আমার জন্ম হয়েছিল অনেক আশা আকাংখার মধ্যে দিয়ে। আমার বড়বোনের জন্মের প্রায় দশ বছর পর আমার জন্ম। বাবা মার অনেক আশা ছেলে হোক, কিন্তু যদি এইটাও মেয়ে হয়? চিন্তার ব্যাপার। যাই হোক বহু অপেক্ষা প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবশেষে প্রচন্ড এক বৃষ্টির রাতে ঘর আলোকিত করে (!!!???) আমি জন্ম নিলাম। ডাক্তার আমার ২পা ধরে তুলে প্রথমে একটু নাড়াচাড়া করলো, তারপর আস্তে আস্তে ২/১ টা চড়ও দিল আমাকে কাঁদানোর জন্য। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কাঁদলাম না আমি। শেষে জোরে একটা থাপ্পর কষালো আমার পাছায়। জন্মের পরপরই একজন মানুষের এরকম নির্দয় আচরনে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম আমি।
সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে আমাকে "শিশু মনোজাগতিক বিদ্যালয়" এ (স্কুল অফ মিউজিক)কেজি বি - তে ভর্তি করে দেওয়া হলো (তখনকার খুলনার একমাত্র ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল)। আব্বু প্রথম যেদিন আমাকে স্কুলে রেখে আসতে গেল, আকাশ, বাতাস, ক্লাস কাঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম আমি, যেন আমাকে চিরদিনের মত ছেড়ে চলে যাচ্ছে আব্বু। আমার স্নেহময় পিতা কিছুক্ষন দাড়িয়ে থাকল, তারপর টিচারদের অনুরোধে একসময় আমাকে রেখে বাসায় চলে গেল।
প্রথমদিন ক্লাসে বসেই আমার পাশে বসা মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেলাম আমি। মেয়েটার নাম ছিল লিসা। টিচার ক্লাস নিয়েই যাচ্ছেন, আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি লিসার দিকে। দেখা যেন আর ফুরায়ই না। শেষে এক পর্যায়ে ক্লাসের মধ্যেই লিসার কানের কাছে যেয়ে ফিসফিস করে বললাম, "বড় হয়ে তুমি আমাকে বিয়ে করবা?"
লিসা অল্প কিছুক্ষন আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। তারপর চোখ মুখ বিকৃত করে, প্রচন্ড এক চিৎকার করে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। একহাতে আমার চুল টেনে ধরে, আরেকহাত দিয়ে ইচ্ছেমত থাপড়াতে লাগল আমাকে। সাড়ে পাঁচ বছর বয়সেই একটা ছেলের প্রতি একটা মেয়ের নিষ্ঠুর আচরনের প্রমান পেলাম। মার খেতে খেতেই ঠিক করলাম, জীবনে কখনও কোন মেয়ের প্রেমে পড়বোনা।যাইহোক এই বিশ্রী অবস্থা থেকে আমাদের ক্লাস ম্যাডাম আমাকে মুক্তি দিলেন। লিসাকে অনেক কষ্টে ছাড়িয়ে ওর হাত থেকে মুক্ত করলেন আমাকে। কৃতগ্গ দৃষ্টিতে ম্যাডামের দিকে তাকালাম আমি এবং জীবনে ২য় বারের মত প্রেমে পড়লাম আমাদের ম্যাডামের।
