বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে থেকেই বাংলাদেশে এক বিরাট ও ব্যাপক বিভিষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এবং তা বাড়তে বাড়তে এমনতর এক পর্যায়ে এসে আজ দাঁড়িয়েছে যে, দেশটাকে এক কথায় জাহান্নাম বলেই মনে হয় কখনও কখনও।
দেশে একটা সরকারের দরকার ছিল। যে সরকার বহুদলীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েও তা হবে ‘জনগণের সরকার’। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তা না হয়ে হয়েছে ‘আওয়ামি লীগের সরকার’। জনগণের ট্যাস্কে পরিচালিত একটা দলীয় সরকার!
কিন্তু দেশের সবাইতো আর আওয়ামি লীগ করেন না। অনেকে আবার কোন রাজনীতির সাথেই জড়িত নন। তাদের কি হবে? তাদের জন্য তো কোন সরকার নেই। অথচ দেশের নাগরিক হবার সুবাদে তাদের নিরাপত্তা ,তাদের দেখা শোনা আর নাগরিক দায়িত্ব পালন বা নাগরিক অধিকার প্রদানের জন্য আদৌ কি কোন সরকার আছে? নেই।
হ্যাঁ, বাংলাদেশের জন্য কোন সরকার নেই। দেশে আওয়ামি লীগের জন্য একটা সরকার আছে বঙ্গভবনে, সচীবালয়েও যারা মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী পরিচয়ে দল আর দলের নেতা কর্মীদের সেবায় ব্যস্ত। কিন্তু দেশের জনগণের সেবা সার্ভিসটা দেবে কে?
লীগের সরকার আছে বলেই তারা সার্ভিস পাচ্ছে, সেবা পাচ্ছে। পাচ্ছে সব রাজকীয় সুবিধা। কিন্তু তা পাচ্ছে জনগণের টাকায়। জনগণের ট্যাক্সের টাকা দেশের মাত্র বত্রিশ পার্সেন্ট লোক, (এখন নির্বাচন দিলে সম্ভবত এই হার এসে দাঁড়াবে শতকরা দশ পার্সেন্ট এ!) যারা লীগের রাজনীতির সমর্থক কর্মী, ক্যাডার, তারা ভোগ করছে।
এর বাইরে বাঁকি আটষট্টি ভাগ বাংলাদেশীই আজ বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে সকল প্রকার রাষ্ট্রিয় ও নাগরিক সুযোগ সুবিধা এবং মৌলিক সেবা সার্ভিস থেকে। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠির সকলেই এদেশেরই নাগরিক যারা সকল নাগরিক সুবিধা ও মৌলিক মানবাধিকার আর নিরাপত্তা পাবার অধিকারীও বটে!
আওয়ামি লীগের সরকার আছে বলেই লীগের লোকজন ছাড়া কারো কোন চাকুরি হবেনা। চাকুরি পাবার একটি মাত্র যোগ্যতা, আর তা হলো লীগ করতে হবে। লীগের একেবারে জানবাজ কর্মী কিনা সে পরীক্ষাও দিতে হবে, সে পরীক্ষাতে উত্তির্ণ হতে হবে!
চাকুরি পাবার মত মেধা, কাংক্ষিত পদের বিপরিতে বর্ণিত যোগ্যতা আছে কিনা, প্রশ্নগুলো অবান্তর। বরং লীগ করে কিনা, লীগের পরীক্ষিত কর্মী কিনা, সেটাই বিবেচ্য। লীগের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় পাশ করলেই চাকুরি হয়ে যাবে। আর কিছুই দরকার নেই।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলী স্পষ্টতই এমনই ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকে যে তের হাজার কর্মচারি নিয়োগ করা হবে, তাদের নিয়োগে একমাত্র আওয়ামি লীগের পরিক্ষিত কর্মীদেরকেই নিয়োগ দেয়া হবে। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের সাবধান করে দিয়েছেন, আওয়ামি লীগের কর্মী ছাড়া আর কাউকে নিয়োগ দেয়া হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতিমধ্যে এই নিয়োগ দেবার প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে বলে কোন কোন পত্রিকা খবরও দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো একটা দেশ কি দলীয় মাস্তান আর পেশীশক্তির ব্যবহারে দক্ষ পান্ডাদের দিয়ে চলে? না তা চালানো যায়? তার উপরে আওয়ামি লীগের পান্ডা মানেই তো চাল চুরিতে ওস্তাদ, লগী বেঠা, অবৈধ অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ, সন্ত্রাসে স্বিদ্ধহস্ত! এরা নারীর দালালিতে পারঙ্গম, তার প্রমান তো আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি রাজধানীর একটা নামকরা মহিলা কলেজের ঘটনায়। পুলিশ পেটাতে দেখেছি দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি নিজের শিক্ষক হলেও পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর মত কাজেও তারা বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে ইতিমধ্যেই। তার উপরে আছে মতের মিল না হলেই প্রতিপক্ষের উপরে হামলে পড়া।
প্রতিপক্ষই কেবল নয়, নিজেদের পক্ষভূক্ত হলেও দ্বিমত পোষণকারীর কোন নিস্তার নেই। তার প্রমান আমরা দেখেছি হোষ্টেলে চার তলা থেকে স্বগোত্রভূক্তদের ছুড়ে ফেলে দেয়ার মধ্যে, দেখেছি বরিশাল পলিটেকনিকেলে প্রকাশ্যে দা দিয়ে কোপানের ঘটনায়!
