কুয়েত শহরের কেন্দ্রস্থলে মোল্লাহ সালেহ মসজিদ এর বেসমেন্ট ও ফার্ষ্ট ফ্লোর জুড়ে ইসলাম প্রেজেন্টেশন কমিটি বা আইপিসি’র বিশাল অফিস। কুয়েতে চাকুরি, ব্যবসা বা ভ্রমনে আগমনকারী ও বসবাসকারী উৎসাহী অমুসলিম জনসাধারণের কাছে ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরাই এই সংগঠনটির কাজ। এ ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সফল একটি নাম। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানই নয় বরং বলা চলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এটি একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান, একটি অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র।
এখানেই আমার সাথে পরিচয় হয়েছিল প্রৌঢ নওমুসলিম ইসলাম প্রচারক আব্দুল্লাহ স্পিরিটোর সাথে। একজন নিবেদিতপ্রান মিশনারী পাদ্রী থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান, ফুল টাইম দায়ী ইলাল্লাহ মরহুম আবব্দুল্লাহ’র সাথে বেশ ক’বৎসর ধরে মোটামুটি একটা ঘনিষ্ঠতাও বজায় ছিল।
পরিচয়ের একদম শুরুর দিকে আইপিসি ভবনের বেসমেন্ট ফ্লোরে অবস্থিত তাঁর অফিস কক্ষে বসে একদিনের এক আলাপচারিতায় তিনি কথা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন,‘আল কুরআন হলো এই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিষ্ময় এবং একমাত্র বিষ্ময়! পৃথিবীর বড় বড় বিষ্ময়গুলো চোখে দেখতে মানুষকে বিশ্বের কোনে কোনে ছুটে যেতে হয়। যেমন তাজমহল দেখতে যেতে হবে ভারতের আগ্রায়, মস্কোর ঘন্টা দেখতে রাশিয়ায়, পিরামিড দেখতে মিশরে যা সবার পক্ষে সব সময় সম্ভব নয়। কারো কারো পক্ষে, বরং বাস্তবতা হলো বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের পক্ষেতো সারা জীবনেও একবার সম্ভব নয় এইসব বিষ্ময়গুলো চোখে দেখা।
বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই এইসব বিষ্ময়কে চোখে না দেখেই বিশ্বাস ও স্বীকার করতে বাধ্য বা প্রস্তুত যে ঐ সব বস্তু বা স্থান বা প্রতিষ্ঠান গুলো হলো বিশ্বের সব চেয়ে বড় বিষ্ময়! তাদের পক্ষে এটা প্রমান করা সম্ভব নয় যে, আসলেই সেগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিষ্ময় কিনা, যেমনটি মানুষ দাবী করে এবং তারা চোখে না দেখে বিশ্বাসও করে! সেটা প্রমান করা। তা ছাড়া এসবের কোন একটি মানুষ্য স¤প্রদায়ের সামনে এ চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দেয়নি যে, সেগুলোই সবচেয়ে বড় বিস্ময়, একমাত্র বিষ্ময়, সেগুলোর দ্বিতীয় কোন উপমা নেই, জুড়ি নেই! তারা মানুষের সামনে এই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেনি যে, যদি বিশ্বাস না কর তবে তোমার আমার মত একটা বানিয়ে দেখাও দেখি!
