দুর্বল অর্থনীতির দেহের যা কিছু সামান্য লোহিত কণিকার প্রবাহ, তার একটি বিশাল অংশের জোগান দেয় এই গার্মেন্টস সেক্টর।
এক সময় ছিল, যখন দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত রুগ্ন শীর্ণ দেহ দেখে, নিতান্তই দয়াবশত হয়ে (মুনাফার অংকটিও ছিল উল্লেখযোগ্য) ধনী দেশগুলির কোটায় আওতায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর ক্রমাগত উন্নতিতে, সংসারের "বোঝা" বলে কথিত নারীরা আত্মনির্ভরতার একটা নিরাপদ আশ্রয় খুজে পেয়েছিলেন।
এখন সেদিন আর নেই। সেই কোটা উঠে যাবার ফলে, এই সেক্টরে বাংলাদেশকে তীব্র প্রতিদন্দিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর উপরে বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এই সেক্টরে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দির তালিকাটি বিশাল। কে নেই এ তালিকায়? ভারত তো বটেই, পাকিস্তান থেকে শুরু করে শ্রীলংকা, মায় চীন পর্যন্ত এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এর উপর আবার রাজনৈতিক দলগুলির কারণে আজ হরতাল, কাল বন্দর বন্ধ, তো পরশু ধর্মঘট ইত্যাদি কারণে উৎপাদনে মারাত্মক বাঁধার সৃস্টি হচ্ছে। সাথে চাঁদা নামক সন্ত্রাসিদের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার কৌশল হিসেবে নগদ নারায়ণ বিতরণের এক অযথা কিন্তু অবশ্যম্ভাবি অভিশাপ।

এর পরেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের অদম্য ইচ্ছা আর অকৃত্রিম কর্মশক্তির কারণে সব প্রতিকুলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছিল এই সেক্টরটি। কিন্ত সে সব অর্জনকে তুচ্ছ করে দিতে এবং এই সব অসহায় নারীদের আবারো দাসি হিসেবে উচ্চ বা মধ্যবিত্তের ঘরে দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ করার মানসে, এই গার্মেন্টস সেক্টরকে ধবংস করার ষড়যন্ত্র চলছে। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই, নেপথ্যের সাপুড়েরা তাদের পোষা সর্পদের রামদা আর পেট্রোল হাতে লেলিয়ে দিয়েছে। যার লেলিহান বিষাক্ত শিখায়, একের পর এক গার্মেন্টস কারখান পুড়ে ছাই হচ্ছে, নতুবা মুখ থুবড়ে পড়ছে।
এই নৈরাজ্য সৃস্টির নেপথ্যের প্রধান একটি কারণ হচ্ছে, শ্রমিকের মৃত্যুর গুজব। হঠাৎ উদয় হওয়া একদল জঙ্গি সন্ত্রাসি এই গুজব ছড়িয়ে বিভিন্ন গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে আসার জন্য উত্তেজিত করে। এতে কাজ না হলে সন্ত্রাসের আতংক ছড়িয়ে তাদেরকে গার্মেন্টস ত্যাগে বাধ্য করে। এর পর চলে অবাধে লুটপাট ও ধবংস লীলা। বাধ্য হয়ে মালিককে কয়েকদিনের জন্য কারখানা বন্ধ রাখতে হয়।
২০০৬ সালে শত শত গার্মেন্টস কারখানা ধবংসের নেপথ্যে দেখা গেছে মাথায় হেলমেট পরিহিত হোন্ডা আরোহিদের। এর মাত্র কয়েকদিন পর বিবিসিতে এক সাক্ষাতকারে, কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা মঞ্জুরুল আহসান খানকে, বেশ গর্ব করেই এর "কৃতিত্ব" দাবি করতে দেখা গিয়েছে। অথচ এই রকম কয়েক লক্ষ খানকে বিক্রি করলেও, একটি কারখানার সাথে সংক্লিষ্ট শ্রমিকদের এক মাসের বেতন জোগাড় করা সম্ভব হবে না। **ঐ একই ঘটনায় একটি বিদেশি এন জি ওর সংক্লিষ্টতার প্রমান পেলেও, অজ্ঞাত কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যাবস্থা নেয়া হয়নি। শুধুমাত্র একজন সাংবাদিককে এই সন্ত্রাসকে উস্কে দেবার