সবকিছু এক এক করে কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। সমাজ বদলে যাচ্ছে, চেনা জানা পরিবেশ বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে মানুষগুলোও। বদলে যাচ্ছে মূল্যবোধ, বদলে যচ্ছে চিন্তা চেতনার জগৎ, সব, সবকিছু। বদলে যাচ্ছে অকল্পনীয় দ্রুত গতীতে!
একদিন যে সমাজে নীতি ছিল, নৈতিকতা ছিল, ছিল মুল্যবোধ, ছিল ভালকে ‘ভাল’ মন্দকে ‘মন্দ’ বলা আর তা মানার মত নৈতিক সাহস, আজ মাত্র তিন বা চারটি দশকের মধ্যেই তা যেন সব বদলে গেল। এখন আর ভালকে ভাল বলা যায় না, যদি না সেই বলার মধ্যে নিজের বা দলের কোন স্বার্থ থাকে। মন্দকেও আর মন্দ বলা যায় না, যদি না সেই বলার পেছনে নিজের বা নিজেদের কোন স্বার্থ থাকে।
ছোটকালে আমাদের পাড়া গাঁ’র পন্ডিত মশাইরা, যাদের কোন বি এ, বি’এড ডিগ্রী ছিল না, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের চোখ ধাঁধাঁনো সার্টিফিকেটও ছিল না, সেসব পন্ডিতরা শিখিয়েছিলেন ‘সদা সত্য কথা বলিবে, কখনও মিথ্যা বলিবে না’। আজ এত বড় বড় ডিগ্রীধারীরা কেউ আর সেই কথাগুলো শেখান না।
কেউ বলেন না যে ‘যে কোন অবস্থায় গুরুজনকে মান্য করিবে’। কেউ না। গুরুজন? সে ব্যাটারা আবার কে? তার সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমাকে নিয়ে তাঁর বা তাঁকে নিয়ে আমারই বা মাথা ব্যাথা কিসের?
আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বৎসর আগের এক সন্ধায়, আব্বা বাসায় না থাকার সুবাদে বাড়ীর সামনের রাস্তায় খেলছিলাম, মাগরিবের নামাজ পড়ে নিজ বাসা অভিমূখে গমণরত কলোনির এক মুরুব্বী তা দেখে থামলেন। নাম, বাসা নম্বর, বাবার নাম জেনে নিয়ে কানটা ধরে, আচ্ছা করে মলে দিয়ে এক ধমকে বাসায় পাঠিয়েছিলেন! বলেছিলেন, এখনই গিয়ে পড়তে বসবে! যতক্ষণ না জড় সড় হয়ে বাসার ভেতরে ঢুকেছি, ততক্ষণ তিনি ঐ রাস্তার উপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাসার ভেতরে ঢুকেছি, নিশ্চিত হয়েই তিনি নিজের পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
তিনি আমার কেউ ছিলেন না, ছিলেন কেবল একই কলোনীর বাসিন্দা একজন মুরুব্বী মাত্র। সেই মুরুব্বীর হাতে কান মলা খেয়ে, স্বাধের খেলা ছেড়ে আসাতে মনে হয়নি যে, আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন, তিনি আমার উপরে অনাধিকার চর্চা করেছেন, তেমনটা ভাবিও নি কখনই। মা’কেও দেখেছি, যারপরনাই খূশী হয়েছিলেন সে দৃশ্য দেখে!
জানি না, আজকের কোন মা অপরের হাতে তার সন্তানের কান মলা ও বকুনি খেতে দেখে খূশী হবেন কি না। জানি না, আজ সেরকম কোন অপরিচিত মুরুব্বী পাড়ার কোন কিশোরকে কান মলা দিয়ে পড়ার টেবিলে যেতে বলার সাহস পাবেন কি না।
আজ দিন বদলেছে, বদলেছে স্বাধীনতা আর অধিকারের সঙ্গা, পরিধিও! নাগরিক দায়িত্ববোধের সংগা আর সীমা আজকের বি এ, বি এড’রা ভাল বলতে পারবেন, সে সংগার সীমা আর পরিধি আমাদের আজকের টিচার্স ট্রেনিং কলেজের কর্ণধাররাই ভাল করে নির্ধারণ করে দিতে পারবেন! আমরা অজ্ঞ, মূর্খ সে সবের কি বুঝি?
