
উপরের ছবিটি ১৯৬৯ সালের হরতালের সময় বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভেনিউয়ের তোলা হয়েছিল। জ্বি এটা হরতালের ছবিই। আমাদের যাদের জন্ম আরো অনেক অনেক পরে, তারা সেকালের হরতালের সাথে একালের হরতালের মিল খুযে পাবেন না।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর হিমালয় সমান জনপ্রিয়তার কারণে বিরোধী দলের অস্তিত্বের প্রয়োজন পড়েনি। তাই হরতালের চেয়ে জাসদ গণবাহিনির বিক্ষোভই ছিল বেশি মাথা ব্যাথার কারণ।

৭৫ এর পট পরিবর্তন এর পর শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় জিয়াউর রহমান আসার পরেও হরতাল করার মত শক্তিশালি বিরোধী দল ছিল না। আওয়ামি লিগ তো বাকশালের সাথে আগেই তিরোহিত হয়েছিল। যার হাল শেষ পর্যন্ত ধরে ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। এই আব্দুর রাজ্জাক হলেন প্রবীন আওয়ামি রাজনীতিবিদ এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য। জনৈক চলচিত্রাভিনেত্রির সাথে অনৈতিক সম্পর্ক ফাস হয়ে যাওয়াতে আওয়ামি লিগ থেকে বহিস্কৃত হয়ে আলাদা আওয়ামি লিগ গঠন করা মিজান চৌধুরিও (চাদপুরের রাজনীতিবিদ এবং পরে এরশাদের দলে যোগ দেয়া) অন্তত বিরোধী দলের মর্যাদা পাবার মত শক্তিশালি ছিল না। তাই হরতালের সুযোগ হয়নি কারো।
জিয়ার সংক্ষিপ্ত শাসনামল শেষ হবার পরে শুরু হয় হোসেন মো এরশাদের সামরিক শাসন। ততদিনে শেখ হাসিনা আওয়ামি লিগকে গুছিয়ে ফেলেছেন। রাজ্জাকও মান ভুলে বাকশালকে আওয়ামি লিগে একিভুত করে ফেলেছেন। তোফায়েল আমু ইত্যাদি বাঘা রাজনীতিবিদরাও আবার দলে সক্রিয় হয়েছেন। যদিও জিয়ার আশির্বাদেই শেখ হাসিনা এবং আওয়ামি লিগের আবারও রাজনীতিতে সক্রিয়তা, তবু বি এন পির প্রতিই তাদের ক্ষোভ ছিল মারাত্মক। এ জন্য এরশাদের সামরিক শাসন জারির পর হাসিনা তাতে সমর্থন দিয়েছিলেন। ফলে গৃহবধু থেকে বাধ্য হয়েই রাজনীতিতে আসা খালেদা জিয়া ব্যাস্ত ছিলেন দল গোছাতে।
এরশাদের শাসনামলের শেষে ভাগ থেকে থেকেই মোটামুটি বিক্ষোভ এবং মারমুখি হরতালের সুচনা ঘটে। এর আগে এরশাদের প্রতি হাসিনার পরোক্ষ সমর্থন থাকায় একলা বি এন পির পক্ষ্যে শক্ত কোন কর্মসুচি দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে ৯০ সালে ঢা বি তে ছাত্র দল এবং ছাত্র লিগের নেতা কর্মি দের এক সাথে পেটানোর ফলে, এই দুই ছাত্র সংগঠনের চাপে হাসিনা খালেদা যৌথ ভাবে এরশাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন এবং হরতাল দিতে বাধ্য হয়।

এরশাদের বিদায়ের পর, ১৯৯১ সালে বি এন পি সরকার গঠন করলে, আওয়ামি লিগের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কেননা তারা মনে করেছিল, (তাদের পক্ষ্যে থাকা বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও একই ইঙ্গিত দিয়েছিল) যে তারাই ক্ষমতায় আসছে। হয়তো তাদের পক্ষ্যে শিকে ছিড়তো, যদি নির্বাচনের ঠিক আগে টেলিভিশনে প্রচারিত হাসিনার জিয়ার বদনাম সর্বস্ব বক্তব্য শুনে দেশবাসি তার উপর থেকে আস্থা হারায়। হাসিনা ভুলে গিয়েছিলেন যে জিয়াকে সাধারণ মানুষ অন্তর থেকেই শ্রদ্ধা করতো। এখনও করে।
বি এন পির কাছে পরজয়ের পর হাসিনা ও আওয়ামি লিগের প্রতিশোধের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ও তার জনগণ। নানা ছলছুতোয় হরতাল আর ভাংচুর করে অতিষ্ঠ করে ফেলে সে। ৯৬ সালে হাসিনা ক্ষমতায় আসলে, ওই ধারা অনুসরন করে বি এন পিও একই কায়দায় দেশবাসির যন্ত্রনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে আঃ লিগের মত মাত্রা ছাড়ায়নি বলে, ২০০১ সালে আবারও ক্ষমতা ফিরে পায় বি এন পি।
২০০১ সালে গোহারা হারার পর, আন্দোলন আর হরতালের নামে হাসিনা আর আঃ লিগের সন্ত্রাস বাংলাদেশের ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। (এর আগে সরকারে থাকার সময়ও তারা হরতাল পালনকারিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালিয়েছিল। এমন কি মহিলা কিংবা নিরীহ অফিসযাত্রিকে প্রকাশ্যে দিগম্বর করতে ছাড়েনি।)
