খেয়াল করা হয়ে উঠেনি। লক্ষ্য করতেই দেখলাম, ব্লগিয় বয়স এক বছর অতিক্রান্ত হয়ে আরো কদিন পার হয়ে গিয়েছে। একান্ত প্রিয় একজনের কখনও " হয় আমি নইলে ব্লগ" টাইপের হুমকি, অথবা "এই ব্লগ আমার সতিন" টাইপের ঈর্ষামিশ্রিত অনেক অম্ল মধুর বাক্যালাপের পরেও, ব্লগের মায়া ছাড়তে পারিনি।
এক বছর খুব অল্প সময় না হলেও, কি করে যে পার হয়ে গেলো টের পাইনি। এর মাঝে সমমনা বিরুদ্ধামনা সবাইকেই পেয়েছি। নিজের একান্ত না বলা কথাগুলি নির্দ্বিধায় বলেছি। মোদ্দা কথা, বিশাল পরিসরে ঘরের একান্ত কোনেই যেন একটা পরিবারকে পেয়ে গেছি। যাদের সাথে হাসি কান্না দুঃখ বেদনা সবই অনুভব করেছি। এ জন্যই এমন নেশার মত ব্লগে পড়ে থাকা।
এক বছর উপলক্ষ্যে লিখতে গিয়ে দেখলাম ঈদ সমাগত। তাই ভাবলাম, এক ঢিলে দুই পাখিই মারা যাক। তাই আপনাদের উদ্দেশ্যে একটু অন্যরকম উপস্থাপনা। বাংলা ছবির অন্যরকম নায়কেরা। তবে এ জন্য বাংলা সিনেমার পোকা, অনেক সিনিয়ার এক ভাইয়ের সাহায্য নিতে হয়েছে। কৃতজ্ঞতা তার প্রতি।
আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, যে ছবিতে শক্ত পোক্ত একজন প্রতিনায়ক থাকে, সেই ছবিটা দর্শক মোটামুটি ভালই খায়। এই ফর্মুলা ব্যাবহার করার ফলেই, হালের ডিপজল যেমন তারকা খ্যাতি লাভ করেছেন, তেমনি তার নামেই ছবি মোটামুটি সুপারহিট। যদিও সেগুলি ঠিক উন্নত রুচির বলা যায় না।
নায়ক নায়িকার প্রেম, এবং নায়কের বীরত্বে একটি ছবিতে ঢাকা পড়ে যায় প্রতিনায়কের অভিনয়। অথচ তিনিও অন্যান্যদের মত সমান কস্ট করে থাকেন। তাই উনাদের সম্মান করে অন্যরকম নায়ক সম্বোধনে আজকের এই লেখা।
বাংলা সিনেমার এই অন্যরকম নায়কদের দুই ধরণের ক্যাটাগড়িতে ভাগ করা হয়েছে। খাটি খল নায়ক এবং অভিনেতা। খাটিরা শুধু খল নায়কের চরিত্রেই অভিনয় করতেন। আর অভিনেতারা শুধুমাত্র খল নায়ক নয়, সাধারণ চরিত্রেও অভিনয় করতেন।

