১৯৭৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া আফগানিস্থানে ঢুকে পড়ে, দখল করে নেয় দেশটা। আফগানিস্থানকে একটি কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র হিসেবে গড়া আর স্ট্রাটেজিক পয়েন্ট থেকে পুরো প্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে। আমেরিকার টনক নড়ে। ঘুম হারাম হয়ে যায়। বৈশ্বিক রাজনীতিতে ঘটে এক সুনামি!
সোভিয়েত রাশিয়াকে আফগানিস্থান ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে আমেরিকার বড় প্রয়োজন পড়ে আফগানবাসীকে যেমন, তেমনি পাকিস্থানকেও। আফগানিস্থানের বিক্ষুব্ধ, হতদরিদ্র, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আধুনিক সামরিক শক্তিতে দূর্বল, অনভিজ্ঞ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দিয়ে শক্তিশালী সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাটা আমেরিকার জন্য এক কথায় অসম্ভব এক কাজ। কিন্তু সেই অসম্ভবকেই আমেরিকা সুক্ষ ও কুশলী পদ্ধতিতে সম্ভব করে তোলে।
কি ছিল সেই কুশলী পদ্ধতিটি? সেই কুশলী পদ্ধতি ছিল, আফগান জনগণকে সামরিক শক্তিতে প্রশিক্ষণ দেবার পাশাপাশি তাদেরকে সংঘটিত করা। সংঘটিত করা কেবলমাত্র দেশ পুনরুদ্ধারেই নয়, বরং তার চেয়েও বেশী ‘কিছু একটা’ করা। সেই বেশি ‘কিছু একটা’ হলো ‘কমিউনিষ্ট কাফের’দের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ এ নামানো! একটি মুসলিম দেশের জনগণকে আমেরিকান সরকারের মত কট্টর ইসলাম বিদ্বেষি একটা সরকার জিহাদে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে! এ জন্য তারা কোটি কোটি ডলার খরচও করেছে।
আফগানিস্থানে স্কুল কারিকুলামেও ছাত্রদের কাছে জিহাদের প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা আর অপরিহার্যতা তুলে ধরা হয়েছে! কার টাকায়? আমেরিকার টাকায়। খোদ আমেরিকারই এক পত্রিকা এ ব্যাপারে জানান দিচ্ছেন আমাদের এভাবে:
"The United States spent millions of dollars to supply Afghan schoolchildren with textbooks filled with violent images and militant Islamic teachings....The primers, which were filled with talk of jihad and featured drawings of guns, bullets, soldiers and mines, have served since then as the Afghan school system's core curriculum. Even the Taliban used the American-produced books,..", (Washington Post, 23 March 2002)
গরজ বড় বালাই-ই বটে! আর জিহাদের জন্য আফগান ধর্মপ্রাণ আফগান জনগণকে সংঘবদ্ধ করতে তার একজন আলেম, ইসলাম জানা, মুসলমান নেতা প্রয়োজন। আর যদি খোদ ইসলামের কেন্দ্রভূমী মক্কা বা মদীনার কোন আলেম হয়, তা হলে তো কোন কথাই নেই! পাক ভারতীয় উপমহাদেশের সাধারণ জনগণের মনে মক্কা বা মদীনা তথা সউদি আরবের কোন শেখ এর প্রতি যে ধরনের মানসিক দূর্বলতা ও আবেগ রয়েছে, তাকে পুরোপুরিভাবেই কাজে লাগানো যায়!
সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্যই আমেরিকান সরকারের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক পার্টনার বিন লাদেন পরিবারের একজন আলেম (!)কে ধরে আনা হলো। সি আই এ এবং আফগান জনগণের মধ্যে লিংক বজায় রাখার কাজই কেবল নয়, বরং ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে জিহাদের জন্য সংঘবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে।
আফগান জনগণকে ইসলামের বাণী, এর শিক্ষা, জিহাদ শেখানোর জন্য আমেরিকার টাকায় একের পর এক খোলা হতে থাকে মাদ্রাসা। পাড়ায় পাড়ায়, অলিতে গলিতে খোলা হয় মাদ্রাসা। কমিউনিষ্ট রাশিয়া যখন আফগানিস্থান দখল করে রেখেছে, ঠিক তখনই আমেরিকার টাকায় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে এসব মাদ্রাসাগুলো! ১৯৮০ সালের দিকে পুরো আফগানিস্থানে যেখানে মাত্র ২৫০০ মাদ্রাসা ছিল, তা মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যে উন্নীত হয় ৩৯০০০ (উনচল্লিশ হাজার) এ! আমেরিকার দেয়া অর্থে, তাদের পরিকল্পনায় কে এ কাজটিকে মাঠে বাস্তবে রুপ দিয়েছিলেন?
তিনি আর কেউ নন। তিনিই হলেন বিন লাদেন, ওসামা বিন লাদেন! আমেরিকার অর্থে, তার দেয়া অস্ত্রে, তার পরামর্শে আর প্রেসিডেন্ট রিগানের নেতৃত্বে পুরো আমেরিকান জনগণের গরজে শুরু হলো জিহাদ! ইসলামিক জিহাদ! সারা বিশ্বময় তখন আল্লাহর রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ‘মুজাহিদ’ খোজা হয়েছে। বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়েছে। না, আফগান জনগণ সেসব বিজ্ঞাপন দেয়নি। দিয়েছে আমেরিকান সরকার, সে দেশের জনগণের টাকায়! এক গবেষকের বক্তব্য তুলে ধরছি, তিনি লিখেছেন;
"Advertisements, paid for from CIA funds, were placed in newspapers and newsletters around the world offering inducements and motivations to join the [Islamic] Jihad." (Pervez Hoodbhoy, Peace Research, 1 May 2005)
এর পরের ইতিহাস সবারই কমবেশী জানা। সে ইতিহাসের পূনরাবৃত্তি এখানে করার কোন সুযোগ নেই। আর তার জন্য úর্যাপ্ত পরিসরও এটা নয়। কিন্তু যে কথা বলতেই হয়, তা হলো, আমেরিকার প্রস্তুতকৃত মুজাহিদ ফ্রাংকেস্টাইনের দৈত্যের মত করে যখন তার নিজের উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখনই আমেরিকার গা’এ জ্বালা ধরেছে।
সেই জ্বালারই বিষময় ফল হলো নিজেদের হাতে গড়া এক কালের বিশ্বস্থ বন্ধুকে নিরস্ত্রাবস্থায় নৃশংসভাবে হত্যা করে উল্লাসে ফেটে পড়া। কিন্তু তাঁরা বোধ হয় স্বাভাবিক বোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন, তা না হলে ঠিকই বুঝতেন যে, বিশ্বাসীর জ্ঞান, তাদের স্মৃতি এখনও পুরোপুরি লোপ পায় নি। কোটি কোটি লোক জানেন, ওসামা আসলে কার প্রোডাক্ট? তারা জানেন, সেই পোডাক্টকে হত্যা করে তা নিয়েও আমেরিকার ঘৃণ্য রাজনীতির শেষ হয়নি।
বরং তা হয়েছে আরও উৎকট, নৃশংস। আরও পৈশাচিক, আরও বর্বর। এই বর্বরতা, এই পৈশাচিকতা আর বিকৃত উন্মত্ততার আড়াল গলে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে আরও এক কলংক। আর সেটা হলো, মিথ্যাচার। জঘন্য মিথ্যাচার। আমেরিকা ওসামার মৃত্যু নিয়ে একের পর এক মিথ্যাচার করে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, এই বিশ্ব আর কোনদিন ওসামাকে তার বুকের উপরে হেটে বেড়াতে দেখতে পাবে না।