হোম ওয়ার্ক করতে দেবার ছলে, খাতা ভরে একই কথা বার বার লিখতে দিয়ে শিখিয়েছিলেন ‘পরের ধন আত্বস্বাৎ করিবে না।’ সততাই চরিত্রের ভূষণ’ ‘জ্ঞানই শক্তি’ ‘চরিত্র অমূল্য সম্পদ’ এসব নীতি কথা।
আজ আধুনিক পদ্ধতিতে আমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়! ওসব পূরোনো আর সেকেলে পদ্ধতি আজ অচল! অচল বলেই বোধ করি এখন এসব নীতিকথা যারা বলেন, তারাও অচল, সমাজে তাদের কোন দাম নেই, প্রয়োজনও নেই!
সে কারণেই কি না জানি না, আমাদের নেতা নেত্রী থেকে শুরু করে, আমাদের তরুণ, যুবক সমাজের আর কেউ এসব নীতিকথার ধারও ধারেন না। সত্য কথা বলা, নিরেট বোকামি ছাড়া আÍ কি? গুরুজনকে মান্য করা? সে তো আমার ব্যক্তি স্বাধীনতার অবমাননা! আমার মানবাধিকারের জঘণ্যরকম অপমান! আমার স্বাধীনতার প্রতি চরম অবজ্ঞা!
তাই তো, আমরা যে স্বাধীন! আমাদের স্বাধীনতার মূল্য রাখতে হবে না? আমরা স্বাধীন বলেই না আমাদের যুবকেরা, আমাদের তরুণে’রা দিন রাত, হাতে গাঁজা-ফেন্সিডিল আর মদের বোতল নিয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকতে পারে! এরা আমাদের ভবিষ্যৎ! আমরা তাদের কিছু বলতে পারি না, কারণ, তাদের ব্যক্তিগত জীবনে বাধা দেবার অধিকার আমাদের নেই, সেটা অনাধিকার চর্চা!
আমরা স্বাধীন বলেই না আমাদের মা বোনে’রা মানবতাবাদী না হয়ে নারীবাদি হতে পেরেছেন। তারাও বহু কষ্টার্জিত স্বাধীনতার স্বাদ নিতে চান পুরোপুরি! তাঁরা চলনে স্বাধীন, বলনে স্বাধীন। তাঁরা আচারে আচরণেও স্বাধীন! স্বাধীন, চিন্তা আর চেতনাতেও! লজ্জা এখন আর ভূষণ নয়, তা তো নারী নির্যাতনের হাতিয়ার! তাই দিন বদলের দিনে বদলে গেছে শোষণ, শাসন আর ভূষণের সংগাও!
এখন তসলিমা, প্রভা আর কানিজ আলমাস’রা লজ্জা ছুঁড়ে ফেলে দিলে হন বরিত সেলিব্রিটি! আর লজ্জা ধরে রেখে আমার মা, আমার বোন, ওঁরা নাকি পরাধীন এখনও! এখনও তারা স্বাধীন হতে পারেন নি!
লজ্জা বিসর্জন দিয়ে জিন্স আর টপ পরতে, ওড়না হিজাব ছাড়তে পারেন নি বলেই তাঁরা স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারেন নি! স্বাধীনতার স্বাদ নিয়েছে বাঁধন’রা, স্বাধীনতার স্বাধ নিয়েছেন তসলিমা, নিয়েছেন আজকের রুমানা, আর ফারজানা’রা। তারাই আগামি প্রজন্মের রোল মডেল!
এই স্বাধীনতার বলেই আশপাশ সব বদলে গেছে। সব কেমন যেন অচেনা, অজানা আমাদের মত ‘ব্যাক ডেটেডদের’ কাছে! আমরা যে লুটে পুটে খেয়ে দেশটাকে ভাগাড়ে পরিণত করার মহোৎসব দেখে রাত দিন তাড়িত হই, এ আমাদের পশ্চাৎপরতা, সেকেলে চিন্তা চেতনার ফল, আর কিছুই নয়!
আর ওদের প্রগতির প্রতিক্রিয়ায় হিংসা আর পশ্চাৎপরতার কারণে আমরা ‘প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি’। দিন বদলের দিনে আমাদের কোন ঠাঁই নেই এ সমাজ, এ দেশে!
স্বাধিকার আর প্রগতির জন্যই স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা যেহেতু একত্রে পাশাপাশি চলতে পারেনা, তাই আমরা অচল! আমরা স্বাধীনতাবিরোধি! এদেশে আমাদের কথা বলার কোন অধিকার নেই! দেশটাকে করদ রাজ্য বানানো হোক, আমরা কথা বলতে পারবনা। বললেই আমরা স্বাধীনতা বিরোধি, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি, রাজাকারের বংশধর!