কিন্তু এর বিপরিতে আল কুরআন এবং একমাত্র আল আল কুরআনই প্রকাশ্যে এবং সকলের কাছে, সর্বকালের সকল মানব সন্তানের কাছে উন্মুক্ত ঘোষণা দিয়ে রেখেছে এই বলে যে, এই আল কুরআন একক ও অদ্বিতীয় এবং এর কোন জুড়ি নেই। সমগ্র কুরআনতো দুরের কথা এর ছোট থেকে ছোট একটা সুরার মত সুরা রচনা করে দেখানোর জন্য বিশ্বের সমগ্র মানব স¤প্রদায়ের কাছে এই গ্রন্থটি প্রকাশ্যে একটি চ্যালেঞ্জ ছুুঁড়ে দিয়ে রেখেছে। বিগত দেড়টি হাজার বৎসর ধরে এই চ্যলেঞ্জ উন্মুক্ত রেয়েছে মানুষের সামনে এবং এই বিশ্বের শেষ দিনটি পর্যন্ত তা একইভাবে বহাল থাকবে।
পৃথিবীর দেশে দেশে কত নামী-দামী লেখক, সাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক, ঐতিহাসিক, কলামিষ্ট, ভাঁষাবীদ এর জন্ম হলো, এবং তারা গতও হয়ে গেলেন। কতজনে কতরকম সাহিত্য রচনা করে বিশ্ব ইতিহাসে তাদের নিজেদের স্থান করে নিলেন, কত নামী দামী পুরষ্কার অর্জন করলেন, যশ খ্যাতির কথা না হয় বাদই দিলাম! কিন্তু কোন একজন সাহিত্যিক, লেখক, ভাঁষাবীদ, কারুরই এই সাহসটুকু হলো না যে, তিনি বা তারা এগিয়ে এসে আল কুরআন এর এই উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জটুকু গ্রহণ করবেন। সমগ্র আল কুরআনতো দুরের কথা, সুরা বাকারা বা ওরকম কোন বড় একটা সুরাও নয় বরং সবচেয়ে ছোট সুরার মত একটি সুরা রচনা করে দেখাবেন, বিশ্বে অমর হয়ে রইবেন! এটাও একটা বিস্ময়ই বটে!
বিষ্ময়কর আল কুরআন এরকম আরও কত বিষ্ময়ের জন্ম দিয়েছে। পতিতকে তুলে ধরেছে বিশ্ব দরবারে সম্মানের উচ্চ শীখরে। অধ:পতিত, হতদরিদ্র একটি জাতি, যারা আল কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছে তাদেরকে স্বল্পতম সময়ে তুলে ধরেছে সাফল্যের কল্পনাতীত স্তরে। নীচ ও অপমানিতকে করেছে মর্যাদাবান ও মহিমান্বিত! দূর্ভাগাকে করেছে সৌভাগ্যবান! অখ্যাতকে করেছে খ্যাত! ভীরুকে করেছে বীর, গরীবকে সম্পদশালী, কৃপনকে দানবীর, রাখালকে বাদশাহ, বাদশাহকে ফকীর! যেন সত্যিকার অর্থেই এ এক যাদুর পরশ। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখুন, দেখবেন বিশ্ব ইতিাহাসের পাতায় পাতায় এমন হাজারো ঘটনা, হাজারো বিষ্ময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে!
ঘরপালানো পারস্যের দাস হযরত সালমান ফারসী (রা
এই তাঁরাই যখন আল কুরআনের সান্নিধ্যে এসে আল কুরআনের কাছে নিজেদের সমর্পন করে দিলেন, কুরআনের রং এর রাঙ্গালেন নিজেদের অন্তর, চোখের নিমেষেই যেন সাধিত হলো এক বিস্ময়! এক বিপ্লব! নিমেষেই এই অখ্যতরা হয়ে উঠলেন খ্যতিমান, বিখ্যাত! এইসব অবহেলিত, অপমানিত, নিগৃহিতরা হয়ে উঠলেন সম্মানিত, তাঁরা এমন এক বিষ্ময়কর অবস্থানে উন্নীত হলেন যে, তাঁদের সে অবস্থানে আসমানের নীচে আর জমিনের উপরে কোনদিনও কোন মানুষ কখনই, কোনভাবেই পৌছুতে পারবেনা!
কেবলকি তাই? সেই তাঁদের জীবনাবসানের দেড় হাজার বৎসর পরে এসে আজও বিশ্বের কোনে কোনে দেড়শত কোটি মুসলমান এইসব সম্মানিত ব্যক্তির নাম শোনা বা বলার সাথে সাথে তাঁদের কল্যাণ চেয়ে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে! অথচ তাঁরা কেউ এইসব মুসলমানদের পরিচিত কেউ নন, রক্ত সম্পর্কীয় আত্বীয়ও নন, পাড়া প্রতিবেশীও নন। তার পরেও কি সম্মান! কি শ্রদ্ধা, ভক্তি, না দেখা এই সব মানুষগুলোর জন্য!
