আমি ব্যাক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে সবাই বাংলাদেশি। সংবিধানে একজন নাগরিকের যে সব অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে, তার প্রত্যেকটি পাবার পুর্ণ অধিকার রাখেন একজন বাংলাদেশি। অভিযোগ রয়েছে যে, ধর্মীয় কারণে যোগ্যতা সত্ত্বেও অনেকে তাদের প্রাপ্য মর্যাদা বা নাগরিক অধিকার পাচ্ছেন না। তাছাড়া অন্যায় অত্যচারের শিকার হচ্ছেন তারা। এই অভিযোগকে হাল্কাভাবে নেয়া উচিত নয়।
আমাদের দেশে আসলে সংখ্যালঘু বলতে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুই বোঝানো হয়। ঐতিহাসিক ভাবেই বাংলার এই অংশটি একটি অসাম্প্রদায়িক মনবৃত্তির অধিকারি। তাই অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারি এই বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে এধরণে অভিযোগ কেন উঠে, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
অনেকেই শহিদ জিয়া কর্তৃক সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজনকেই এই বৈষম্যতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এই সংযোজনের ফলে, অনেকে অস্বস্তি বোধ করছেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন, এটা অবাস্তব নয়। কিন্তু সংবিধানে যাই থাকুক না কেন, তাই বলে আপামর বাংলাদেশিদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় কিন্তু কোন পরিবর্তন আসেনি। এমন কি এরশাদ যখন রাস্ট্র ধর্ম ইসলাম বলে ঘোষনা দেন, তখনও মার মার কাট কাট করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর কেউ ঝাপিয়ে পড়েছে, এমনও তো নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সংবিধানে বিস্মিল্লাহ বা রাস্ট্র ধর্মে ইসলামের সংযোজনের সাথে "ধর্মীয় সংখ্যলঘু নিপীড়নের" কোন সম্পর্ক নেই।
তাহলে নির্যাতন নিপীড়িনের যে অভিযোগ রয়েছে, সেটা কি অসত্য? যে ব্যাপক অর্থে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার নির্যাতন বৈষম্য আর নিপীড়নের অভিযোগ আসে, অত ব্যাপক মাত্রায় না হলেও, গ্রামাঞ্চলে এধরণের ঘটনা ঘটে থাকে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর ভয়াবহ নির্যাতনের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আসে, ২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই। কিন্তু ধর্মীয় চেতনা নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের কারণেই এই নিন্দনীয় কাজটি করা হয়েছিল। যার শিকার শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছিলেন না, বরং আওয়ামি লিগকে ভোট দেবার "অপরাধে" এই ঘৃণ্য অপরাধের বলি হয়েছেন আওয়ামী সমর্থক মাত্রেই।
তাহলে বহিঃ বিশ্বে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে গুরুতর প্রচারণা চলছে তার উৎস কোথায়? অনেকে এর স্বপক্ষ্যে অনেকে জনসংখ্যা ভিত্তিক একটি পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করেন। যেখানে দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতা পুর্ব বাংলাদেশে যত সংখ্যালঘু মানুষদের অস্তিত্ব ছিল, স্বাধীনতার পর সেই সংখ্যাটা কমে আসছে।
"খেলাফত" হারানোয় অভিমানি মুসলমানরা যখন আধুনিক শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন হিন্দুরা শিক্ষাকে বরণ করে নিয়েছিলেন। আমি বৃটিশ রাজত্ব্যের শুরুর কথা বলছি। এর দীর্ঘ দিন পর মুসলমানরা স্বম্বিত ফিরে পেলেও, ততদিনে এই দুই ধর্মের মানুষদের ভেতর যোজন যোজন পার্থক্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে শ্রেণী বৈষম্যের একটা সুযোগ করে দিয়েছিল মুসলমানরাই। এই সুত্র ধরে বৃটিশদের সাথে সহযোগিতা করে, উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের অনেকেই জমিদারিত্ব লাভ করেছিলেন। এবং চিরচারিত শাসক গোষ্ঠি অত্যাচারের ধারায় প্রজাদের উপর নিপীড়ন চালানো শুরু করে। তৎকালিন পুর্ব বঙ্গ মুসলমান প্রজা অধ্যুসিত হবার কারণে, শাসকের শোষক চরিত্রের চেয়ে তার ধর্মিয় পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে উঠে। ফলে সাধারণ প্রজাদের ভেতর এক ধরণের হিন্দু বিদ্বেষদের জন্ম হয়। তাছাড়া ব্রিটিশ ভারতের রাজধানি হবার সুবাদে, এবং পঃ বঙ্গ শিক্ষা দীক্ষায় অনেক অগ্রগ্রামি হবার ফলে, যে উন্নয়নের সুফল ভোগ করেছে, তার ছিটে ফোটাও পুর্ব বঙ্গের গায়ে লাগেনি। অথচ তৎকালিন পুর্ব বঙ্গ ছিল কৃষিজাত পণ্যের অন্যতম উৎস।