কথাটা একেবারে সত্যি। এটা নতুন কিছুই নয়। মুসলমানরা, বিশেষ করে, বোদ্ধা গোষ্ঠি অনেক আগেই সে ঘটনা জানেন। খোদ আমেরিকার অনেক রাজনীতিবিদ আর ইন্টালিজেন্স বিভাগের হোমরা চোমারা সে কথা বলেছেন প্রকাশ্যেই। উদাহারণ লাগবে? দিচ্ছি দেখুন;
হেনির কিসিঞ্জার, জেমস বেকার আর সাইরাস ভ্যান্স এই তিনজন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বা ফরেন সেক্রেটারীর অধিনে ডেপুটি এ্যসিষ্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছেন, এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি Steve R. Pieczenik সেই ২৪ এপ্রিল ২০০২ Alex Jones Show নামক টিভি টক শো’তে বিশ্বকে জানিয়েছিলেন, ওসামা বিন লাদেন মারা গেছেন অনেক আগেই। কি ভাবে তিনি মারা গেছেন? তার জবাবও তিনি দিয়েছেন, কিডনি অকেজো হয়ে।
একথাটাই একবার এক অসতর্ক মহুর্তে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন সেই ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসেই, পাক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ওসামা’র কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন অকেজো হয়ে যাওয়াতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন পূর্ব আফগানিস্থানের এক শহরে। পরে অবশ্য ‘ড্যাডি’র ধমক খেয়ে মোশাররফ সংগত কারণেই আর মুখ খুলেন নি!
যাহোক, আমেরিকান সরাকরের এক সময়কার উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ব্যক্তি উক্ত টক শো’তে এটাও জানান দিয়েছেন যে, যে ভিডিও ফিল্ম এ ওসামা বিন লাদেন ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার দায় দায়িত্ব স্বীকার করছেন বলে দেখানো হয়েছে, সেটি জাল একটা ভিডিও।
সিআইএ’র এই প্রাক্তন এক কর্মকর্তা এক রেডিও টক শো’তে প্রশ্নের উত্তরে জানান দিয়েছিলেন যে, ওসামা মারা গেছেন। ২০০১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ফক্স নিউজ টেলিভিশন চ্যানেল আফগানিস্থানের এক সুত্রের বরাত দিয়ে জানান দেয় যে, বিন লাদেন মারা গেছেন।
১৭ই জুলাই, ২০০২ এ এফ বি আই এর কাউন্টার টেররিজম বিভাগের তৎকালিন প্রধান ডেল ওয়াটসন (Dale Watson), , এর পরে ঐ একই বৎসরের অক্টোবরে সি এন এন এর সাথে এক স্বাক্ষাৎকারে আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, ২০০৩ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট ফক্স নিউজ চ্যানেলে এক টক শো’তে, ২০০৫ এর নভেম্বরে প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর হ্যারি রিড, ২০০৭ এ পাকিস্থানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো আল জাজিরা টিভিতে ডেভিড ফ্রস্টের সাথে এক টক শো’তে, ২০০৯ এর মার্চ মাসে বোস্টন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এঞ্জেলো কডোভিলা (Angelo Codevilla), ঐ একই বৎসরের মে মাসে পাকিস্থানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ জারদারী এক সাক্ষাৎকারে জানান দিচ্ছেন যে, বিন লাদেন বেঁচে নেই।