মক্কা মদীনায় হজ্জ, ওমরাহ’র জন্য বিশ্বের কোনা কোনা তেকে প্রতিদিনই মুসলমানরা যাচ্ছেন বা বিভিন্ন কাজে সউদি আরবে প্রতিদিন ধমর্, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যাতায়াত করছে, বিশেষ করে প্রতি বৎসরে হ্জ্জ এবং রোজার এর সময় লক্ষ লক্ষ মুসলমান ভীড় করছেন এই দুটি স্থানে। তাঁরা তাঁদের ওমরাহ বা হজ্জ সমাপন করেন। কিন্তু এর পাশাপশি তাঁরা এইসব সম্মানিত সাহাবিদের কবর রয়েছে যে সব স্থানে, সেখানেও যান, তাদের মাগফেরাত কামনা করে দোওয়া করেন। আমি নিজের চোখে বদর, ওহদ খন্দক, খাইবার, জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে বিশ্বের বিভিন্নস্থান থেকে আসা নানা বর্ণ আর ভাঁষার শত শত মুসলমানকে এঁদের জন্য দোওয়া করতে দেখেছি, দেখেছি তাদের চোখ বেয়ে নিরবে অশ্র“ গড়িয়ে পড়তে!
পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে যেখানেই সাহাবীদের কবর রয়েছে, যেমন মিশরের কায়রো, সিরিয়ার দামেষ্ক, চীন এর ক্যন্টন প্রদেশ, ইরাকের বাগদাদ, কারবালা, তুরষ্কের ইস্তাবম্বুল, সাইপ্রাস বা গ্রীস সবখানেই একই চিত্র! এ কি কম বিষ্ময়কর ঘটনা?
কেউ যদি এই বিষ্ময়ের কোন যুক্তিগ্রাহ্য ও গ্রহণযোগ্য জবাব খুঁজতে যান তবে দেখবেন একটি মাত্র জবাবই পাচ্ছেন, আর তা হলো আল কুরআন। এর পেছনে একমাত্র আল কুরআনই রয়েছে! দেড় হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবী হতে গত হয়ে যাওয়া এইসব মানুষগুলোর প্রতি বিশ্ব মুসলমানদের যে ভালাবাসা, যে শ্রদ্ধা, যে প্রগাঢ় মমত্ববোধ আর ভক্তি, যে আন্তুরিক সম্মান, তা একমাত্র এই কারণেই যে, ঐসব ব্যক্তিবর্গ আল কুরআনের প্রকৃত ও একনিষ্ঠ অনুসারি ছিলেন। শুধু অনুসারি ছিলেন তাই নয় বরং তাঁরা এই পবিত্র বিষ্ময়কর গ্রন্থটির ধারক ছিলেন। আর এটিকে নিষ্ঠার সাথে ধারণ করার কারণেই তাঁদের এত মর্যাদা, এত সম্মান, তাঁদের প্রতি মানুষের এত ভালবাস আর শ্রদ্ধা। এটিকে কী বলবেন, কীভাবে ব্যখ্যা করবেন? এটি কী আল কুরআনের কোন বিষ্ময় নয়?
আল্লাহর রাসুল (স
একজন মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়েও মানুষের মাঝে বাস করেও জ্বীন ও মানুষের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল নির্বাচিত হয়ে আল কুরআনকে নিজের চরিত্রে ধারণ ও তা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্যভাবে ফুটিয়ে তোলাটা ছিল এক অনূপম বিষ্ময়।
রক্ত মাংশের একজন মানুষ হয়েও আল কুরআনের মডেল হতে পারাটাই তাঁর জন্য ছিল একটা বিষ্ময়। স্বয়ং আল্লাহ পাকই তাঁকে এই কাজের জন্য বাছাই করেছেন, গড়ে নিয়েছেন। তাঁকে প্রতি পদে পদে পরিচালিত করেছেন, গাইড করেছেন। তিনি আল কুরআনের ধারক বাহক, এবং সরকারি ব্যখাদাতা হতে পেরে সম্মানিত হয়েছেন আকাশে, জমিনে সকলের কাছে। তিনি আল কুরআন পেয়ে যেমনি পরিতৃপ্ত ছিলেন, তেমনি কৃতজ্ঞও ছিলেন আল্লাহর কাছে। আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়ে তাঁর ধারে কাছেও কেউ কোনদিন যেতে পারবেনা, পৃথিবীর কোন মানুষই নয়! এসবই এক বিষ্ময়। আর সেই বিষ্ময়ও সম্ভব হয়েছে আরও একটি বড় বিষ্ময় আল কুরআন এর কারণেই। এই বাস্তবতায় ফুটে ওঠেছে আল কুরআনকে তাঁর সবচেয়ে বড় মোজেজা বলে আখ্যায়িত করার মধ্য দিয়ে!
