কয়েকদিন আগে "ভারতীয় আগ্রাসন কোন জুজু নয় বাস্তব সত্য" নামের একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। সেখানে অনেক ধরণের মন্তব্য এসেছিল। তবে ব্লগার দিগন্ত কে ধন্যবাদ যে, তিনি অংশ নিয়েছেন এবং বেশি কিছু গঠনশিল মন্তব্য করেছেন। যার জন্য তাকে অনেক ধন্যবাদ। যেমন তিনি নিঃসংকোচে যে কথাগুলো বলেছেন, সেটা সচেতন এবং বন্ধুভাবাপন্ন ভারতীয়দের মনে কথা বলেই ধরে নিচ্ছি। তবে দুঃখ হলো, এধরণের শুভবুদ্ধি উদায়ক প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের পথে অন্যতম বাধা হলো ভারতীয় পররাস্ট্র নীতি। তিনি লিখেছেন
" ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভাল করতে গেলে ভারতের আগ বাড়িয়ে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত যেগুলো ভারত সরকার নেয় না। যে যে বিষয়ে ভারতের উচিত বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা করা -
১) ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপায়ণ সহ আই-টি শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ। এক্ষেত্রে ভারতীয় অনেক কোম্পানীর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ।
২) নেপাল, ভুটান, উত্তর-পূর্ব ভারত সহ বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টির জলের জলাধার তৈরী করে উদ্বৃত্ত জল গরমকালে যোগান দেওয়া। বাঁধ ও গঙ্গোত্রী হিমবাহের দৈর্ঘ্য হ্রাসের কারণে সমগ্র গাঙ্গেয় অববাহিকা এখন গরমকালে জলাভাবে ভোগে।
৩) মহাকাশ-গবেষণার তথ্য সরবরাহ করা। ভারতের স্যাটেলাইট তথ্য বাংলাদেশের পরিকল্পনার কাজে আসে। পরবর্তী চন্দ্রাভিযানে বাংলাদেশ থেকে একটা পে-লোড নেওয়া।"
গোল বাধলো, যখন তিনি বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বিরুপতার পক্ষ্যে সাফাই গাইলেন। তালিকাটা দীর্ঘ। তাই আলাদা পোস্ট দিয়ে জবাব দিচ্ছি। আর আপনার সবার অংশগ্রহনে, একটা সুন্দর আলোচনা হোক এই কামনায়, সেটা শেয়ার করলাম।
১. সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদেরকে বৈরি বলে ঘোষনা
- ভারতের সীমান্তে বেড়া দেবার অধিকার ভারতের আছে যেমন বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেবার অধিকার বাংলাদেশের আছে। এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু।
- জ্বি মানছি এটা আপনাদের আভ্যন্তরিন ব্যাপার। কিন্ত একাজটি করার পেছনে কি ভারতের পক্ষ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের ধোয়া তোলা হয়নি?
২. বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও দ্বিপাক্ষিক বানিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে অনিহা
- বাণিজ্য ঘাটতি চিনের সাথেও আছে। ভারত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যা যা কেনে তার কোনোটিও বাংলাদেশে উৎপন্ন হয় না, তাই ঘাটতি স্বাভাবিক। একই ভাবে বাংলাদেশ আমেরিকার সাথে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত, আপনি বলুন তো, আমেরিকা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চাইলে বাংলাদেশ কি কি করতে পারে?
- ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে পাট/পাটজাত দ্রব্য, কাপড়/তঈরি পোষাক, চামড়া/ চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, মাছ ধরার নৌকা/ট্রলার, যাত্রিবাহি লঞ্চ, ব্যাটারি, ফলের জুস, ইত্যাদি আমদানি করতে পারে। তাছাড়া ভারত বাংলাদেশের ২৩টি পণ্যের উপর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। ফলে আপনার উক্তিটির সত্যতা থাকলো না। আমেরিকা আগা গোড়ায় একটি আমদানি নির্ভর জাতি ( মাত্র হাতে গোনা কয়েক্টা আইটেম ছাড়া)। তাই, এখনে আমেরিকার তুলনা করা ঠিক হয়নি।
৩. সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা
- নিন্দা জানাই। আমি আশা করি বাংলাদেশ এর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবী করে আন্তর্জাতিক কোর্টে এপিল করবে। আমি (ফারাক্কা/বাঁধ সহ) বাংলাদেশকে সমর্থন করব এই ক্ষেত্রে।
- এর আগে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে বলার প্রক্রিয়া শুরুর "অপরাধে" একজন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্র করেছিলেন ভারত। তাছাড়া, স্বিপাক্ষিক ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষ্যের অবস্থানের বিরোধি হচ্ছে ভারত।
৪. মিডিয়ায় অহরহ বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাস্ট্র বলে অপপ্রচার
- মিডিয়া স্বাধীন, ভারত সরকার মিডিয়া চালায় না। বাজে ও ভাল মিডিয়া রিপোর্ট দুইই আসে। বাংলাদেশের মিডিয়াতেও একই ভাবে ভারত নিয়ে অনেক অপপ্রচার চলে।
- বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করবার সময় ভারতীয় মিডিয়া কিন্তু সরকারি সুত্রের উদ্ধৃতিই দিয়ে থাকে! সেক্ষেত্রে প্রমানিত হচ্ছে যে ভারতের মি ডিয়া, যাচাই না করেই, সরকারের কথাকে বেদবাক্য জ্ঞান করে বাংলাদেশ বিরোধি অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে।
৫. বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসিদের রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান
- কতজন আছে? রেফারেন্স দিন - বিশেষত "রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা"-র। বাংলাদেশের সাথে ভারতের কোনো বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। একই ভাবে বাংলাদেশেও অনেক ভারতীয় সন্ত্রাসী আছে।
- রাস্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই, বাংলাদেশ থেকে হত্যা, ধর্ষণ চাঁদাবাজি, ইত্যাদি অপরাধে অপরাধিরা, কি করে ভারতে গিয়ে ব্যাবসা পরিচালনা করতে পারে? কি করেই বা রেশন কার্ড মায় পাসপোর্ট পর্যন্ত পেয়ে থাকে? বিগত তত্ত্ববধায়ক সরকারের আমলে, ভারত বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসিকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ভেতর অনুপ চেটিয়া আছেন, তবে জেলে। এবং তার সাথে বাংলাদেশি সন্ত্রাসিদের তুলনা চলে না কোন মতেই।
৬. পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদি শান্তিবাহিনীকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা
- একই অভিযোগ ভারতেরও আছে - উলফা সম্পর্কে। চট্টগ্রামের দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা এটাই প্রমাণ করে যে সরকারীভাবে তাদের সাহায্য দেওয়া হত।
- অনেক বলার পর, ভারত আলফার ঘাটি সন্দেহে যে স্থানগুলি চিহ্নিত করেছিল, সেটির মধ্যে, ঢাকার শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির নাম ছিল। যেখানে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারিদের আবাস্থাল। ঘনবসতিপুর্ণ একটি জায়গায় এমন প্রকাশ্যে একটি গোপন দলের ঘাটি থাকার দাবি কি হাস্যকর নয়? দশ ট্রাক অস্রের ব্যাপারটায় কেউ দাবি করেনি যে, বাংলাদেশ সরকার সেগুলি আমদানি করেছিল। বরং সেগুলি পাচার করার রোধ করার মাধ্যমেই প্রমান হয় যে বাংলাদেশ কোন বিচ্ছিন্নতাবাদিদের আশ্রইয় প্রশ্রয় দেয় না।
৭. বাংলাদেশি পণ্য ও টি ভি চ্যানেল্গুলিকে ভারতে প্রবেশে বাধা
- পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের আর বাংলাদেশের বাণিজ্য মুক্ত নয়, শুল্ক লাগে। টিভি চ্যানেল নিয়ে সরকারি কোনো বাধানিষধ নেই। বর্তমান ডিটিএইচ ব্যবস্থায় সবাই ইচ্ছা করলেই বাংলাদেশী চ্যানেল দেখতে পারে। কেবল অপারেটরদের কোনো সরকারী নির্দেশ দেওয়া নেই চ্যানেল প্রচারের বিরুদ্ধে যেমনটা আছে পাকিস্তানী চ্যানেল প্রচারের বিরুদ্ধে।
- আমরা যদি ভারতীয় চ্যানেলগুলিকে উদারভাবে আমাদের দেশে প্রবেশাধিকার দিতে পারি, তাহলে কোন কারণে ভারত সেটা দিতে পারছে না?
