
স্যামুয়েল হান্টিন্টনের "দা ক্ল্যাস অফ সিভিলাইজেশন" বইটি সমন্ধে অনেকেই জানেন। সেখানে এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যাবস্থা কায়েম করার রুপরেখা বর্ণনা করা হয়েছিল। এই তত্ত্বটি ১৯৯২ সালে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট নামে চরম রক্ষণশীল একটি থিংক ট্যাংকের সভায় আলোচিত হয়। যে প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত করা। যেটাকে আমরা আজকের পৃথিবিতে কর্পোরেট পুঁজিবাদ বলে জানি।

রাস্ট্রবিজ্ঞানি হিসাবে হান্টিন্টন যে কোন তত্ত্ব উপস্থাপন করতেই পারেন। কিন্ত সেই তত্ত্বটিকে বাস্তবে রুপ দিতে ওই থিংক ট্যাংকের (অ)সভ্য একদল ভয়ংকর সন্ত্রাসি আমেরিকার রাস্ট্রিয় ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ফলে, সেটি আর তত্ত্বের মধ্যেই আবদ্ধ নেই। মিথ্যাবাদি উন্মাদ ছোট বুশের কার্যক্রমে যেভাবে সুনির্দিস্টভাবে বিভিন্ন জাতি এবং সংস্কৃতিকে টার্গেট করে রাস্ট্রিয় সন্ত্রাস চালানো হয়েছে, বিপরীত রাজনৈতিক আদর্শে অবস্থিত বারাক ওবামাও সেটি এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। অর্থাৎ সেটি আর তত্ত্বে আবদ্ধ নেই। ভয়ংকর বাস্তবে পরিণত হয়েছে, যার উদ্দেশ্য সারা বিশ্বে একক পরাশক্তির পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

তবে সেই বিশদ আলোচনায় না গিয়ে বরং এই তত্ত্বের কি প্রভাব আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে পড়েছে, তার খানিকটা আলোচনা করা যাক।
সোভিয়েত ইউনিয়ানের পতনের পর, এক কেন্দ্রিক বিশ্বব্যাবস্থার বিরোধী জ্ঞান করে মুসলমানদের টার্গেট করা হলো। এজন্য কাজে লাগানো হলো ৯/১১ এর ঘটনাকে। তবে হাজার রাখঢাক করেও মিথ্যাকে চাপা দেয়া গেলো না। যুক্তি এবং বিজ্ঞান দিয়েই প্রমান করা গেলো যে, এই তত্ত্বের প্রয়োগকারিরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি প্রচার করেছিল। এর পরেও একই ক্ষুরে মাথা কামানো সাম্রাজ্যবাদি মিডিয়ার গোয়েবলেসিয় প্রচারনায় মিথ্যাটিই এখন প্রতিষ্ঠিত। যা শুধু পশ্চিমা বিশ্বের শাসককের মুখে নয়, বরং তাদের তল্পিতল্পা বহনকারি অন্যান্য দেশের শাসকদের মুখ দিয়েও হরহামেশা শোনা যায়।


যদিও এই তত্ত্বটি উগ্র রক্ষণশীলদের আবিস্কৃত, তবুও কর্পোরেট পুজি ব্যাবস্থা প্রসারে তারা নিজেদেরই
বিশ্বাসকে ছাড় দিতে প্রস্তত। ধরুণ ডিক চেনির কথা। এই চোর (এনরন কেইস এ) মিথ্যাবাদি খুনিকে না চেনার কিছু নেই। যদিও কুমারিদের গর্ভধারণের বিরুদ্ধে তার অবস্থান, কিন্তু তার নিজের মেয়েই যখন কুমারি অবস্থায় গর্ভবতি হলো, তখন ওই তত্ত্বের প্রতি নতজানু থেকেই তিনি বিশ্বাসে ছাড় দিয়ে মুখে কুলুপ এটে রইলেন। কন্ডোলিসা রাইস যে কিনা আরেক গোড়া খ্রিস্টপন্থি হিসাবে বুশ ক্যাবিনেটে স্থান পেয়েছিলেন, তিনি নিজেই একজন লেসবিয়ান। অর্থাৎ যায় যদি যাক প্রাণ কর্পোরেট গণতন্ত্র ভগবান।
