![]()
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বকবি বলে যিনি সম্মানিত এবং সমাদৃত। আমাদের বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং কলাকে যিনি সারা বিশ্বব্যাপি পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন। বঙ্কিমের সময়কার সাধারনের জন্য দুর্বোধ্য লেখ্য ভাষাকে সাধারনের জন্য বোধ্য করে দেবার অগ্রদুত যিনি, তিনিই রবি ঠাকুর। একারনেই বাংলা ভাষাভাষি মানুষ চিরকাল তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
রবীন্দ্রনাথের আরো পরিচয় আছে। যেমন তিনি ছিলেন জমিদার, ব্যাবসায়ি এবং ধর্মানুরাগি একজন সব্যসাচি মানুষ।

প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে উজান আর ভাটির মানুষদের মধ্যে সব সময়েই মন মানসিকতার একটা পার্থক্য লক্ষনীয়। বাংলায় সেই পার্থক্য ধর্মীয়ভাবে আরো প্রকট হয়ে দেখা দেয় ১৭৫৭ সালে বৃটিশ বণিকদের বাংলা কুক্ষিগত করার মাধ্যমে। "যবনদের" পতনে উল্লাসিত হিন্দুরা বৃটিশদের দেয়া সব সুযোগ সুবিধার পুর্ণ সদব্যাবহার করে। আর "খেলাফত" হারানোর অদুরদর্শি অভিমানে মুসলমানেরা বৃটিশদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে। এখানে লক্ষনীয় যে পশ্চিম বাংলায় হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগুরু এবং পুর্ব বাংলায় মুসলমানেরা।
বৃটিশ শাসনে প্রথমে কোলকাতাই ছিল রাজধানি। তাই প্রাশাসনিক দফতর থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবই ছিল কোলকাতায়। আর অপেক্ষাকৃত উর্বরভুমি থাকায় পুর্ব বাংলা ছিল শস্যভান্ডার। ফলে পশ্চিম বাংলায় যেমন একদিকে হাজার হাজার শিক্ষিত মানুষ গড়ে উঠছিল, তখন পুর্ব বাংলার শিক্ষার আলো বঞ্চিত মানুষেরা শস্য উৎপাদনের নিমিত্ত বলেই গণ্য হতো। আর একারণেই সময়ের সাথে সাথে পুর্ব বাংলার বাঙ্গালিদের প্রতি পশ্চিম বাংলার বাঙ্গালিদের এক ধরণের নাক সিটকানোর অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। সাথে ছিল মুসলমান হবার অপরাধ।
পুর্ব বাংলার মুসলমানদের ঘুম যখন ভাঙ্গলো, তখন পশ্চিম বাংলার মানুষেরা শিক্ষা দীক্ষায় অনেকদুর এগিয়ে গিয়েছে। শুধু তাই না, বৃটিশ প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপুর্ণ পদেও তারা আসীন।
বিশাল এই প্রার্থক্য দুর করতে ( অনেকে বলেন, বৃটিশদের ডিভাইড এন্ড রুলের অংশ হিসেবে) ঢাকাকে রাজধানি করে ইস্ট বেঙ্গল এন্ড আসাম প্রদেশ গড়ার ঘোষনা দিয়েছিলেন তৎকালিন ভাইসরয় লর্ড কার্জন। একই সাথে পুর্ব বাংলার মানুষদের উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাও করা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কট্টরপন্থি হিন্দুরা বঙ্গমাতার কল্পিত অস্তিত্ব আবিস্কার করে "মায়ের" দ্বিখন্ডিতকরনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলে। (১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় "মায়ের" এই দ্বিখন্ডিতকরন তারা কোন যুক্তিতে মেনে নিয়েছিলেন, সেটা ইতিহাসের কাছেই প্রশ্ন হয়ে থাক)।