৮. সিডর পরবর্তিতে চাল নিয়ে চালিয়াতি
- সরকারের কাছে চাল ছিল না, তাই চাল দিতে পারে নি। প্রতিশ্রুতিভঙ্গ নিশ্চয় অন্যায় কিন্তু ভেবে দেখুন মালয়েশিয়া কদিন আগে প্রতিশ্রুতিভঙ্গ করে শ্রমিকদের ফেরত পাঠাল। সে নিয়ে আপনি তো মালয়েশিয়ান আগ্রাসনের কথা লিখলেন না। বাংলাদেশের ভারতীয় চালের দরকার কেন? বলেই তো দিচ্ছেন ভারত বৈরী রাষ্ট্র।
- অনেক জল ঘোলা করার পর, প্রণব বাবুর প্রতিশ্রতিরও অনেক উচ্চ মুল্যে বাংলাদেশ চাল কিনেছিল। কিন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে সৃস্টি করা ভারতীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়, সীমান্তে শত শত চালবাহি ট্রাক, দিনের পর দিন সীমান্তে বসে ছিল।
৯. সীমান্তে শত শত কারখানা বসিয়ে ফেন্সিডিল উৎপাদন এবং বাংলাদেশে চোরাচালান করে দেয়া
- ফেন্সিডিল যতটা বাংলাদেশে সমস্যা ততটাই ভারতেও।
- কাটাতারের বেড়া এর উপর বি এস এফের কঠোর নজরদারির ভেতরেও কি করে শুধু ফেন্সিডিল অনায়াসে বাংলাদেশে আসে, সেটা চিন্তা করবার অনুরোধ করছিল।
১০. মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসি বাংলাদেশিদের নামে অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার থেকে বাংলাদেশকে বিতারণের চেস্টা।
- রেফারেন্স?
- প্রায়শই দেখা যায়, আরব দেশের পত্র পত্রিকায় বাংলাদেশ বিরোধি রিপোর্ট। আর সে সংবাদ পত্রের অনেক সাংবাদিকই কিন্তু ভারতীয়। এব্যাপারে এই ব্লগেও বোধ করি মাস খানেক আগে একটি পোস্ট এসেছিল। কেউ জানলে দয়া করে লিংকটা দেবেন।
যে বিষয় গুলি তুলে ধরা হলো, সে সবের সাথেই কিন্তু বাংলাদেশের মরাবাচা জড়িত। অথচ আমাদের রাজনীতিবিদরা এই বিষয়গুলিকে শুধু রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়েছেন। আন্তরিকভাবে কেউই সেটা সুরাহা করার উদ্যোগ নেননি। নিলেও সেখানে ভারতের সদ্বিচ্ছার অভাব ছিল। তাই আমাদের উচিত হবে, এই সব বিষয়ে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতীয়দেরও দৃস্টি আকর্ষন করা। যাতে দুই দেশের জনগনের ভেতর যে সৌহার্দ্যপুর্ণ সম্পর্ক আছে, সেটা যেন রাস্ট্রিয় নীতিতে প্রতিফলিত হয়। ধন্যবাদ সবাইকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