১। গোলাম মোস্তফা-- জি, ঠিক ধরেছেন। উচ্চবিত্ত স্নেহশীল বাবার চরিত্রে কি সিনেমা, কি মঞ্চ কি টিভি পর্দা, সবখানে যার বিচরণ ছিল অবাধ এবং নিঃসংকোচ, অভিনয় যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল, এই মানুষটিকে নির্দ্বিধায় আমাদের অভিনয় জগতের সবচেয়ে শক্তিশালি বলে অভিহিত করা যায়। ইনিও এক সময় কখনও ঈর্ষাকাতর প্রেমিক কিংবা আত্মগরিমায় অন্ধ বিত্তবান পিতা হিসেবে খল নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন।
২। এম এ সামাদ --- না, ইনি প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক এম এ সামাদ নন। সিংহভাগ ছবিতেই তিনি খল নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন। তবে জন্মসুত্রে পশ্চিম বঙ্গিয় বলে, বাংলাদেশের গ্রাম্য ভাষায় সংলাপ বলার সময় ঠিক বলতে পারতেন না। " করসোস" কে কচ্চস, "বলসস" কে বলচোচ ইত্যাদি এ রকম বাচনভঙ্গি ছিল তার। তবে অভিনয়ে খুঁত ছিল না। উল্লেখযোগ্য ছবি, নবাব সিরাজুদ্দৌলা ( জগত শেঠের ভুমিকায়), রংবাজ ( মহাজনের ভুমিকায়)।
৩। তুলিপ ঃ উচ্চবিত্ত লম্পটের ভুমিকায় তিনি পারদর্শি ছিলেন। সুস্থ পরিছন্ন সামাজিক ছবিগুলিতে খলনায়ক হিসেবে তিনি অনেকদিন রুপালি পর্দায় ছিলেন। পরে সম্ভবত হুমায়ুন আহমেদের একটি ধারাবাহিকে প্বার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
৪। মেহফুজ -- ইনিও নাটকে অভিনয় করেছেন, কিন্ত তার আগ থেকেই তিনি সিনেমার খল নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন। তুলিপের সমসাময়িক হওয়াতে, এদের দুজনের চরিত্রের কোন পার্থক্য ছিল না।

৫। রাজু আহমেদ--- রুপালি পর্দায় একবারে খাঁটি ভিলেন বলতে যায়, ইনি ছিলেন একদম ঠিক তাই। তার চেহারার মধ্যেই ভিলেনি এমনই ভাব ছিল, যে বাস্তবেও নাকি সবাই তাকে মানে মানে এড়িয়েই চলতো। তার সংলাপ প্রক্ষেপন, তাকানোর ভঙ্গি, হাসি, সব কিছুই এতই নিখুত খল্ভাব ছিল, যে অনায়াসেই তাকে বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ খল নায়কের খেতাব দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালিন সময়ে "জল্লাদের দরবার" নামের কথিকা তার কারণেই আরো বেশি আকর্ষনীয় করে তুলেছিল। স্বাধীনতার আগের কটা বছর, আর পরের কয়েকটা বছর, তিনি একচেটিয়া অভিনয় করে গেছেন। প্রতিটি ছবিতেই তার সমান মুন্সিয়ানা ছিল বলে, আলাদা করে শুধুমাত্র "ওরা এগার জন" ছবিটির নাম বলতে পারছি। স্বাধীনতার মাত্র বছর দুই বছরের মধ্যেই, নারীঘটিত ব্যাপারে তৎকালিন ক্ষমতাসীন এক রাজপুত্রের সাথে দ্বন্দের কারণে রাজু আহমেদ খুন হন। উপরের ছবিতে ডান দিকের নীচের ছবিটিই রাজু আহমেদের।

৬। খলিলুল্লাহ খান -- ইনি অভিনয় জগতের আরেকজন দিকপাল, যাকে আমরা খলিল নামের চিনি। উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার, উচ্চবিত্ত পিতা এধরণের পার্শ্বচরিত্রেই তাকে দেখে আমরা অভ্যস্থ। কিন্ত নেই নেই করেও, অনেক ছবিতে তিনি খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছি। উল্লেখযোগ্য ছবি "সংগ্রাম", "মিন্টু আমার নাম।"