এই সন্ত্রাসি পুজিবাদের মুর্তির ঘণকৃষ্ণ বর্ণকে শুভ্র করার প্রয়াশেই বিশেষ কিছু শব্দের নতুন ব্যাখা দিয়ে সারা বিশ্বে প্রচার চালানো হচ্ছে। আধুনিকমনস্কতা, প্রগতিশীলতা, মানবাধিকার ইত্যাদির সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠায় রত একটি অতি শক্তিশালি গোষ্ঠি, যাদের মতের বাইরে পা ফেলার সাধ্য এমন কি ওবামার পর্যন্তও নেই।



জাতি হিসাবে আমরা হুজুগে, এটা নিয়ে সন্দেহ নেই। এজন্যই প্রথমে বিভিন্ন এন জি ও আর কর্পোরেট হাউজের মাধ্যমে আমাদের আধুনিকতা গেলানো হয়েছে। আমাদের আবেগ অনুভুতিকে সুরসুরি দিয়ে প্রথমে নিজেদের আস্থার পথটি অর্জন করেছে। যেমনটি ধরুণ গ্রামীন ফোনের মা বিজ্ঞাপনটি। অথবা গ্রামিণ ফোনের মুক্তিযুদ্ধের চিঠি। তারা সাথে নিয়েছে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এবং কিছু প্রকাশনা সংস্থাকে। লাক্স-চ্যানেল আই, কিংবা - গ্রামীণ ফোন ইত্যাদি পার্টনারশিপ গড়ে উঠেছে, যাতে তারা আমাদের আধুনিকতা প্রগতিশীলতার নতুন সংজ্ঞা শিখাতে পারেন, চর্চা করাতে পারেন।
তারই ধারাবাহিকতায় আমরা পাচ্ছি, ডিজে আরযে আর ডিজুস নামের না ঘরের না ঘাটের একদল আপন দেশ ও সংস্কৃতি বৈরি একটি নতুন প্রজন্মকে। এরাই তাদের পরবর্তি প্রজন্মের কাছে এমন একটি সংস্কৃতি রেখে যাবে, যাতে বাংলাদেশের নাম গন্ধ আর খুজে পাওয়া যাবে না। আর যে জাতির সংস্কৃতিই বিলুপ্ত হয়, সে জাতি কি টিকে থাকতে পারে?

পৃথিবীতে বোধ করি একমাত্র আমাদের দেশেই বুদ্ধিজীবিদের একটি বিশাল অংশ বিক্রি হবার জন্য তৈরি হয়েই থাকেন। শুধু তার চাহিদা মাফিক পাওনাটা দিলেই ল্যাঠা চুকে গেলো। এজন্য দেখা যায়, আজীবন বামপন্থি আদর্শে লালিত পালিত চর্চিতরা আজকাল জোর গলায় পুজিবাদের জয়গান গেয়ে চলেছে।
এর বিপরীতে চললে দেয়া হচ্ছে নানা রকম অপবাদ। যার মধ্যে মৌলবাদি, উগ্রপন্থি, তালেবানপন্থি, সন্ত্রাসবাদি এমনকি রাজাকারপন্থিও বলা হচ্ছে।
ইউটিউব একটি অত্যন্ত শক্তিশালি ও জনপ্রিয় মাধ্যম। সেখানে দু ধরনের দুটি ভিডিও চিত্র দেখে শংকিত হলাম। একটিতে দেখা গেলো পতিতালয়ে অভিযান চলাকালে সেখানে ধরা পড়ারা যে যেভাবে পারছে, মুখ ঢাকছে। আরেকটিতে ক্যামেরার পেছন থেকে উৎসাহ পেয়ে এক জোড়া অল্প বয়স্ক প্রেমিক প্রেমিকা আরো বেশি উৎসাহ নিয়ে চুম্বনরত। একই ধরণের আরেকটি ভিডিওতে লোক দেখানো লজ্জায় আপ্লুত তরুণীকে প্রেমিকের বন্ধুটি ভবিষ্যতে যৌথ যৌনমিলনের প্রস্তাব দিয়ে রাখছে। তাও প্রেমিকের সামনেই।
আগে গোপণ ক্যামেরায় অভিসারের দৃশ্য বন্দি করা হতো। এখন দুই পক্ষ্যের স্বপ্রণদনায় সে কাজটি হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা ! এদের কি মা বাবা আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। না হয় মা বাবার পক্ষ্যে ভিডিও দেখার সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাই বলে কি তরুণ আত্মীয় স্বজনদের কাছেও ধরা পড়ে আত্মসম্মান খোয়ানোর ভয় নেই? এদের ব্যাপারে সমাজ কি এতই উদাসীন, যে পতিত কিংবা পতিতা হিসাবে এরা সমাজে বুক ফুলিয়ে চলতে পারে?