আজ দেশের প্রতিটি জেলা থানা পর্যায়েই চলছে ছাত্রলীগের তান্ডব। নিরবিচ্ছিন্ন তান্ডব। টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজী, ডান্ডাবাজী থেকে শুরু করে অস্ত্রবাজী খূন খারাবী, ধর্ষণ, সংখ্যালঘুদের জমি দখল, তাদের বাড়ী ঘর দখল, মন্দীর ভাংচূর, প্রতীমা ভাঙ্গার ঘটনায় এরা,কেবল কেবল জড়িতই না বরং তা অপ্রতিরোধ্যগতিতে চালিয়েও যাচ্ছে। তাদের কোন শাস্তি হচ্ছেনা কারন, পুলিশ জানে, ওদের ধরা কেবলই পন্ডশ্রম। উল্টো পুলিশকেই ক্লোজ্ড হতে হবে।
দেশে আঈন শৃংখলা ভেঙ্গে পড়েছে, ভেঙ্গে পড়েছে প্রশাসনও। প্রশাসনের যে সব কর্মকর্তা কর্মচারী জনগণের নিরাপত্তা দিতে নিয়োজিত, সেই তারাই নির্যাতিত! সেই তারাই এতটা অসহায় যে, সাংবাদিক সম্মেলন করে তাঁরাই নিরাপত্তা চেয়েছেন সরকারের কাছে। থানায় জিডিও করেছেন। প্রাণভয়ে অনেকেই পালিয়ে বেড়চ্ছেন। অনেক কর্মকর্তা তাদের পরিবার পরিজনকেও নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়েছেন কর্মস্থল থেকে!!
ক’দিন আগে প্রকশে পাবনা শহরে এক নিয়োগ পরীক্ষায় চলাকালীন প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের পান্ডারা লাঠি সোটা নিয়ে হামলা চালিয়েছে পরীক্ষা কেন্দ্রে। পিটিয়ে আহত, অপদস্থ করেছে জেলার এডিসি, ম্যাজিষ্ট্রেট সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের। তেড়ে বের করে দিয়েছে পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারীদের। তারাই আবার সেইসব ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট’দের রাজাকার উপাধি দিয়ে শহর ছাড়া করার দাবীতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। রাস্তা অবরোধ করছে, মানবন্ধন করছে। করছে সংবাদ সম্মেলন! প্রকাশ্যে!! আর সদ্য খবর হলো, দলীয় সরকার দলীয় পান্ডাদের দাবী মেনে নিয়ে সেইসব কর্মকর্তাদের সরিয়েও দিয়েছেন!
এ কোন দেশ? এ কোন সমাজ? যেখানে ক্যডাররা রাস্তায় বীরদর্পে প্রকাশ্যে ঘোরে, হম্বিতম্বী করে আর পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ডিসি, এরা থানায় ডাইরী করেন নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে, সংবাদ সম্মেলন করে! সাংবাদিক ডেকে আবার কাঁদেনও মার খেয়ে, প্রাণ ভয়ে!!
বাংলাদেশের সরকার যদি থাকত, জনগণের সরকার, জনগণের জন্য, আর জনগণের দ্বারা সরকার, তা হলে এতদিনে এদের একটা বিহিত হতো। কিন্তু যেহেতু বর্তমান সরকার হলো আওয়ামি লীগের দলীয় সরকার, আওয়ামি লীগের জন্য, আওয়ামি লীগের দ্বারা, তাই এরা তিরৃস্কৃত না হয়ে বরং পুরস্কৃত হয়ে চলেছে!