কুরআন পাক এ আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন নিজেই বলেছেন, তাঁর প্রিয় হাবিব এর উদ্দেশ্যে:
‘মা আনজালনা’ল কুরআনা লি ত্বাশক্বা’
অর্থাৎ আমি এই জন্য তোমার উপরে কুরআন নাজিল করিনি যে, এর ধারক হবার কারণে তুমি বিপদে পড়ে যাবে, তোমার জীবন অশাান্তিময় হয়ে উঠবে’।
কুরআন মূলত কি জন্য এসেছে মানুষের কাছে সে ব্যপারে বহুবার বহু জায়গায় বলা হয়েছে, তার মধ্যে অতি সংক্ষেপে এক স্থানে বলা হয়েছে ‘লি ইউখরিজাকুম মিনাজ জুলামাতি ইলান্ নুর অর্থাৎ তাদেরকে ( মানুষকে বা এর অনুসারীদেরকে) অন্ধকার জীবন থেকে উজ্জল জীবনে টেনে আনার জন্যই কুরআন নাজিল করা হয়েছে। আর কে না বোঝে যে, এখানে আঁধার আর উজ্জলতাকে প্রতিকী অর্থে অজ্ঞানতা, অভাব অনটন, অপমান জিল্লতী, দু:খ-কষ্টকে এবং উজ্জলতা বলতে সুখ, স্বাচ্ছন্দ, শান্তি-স্থিতি, নিরাপত্তা-প্রগতি, সম্মান ও উত্তরণ এসবকে, মোটের উপরে, এক কথায় সার্থক ও সফল জীবনকে বোঝানো হয়েছে।
এটাতো গেল আল কুরআনের কথা। যা কুরআনের পাতায় লিপিবব্ধ হয়ে আছে। আর বাস্তবে ইতিহাস, বিশ্ব ইতিহাস এ কথা বার বার প্রমান করে দিয়েছে যে, যে বা যারাই আল কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছে আল কুরআন তাকে বা তাদেরকেই সাফল্য, সূখ আর সমৃদ্ধির চুড়ান্ত মঞ্জিলে পৌছে দিয়েছে! বিশ্বে তাদেরকেই প্রভাবশালী বানিয়ে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দিয়েছে। সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে পথ দেখিয়েছে। আর এই ব্যক্তি বা গোষ্ঠিই পুরা মানব স¤প্রদায়কে, পুরো সমাজকে দিক নির্দেশনা দেবার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
এ বাস্তবতার আলোকে যে প্রশ্নটি এখন অনিবার্যভাবে এসে দাঁড়ায় সামনে তা হলো এই যে, আজ বিশ্বের দেড়শত কোটি মুসলমান, যারা আল কুরআন এর ধারক, এর অনুসারী হবার দাবীদার, তারা কেন গঞ্জনা, লাঞ্চনা আর জিল্লতীর গভীরে ডুবে আছে? আজ কেন আল কুরআন এর ধারক বাহকরা জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে পথ হারা উদ্ভান্ত্র, দিশাহীন? আজ কেন তারা প্রতিটি কোনে কোনে নিগৃহীত পদদলিত হচ্ছে? আজ কেন তারা বিশ্বকে পথ দেখানোর পরিবর্তে নিজেরাই পথহারা? আজ কেন তারা শাসকের আসন হারিয়ে নির্মমভাবে শাসিত হয়ে চলেছে? অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলা’মীন এর ঘোষণা তো এমন ছিলনা। তা হলে এমন হলো কেন?