এ নিয়ে তথাকথিত প্রগতিশীল আর আধুনিক মনস্কদের কোন বিকার নেই। নেই উদ্বেগ কিংবা উৎকন্ঠা। এমনকি ক্ষীণ স্বরে প্রতিবাদটুকুও নেই। কি করে থাকবে? উনাদের বিবেক যে টাকার কাছে বন্ধক রেখেছেন। অথচ যে টাকার জন্য তারা নিশ্চুপ, সে টাকায় বেড়ে উঠা ওদের নিজের সন্তানরাও যে উচ্ছন্নে যাচ্ছে, সে খেয়াল কি আছে? (ব্লগেই বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের সন্তানদের নিয়ে একটি লেখা পড়েছিলাম। সেখানে অনেকের সাথে সাথে আসাদুজ্জামান নুরের যুক্তরাজ্য প্রবাসি পুত্রটি যে ড্রাগ এডিক্ট, সেটা জানার দুর্ভাগ্য হয়েছিল। নুর শুধু রাজনীতিবিদ নন, তিনি নিজেকে বুদ্ধিজীবি বলেও প্রচার করে থাকেন, এজন্য তার উদাহারণটা দিতে হলো।)
হান্টিংটিন তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নাম ও আঙ্গিকে কিছু সেবাদাস সংগঠন পরিচালিত হচ্ছে। শুধু বাস্তবে নয়, অন্তর্জালেও টাকা বিলানো হয়েছিল দেদার। তারই অংশ হিসাবে ভারতের বিজেপির আশির্বাদপুস্ট হয়ে মুক্তমনা নামে একটি বাংলাদেশ ও ইসলামোফোবিক ওয়েবসাইট দিনমান বাংলাদেশের কুৎসা রটনার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। মুখে প্রগতিশীলতা আর নাস্তিকতার নাম করলেও, শুধু মাত্র ইসলাম ও মুসলমান বিরোধীতাই ছিল এর একমাত্র উদ্দেশ্য।অবশ্য বুশ আর জায়নবাদি নিও কনরা যে বিশ্ব সভ্যতা ও শান্তির একমাত্র রক্ষক, সেটাও বলে চলতো। (টাকাটা তো হালাল করতে হবে?)
সাথে ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া খাওয়ার নিমিত্তে এরা আবার ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে চলতো (এখনও চলে) আর বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের আখড়া বলে প্রচার করে থাকে। বেশ কিছু শক্তিশালি লেখকের প্রতিবাদের মুখে এবং বুশের বিদায়ে টাকা আসায় ভাটা পড়েছে বলে, মুক্তমনা এখন কোনঠাসা। নইলে, অন্তর্জালে এক কোনায় বসে থাকা পালের গোদা অভিজিৎ কেন সামুতে লিঙ্গ বদলে মুক্তমনার আবর্জনা বিসর্জন করতে আসবে?