শিক্ষায় অনগ্রসর পুর্ব বঙ্গের মুসলমানদের প্রতি, ধনি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালি এবং শিক্ষিত পঃ বঙ্গের মানুষদের একধরনের উন্নাসিকতার তৈরি হয়েছিল। ফলে উল্লেখযোগ্য লেখকদের মধ্যে এক মাত্র মাণিক বন্দোপাধায়কেই এপারের লোকজনের প্রতি খানিকটা সহানুভুতিশিল দেখা গেছে।
বঙ্কিমের ঘৃণাবোধক শব্দাবলি, যেমন "নেড়ে", "যবন", "ম্লেচ্ছ" "বিদেশি" ইত্যদি, শ্রদ্ধেয় শরৎচন্দ্রের বাঙ্গালি মুসলামানকে, শুধু মুসলমান বলে আখ্যা, কবি গুরুর বঙ্গভঙ্গ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা এসব কারণেও হিন্দুদের প্রতি মুসলমানদের মনে এক ধরণের বিতৃষ্ণা ও অবিশ্বাসের জন্ম নেয়। যেহেতু সে সময় বাঙ্গালি মুসলমানদের ভাব প্রকাশের জায়গা ছিল খুবই অল্প, তাই পুর্ব বঙ্গের হিন্দুদের প্রতি অযৌক্তিকভাবেই, সেই বিরাগের প্রতিফলন ঘটে।
তবে, সেই বিরাগ প্রকাশের ধরণটা কোনদিনই এতটা উগ্র হয়ে উঠেনি, যেখানে হিন্দু নিধনই একমাত্র ধ্যান জ্ঞান ছিল। এছাড়া ক্রমেই শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে সেই স্বল্প মাত্রার বিরাগটিও ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছিল। কিন্তু পুর্ব বঙ্গের হিন্দুরা কোনমতেই আস্বস্ত হতে পারেননি। তাই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হিন্দু জনগোষ্ঠির একটি বিশাল অংশ ভারতে চলে গেলেও, আর ফেরৎ আসেননি। তাছাড়া ভারত ভাগের সময় এবং ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময়ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়াতে, পুর্ব বঙ্গে হিন্দুদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছিল।
বর্তমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইন শৃংখলার বেহাল ইত্যাদির কারণে প্রতিদিনই খুন, জখম, হত্যা লুটপাট, জমি দখল ইত্যাদি অপরাধ ঘটে থাকে। যারা এর শিকার, তারা সমাজের সব ধর্মেরই নিম্নবিত্ত, অসহায় মানুষ। অথচ বাংলাদেশ বিরোধি একটা গোষ্ঠি, আমাদের এই দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে শুধু মাত্র একে সংখ্যালঘুর উপর নির্যাতনবলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আর পুর্ব বঙ্গ তথা বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রতি চির বৈরি কোলকাতার বুদ্ধিজীবি মহলের সুতায় নৃত্য করা একদল মুসলমান নামধারি বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবি, মুসলমান বিরোধিতায় সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক দেশ বলে প্রমান করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এর সর্বশেষ সংযোজন, কুখ্যাত বাংলাদেশ বিরোধি মহলের অন্যতম পান্ডা আব্দুল গাফফার চৌধুরির সাম্প্রতিক মন্তব্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিনস্টকারি এ কুচক্রি মহলের বিরুদ্ধে যখন প্রতিরোধ করা প্র্যোজন তখন, এ ধরণের অসুস্থ সাম্প্রদায়িক চেতনাধারি বুদ্ধিজীবিকে স্বাধীনতা পদক দিয়ে বরং আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকেই অসম্মান করেছি।
আগেই বলেছি, এ দেশ শুধু মাত্র মুসলমানদের নয়, বরং ধর্ম বর্ণ ভাষা নির্বিশেষ সব বাংলাদেশির গৌরবের আবাস স্থল। আর এই গৌরবে কলংক আনায়নকারি অত্যাচারি, ধর্ষক, ভুমিদস্যু এবং দেশদ্রোহি বুদ্ধিজীবিদের চরম শাস্তি দিয়ে, শান্তিকামি মানুষদের ভেতর স্বস্তি ফিরিহ্যে আনতে হবে। সেই সাথে ব্যাপক অনুসন্ধান করে, সংখ্যালঘু বৈষম্যের কারণ উৎঘাটন করে, তাদের ভেতর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। যেন এ দেশের উন্নতির পথে তারাও হতে পারেন, সমান অংশিদার। এবং তাদের ব্যাথা বেদনাকে পুজি করে যেন কোন অপশক্তি আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মাথা তুলে না দাড়াতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

