প্রতি বছর ১৫ই আগস্ট আসলেই পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে যায় শহর। কাল কাপড়ের উপর সাদা অক্ষরে লেখা থাকে কাঁদো বাঙ্গালি কাঁদো। আঃ লিগ ক্ষমতায় থাকলে এ উপলক্ষ্যে যা চলে, তা কথায় বলা যায় পাব্লিক নুইসেন্স। ভোরের আলো ফোটার সাথে মাইকের উপদ্রব সেই যে শুরু হয়, সেটা চলে একবারে বেশ রাত অবধি। কারো কিচ্ছুটি বলার উপায় নেই। কারণ সেগুলি পরিচালনার দ্বায়িত্বে থাকে এলাকার "স্বনাম(কু)খ্যাত" প্রভাবশালি লোকজন। কেউ টু ফু করলে পরিণতি, আইন বা যুক্তি যাই বলুক না কেন, পক্ষ্যে যাবে না। (অবশ্য এ বছর রমযান মাসে দিনটি পড়েছে বিধায়, এই নুইসেন্সের মাত্রাটা কিছুটা কম)
অবশ্য বাপের গাটের পয়সা খরচ করে কেই মচ্ছব করলে, তাও না হয় মনকে প্রবোধ দেয়া যেতো। কিন্ত পেশি শক্তির জোরে ক্ষুদে পানের দোকানদার থেকে শুরু করে মায় সাধারণ পাবলিকের পকেট কেটে শোক মানানোটা ধর্মের বিচারে বাদই দিলাম, নৈতিকতার বিচারেও কতটা যুক্তিযুক্ত?
ডাকাতির পয়সায় একজন মৃত মানুষের আত্মার কতটা সদগতি হয় জানি না। তবে এই উপলক্ষ্যে ডাকাতি লব্ধ সব টাকাই যে শ্রাদ্ধে খরচ হয় না, সেটা নিশ্চিত। এর পরেও সে সব মচ্ছবের খবর মিডিয়াতে বেশ ফলাও করে প্রচারিত হয়। আর সে সব দেখে, চ্যালা চামুন্ডা পরিবেস্টিত বঙ্গবন্ধুর কন্যারাও বেশ আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন।
সুখ দুঃখ হাসি কান্না সবই অনুভুতির ব্যাপার। তবে পেশাগত বাধ্যবাধকতা থাকলে, সুখ দুঃখ হাসি কান্নার কৃত্রিম অভিব্যাক্তির অভ্যাস অনেকেই করে থাকেন। যেমন অভিনয় শিল্পিরা। দর্শকদের বিনোদনের জন্য তারা পর্দায় কৃত্রিম অনুভুতি ফুটিয়ে তোলেন। যে যত অকৃত্রিমভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তিনি তত বড় তারকা।

অনেকে আবার ক্ষমতায় যাবার পন্থা হিসেবেও এই ধরণের অভিনয়ে বেশ পারঙ্গম। যদিও তারা পেশা হিসেবে অভিনয় শিল্পি নন। তবে তাদের অভিনয়ে ভুলে তাদের ক্ষমতায় তুলে দিলে, দৃশ্যপট বদলে যায়। তখন খোদ পাবলিককেই কাঁদতে হয়। তাও কৃত্রিম না আদি ও অকৃত্রিমভাবেই।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এক সফল সামরিক অভ্যুত্থানে পরিবারসহ বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছিলেন। এখন যে যত রকম কথাই বলুক না কেন, সময়ের চাকাকে তো পেছনে ঘোরানো যাবে না। হাজার চেস্টা করেও তো ইতিহাসকে বদলানো যাবে না। অথচ ক্ষমতায় গেলেই সেই চেস্টাটুকু নিরলস ভাবে করে যাচ্ছে আঃ লিগ।
