আমি কয়েক বছর আগে একবার লিখেছিলাম, ফেব্রুয়ারি মাস এলে আমার খারাপ লাগে। মানুষ এত মিথ্যা কথা বলে। গতকালই আমাকে দেশের বাইরে থেকে একজন ফোন করে জিজ্ঞেস করছিলেন, এতদিন পর এখন এত ভাষাসৈনিক কোথা থেকে এলো? আসলে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের যখন থেকে 'ভাষাসৈনিক' বলে আখ্যায়িত করা শুরু হয়েছে তখন থেকেই এই অভিধা লাগামছাড়া হয়েছে। এরশাদের শাসনামলের গোড়ার দিকেই মিলিটারি কালচারের প্রভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ভাষাসৈনিক বলে আখ্যায়িত করার রেওয়াজ শুরু হয়েছে। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল এবং তারপর পুরো সত্তরের দশকেও ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ভাষাসৈনিক বলার চিন্তা কারো মাথায় আসেনি। এরশাদের আমলে কতিপয় মতলবাজ বুদ্ধিজীবী নিজেদের 'ভাষাসৈনিক' বলে আখ্যায়িত করে এ কাজ শুরু করার পর দেশের বর্তমান অবস্থায় এতে বাতাস লেগে এই অভিধা চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। এখন এর থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আর আছে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া ১৯৭১ সালে যারা অস্ত্র হাতে নিয়ে কোনো যুদ্ধই করেনি তারা যেমন নিজেদের 'মুক্তিযোদ্ধা' বলে পরিচয় দিয়ে তাদের অনেক কীর্তিকথা শোনাচ্ছে, তেমনি ভাষা আন্দোলনের সৈনিক বলে নিজেদের আখ্যায়িত করে অনেকেই এখন বাজার গরম করছে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ৬৩ বছর এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ৫৯ বছর পার হয়েছে। এখনও পর্যন্ত 'ভাষাসৈনিকদের' যে সংখ্যা দেখা যাচ্ছে তা প্রকাণ্ড। তা ছাড়া আন্দোলনের সময় যাদের ভূমিকা ছিল অতি সামান্য বা নগণ্য তারাও অন্যদের মৃত্যুজনিত অনুপস্থিতির কারণে এমনভাবে 'ভাষাসৈনিক' হিসেবে এগিয়ে এসে নিজেদের গৌরবান্বিত করছেন এবং অন্যরাও তাদের নিয়ে মাতামাতি করছেন, যার মধ্যে অন্য যাই হোক, রুচির অভাবও খুব প্রকট। অবস্থা দেখে মনে হয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের একটা উপায় হিসেবে এরা ভাষা আন্দোলনকে আঁকড়ে ধরে এখন নানা মিথ্যা প্রচার করছেন। মনে রাখা দরকার যে, অতিরঞ্জনও মিথ্যার একটি প্রকার।
এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের উদগ্র আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষ এখন নানা কাজ করছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব কাজ যে ধরনেরই হোক, এর মূল লক্ষ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন এতে সন্দেহ নেই। কোরবানি দেওয়া, হজ করা, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেওয়া থেকে নিয়ে লেখক হিসেবে বইপত্র প্রকাশ পর্যন্ত এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের এক এক উপায়। যে কোনো বিষয়কে অবলম্বন করে এ চেষ্টা করবে সেটা নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের অবস্থান ও ধান্ধার ওপর। এদিক দিয়ে বিচার করলে এভাবে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের চেষ্টা এক ধরনের ধান্ধাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়।
এ বিষয়টা এখন দুশ্চিন্তার কারণ এ জন্য যে, এই ধান্ধাবাজির কবলে পড়ে অন্য যাই হোক, দেশের ইতিহাস সংকটে অনেক মিথ্যা ছাপার অক্ষরে চারদিকে প্রবাহিত হচ্ছে এবং সত্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই মিথ্যারই জয়জয়কার হচ্ছে।
১৯৭১ সালে যারা কোনো সশস্ত্র লড়াই করেনি, সশস্ত্র লড়াইয়ের ধারে-কাছেও যারা ছিল না তারা এখন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রচারিত ও পরিচিত। ২৫ মার্চের পর যারা প্রাণভয়ে ভারতে পালিয়ে ছিল তারাই এখন সাধারণভাবে মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচিত। এই পলাতকদের মধ্যে যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও যারা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটিশ ইত্যাদি সরকারের কাছে নানাভাবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ও স্বাধীনতার পক্ষে তদবির করতেন, যারা রেডিওতে সংবাদ পাঠ করতেন বা অন্য কোনো প্রোগ্রাম করতেন, যারা লেখালেখি করতেন, তারাও মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচিত। কাজেই বোঝা মুশকিল প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে নিয়ে লড়াই কারা করেছিলেন। কর্নেল তাহের, কর্নেল নূরুজ্জামানের কাছে শুনেছি, যারা বাস্তবত লড়াইয়ের ময়দানে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন তারা অধিকাংশই ছিলেন কৃষক, শ্রমিক পরিবারের গরিব লোক। ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষে তারা যেখান থেকে এসেছিলেন সেখানেই ফিরে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ভাঙিয়ে খাওয়ার কোনো চেষ্টা বা সুযোগ তাদের ছিল না। তাদের কোনো কথা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শোনা যায় না। পালিয়ে গিয়ে যারা নানা ধান্ধাবাজি করেছিলেন তাদেরই নাম এখন মুক্তিযোদ্ধাদের সামনের সারিতে!