৭। এ টি এম শামসুজ্জামান -- ইনি নিজ নামেই খ্যাত। আপনারা কি জানেন উনি কিন্ত অনেক আগে থেকেই খল পার্শ্ব অভিনেতার ভুমিকায় অভিনয় করতেন? মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিগুলি যেমন ওরা ১১ জন, সংগ্রাম ইত্যাদি ছবিতে তিনি রম্য খল অভিনেতার ভুমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তবে আমজাদ হোসেন পরিচালিত "নয়ন মনি" ছবিতে মোড়লের অভিনয়, তাকে রীতিমত বিখ্যাত করে তোলে। এর পর থেকে গ্রামভিত্তিক কুটিল মোড়লের ভুমিকায় তার সমকক্ষ্ আর কোন অভিনেতা পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত অতন্ত দক্ষতার সাথে তিনি অভিনয় করে যাচ্ছেন। কায়মন বাক্যে প্রার্থনা করি, তিনি আমাদের মাঝে আরো অনেকদিন থাকুন।
৮। কাজি এহসান -- পরিশালিত ভাষায় খলনায়কের সংলাপ বলায় তার মত আর কেউকে দেখা যায়নি। নাট্যাভিনেতা প্রবালের মধ্যে তার কিছুটা ছাপ আছে। বিমানের কর্মকর্তা কাজি এহসান শ্রেফ শখের বশেই অভিনয় করতেন বলে খুব বেশি ছবি করা হয়নি তার। সাধারনত উচ্চবিত্তের বখে যাওয়া সন্তানের ভুমিকাতেই তাকে বেশি দেখা যেতো।
৯। রাজ --- ইনার দেহের মতই গলাটা ছিল বেশ রাশভারি। ক্রুর হাসিই ছিল তার একটি বিশেষ বৈশিষ্য। ওরা ১১ জন এবং দয়াল ভান্ডার তার উল্লেখযোগ্য ছবি। রাজু আহমেদের ছবির ঠিক উপরেরটাই রাজের ছবি।
১০। জুবের আলম --- নারীলোলুপ চরিত্রেই তাকে সব সময় দেখা যেত। সাধারণত তিনি সামাজিক ছবিতেই অভিনয় করতেন।
১১। আব্দুল মতিন -- ঘন কৃষকায় কিন্তু ছিমছাম দেহেরও কেউ ভিলেন হতে পারে, এধারণাটি তিনিই প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন। নাট্টকর্মী হিসেবে অভিনয় জীবন শুরু করলেও, কালের আবর্তে তাকে খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করে যেতে হয়েছে। যারা নবাব সিরাজুদ্দৌলা ছবিটা দেখেছেন, তারা আব্দুল মতিনকে, সিরাজ হন্তারক মোহাম্মদি বেগের ভুমিকায় দেখে থাকবেন। রীতিমত ভয়ংকর এবং বাস্তব মনে হয়েছে। পরবর্তিতে তিনি ফোক ফ্যান্টাসি চলচিত্রে রাক্ষস খোক্কসের ভুমিকায় অভিনয় করেছেন। নাট্ট ও চলচিত্র অভিনেতা আব্দুর রাতিনের পিতা তিনি।
১২। আদিল --- ৮০ এর দশকে ফোক ফ্যান্টাসি ছবির হিড়িক শুরু হওয়ার পর, নায়ক হিসেবে যেমন মিস্টার ঢাকা ওয়াসিমের উত্থান হয়, তেমনি তার প্রতিপক্ষ হয়ে খল নায়কের আসন পাকা করে নেন আদিল। তার উদিয়মান ক্যারিয়ারে ইতি ঘটে যখন, বধু হত্যার দায়ে তার নামে মামলা হয়। তিনি অনেকদিন পলাতক থাকায় তার অভিনয়ের ইতি ঘটে।
১৩। জসিম -- বাংলাদেশের ইতিহাসে খল নায়ক থেকে সফল নায়ক হবার রেকর্ড এক মাত্র জসিমেরই রয়েছে। রংবাজ ছবিতে প্রধান ভিলেনের ভুমিকায় অভিনয় করে তিনি রীতিমত তারকা ভিলেনে পরিণত হন। এর পর অনেকগুলি ছবিতে তিনি খল নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করেন। শুধু খল নায়কের অভিনয়ের মধ্যেই তার কর্মসীমানা সীমাবদ্ধ ছিল না। "জ্যাম্বস" নামে তার একটি ফাইটিং দল ছিল, যারা চলচিত্রে মারপিটের অংশটূকু পরিচালনা করতো। এই গ্রুপে আরো দুজন হলেন, মাহবুব গুই, এবং জাম্বু। ক্যারিয়ারের স্বর্ণসময়ের জসীম অকৎসাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
১৪। জাম্বু -- খল নায়কদের মধ্যেই তিনিই বোধ করি সবচেয়ে কম সংলাপ বলতেন। বিশাল দশাসই শরীরের কামানো মাথা, এটিই ছিল তার বৈশিষ্ট। কিছুদিন আগে, তিনিও হার্টফেল করে মারা যান।
১৫। বাবর --- খানিকটা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা ইনার ট্রেন্ড। রাস্তার বখাটে থেকে শুরু করে বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলের মেয়েদের পেছনে ছোক ছোক করা, নায়ক বাধা দেয়া মাত্রই চাকু বের করে মারা চেস্টা, এসবের মধ্যেই তার ভিলেনি অভিনয় জীবন সীমাবদ্ধ ছিল।