এই মুক্তমনা (মুত্রমনা) আবর্জনা মাথায় ভরে নিজেদের মহা জ্ঞানি ভাবা কিছু মহা নাইপ্তা, বিজ্ঞান-আরুজ আলি মাতবর-লালন-ডকিন্স-প্রগতিশীলতা এসবের আড়ালে ওই আবর্জনা সামুতে বিলানোর ব্যাবস্থা করেছে। আরে, তোরা এতই যদি শিক্ষিত হবি, তাহলে কেন তোদের একটা সামান্য চাকরির জন্য সহব্লগারের দয়ার উপর নির্ভর করতে হয়?
এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠায় শুধু ইসলাম বা মুসলমান নয়, বিভিন্ন দেশের জাতিয়বাদিরাও শত্রু হিসাবে গণ্য। তাই দেখা যাচ্ছে কম্যুনিজমের পতনের পরেও, ইরাক- উঃ কোরিয়া- কিউবা- লিবিয়া- সিরিয়া- ভেনেজুয়েলা ইত্যাদি রাস্ট্রর বিরুদ্ধে তেনারা জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
গায়ে জাতিয়বাদের ছাপ থাকার কারণে বাংলাদেশে, বি এন পির ১২টা বাজানো হয়েছে এদেরই পৃষ্ঠপোষকতায়। যদিও ক্ষমতায় থাকতে বি এন পি উনাদের মন রক্ষায় সবকিছুই করেছিল। (মুক্তবাজারের নামে মুক্তকচ্ছ হয়ে দেশীয় পণ্য ও সংস্কৃতির ১৪টা বাজানো, বি এন পিরই অবদান।)
অন্তর্জালে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাংলা ব্লগ সামুকেও জাতিয়তাবাদি মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নানা ছল ছুতায় কোনঠাসা করার চক্রান্ত চলছে। সেই চক্রান্তের অংশ হিসাবেই জাতিয়বাদি বলে পরিচিত বাংলাদেশ জিন্দাবাদ নামের শক্তিশালি ব্লগারকে জেনারেল করা হয়েছে। ব্যাক্তিগত আক্রমন ব্লগ নীতিমালার পরিপন্থি হলেও অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শক্তিশালি ব্লগার জুলভার্ণ ভাই, দাসত্ব, ফারুক ওয়াসিফ, এবং অন্য অনেককেই, মুত্রমনার চ্যালারা মাল্টিনিকে আক্রমন করে নিরুৎসাহিত করেছে। আর এর পেছনে প্রত্যক্ষ সমর্থন সামু কর্তৃপক্ষ্যের, সেটি আর গোপণীয় নেই। নইলে ইসলাম নবীজির বিরুদ্ধে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিরোধী সমকামকে বৈধ করার জন্য নৃত্য করাদের ইশারায় কেন সামু কর্তৃপক্ষ চলবেন?
আধুনিকতার নামে খোট্টা মাউড়া হিন্দি সংস্কৃতি, কিংবা পশ্চিমের ভাদাইমা সংস্কৃতির চর্চাকারিদের অনুসরণ করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে, এর পর এই অসুস্থ চর্চা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? প্যান্ট পাছায় পড়ে, কিংবা বুক দেখানো জামা পড়ে, অবাধ যৌনমিলনে গা ভাসিয়ে দিয়ে, মুখে হিন্দি ইংরেজি জগাখিচুড়ি প্রলাপ বকে, আর যাই হোক, শিক্ষিত হওয়া যায় না। এর নাম আধুনিকতাও নয়। বরং এর নাম পশ্চাদমুখিতা। যেমন অসভ্য অবস্থায় মানব জাতি অর্ধ নগ্ন থাক্তো সে রকমই।
এত কিছু করেও রেহাই নেই। এর পরেও আমরা ঠিক আধুনিক হতে পারছি না। তাই ভাবি আর কতটুকু নামলে বা নামালে প্রগতিশীল আর আধুনিক হয়ে আমরা পরিচিত হতে পারবো?
**একই সঙ্গে আমার বর্ণমালায় প্রকাশিত।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০১১ সকাল ১১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