আর ২০০১ সালের পর থেকে যতদিন বিরোধী দলে ছিল, আওয়ামি লিগের কাজই ছিল লাগাতার হরতাল দেয়া। এমন কি ১১ জন নিরীহ বাসযাত্রিকেও পুড়িয়ে মারতে ছাড়েনি ওরা। আর হরতালের পৈশাচিকতার শিকার নিরীহ বেবিট্যাক্সি চালকও হয়েছিল। বেচারাকে গাড়িশুদ্ধ পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।
আমাদের দেশে হরতাল হলেই পাবলিক বা প্রাইভেট যানবাহন ধবংস এবং নিরীহ জনগনের উপর সন্ত্রাস চালানোর কারনেই সাধারণ মানুষ হরতালের দিন নিস্ক্রিয় হয়ে নিরাপদে থাকে। পিটাপিটি যাই হয়, সেটা পুলিশের সাথে পিকেটারদের। অথচ যারা হরতাল ডাকে, তারা বলে হরতাল সফল, জনগণকে শুভেচ্ছা। আর সরকার বলে হরতাল ব্যার্থ জনগনকে অভিনন্দন।
হরতালে দেশের অর্থনীতির চরম ক্ষতি হয়, তাতে সন্দেহ নেই। সাধারন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সেটাও সত্য। আমরা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের ভোগান্তির কথা তো জানি। চলুন জানা যাক সাধারণ মধ্যবিত্তের বিড়ম্বনা আর নিরাপত্তাহীনতার কথা।
যিনি সরকারি চাকুরে, তিনি যদি ভয়ে ঘরে বসে থাকেন, তাহলে তার প্রতিদন্দ্বিরা অফিসে রটিয়ে দিবে তিনি বিরোধি দলের সমর্থক। অর্থাৎ অফিসে না গেলেই তাকে বিরোধি দলের সমর্থক জ্ঞান করে নানা রকম রাজনীতির শিকার হতে হবে। তাই প্রাণটা হাতে করেই তাকে হরতালের দিনও রাস্তায় নামতে হয়। যেহেতু যানবাহনের সমস্যা, তাই যত দুরের পথই হোক না হাতে প্রান আর পায়ের শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই তাকে অফিসমুখি হতে হয়।আর যারা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে, অনুপস্থিতির অজুহাতে চাকুরি চলে যাওয়া তো ডালভাত। তাই তাকেও জীবিকার তাগিদে ওই একই ভাবে রাস্তায় নামতে হয়।
উভয় ক্ষেত্রেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা থাকেন চরম উৎকন্ঠায়। আর এতে সৃস্টি হয় এক ধরনের মানসিক চাপ। যা দুর্বল চিত্তদের স্বাস্থের প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃস্টিকারি।
আগামি ৩০শে নভেম্বর বি এন পি হরতাল ডাকার পর, আওয়ামি লিগের পক্ষ থেকেই এক হাত দেখে নেবার হুমকি দিয়ে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ দু পক্ষই কে জন আরেকজনকে দেখে নেবার প্রস্তুতিতে রয়েছে। এই ডামাডলের মধ্যে সাধারণ নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের ঘরের কোন সদস্যের আহত নিহত হবার নিয়তি, সে নিয়তিই জানে। তবে দুই দলের এই সংঘাতে কোন অপুরনীয় ক্ষতি হলে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেবার মত ধন সম্পদ পৃথিবীতে কোথাও আছে বলে জানা নেই।
ইতিমধ্যে অভ্যাস বশত ( সরকারে থাকলে হরতাল বিরোধী আর বিরোধি দলে থাকলে হরতাল সমর্থক) আঃ লিগ সমর্থিত সংগঠনগুলি বেশ উচ্চ গলায় হরতাল বিরোধী আওয়াজ দেয়া শুরু করেছে। যার মধ্যে ঢা বির ভিসি আরেফিন আর ব্যাবসায়িদের সংগঠন এ কে আজাদও আছেন।
অবশ্য আঃ লিগের ভারপ্রাপ্ত সাঃ সম্পদক মাহবুবুল আলম হানিফ হরতালকে গণতান্ত্রিক অধিকার বললেও, বি এন পির হরতালের সমালোচনা করেছেন। অর্থাৎ তারা বিরোধী দলে থাকলে, হরতাল করা নিয়ে কেউ যেন সমালোচনা না করতে পারে সেই ব্যাবস্থা করে রাখলেন আর কি !
২০০১ সালে নির্বাচনের আগে হাসিনা, বিরোধী দলে গেলে হরতাল করবো না বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার সব কয়টা অঙ্গিকারের মত এই ওয়াদাও যে নিছক কথার কথা ছিল, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আঃ লিগের কর্মকান্ডেই সেটা প্রমানিত হয়েছিল।
আজ হরতালের বিরুদ্ধে এত এত কথা হুমকি ধমকি, এসব কি তাদের সাজে। যারা ভুক্তভোগি সেই সাধারণ মানুষ হরতালকে মন্দ বললেও , অন্তত বি এন পি বা আওয়ামি লিগের সাজে না হরতালকে মন্দ বলার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