এ দেশে এখনও কয়েক কোটি মানুষ আছে, যাদের স্মৃতির মণিকোঠায় ৭৫ এর ১৫ই আগস্ট পুর্ববর্তি আওয়ামী শাসনের কথা রাখা আছে। তাই যখনই শ্রেফ নেক নজরে পড়ে স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কিংবা দলীয় আবেগে অন্ধ ভাড়াটে লেখকরা মিথ্যা ইতিহাস গড়ার অপচেস্টা করে, তখন অন্তত মনে মনে হলেও অনেকেই প্রতিবাদ করে থাকেন।
শত গলি ঘুপচি ঘেটে সে সব মানুষদের খোঁজার দরকার নেই। আঃ লিগের দুই পাশে থাকা ইনু মেননদের ট্রুথ সিরাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেই গড়গড় করে সত্য কথাটা বের হয়ে আসবে। তাছাড়া সেদিন তাদের ভুমিকার কথা বিস্মিত হবার মত অতদিন তো আর পার হয়ে যায়নি। আর উপদেস্টা হিসেবে যাকে হাসিনা বেশ কাছের করে রেখেছেন, সেই এই টি ইমাম যে খোন্দকার মোশতাকের খুবই প্রিয়ভাজন ছিলেন সেটা সচিবালয় থেকে শুরু করে রাজপথের অনেকেরই তো জানা। ইতিহাস তো ইমাম সাহেবও ভালো করেই জানেন। ইনু মেনন ইমাম সাহেবরা প্রাপ্তির আশায়ই যে মুখে তালা দিয়ে বসে আছেন, সেটা না বললেও চলে।

সোহরার্দির শিষ্য ছিলেন। পাকিস্থানি আমলে কিছুদিন মন্ত্রিও ছিলেন। ছিল ৪০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। অথচ স্বাধীনতার পর, সে সব অভিজ্ঞতা কেন এমনভাবে কর্পুরের মত উড়ে গেলো সেটি কেউ বিশ্লেষন করছেন না। হ্যা তাতে অনেক অপ্রিয় সত্য বের হয়ে আসবে, সন্দেহ নেই। কিন্ত সত্যটি তো প্রকাশিত হতো !
এক লাইনে সত্য কথাটি হলো, স্বাধীনতাপুর্ব বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর যে হিমালয়সম ইমেজ ছিল, তার মৃত্যু পুর্ববর্তি বছর গুলিতে সে সব মাটিতে নেমে এসেছিল। হাসিনা আর আঃ লিগ এ সত্যটা ভালো করেই জানে যে, সে সব স্মৃতি এখন মানুষের মনে জীবন্ত রয়েছে। তাই কচি কাচাদের মাথা চিবিয়ে খাবার নিমিত্তে, আবেগকে উস্কে দিয়ে ইতিহাসের চাকাকে উলটো দিকে ঘোরানোর ফন্দি ফিকিরে মত্ত তারা। কবি নজরুল কলেজের পাগলা শিক্ষক নামে খ্যাত অভিনয় শিল্পী মমতাজুদ্দিনকে দিয়ে তাই শিক্ষাব্যাবস্থায় খ্যাপাটে ইতিহাস জুড়ে দেয়া হয়েছে।
অথচ নিজের সন্তান আর আত্মিয়স্বজনদের লোভ লালসার রাশ টেনে ধরলে, আর ক্ষমতার অপব্যাবহার রোধ করতে পারলে, কোন ব্যাটার সাধ্য হতো না বঙ্গবন্ধুর হায়ে একটা ফুলের টোকাটিও দেবার। বঙ্গবন্ধু যে সে চেস্টাটি করেননি তেমন নয়। তবে সে চেস্টায় তার চিরচারিত দৃঢ়তা ছিল অনুপস্থিত।
বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, এমন অনেকে বলেন যে, সন্তানদের অনাচারের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু কঠোর হবার চেস্টা করলেই অন্দরমহল থেকে নাকি এ ধরণের আওয়াজ দেয়া হতো " আপনে তো সারাজীবন মানুষের জন্যই জীবন কাটায়া দিলেন। আমরা কি পাইলাম। অহন আমার পুলাপাইনগুলি এক আধটু কিছু করতে যখন চায়, তাতে আপনে মানা করেন ক্যান? খবরদার ওগো শাসনের কথা ভুলেও মনে আইন্নেন না। নইলে...।"
