদ্বুদ্ধ করে, তার হৃদয় দিয়ে বিষয়টিকে অনুধাবন করতে, এর তাৎপর্য বুঝে নিতে এবং সেই জ্ঞানকে ভিত্তি করে তার নিজের মনে নিজস্ব চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটুক, এটাই চায়। ইসলামের এটা হলো অনন্য ও একক বৈশিষ্ঠ।
আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় যে এর পাঠককে, বার বার চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে, বার বার তাকে তাগাদা দেয় এই বলে যে, আফালা ত্বাফাক্কারুন? আফালা ত্বদ্বাব্বারুন? আফালা ত্বা’ক্বিলুন? এইসবই হলো ব্যক্তিকে একটি গতিশীল চিন্তাধারার দিকে ধাবিত করার জন্যই। আর এর ফলও কিন্তু কুরআনের যে কোন সচেতন পাঠকই হাতে হাতে পেয়ে যান।
এর উদাহারণ আমাদের সামনে রয়েছে ভূরী ভূরী। ওমর (রা
হযরত আলী (রা
আচ্ছা, হজরত আলী, হজরত ওমর রা: এঁদের কথা না হয় তর্কের খাতীরে বাদই দিলাম। কারণ, অনেকে হয়ত বলতে পারেন যে, তাঁরা স্বয়ং আল্লারহ রাসুল সা: এর হাতে প্রশিক্ষিত ছিলেন, তাই তাঁরা কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও এসব হতে পেরেছিলেন। এ যুক্তির বিপরিতে তেমন কোন যুক্তি থাকেনা খাড়া করার মত। কারণ, যুক্তিটি অকাট্য ঐতিহাসিকভাবে প্রমানিত সত্য।
তবে এরকম কোন যুক্তি কিন্তু খাটেনা ইবনে সীনার বেলায়। কুরআনের হাফেজ, ইবনে সীনা কোন মেডিকেল কলেজে পড়েছিলেন যে, তিনি একজন চিকিৎসকই কেবল নন, হতে পেরেছিলেন জগৎজোড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানী? কোন ইউনিভার্সিটিতে দর্শন পড়েছিলেন যে, তিনি একজন দার্শনিক হতে পেরেছিলেন? কোন প্রতিষ্ঠানে তিনি জোতির্বিজ্ঞান পড়েছিলেন যে, তিনি একজন জোতির্বিজ্ঞানী হতে পেরেছিলেন? গনীতই-বা কোন ভার্সিটিতে পড়েছিলেন, যে তিনি গনীত শাস্ত্রে একজন বিশেষজ্ঞ হতে পেরেছিলেন?
তিনি কি ভাবে একজন কবি হলেন? কিভাবে একজন সঙ্গিতজ্ঞ হলেন? কিভাবে তাঁর ভেতরে এত প্রতীভার স্ফুরণ ঘটল? এর উত্তর একটাই, তা হলো, ইসলাম যে পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তির মধ্যে জ্ঞান সঞ্চারণ করতে চায়, ঠিক সে পদ্ধতিতেই তিনি জ্ঞান আহরণ করতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই, জ্ঞান এর মৌলিক কথা, ইজতিহাদি শক্তি, তাঁর ভেতরে তৈরী হয়েছিল। ফলে তিনি হতে পেরেছিলেন অনন্য! হতে পেরেছিলেন ইবনে সীনা! একইভাবে ইবনে বতুতা, ইবনে খালদুন, রাজী, জাবির, ইবনে হায়সাম, আল ফারাবী’দের জন্ম।
কিন্তু এইসব মনীষিরা গত হয়ে যাবার পরে আজ একটা হাজার বৎসর পার হয়ে গেল, আর একজনও ইবনে সিনা জন্ম নিলনা! আর একজন ফারাবী কিংবা রাজী, কিংবা জাবির এর দেখা এই বিশ্ব পেলনা। আল কুরআন আজও আছে, প্রতিদিনই পড়েন কোটি কোটি মুসলমান, কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে একজনও ইবনে সীনার জন্ম হলো না! এর কারণটা কি?
কারণ, আমরা শিক্ষার জগতকে করে নিয়েছি একেবারে সংকীর্ণ, এই সংকীর্ণতার পথ ধরেই এসেছে অজ্ঞতা, আর অজ্ঞতার সাথে সাথে যে হিংষা, বিদ্বেষ, অনৈক্য এসে বাঁসা বাধে, সেটা কেনা জানে? সেই হিংষা বিদ্বেষতো সমাপ্তি ঘটায় সমাজের ভেতরে পরমত সহিষ্ণুতার। এর বদলে বরং জন্ম নেয় সামাজিক অনৈক্য। একের ভেতরেই তৈরি হয় বহু। বহু মত, বহু পথ। দল, উপদল। আর এর অনিবার্য পরিণতি হলো কোন্দল। প্রমান, আজকের মুসলিম বিশ্ব! আজকের বাংলাদেশ!!