জন্য কয়েকদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নেপথ্যের কারিগড়দের লম্বা হাতের কারণে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল পুলিশ। আর সে সাংবাদিক ব্যাটা মানবাধিকার আর নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে এখন ধরাছোয়ার বাইরে চলে গিয়েছে। কিন্তু যা ক্ষতি হবার তা তো হয়েই গিয়েছিল। এর পর যদিও আবার ঘুরে দাড়ানোর চেস্টা চলছে, ঠিক তখনই নতুন করে সন্ত্রাসি কার্যক্রম শুরু হয়ে গিয়েছে।
গারমেন্টস কারখানার মালিকরা সবাই যে ধোয়া তুলসি পাতা নন, সেটি নিশ্চিত। মুনাফার কালো লোভি হাতের নির্যাতনে অতীতে বহু শ্রমিক পিষ্ঠ হয়েছিলেন। অমানুষিক পরিশ্রম করিয়ে পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক না দেয়া, অবাস্তব বেতন কাঠামো, পারিশ্রমিক দানে গড়িমসি, অগ্নি নিরাপত্তার অনুপস্থিতি ইত্যাদি ছিল খুব সাধারণ ঘটনা। তবে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের ফলে এবং বহু শ্রমিকের প্রাণদানের কারনে সেসব অনেকটাই কমে এসেছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যেদিন থেকে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলি যুক্ত হয়েছে, সেদিন থেকে শ্রমিকদের অধিকারের চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথেই বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা গিয়েছে। আর সেই সব রাজনৈতিক দলগুলির পেছনে অসাধু মালিকপক্ষ সু্যোগ বুঝে কিছু খরচ করলেই, অদৃশ্য হাতের ইশারায় নিরব হয়ে যায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন।
শ্রমিকদের নিজেদের স্বার্থেই এই সব রাজনৈতিক সংক্লিষ্টতা পরিহার করতে হবে। সেই সাথে তাদের স্বার্থের পিঠে ছুড়িকাঘাত করা নেতাদের নেতৃত্ব মানতে অস্বীকৃতি জানাতে হবে। আর শ্রেফ গুজবে কান না দিয়ে, তাদের জীবিকাস্থলকে রাখতে হবে নৈরাজ্য আর সন্ত্রাসমুক্ত।
যেহেতু আমাদের মোট আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই গার্মেন্টস সেক্টর, তাই এই সেক্টরের সাথে সংক্লিষ্ট দুই পক্ষ্যেরই স্বার্থে রক্ষায়, সরকারের সব মেধা ও মননশীলতা বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
তবে এর আগে, এই দেশঘাতি এই সর্প আর সাপুড়েদের ( সে বিদেশি এন জি ওই হোক, কিংবা সাংবাদিক অথবা লাল ঝান্ডার ধারক বাহক) বিষদাঁত এমনভাবে তুলে ফেলতে হবে, যাতে অদুর ভবিষ্যতে এদের বিষের জ্বালায় আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা মালিক কোন পক্ষ্যকেই নীল না হয়ে যেতে হয়।
পাদটিকাঃ সাম্প্রতিক আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া সন্ত্রাস উস্কে দেবার পেছনে, কম্যুনিস্ট নেতা মন্টু ঘোষের নাম শোনা গেছে। এর আগেও এধরণের ধবংসাত্মক কাজে তার উস্কানি ছিল বলে কথিত আছে। কোন অজানা কারণে এই চিহ্নিত সন্ত্রাসের মদদদাতা ধরা ছোয়ার বাইরে আছে, সেটি একটা বিশাল প্রশ্ন। তাছাড়া গার্মেন্টসের ৯০ ভাগেরও বেশি শ্রমিক নারী হলেও, শ্রমিক আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসে লিপ্ত সবাই পুরুষ। এই ধাঁধার উত্তরের মধ্যেই অনেক রহস্যের উত্তর খুজে পাওয়া সম্ভব।
** তথ্যসুত্রঃ আজকের দৈনিক ইত্তেফাক।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০০৯ রাত ৮:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


