১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজির সতোরো ঘোড় সওয়ারের ভারতবর্ষে আগমণের মাধ্যমে এসেছিল রাজনৈতিক ইসলাম। ইসলামের প্রভাব আর যাত্রার সেই শুরু। এর আগেও ভারতবাসীর কাছে ইসলাম পরিচিত ছিল। উপকুলীয় এলাকায় ব্যবসায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গই মুসলমানদের কৃষ্টি আর সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়।
উন্নত মানবিক মুল্যবোধ সম্পন্ন সাংস্কৃতি ‘ইসলাম’ মানুষ হিসেবে তাদের উপযুক্ত প্রাপ্য মর্যাদায় তুলে ধরে, মুক্তির পথ দেখিয়ে অচ্ছুত ও বংশানুক্রমে দাসত্বের জিঞ্জিরে আবদ্ধকে উঠায় সম্মানের শিখরে। ফলে ইসলাম আসন গাড়ে ভারতীয় সাধারণ মানুষের মনে।
এই মুক্তি, স্বাধীনতা, আর সমঅধিকারের জন্যই ভারতবাসীর কাছে কাংক্ষিত ছিল বখতিয়ারের আগমণ! প্রত্যাশার মাত্রা এতটা উচ্চকিত ছিল বলেই তিনি মাত্র সতোরো সওয়ার নিয়ে ভারত জয় করেছিলেন! বখতিয়ারের জয় যতটা না সামরিক, তারও বেশী ছিল আত্বিক জয় ইসলামি সংস্কৃতির কারণে। অর্থাৎ সাং®কৃতিক বিজয়!
এর পরে ইসলামকে আর পেছন ফিরতে হয়নি। ভারতবাসীর মুক্তির সেই শুরু। যদিও তা কখনই বাধাহীন নিরুপদ্রব ছিল না। ১৫২৬ থেকে তিনশত বৎসরের মোঘল শাসন, তার পরে বাংলার স্বাধীন সুলতান, আর নবাবদের শাসনও ছিল পলাশিতে নবাব সিরাজের পতন অব্দী। এ সময়কালে রাজনীতির উত্থান-পতনের পাশাপাশি সংস্কৃতিরও উত্থান, পতন ঘটেছে।
সংস্কৃতির উত্থান পতন? সেটা আবার কি? সেই কবে ভারতের কোন বন্দরে আরবের কোন এক মুসলমান বণিক তার বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে নোঙ্গর করেছিলেন! অজানা সেই বণিক কেবল বাণিজ্য পণ্যই আনেন নি, এনেছিলেন একটা সংস্কৃতিও। ইসলামি সংস্কৃতি।
১৭৫৭ তে ইংরেজরা এদেশীয় হিন্দু দোসরদের গাদ্দারি আর সহায়তায় ‘যুদ্ধ’ নামের প্রহসনের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা কেড়ে ১৯০ বৎসর শাসনের শুরুতেই যে কাজটিতে হাত দিয়েছে, তা হলো, ভারতবর্ষের মুসলমানদের তাদের ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেবার, তাদের সংস্কৃতিকে ভেঙ্গে দেবার কাজ।
তারা ইতিহাস বিকৃতি ও ইসলামি সংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে ভেঙ্গেছে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে। এভাবেই আর্থসামাজিক, নৃত্বাত্বিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সবদিক বিচারে বিপর্যস্থ করে ইসলামিক সামাজিক অবকাঠামোকে ভেঙ্গেছে ঐ সংস্কৃতিক আবহকে ভাঙ্গার মাধ্যমেই।
মুসলমানদের মধ্যে কিছু ক্ষণজন্মা আলেম ওলামা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এ বিপর্যয়কে ঠেকানোর। তার তাৎক্ষণিক ও দূরবর্তি ফলও আমরা পেয়েছি, পাচ্ছিও। কিন্তু আপামর মুসলিম জনতা তাঁদের এই প্রচেষ্টাকে দেখেছেন নিছক ‘ধর্মীয় আন্দোলন’ ‘ইসলামি পূনর্জাগরণবাদ’ কিংবা ‘স্বাধীনতা আন্দোলন’ হিসেবে। এর সাথে তারা নিজেদের সমাজ জীবনের সাংস্কৃতিক দিকটিকে অঙ্গিভূত করেনি।
ফলে ইসলামি সাংস্কৃতি পূনরুদ্ধারে দু’একটা মহলের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ছাড়া কোন সম্মিলিত প্রচেষ্টা হয়নি। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ এঁরা যে মহৎ প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন, তার সাথে সাধারণ জনগণ যোগ দেয়নি। যে কোন পরাজিত জাতিই সর্বপ্রকারে হারানো শক্তি, ঐতিহ্য পূনরুদ্ধারে চেষ্টা করে। আফসোস, বাঙ্গালী মুসলমান সে কাজটিও করেনি!