আন্দালুস এ মালিকি মাজহাবকে অনুসরণ করতেন শাসক বর্গ। এই মাজহাব ছাড়া অন্য কোন মাজহাবের চর্চা করাটাই করেছিলেন নিষিদ্ধ। এর ফলে ইসলামের মুল অন্তর্ণীহিত শক্তি, ‘ইজতিহাদ’ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রখ্যাত দার্শনিক ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মোকাদ্দমা’য় আন্দালুস এ তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন, এই কারণে যে, সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের পাঠদানের বেলায় শিক্ষকরা ছাত্রকে ‘কোন একটা বিষয় অনুধাবন করানোর চাইতে তা মুখস্থ করার প্রতিই বেশী গুরুত্ব প্রদান করেন’।
এসবই ইতিহাস। কিন্তু সেই ইতিহাসের চর্চাওতো আমরা করিনা। ইতিহাস র্চচার ক্ষেত্রে আমাদেরকে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, আমরা আমাদের পূর্ব পূরুষের ইতিহাস, আমাদের অতিত ইতিহাস চর্চার সময় তাদের প্রতিটি কাজকেই একটা ইতিবাচক ব্যখা দেবার চেষ্টা করবনা, তেমনটা করলে ইতিহাসের যে শিক্ষা, সেই শিক্ষাই আমাদের দৃষ্টিসীমার আড়ালে রয়ে যাবে।
আমরা বরং ঘটনা যা ঘটেছে, যে প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, এবং উক্ত ঘটনাটি যে শিক্ষা সমাজের উপরে রেখে গেছে, সেটাকেই তুলে ধরব। আমরা যখন সেই ইতিহাসকে বিচার, বিশ্লেষন করব, তখন আমাদের দৃষ্টিতে খন্ডিত চিত্র নয়, বরং যে ঘটনাসমুহের পরম্পরায় ঘটনা ঘটেছে, সংশ্লিষ্ট সমাজ ও ব্যক্তি এবং পরবর্তি মানব স¤প্রদায়ের উপরে সেই ঘটনা যে প্রভাব রেখেছে, তার প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরব। এর মধ্যেই রয়েছে সেই পরিবেশ, যে পরিবেশে ইতিহাস থেকে যথাযথ শিক্ষা নেয়া যায়।
একটা ছাট্ট উদাহারণ দেই, গ্রানাডার শেষ মুসলিম সম্রাট আবু আব্দুল্লাহর দেশপ্রেম আর ঈমানী শক্তি কি ছিল? কতটুকু ছিল? সেটা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। গ্রানাডার পতনের জন্য আমরা আবু আব্দুল্লাহকে এককভাবে দোষারোপ না করেও বলতে পারি যে, তিনি এর দায়ভার এড়াতে পারেন না কোনমতেই।
তৎকালীন সমাজে আমীর-ওমরাহসহ প্রভাবশালী মহলে যে নৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ত্র“টি বিচ্যুতির পথ ধরে এই লজ্জাজনক পরাজয় এসেছে, তা রোধে আবু আব্দুল্লাহ বিজ্ঞতার প্রমান দিতে পারেন নি বরং তিনিও নিজেও তৎকালীন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট অংশ যেসব ত্র“টি বিচ্যুতি আক্রান্ত ছিল, তা হতে মুক্ত ছিলেন না।
এ সত্য আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে, বলতে হবে এবং তার বিশ্লেষনও করতে হবে। আমরা জানি, আবু আব্দুল্লাহ যখন গ্রানাডা, তাঁর বিলাসি রাজপ্রাসাদ ‘আল হামরা’ ছেড়ে যাচ্ছিলেন, তখন বার বার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে দর দর করে অশ্র“ ঝরে পড়ছিল। এই অবস্থা দেখে তাঁরই বৃদ্ধা মা আয়েশা ছেলেকে ভৎসর্না করে বলেছিলেন ‘ আবু আব্দুল্লাহ, একজন পুরুষের মত যে শহরকে রক্ষা করতে পারনি, একজন নারীর মত তার জন্য কাঁদছ?’
এখানে প্রানভয়ে জগদ্বিৎখ্যাত আল হামারা ছেড়ে গ্রানাডার শাসক আবু আব্দুল্লাহ পরিবার পরিজন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন, সেটা ইতিহাস। এটাও ইতিহাস যে, তিনি পালিয়ে যাবার সময় গ্রানাডার জন্য, তাঁর রাজ্য, তাঁর সাধের আল হামরার জন্য চোখের অশ্র“ ফেলেছেন।
কিন্তু আমরা এখানে, ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষনে চোখের অশ্র“ ফেলার মধ্যে আবু আব্দুল্লাহর দেশ প্রেমকে যদি ফুটিয়ে তুলি, তবে সেটা হবে ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। সেটা হবে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একটা মেকি জগতে নিজেদের আড়াল করে রাখার প্রচেষ্টা মাত্র।
বরং উক্ত ঘটনার মধ্যে ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষাটা হলো, আবু আব্দুল্লাহর বৃদ্ধা মা, আয়েশার মুখ দিয়ে যে কথাটা বেরিয়ে এসেছে, তিনি তার পুত্রের কাপুরুষতার জন্য অল্প কথায় যে ভর্ৎসনাটুকু করেছেন, সেটি।
তার মধ্যেই রয়েছে একটা ঐতিহাসিক শিক্ষা। বিলাসি জীবনের মরীচিকায় যাঁরা তাঁদের দ্বায়িত্ব পালনে তৎপর না হয়, তাদের কাপুরুষতার জন্য কাঁদতে হয়, কেবল তাদের নিজেদেরই নয়, বরং অনাগত বংশধরদেরও!
আজ যেসব বাংলাদেশী দেশে-বিদেশে বসে দেশটার বর্তমান জিল্লতী দেখছেন, আর নিশ্চুপ বসে আছেন, তাঁরা কি ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকে শিক্ষা নেবেন? আসলেই কি ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না?
এমনকি মুসলমানরাও নন? আমার তা মনে হয়না।্ ইসলামও কিন্তু তা বলে ন্।া ইসলাম বরং ইতিহাসই তো শিক্ষা দেয়। বলে, শেখ। ইসলামের ইতিহাস তো শেখারই ইতিহাস। আমরা কি তার পরেও শিখব না?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