বাধ্য হয়েই বঙ্গবন্ধুকে তার ইচ্ছাকে সংবরন করতে হতো। কিন্তু এই সংবরনের মুল্য এতবেশি ছিল যে শেষ পর্যন্তই তাকে নিয়তির হাতেই নিজেকে সোপর্দ করতে হয়েছিল।
সাধারণত রাজনীতিকে সর্বস্ব মনে করা নেতাদের সহধর্মিনীরাই সংসারের হাল ধরে থাকেন। ঘরের সেই শিক্ষা থেকেই প্রথম পাঠ হয় রাজনীতিবিদদের সন্তানদের। আঃ লিগের প্রেসিডিয়ামের একজন প্রয়াত
সদস্যকে পারিবারিকভাবেই চিনি। যার সন্তানদের কোনদিনই দল কিংবা বাপের নাম ভাঙ্গিয়ে অনাচার করতে দেখিনি আমি। যার পুরো কৃতিত্বটাই ছিল সেই রাজনীতিবিদের সহধর্মিনীর।
কামাল বা হাসিনা রেহানার আচার আচরনের মধ্যে পারিবারিক সুশিক্ষার কোন প্রমান পাওয়া যায় না। ফলে অভিযোগের আঙ্গুল অন্দর মহলেই দিকেই নির্দেশিত হতে পারে।
ক্ষমতার পালা বদলে যারা অংশ নেন, তারাই দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসেন। অন্তত বিশ্ব ইতিহাস সে রকমই আছে। ব্যাতিক্রম শুধু বাংলাদেশে। যেখানে ১৫ই আগস্টের পরিবর্তনের নায়কেরা ক্ষমতার ছিটেফোটাও চেখে দেখেননি। তাছাড়া আঃ লিগ গায়ের জোরে যতই এদেরকে পাকিস্থানপন্থি বা রাজাকার খেতাব দেবার চেস্টা করুক না কেন, এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন সম্মুখ সমরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধা।
যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতই কেন বঙ্গবন্ধুর রক্তে
রঞ্জিত হলো, সে বিশ্লেষনে যেতে হবেই। তারা ক্ষমতার লোভে এ কাজটি করে থাকলে, কেন সেদিন ক্ষমতা নেননি? আর তাই যদি না হয়, তাহলে কেন এ কাজটি তারা করেছিলেন?
দিনের পর দিন ইতিহাসকে পালটে দেবার অভিপ্রায়ে অর্ধসত্য কিংবা মিথ্যা কথা বলে, এই মুক্তিযোদ্ধাদের ভিলেনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ বেনিফিশিয়ারি ছিলো তো সমগ্র জাতিই। সেদিন তারা যেমন আনন্দ উল্লাস করেনি, তেমনি প্রতিবাদও করেনি। এই বদলে তাদের মৌন সমর্থন ছিল। তাই দোষের ভাগিদার হয়ে এরাই কেন শুধু ফাসিকাষ্ঠে ঝুলবেন? এই রক্তাত্ত পরিবর্তন যদি অপরাধই হয়, তাহলে কেন সেদিনের প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিক একই দোষে দুস্ট হবেন না? কেন বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার কাজে নিয়োজিত রক্ষিবাহিনীর প্রধান তোফায়েল আহমেদ বহাল তবিয়তে হিরো হয়ে থাকবেন?