নির্মম ও জীবন ঘেঁষা প্রশ্ন বটে। তবে এর উত্তর খুঁজতে বেশী দুর যেতে হবে না। আপনার হাতের কাছে আল কুরআন এর যে কপিটি আছে, তা দয়া করে খুলুন এবং সুরা বাক্বারা’র ৮৫ নাম্বার আয়াতটি একবার অর্থসহ পড়ে নিন। যেখানে বলা হচ্ছে;
তবে কি তোমরা এই কুরআনের কিছু অংশকে মানবে আর কিছু অংশকে করবে অস্বীকার? তোমাদের মধ্যে থেকে যারা এমনটি করবে তাদের শাস্তি এ পার্থিব জীবনে দূর্গতি ছাড়া আর কিছুই নয়! আর পরকালেও তাদের কে ঠেলে দেয়া হবে ভয়ংকর শাস্তির দিকে! তোমাদের কাজ কারবার তোমরা যা করো, সে সব সন্মন্ধ্যে আল্লাহ বেখবর নন।
এবার কুরআন খানা বন্ধ করুন, যথাস্থানে রাখুন আর আপনি দয়া করে নিজের চোখ দুটি বন্ধ করে কোন এক নির্জন স্থানে নিশ্চুপ বসুন এবং একাকী মনের গভীরে ডুব দিন ক্ষণিকের জন্য।
নিজের মনের কোনে বিচার করে দেখুনতো, সত্যিই আল কুরআন এর সাথে আমাদের ব্যক্তিগত বা সামষ্ঠিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রিয়, প্রকাশ্য বা পরোক্ষ, প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রিয় সংশ্লিষ্ঠতা ‘কিছু মানা আর কিছু না মানা’ ষ্টাইলের কিনা?
আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, আপনি যদি এই একটি ক্ষেত্রে অন্তত নিজের সাথে প্রতারণা না করেন, তবে স্বীকার করতে বাধ্য যে, আমরা প্রত্যেকে একক বা সামষ্ঠিক, ব্যক্তিগত বা সামাজিক, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল কুরআন এর সাথে সুবিদাবাদী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি। আর এর অনিবার্য আর অকাট্য পরিনতি হিসেবে আমরা মুসলমানরা অপমান, জিল্লতি, লাঞ্চনা আর গঞ্জনার মধ্যে নিপতিত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। কুরআন এর নির্দেশ মেনে আমরা আল্লাহর দাসত্ব করতে নামিনি বলেই পুরো বিশ্বের দাসত্ব করতে হচ্ছে আমাদের! আর আখেরাতে আমাদের অবস্থা কোথায় হবে, সে জবাব আমার এই লেখায় নয় বরং উক্ত আয়াতের শেষাংশে নজর দিলেই সুষ্পষ্ট এবং সন্দেহাতীতভাবে দেখে নিতে পারবেন।
এ ব্যাপারে আরও এক জায়গায় একেবারে পরিষ্কার করেই আল্লাহ পাক বলে দিয়েছে এমন একটা কথা, যার সাথে বিশ্ব ইতিাহসের বিশেষ করে বর্তমান কালেরও মুসলমানদের সার্বিক অবস্থার সাযুস্য লক্ষনীয় ভাবে ধরা পড়ে। কুরআনের সুরা মায়েদা’র চুয়ান্ন নম্বর আয়াতে পরিস্কার সাবধান বানী তুলে ধরা হয়েছে আমাদের সামনে, এভাবে
‘হে ঈমানদারগন; তোমাদেও মধ্যে থেকে যারা নিজেদেও জীবন ব্যবস্থা থেকে মূখ ফিরিয়ে নেবে আল্লাহ শীঘ্রই তাদের স্থলে নতুন একটা দলকে উইস্থ করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন আর তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে। তারা হবে মুসলমানদেও প্রতি কোমল ও বিনম্র, আর কাফেরদেও প্রতি কঠোর।তারা আল্লাহর পথে তাদেও সকল চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যাবে আর সে ব্যাপাওে কোন বিদ্রুপাকারীর পরওয়া করবেন না। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, আল্লাহ যাকে খূশী তা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’
উক্ত ঘোষণা আর সাবধানবানীতে কি বর্তমানে বিশ্ব মুসলমানদেও যে আর্থ সামাজিক আর ভূ রাজনৈতি দুরাবস্থা বিদ্যমান, তার যথার্ত কারণটা ফুটে উঠেনি? আয়াতটির দিকে একটুখানি মনযোগ সহকারে নজর দিলেই তা যে কোন পাঠকের কাছেই সুষ্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
যদি কেউ এরকম পণ করে থাকেন যে, কোন অবস্থাতেই নিজেদের অবস্থান ও ভাগ্য পরিবর্তনে সচেষ্ট হবেন না, তবে তার কথা আলাদা। আমি বরং তাঁদের প্রতি আবেদন জানাতে চাই, যাঁরা প্রকৃত অর্থেই বর্তমান এই জিল্লতি থেকে মুক্তির কথা ভাবেন, মুক্তি অন্বেষণ করেন, আসুন আমরা আজ এ কথাটা খুব ভালো করে বুঝে নেই যে, শুধুমাত্র আমাদের কারণেই ইসলাাম আজ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে অবজ্ঞা, আর বিদ্রুপের বিষয়ে পরিণত হয়েছে!