প্রায় ৩/৪ মাস পর একদিন স্কুলে লাল হাফপ্যান্ট ভর্তি করে পায়খানা করে দিলাম আমি। হাফ প্যান্ট ভেদ কর এক টুকরা মেঝেতেও পড়লো। মেঝেতে পড়া টুকরাটা পা দিয়ে ঠেলে দিলাম সামনের বেঞ্চে বসা লিসার দিকে। তারপর চেচিয়ে উঠলাম, "লিসা স্কার্ট ভরে পায়খানা করে দিয়েছে"। সারা ক্লাস জুড়ে হৈচৈ পড়ে গেল। সবাই লিসাকে নিয়ে হাসাহাসি করত লাগল। অবশেষে ম্যাডাম এসে বের করলেন বিশেষ কাজটার জন্য আসলে দায়ী কে।
স্কুল অফ মিউজিকে ক্লাস টু পর্যন্ত পড়েছিলাম আমি। ওয়ানে ওঠার আগেই আমার আব্বু মারা গেল। স্কুলে আর বলার মত তেমন বিশেষ কিছু ঘটেনি। থ্রীতে যেয়ে ভর্তি হলাম খুলনা জিলা স্কুলে।
ক্লাস থ্রীতে ভর্তি হলাম জিলা স্কুলে। গর্বে আর মাটিতে পা পরে না। ১৭০০ স্টুডুন্টের মধ্যে সুযোগ পেলাম মাত্র ৯২ জন। আমার রোল হলো ৯২।
আবার প্রেম এলো। এবার স্কুলের এক টিচারের মেয়ে। মেয়ে তো নয়, এক্কেরে রাজকইন্যা।
কিছুদিন পর শুনলাম সেন্ট জোসেফ স্কুলের সাথে আমাদের ফুটবল ম্যাচ হবে। আর তার চীফ গেস্ট থাকবে আমাদের বাংলা স্যার। মানে আমার হবু শ্বশুড় আব্বা। আরো জানতে পারলাম খেলা দেখতে আমার পৈরিও উপস্থিত থাকবে। একটা সুযোগ দেখলাম, ওর চোখে হিরো হওয়ার। টীমের ক্যাপ্টেনকে পুরো দশটাকার চটপটি আর মুড়িমাখা খাওয়ালাম। অনেক পটায়ে শেষে রাজি করালাম আমাকে টীমে নেওয়ার জন্য, শর্ত শুধু একটাই আমাকে প্রচুর প্রাকটিস করতে হবে যেন তার ঘুষ খাওয়ার ব্যাপারটা ধরা না পড়ে। প্র্যাকটিস শুরু করলাম। মোটামুটি আয়ত্বে আনলাম, গোল বস্তুটাকে ক্যামনে ইচ্ছামতো লাথ্থাইতে হয়।
অবশেষে সেই বিশেষ দিনটা এলো। আমরা এগারোজন যখন মাঠে নামছি, যখন আমার নাম মাইকে ঘোষনা করা হলো, তখন তাকালাম গ্যালারীতে বসা আমার এন্জেলের দিকে। দেখি, ও একমনে পটেটো ক্রাকাস চিবাচ্ছে। খেলা শুরু হলো। প্রবল উত্তেজনা। সেই প্রবল উত্তেজনার মধ্যেই আমরা ৩টা গোল খেয়ে ফেললাম। আমার ফুচুফুচু দেখি শ্যামলা মুখটা কালো করে বসে আছে। না, আর সহ্য করা যায়না। আমার ভিতরের সুপারম্যান বাইরে বেরিয়ে এলো। একবার, শুধু একবার বলটা আমার পায়ে আসুক! আসলোও। ম্যারাডোনা স্টাইলে ছুটলাম বল নিয়ে। প্রথম দিকে প্রতিপক্ষ আমার কাছ থেকে বলটা কাড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু পরে হাল ছেড়ে দিল। ছেড়ে তো দেবেই, বল পড়েছে যে সুপার হিরোর পায়ে। অবশেষে খেলার শেষ মূহুর্তে সকল বাধা বিপত্তি পার হয়ে, শেষ পর্যন্ত গোল দিতে সক্ষম হলাম আমি। গোল দেওয়ার পরে খেয়াল করলাম, আমার দলের কেউ আমাকে আনন্দে জড়ায়ে ধরলো না। হিংসা, সবি হিংসা
এই প্রেমটাও গেল।
তারপর? তারপরের ঘটনাতো আগেই লিখে ফেলেছি।
তারপর আমার ছোট থেকে বড় হওয়া, প্রেমে পড়া আর প্রচুর প্রচুর গান শোনা। দেখুন তো, কেউ কি সেই ছেলেবেলায় ফিরে যাচ্ছেন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