এই মিছিলে বঙ্কিমের মত মুসলমান বিদ্বেষি থেকে শুরু করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মত মনিষিরাও ছিলেন। আর এই বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনকে সাংস্কৃতিক রুপ দিতে রবীন্দ্রনাথ "আমার সোনার বাংলা" রচনা করেছিলেন। যা আজ আমাদের জাতীয় সঙ্গিত! তিনি একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠারও বিরোধীতা করেছিলেন। এটা কি পুর্ব বাংলার চাষাভুষাদের শিক্ষিত হয়ে যাবার আশংকায় নাকি সমসাময়িক বিশ্বভারতীতে ছাত্র ভর্তি কমে যাবার আশংকায়, সেটা ইতিহাস বিবেচনা করবে। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ্যেই স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দান করেছিলেন, যা প্রকারন্তেই ছিল উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক আন্দোলন।
তথ্য সুত্রঃ
Click This Link
সেই আন্দোলনের ফলে বঙ্গভঙ্গ রোধ হয়েছিল। ফলে পুর্ব বাংলার মানুষদের শিক্ষাদীক্ষা ব্যাবসা বাণিজ্য কিংবা প্রাশাসনিক কাজে পশ্চিম বাংলার মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হবার আগ পর্যন্ত এ অবস্থা চলেছিল।
পুর্ব বাংলা এখন স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের পুরানো প্রজন্মের শিক্ষিত মানুষদের অনেকেই কোলকাতায় লেখাপড়া শিখেছেন। মুলত আমাদের যে শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি সমাজ, তার সিংহভাগই কোলকাতাকেন্দ্রিক। তারা যে ধরণের সাংস্কৃতিক চর্চা করেন, সেটা যত না আমাদের দেশ ও মাটির কাছাকাছি, তার চেয়ে বেশি পশ্চিম বাংলার সাথে সামঞ্জস্য পুর্ণ।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনধারা নিরিখে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ধারার উত্তরণ ঘটাতে ব্যার্থ হয়ে, ইনারা রবীন্দ্রনাথকেই আকড়ে ধরেছেন। আর তাদের ওই ব্যার্থতা ঢাকতে এমন সব মিথ্যাচারের জন্ম দিচ্ছেন, যা শুনলে খোদ রবীন্দ্রনাথ নিজেও লজ্জা পেতেন। এর মধ্যে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জলন, উত্তরীয় উপহার, ঘটপুজা ইত্যাদি। সাথে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনা। ( এধরণের আচার শান্তিনিকেতনের সাধারণ আচার)।
প্রথমত ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ঘৃণার মত অবাস্তব ও অদুরদর্শি সিদ্ধান্তের কারণে এবং দ্বিতীয়ত সুযোগের অভাবে শিক্ষিত না হতে পারার জন্য বাংলাদেশের সাধারণ মানূষ এক ধরণের হীনমন্যতায় ভোগে। তাই বাধ্য হয়েই কোলকাতাকেন্দ্রিক এই সাংস্কৃতিক আচারকেই "শিক্ষিত" মানুষের আচার বলে মেনে নিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারিদের মুখ বন্ধ করার জন্য অবশ্য "সাম্প্রদায়িক চেতনাধারি" কিংবা "বাঙ্গালি বিরোধী" নামের অপবাদটি তৈরি করাই আছে। এই ভয়েও অনেকে এই ধরণের বাংলাদেশের মুল সংস্কৃতির পরিপন্থিরা আচারের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলেন না।
অথচ রবীন্দ্রনাথদের জীবন ও আদর্শ যারা পড়েছেন, তারা কোনদিনও অবশ্য রবীন্দ্রনাথকে অসাম্প্রদায়িক কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিভু বলবেন না। রবীন্দ্রনাথ নিজেও কোনদিন এই দাবি করেননি।
যুগের সাথে সময়ের সাথে সবকিছু বদলায়। আমাদেরকেও বদলাতে হবে। শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মাথা বলে যাদেরকে আমরা শীর্ষস্থানে বসিয়ে সম্মান করছি, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কিংবা সংস্কৃতির পরিপন্থি আচার অনুসরন এবং প্রচারের মত কাজে জড়িতরা, এধরণের সম্মানের উপযুক্ত কিনা, সেটা আবার ভেবে দেখার সময় এসেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