কেবলমাত্র আমাদের কারণেই, হ্যাঁ শুধুমাত্র এই মুসলমানদের কারণেই সমগ্র বিশ্বব্যাপি আজ এ কথা প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে যে, মুসলমান মানেই হলো সন্ত্রাসী, মূর্খ, পশ্চাৎপর জাতী। ইসলাম মানেই হলো সন্ত্রাস। আল কুরআন নাকি মানুষকে পশ্চাৎপদ করে রাখে। বিশ্বকে নাকি মুসলমানরা কিছুই দেয়নি! ইসলামের কাছে নাকি এই সভ্যতা, এই বিশ্ব এবং বিশ্ববাসীর কোন দায়বদ্ধতা নেই!
আছে কি নেই, সে বিষয়ে এই বিশ্ববাসী খুব ভালো করেই জানে। আমরা বরং সে বিতর্কে নিজেদের না জড়াই। আমরা বরং সে কারণটিই খুজে বের করি, যে কারণে সে দিনের মুসলমানরা বিশ্বে গুণে, জ্ঞানে, বিত্ত আর বৈভবে, শৌর্যে আর বীর্যে অতুলনীয় হয়ে উঠেছিলেন। আমরা বরং সে কারণটি খুজে দেখার চেষ্টা করি, যে কারণে একজন মাঠের রাখালও প্রায় বারো লক্ষ বর্গমাইল এর শাসক হতে পেরেছিলেন, যে কারণে দেশের একজন শাসক হয়েও রাখালকে উঠে চড়িয়ে নিজে সেই উঠের রশি টেনে নিতে পেরেছিলেন।
আসুন, আমার বরং সেই কারণটা খুজে বের করার চেষ্টা করি, যে কারণে একজন হাবশী কালো ক্রীতদাস বেলালও কোটি কোটি মানুষের নেতা হতে পেরেছিলেন। যে কারণে আজও মুসলমানরা এইসব ব্যক্তিদের কবরের পাশে গিয়েই কেবলমাত্র তাঁদের স্মৃতীতে কাঁদেন না বরং বিশ্বের যে কোন স্থানে, যে কোন সময় তাদের নামটি পর্যন্ত শুনলেই তারা ভক্তিতে বিগলিত হয়ে আল্লাহর কাছে তাদের কল্যাণ চেয়ে দোওয়া করেন!
আমদের এইসব প্রশ্ন এবং তার উত্তর খোঁজার জবাব যদি এই হয় যে, আল কুরআন কে নিষ্ঠার সাথে ধারণ করার কারনেই তাঁরা তেমনটি হতে পেরেছিলেন, তা হলে আমাদেরকে, অর্থাৎ আমরা যারা সেই একই আল কুরআন এর ধারক ও অনুসারি হবার দাবীদার , তাদেরকে জানতে হবে কোন সে পদ্ধতি ছিল, যে পদ্ধতিতে আল কুরআনকে আঁকড়ে ধরার কারণে তাঁরা সেই সব পরিবর্তনের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন?
কোন সে পদ্ধতি? যে পদ্ধতিতে তারা আল কুরআন এর কাছে নিজেদের সমর্পিত করার ফলে সকল প্রকার কল্যানটুকু নিতে পেরেছিলেন? জানতে হবে, তাঁদের কুরআন অনুসরণের সাথে আমাদের কুরআন অনুসরণের পার্থক্যটা কোথায় এবং কতটুকু?
আসুন, আমরাও তাঁদের মত করে কুরআনকে আঁকড়ে ধরি, এর কাছে নিজেদের সমর্পিত করে দেই। এরই মাঝে নিজেদের মুক্তির পথ খুঁজি। এখন আমাদের যে কাজটি করতে হবে তা হলো, এ জন্য আমাদের পিছন ফিরে চাইতে হবে। এটা আমাদের বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার সময় নয়। সময় হল আত্বশুদ্ধীর জন্য পেছন ফিরে চাওয়ার। নিজের ভেতর পানে চাওয়ার সময় এটা আসুন, আমরা পেছন ফিরে চাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