পিতার ভাবমুর্তির কথা এবং এই পরিবর্তনে দেশের মানুষের মনোভাবের কথা বিলক্ষন জানেন শেখ হাসিনা। একারণেই বি বি সি র সিরাজুর রহমানের সাথে এক সাক্ষাতকারে বলেই ফেলেছিলেন যে, "যে দেশের মানূষ আমার পিতা মাতা ভাই সহ আমার পরিবারকে ধবংস করে দিয়েছে, যে দেশ আমার পিতার জন্য চোখের পানি ফেলেনি, সেটা আমার দেশ নয়।"
হাসিনা এ কথাটি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন বলেই, সন্তান সন্তদিকে বিদেশের নাগরিক করে বিদেশেই রেখেছেন। এমন কি ছোট বোনটিও পরিবার সহ বিদেশে অভিবাসি করে রেখেছেন। সেই ঘরের সন্তানদেরো বিদেশি শশুড় শাশুড়ি। অর্থাৎ আত্মিয়তা করবার জন্য বাংলাদেশের কোন পরিবারকে তিনি আস্থায় নিতে পারেননি। ব্যাতিক্রম শুধু রাজাকার পরিবারটি।
সেই বিশ্বাসে বলিয়ন বলেই, প্রতিশোধ নেবার জন্যই তিনি তার পালিত কুকুরগুলি সাধারণ মানুষের উপর লেলিয়ে দেন। যার ফলাফল আমরা ৯৬ তে যেমন দেখেছি, তেমনি এখনও দেখছি। আওয়ামী লিগ ক্ষমতায় আসলেই সন্ত্রাসের মাৎসন্যায় শুরু হয়, সেটার শুরু সেই ৭২ সাল থেকেই। অর্থাৎ দল হিসেবে আঃ লিগের রাজনৈতিক চরিত্রের কোন পরিবর্তন হয়নি। তার সাথে হাসিনার প্রতিশোধ স্পৃহা যোগ হওয়াতে বাড়াবাড়ির চুড়ান্ত হচ্ছে।
মনে হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। তাই বিতর্কিত এক নির্বাচনে আঃ লিগ ভয়ংকর নিরকুংশতায় ক্ষমতায় আসীন। এখন তাদের ইচ্ছামত যা খুশি যেমন খুশি করছে।
দেশের প্রতি মমত্ববোধের আর দেশপ্রেমের কারণে যারা সেদিনের সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন,তাদের ফাসি দিয়ে ভবিষ্যত প্রতিবাদকারিদের মনবল ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। যে জনগণের জন্য এই পরিবর্তন করা, প্রয়োজনের দিন সেই জনগণের কেউকেই সেদিনের দেশপ্রেমিকরা কাছে পাননি। পাননি সমর্থন কিংবা সামান্য সমবেদনা। তাই নতুন করে কেউ প্রতিবাদি হতে আদৌ কেউ উৎসাহি হবেন বলে মনে হচ্ছে না। তবে ইতিহাস বলে সময়ের প্রয়োজনে কেউ না কেউ প্রতিবাদি হয়ে উঠেই।
নিরংকুশ ক্ষমতা হাতে পেয়ে বঙ্গবন্ধু যেমন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়েছিলেন, সেই একই পথে হাসিনাও হাটছেন। জনগনের তোয়াক্কা না করেই সংবিধান বদল, নাম বদল, নানান বদলের খেলায় মত্ত তিনি। এখন তিনি চান, মানুষের অনুভুতির উপরেও নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে। তারই অংশ হিসেবে আগস্ট মাস আসলেই কাঁদো বাঙ্গালি কাঁদো বলে জোর করেই আমাদের কাদতে বাধ্য করা হাস্যকর চেস্টা লক্ষনীয়। আর চাদাবাজির টাকায় কারো আত্মার সদগতি না হলেও, জনগনের ভোগান্তি হয়, এ কারনেই এই অনাচারকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন। ইচ্ছের বিরুদ্ধে শোক পালন করতে বাধ্য করলে, অন্তত সন্ত্রাসের হাত থেকেবাচতে অনেকেই শোকের অভিনয় করবে বটে ! কিন্ত মনের ভেতর ১৫ই আগস্টের নিহতদের প্রতি ঘৃণা না থাকলেও, ঘৃণা তৈরি হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