যে লাদেন আজ থেকে কয়েক বৎসর আগেই মারা গেছেন সেই লাদেনকে আবার নতুন করে বধ করার এই নাটক করার কি দরকার ছিল? প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠবে। উঠবে কি, ইতিমধ্যেই সেটা উঠেছেও। সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজব এই নিবন্ধেই। আরও একটু পরে, তবে তার আগে বর্তমান নাটক নিয়েই আরও কিছু কথা বলে নেওয়া দরকার বোধ করছি।
‘লাদেন বধ’ নাটকের অংশ হিসেবে বন্ধুকে হত্যা করে তার ছবি বিশ্বময় ছবি ছেড়ে দেওয়া হলো, সে ছবিতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ওবামা, ফরেন সেক্রেটারি মিসেস ক্লিন্টন এবং জাতিয় নিরাপত্তা কাউন্সলের উচ্চপদস্থ পরামর্শক এবং অতি অবশ্যই সি আই এ’র ডাইরেক্টÍ একত্রে বসে পাকিস্থানে কথিত বাড়িতে বিন লাদেন বধ অভিযান দেখছেন। উক্ত অভিযানে অংশ নেওয়া কমান্ডোদের মাথার হেলমেটে সাঁটা ক্যমেরার মাধ্যমে তাঁরা নাকি অভিযানটি লাইভ দেখেছেন। ঘটনার আকষ্মিকতায় মিসেস ক্লিন্টনতো বিষ্ময়ে, উত্তেজনায় তাঁর একটা হাত দিয়ে খোলা মুখ ঢাঁকার চেষ্টা করছেন, সেটাও দেখলাম আমরা, দেখেছেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষও।
ছবিটি হোয়াইট হাজউজের ভেতরের। রাস্তায় ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ছবি নয়। আর ছবির সাথে যে ব্যাখা দেওয়া হয়েছিল, সেটাও সেই হোয়াইট হাউজেরই দেওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের ভেতরের ছবি। ছবিটি কেউ মেনিউপুলেট করে নি। নিউজ এজেন্সিকে সরবরাহ করেছে খোদ হোয়াইট হাউজের পাবলিক রিলেশন্স ডিপার্টমেন্ট। এবং ছবিটি তুলেছেনও সরকারি ফটোগ্রাফার, হোয়াইট হাউজে এম্বেডেড সাংবাদিকরা, হাতো গোণা ক’জন, যাদের একেবারে ভেতর থেকে, প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে খবর ও ছবি সংগ্রহ করার বিশেষ অনুমতি আছে, তারা।
অথচ এখন খোদ সি আই এ’র প্রধান বলছেন উল্টো কথা। গেল ৪ তারিখে তিনি আমাদের সদয় হয়ে জানালেন যে, আসলে প্রেসিডেন্ট ও তার পরামর্শকরা, সভাসদরা ওসামা বধ অভিযানটি পুরোপুরি লাইভ দেখেন নি আগে যেমনটি বলা হয়েছিল! যে মহুর্তে কমান্ডোরা ওসামার বাড়ীতে প্রবেশ করে, বা তাঁকে সম্মুখে পায়, সে মহুর্তেই ক্যমেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়! মোট ৩৮ মিনিট ধরে চলা অভিযানটির খুব স্পর্শকাতর মহুর্তে প্রায় ২৫ মিনিট ক্যামেরার এই লাইভ ট্রান্সমিশন বন্ধ রাখা হয়!
এর আগে ঘটনার পর পরই বলা হলো, ওসামা নাকি ছিলেন স্বশস্ত্র। তিনি আত্বসমর্পণ না করে অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, তাই নিরুপায় হয়ে তাঁকে গুলী করে হত্যা করা হয়েছে। এখন সেই খোদ আমেরিকান সরকারই আবার বলছেন, না, তাঁর হাতে কোন অস্ত্র ছিল না।
অস্ত্রই যদি না থাকে তা হলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তিনি প্রতিরোধ গড়লেন কিভাবে? আবার বলা হয়েছে, ওসামা নাকি তাঁর স্ত্রীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, তাই সেই স্ত্রীও নিহত হয়েছেন। এখন সেই তারাই আবার বলছেন, না, তাঁর স্ত্রী নিহত হন নি। আর পাকিস্থান সরকারও নিশ্চিত করেছেন যে, ওসামার স্ত্রী আহত হয়ে তাদের হেফাজতে চিকিৎসাধীন আছে। (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