কেউ যদি রাতারাতি পদ্মা সেতুর বাজেট খেয়েও ফেলে, তাতে আমাদের কি? আমাদের কোন কথাই বলার অধিকার নেই, কেউ যদি আমার দেশের বুক চীরে রাক্ষুসে রাবনের পথ বানায়, তাতে আমার কি? আমি কোন কথা বলতে পারবনা, কারণ আমি রাজাকার না হলেও তার বংশধর!
কেউ যদি আমার সোনার বাংলার প্রাণশক্তি শত শত নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দেশটাকে মরুভূমি বানাতে চায়, তাতেও আমার কোন কথা বলার অধিকার নেই, কারণ, আমি ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল রাজাকারের চেলা! কেউ যদি আমার বোন ফেলানি’কে মেরে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখে, কেউ যদি আমার মা, আমার বোনকে বাজারে ওঠায়, তারপরেও আমি কোন কথা বলতে পারবনা! কারণ, আমার কোন অধিকারই নেই এ ব্যপারে কথা বলার! আমি যে প্রতিক্রিয়াশীল রাজাকারের বংশধর!
স্বাধীন দেশে আমার কথা বলার কোন স্বাধীনতা নেই! কারণ, আমি যে মানতে পারি না, মানাতে পারি না নিজেকে ঐ বদলে যাওয়ার দর্শনের সাথে! ‘বদলে যাওয়া’ কিংবা ‘বদলে দেবার’ চটকদার শ্লোগাণের সাথে সাথে আমার নীতি বদলাতে পারিনি, নৈতিকতা বদলাতে পারিনি, পারিনি বদলাতে নিজেকেও!
আমি যে এখনও বুকের গহীনে আঁকড়ে ধরে বসে আছি আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার সেই শ্বাশত রুপটাকে, যেখানে বাংলার পরতে পরতে মিশে আছে শাহজালাল, শাহপরানের স্মৃতি, মিশে আছে ফকির মজনু শাহ কিংবা বারো আউলিয়ার দর্শন, মিশে আছে শহীদ তিতুমীরের শাহাদাতের তামান্না। মিশে আছে বখতিয়ার আর শায়েস্তা খাঁর দেয়া মুক্তির পয়গাম!
তাই আমি অপাংক্তেয়, পরিত্যাজ্য একজন! আমার কোন অধিকার নেই! প্রতিবাদের অধিকার নেই, প্রতিরোধের অধিকারও নেই। সুযোগও নেই চিৎকার করে বলার ‘ও আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’! আমি রাজাকারের বংশধর, বাংলাকে ভালবাসার কোন সুুযোগ আমার নেই!
আমরা যে স্বাধীন! স্বাধীনতার যাদুকরি ছোঁয়ায় পূরোনো সেকেলে সব কিছুই আজ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়! নীতি ক্ষয়ে যায়, নৈতিকতা ক্ষয়ে যায়। ভালবাসা দয়া-মায়া-মমতা, প্রেম-প্রীতি এসবের চিরায়ত ধারণাগুলো সব ক্ষয়ে যায়। ক্ষয়ে যায় দেশপ্রেমের আর দেশদ্রোহিতার ধারনাও!
স্বাধীনতার এই চমকপ্রদ ছোঁয়ায় ঘরে বাইরে সবখানেই কেবল রক্তক্ষরণ! তরতাজা যুবকের বুকের রক্ত থেকে শুরু করে ব্যংাকের ডলার, পদ্মা-তিস্তার পানি থেকে ব্যবসা বাণিজ্য আর শেয়ার মার্কেটের কলমানি, সবখানেই কেবলই ক্ষয়! চিন্তা-চেতনায়, মন-মননে ক্ষয়, অবক্ষয়। এখন দিন বদলেছে, দিন বদলের দিনে এখন কেউ আর জয়ের কথা বলে না।
জনান্তিই কেবল জানেন, আর আমিও জানি, মিরপুর কিংবা রায়েরবাজারে, পদ্মা-মেঘনা, সূরমা-যমুনার অববাহিকায়, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এভূখন্ডে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লক্ষ শহীদের আত্বারাই কেবল আজও এ অবক্ষয়ের মাঝেও গেয়ে চলেছেন ‘জয়, বাংলার জয়’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