১৬। মিজু আহমেদ -- বিশাল বপুর অধিকারি এই সুঅভিনেতা উত্তর বঙ্গের আঞ্চলিক উচ্চারণে সংলাপ বলেই বেশি খ্যাতি পেয়েছেন। হালের আমলের ডিপজলের সাথে সমান পাল্লা দিয়েই তিনি অভিনয় করে যাচ্ছেন।
১৭। কাবিলা -- আমার কাছে তার অভিনয় বেশ ভালো মনে হয়। বিশেষ করে, নির্ভুল উচ্চারণে বরিশাল বা আদি ঢাকার ভাষায় সন্ত্রাসির অভিনয়। উল্লেখযোগ্য ছবি "ইতিহাস" "ঢাকাইয়া পোলা বরিশাইলা মাইয়া"।
১৮। মিশা সওদাগর -- ইনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করলেও, অভিনয়কে ভালোবেসে চলচিত্রে দাপটের সাথে খল নায়কের অভিনয় করে যাচ্ছেন। যদিও অভিনয়ের চেয়ে চিৎকার চেচামেচিতেই তিনি বেশি অভ্যস্থ !

১৯। রাজিব -- "খোকন সোনা" ছবিতে নায়িকা জুলিয়ার বিপরীতে নায়ক হিসেবে তার প্রথম চলচিত্রে আগমন হলেও, ছবিটি ফ্লপ হওয়ার তাকে খলনায়কের চরিত্রেই অভিনয় করতে হয়। খল নায়ক হিসেবে, কি গ্রাম কি শহরভিত্তিক যে কোন ছবিতেই তাকে দারুণ মানিয়ে যেত। তাই খুব দ্রুতই তিনি অভিনয় জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত তিনি এফ ডি সির এম ডি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন।

২০। ডিপজল -- ইনার সমন্ধে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে চলচিত্রে খিস্তি খেউরের ব্যাপারটিতে যে একটা অলিখিত সেন্সর ছিল, ইনার আগমনে সেই ব্যাপারটা চুকেবুকে গিয়েছিল। ফলে, চরম অশ্লিল সংলাপে ভরপুর ছবি মানেই ডিপজলের অভিনিত। অনেকে বলেন, বাস্তবে তিনি যা করে থাকেন, সেটাই রুপালি পর্দায় নিখুতভাবে অভিনয় করে দেখান ডিপজল। শুধু অভিনয় নয়, অনেক ছবিতে তিনি নাকি সংলাপ লেখা থেকে শুরু করে পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করে থাকেন। সম্ভবত অমি বনি কথাচিত্র নামের প্রযোজনা সংস্থাটি তারই মালিকানাধীন। বি এন পির ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে মিরপুর এলাকায় সন্ত্রাসি কার্যক্রমের জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। আমিন বাজারের গাংচিল নামের যে সন্ত্রাসি দল, তারও নাকি পৃষ্ঠপোষক ডিপজল। কয়েকবার র্যাবের হাতে ধরাও পড়েছিলেন তিনি। বর্তমানে কিছুদিন কারাভোগের পর এখন জামিনে মুক্ত। বস্তুত বাংলা ছবির জগতটিকে অশ্লিলতা দিয়ে ধবংস করার পরিকল্পনায় তারও অবদান ছিল বলে জানা যায়।
এই গেলো মোটামুটি বাংলা চলচিত্রের অন্যরকম নায়কদের নিয়ে কিছু কথকতা। সিনেমা গবেষক ব্লগার ফাহমিদুল হক ভাইয়ের সাথে আলাপ থাকলে হয়তো আরো কিছু তথ্য পাওয়া যেত। সবাইকে ধন্যবাদ এবং

ঈদ মোবারক

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