কুখ্যাত মালীবাগ হত্যাকান্ডের কথা, যে ঘটনায় প্রকাশ্যে দিবালোকে শত শত লোকের সামনেই চার জন বনী আদমকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আওয়াম লীগ দলীয় এমপি ডা: ইকবাল’সহ তার নেতা কর্মীরা সেই হত্যাকান্ডে জড়িত ছিল, হত্যাকান্ডের সময় অবৈধ অস্ত্র হাতে গুলি করার দৃশ্য দেশের জাতিয় সকল পত্র পত্রিকায় এসেছে, কোটি কোটি দেশবাসী তা দেখেছে, তার পরেও সে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। খূনী, মাস্তান, দলীয় নেতাকর্মীদের সবাইকেই মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে চা’র দোকান থেকে গামাকে তুলে এনে বাজারে উপরে উপর্যপূরী কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয় আওয়ামি লীগ দলীয় কর্মীরা, বিচারে তাদের মৃত্যুদন্ডও হয়। উক্ত দন্ডের বিরুদ্ধে তাদের আদালতে আপিল শুনানীর অপেক্ষাতে থাকতেই সেই আসামিদেরকেও রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমায় মুক্ত করা হয়! তাই কেবল নয়, তাদের কাউকে কাউকে পুরস্কৃতও করা হলো সপ্তাহ দুয়েক আগে, সরকারি চাকুরী দিয়ে!
আওয়ামি লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে, যাকে দুর্ণীতির দায়ে আদালত শাস্তিপ্রাপ্ত পলাতক শাহদাব, সেই তাকেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দেন। যদিও উক্ত শাহদাব চৌধুরী কখনই আদালতে আত্বসমর্পন করেনি।
আরও আছে ‘রাজনৈতি মামলা’ নামক একটা চটকদার শিরোনাম দিয়ে এক এক দলীয় ক্যাডারদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা গুলো সব তুলে নেবার ইতিহাস। আছে ইব্রাহিম হত্যা মামলা নিয়ে এমপি শাওন’কে রক্ষায় নির্লজ্জভাবে চেষ্টা করে যাবার ঘটনা।
এসব দেখে শুনে কোন নির্যাতিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠির কি আর সাহস হবে আদালতে নির্যাতনের প্রতিকার চাইতে যাবার? গিয়ে কি লাভ হবে? বিচারতো পাবেনা। মামলা করে উল্টো প্রাণ ভয়ে পালাতে হবে! বাড়ী -ঘর, ভিটে-মাটি ছাড়া হতে হবে!
আওয়ামি লীগের পরীক্ষিত সন্ত্রাসী হওয়াটাই যদি চাকুরি পাবার একমাত্র যোগ্যতা হয়, তাহলে সন্ত্রাস কমবে কেন? কে কত সন্ত্রাস করতে পারে, সে পরীক্ষা দিয়েই না চাকুরি পাবার সম্ভবনাকে নিশ্চিত করতে হবে! তা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পড়াশোনা করে কি হবে? ছাত্রদের তো উচিৎ পড়া শোনা সব শিকোয় তুলে লগী, বৈঠা, কিংবা, এমপি শাওনের মত পিস্তল, চাকু হাতে রাস্তায় নেমে পড়ে সন্ত্রাসের পরীক্ষা দেওয়া! এই যদি হয় অবস্থা, তা হলে আর শৃংখলা থাকল কোথায়?
না, কোথাও কোন শৃংখলা নেই। এদেরকে প্রতিহত করার কেউ নেই। দেশের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা, যারা সব সময় পুলিশ প্রোটেকশনে চলেন, বাস করেনও সেই পুলিশ প্রটেকশনেই, যাদের বাড়ীতে, গাড়ীতে থাকে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারা, অফিসে থাকে দারোয়ান, সেই তারাই যদি নিরাপত্তাহীন হন, যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তা হলে কি আর বুঝতে বাঁকি থাকে যে, দেশের কোটি কোটি সাধারণ জনগণ কোন জাহান্মামে বাস করছে! তাদের দিন কাটে কেমনে? রাত কিভাবে কাটে? কতটা উৎকন্ঠার মধ্যে কাটে তাদের প্রতিটি মহুর্ত!
বাংলাদেশে দেশে কোন সরকার নেই। নেই জনগণের সরকার, যারা জনগণকে রক্ষা করবে দলীয় ক্যাডারদের এইসব উৎপাত থেকে। জনগণকে রক্ষা করতে, দেশটাকে রক্ষা করতে আজ নিখাঁদ দেশ প্রেমিক বাংলাদেশীদের এগিয়ে আসতে হবে, যাঁরা বাংলাদেশ নামক এই জাহান্নামে বসেও পুষ্পের হাঁসি হাঁসতে এবং কোটি কোটি নির্যাতিত জনতাকে হাঁসাতে পারবেন মুক্তির আনন্দে! আমার বিশ্বাস জাহান্নামে বসেও পূস্পের হাঁসি হাঁসতে পারা এরকম যুবক আওয়ামি লীগ বি এন পি সহ সকল দল সকল মতাদর্শীদের মধ্যেই রয়েছেন। এখন তাদেরকেই দেশোদ্ধারে দায়িত্ব নিতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