সম্ভবত দু’টো কারণে। প্রথমটি; উপমহাদেশীয় সমকালীন মুসলিম সমাজ নিজেদের ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে সচেতন নয়। এরা ধর্ম, ইতিহাস, আর সাংস্কৃতি, এসবের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনরেখা টেনে জীবনকে খন্ডিত, বহুধাবিভক্ত করেছে!
মুসলমানদের অতিত ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। কথায় আছে ‘দ্যা ওয়ান হু কন্ট্র্রোলস্ দ্যা পাষ্ট, কন্ট্রোলস্ দ্যা ফিউচার। মুসলমানদের অতিত ইতিহাসকে কন্ট্রোল করেছে ইংরেজ ও হিন্দুরা। ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ পথনির্দেশও দিয়েছে নেহেরু, গান্ধী, বল্লভ ভাই, রামমোহন’রা!
দ্বিতীয় কারণ, মুসলমান সমাজে বাস করেও মতাদর্শগত বা চিন্তার পার্থক্য থাকায় সমাজের একটা গোষ্ঠি অপর উৎসাহি গোষ্ঠিকে সঠিক ইতিহাস চর্চার কাজে সহযোগীতা না করে এলক্ষ্যে সামান্যতম উদ্যোগকেও সর্বশক্তিতে প্রতিরোধ করেছে। এই আভ্যন্তরীণ অনৈক্যই সবচেয়ে বড় বাধা। এ বাধা দূর করতে রাজনীতিবিদ, সমাজের জ্ঞানী-গুণী, লেখক, চিন্তাবীদ, বুদ্ধিজীবি কবি, সাহিত্যিকবৃন্দ অনেকেই চেষ্টা করেও সফল হননি।
এতদ্বাঞ্চলে হাতে গোণা দু’একজন, যেমন, কবি ইকবাল, নজরুল, পরবর্তিতে ফররুখ, প্রমূখ ছাড়া আর কেউ ইসলামি আদর্শভিত্তিক সাহিত্য চর্চায় এগিয়ে আসেননি। মুসলিম সাহিত্যিকদের অধিকাংশই ভিন্নাদর্শের কাছে আত্ববিক্রয় করেছেন। তাঁদের সাহিত্য বরং উল্টো মুসলিম গণমানসকে ইসলামি ইতিহাস, সংস্কৃতি, তথা ইসলাম থেকে দূরে নিয়ে গেছে।
অপরদিকে হিন্দু সাহিত্যিকরা নিজেদের আদর্শ-মূল্যবোধ ভিত্তিক সাংস্কৃতিক বলয় গড়েছেন, নিজেদের কৃষ্টি, ইতিহাস ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এরকম সাংস্কৃতিক বলয়ে নিয়োজিত থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র, কবি রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণ্যবাদী যে বিশাল সাহিত্য গড়েছেন, তা ভারতের আগামি গতিপথকেই কেবল নির্দেশ করেনি বরং এর চালিকাশক্তি হয়েছে। তাদের পরিচিতিকে সুসংহত করেছে, ইতিহাসকে তুলে ধরেছে সমকালীন প্রজন্মের কাছে।
সেই হিন্দুত্ববাদী সাহিত্যকেই আজ মুসলিম জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে, তাদেরকে নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ভূলিয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নেবার জন্য। এটাই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। পক্ষ আর বিপক্ষের, দু’টি আদর্শের, দু’টি সংস্কৃতির সংঘাত। সত্য-মিথ্যা, হক্ক-বাতিলের চলমান যুদ্ধ। অবিরাম চলছে, চলবেও। কার্লমার্কস একে বলেছেন ‘শ্রেণী সংঘাত’। কিন্তু মুসলমানরা জানে, এটা সত্য আর মিথ্যার সংঘাত। হক্ক আর বাতিলের, ইসলাম আর কুফরির দ্বন্দ।
বাংলাদেশে এ দ্বন্দ ইদানিং প্রকটভঅবে দৃশ্যমান! ইসলামি সাংস্কৃতিকে বাংলাদেশ থেকে বিদেয় করার আয়োজন চললেও আমাদের শিক্ষিত স¤প্রদায়, লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের অধিকাংশই আছেন এই আয়োজনের ক্রীড়ণক হিসেবে। এটাই সমকালীন বাংলাদেশী সমাজে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