ভাষা আন্দোলনের যে দু'জন প্রধান নেতা এখনও জীবিত আছেন তারা হলেন অলি আহাদ ও আবদুল মতিন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কোনো একক নেতা না থাকলেও অলি আহাদ ছিলেন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সাংগঠনিকভাবে তার চেয়ে বড় ভূমিকা ও বেশি গুরুত্ব কারও ছিল না। কিন্তু তিনি সে হিসেবে নিজের প্রচারণা করেননি। তা ছাড়া তার পরবর্তী রাজনীতি প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার কারণে ভাষা আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা এখন প্রায় অগ্রাহ্য করা হয়। বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চার এক ট্র্যাজেডি হলো এটাই। যারা রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাস চর্বণ করেন অথবা অন্য ধান্ধাবাজির মধ্যে থাকেন তাদের মধ্যে বর্তমানের সুবিধার জন্য অতীতকে ব্যাখ্যা করা, এমনকি ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা ভয়াবহভাবে প্রবল। যত দিন যাচ্ছে এদিক দিয়ে অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ একজন নারী 'ভাষাসৈনিক' হিসেবে হঠাৎ করে সামনে এসে এমন করছেন যেন সে সময় তার ভূমিকা বিরাট ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ছাত্রী হিসেবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছিলেন অনেকের সঙ্গে। এছাড়া তার এমন কোনো ভূমিকা ছিল না যাতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বীরাঙ্গনা হিসেবে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা দরকার। তার দাবি সেটাই। আমি ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী হিসেবে তার নাম আমার বইয়ে উল্লেখ করেছি। কিন্তু সেটা তাকে সন্তুষ্ট করার মতো নয়। তার কথা হলো, আমার বইয়ে নারীদের ভূমিকা বিষয়ে কিছুই নেই, কাজেই সেটা ইতিহাস পদবাচ্য নয়। তিনি কী বলছেন সেটা বাদ দিয়েও বলা দরকার যে, আমার বইয়ে আমি ১৯৪৮ সালে যশোর, ঢাকা, সিলেট ইত্যাদি এলাকার ভাষা আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকার কথা লিখেছি। ১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জে মমতাজ বেগমের ভূমিকার কথা লিখেছি। তার ভূমিকা সে সময় শুধু নারীদের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু নারী হিসেবে নয়, ভাষা আন্দোলনের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে সাধারণ বিবেচনা থেকেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অন্য অনেক নারীর ভূমিকাও উল্লেখ আমি করেছি তাদের অবস্থান অনুযায়ী। তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় ঐতিহাসিক বিবেচনার দিক থেকে খেয়াল রাখা দরকার। সে সময় সাধারণভাবে নারীদের সামাজিক অবস্থানের কারণে ছাত্ররাজনীতি ও সাধারণ রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ যে পর্যায়ে ছিল তাতে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে ব্যাপকভাবে নারীদের অংশগ্রহণ সম্ভব ছিল না। তবু সে সময় নারীরা অনেকেই এ আন্দোলনে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে নিজেদের মতো করে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে যেমন, নারীদের ক্ষেত্রেও তেমনি, সকলের নাম সাধারণ ইতিহাস বর্ণনার সময় উল্লেখ ও লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সে চেষ্টা করলে তালিকার নিচে ইতিহাসের মর্মবস্তু ধামাচাপা পড়ার কথা। আমার মনে আছে, অনেক বছর আগে আমাকে একজন অভিযোগের সুরে বলেছিলেন, ১৯৫২ সালে তিনি পোস্টার লাগিয়েছিলেন অথচ তার নাম আমার বইয়ে কোথাও নেই! তিনি যে পাড়ায় থাকতেন সে পাড়ায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এ জন্য তার নাম লিপিবদ্ধ হতে পারে কিন্তু সাধারণ ইতিহাসের বাইরে তার নাম উল্লেখ কীভাবে সম্ভব?
এখন 'ভাষাসৈনিকদের' মধ্যে অনেক স্মৃতিচারণ দেখা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, এই স্মৃতিচারণের ব্যাপারটিও শুরু হয়েছে 'ভাষাসৈনিক' শব্দবন্ধটি চালু হওয়ার কাছাকাছি সময় থেকে। আমি যখন ভাষা আন্দোলনের ওপর বইটি লেখার কাজ করছিলাম, তখন এ ধরনের কোনো স্মৃতিচারণের ব্যাপার ছিল না। কাজেই আমি নিজে অসংখ্য লোকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, যার মধ্যে ৫৯টি সাক্ষাৎকারের বিবরণ আমি প্রকাশ করেছি 'ভাষা আন্দোলন : কতিপয় দলিল' নামে বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত বইয়ে। খুব সম্ভবত ১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমী ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণের একটা সংকলন বের করেছিল। এছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমার কাজের সময় আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে, যাদের সাক্ষাৎকার আমি নিচ্ছিলাম তাদের মধ্যে কারও কারও কিছুটা স্মৃতিভ্রম হচ্ছিল। বহু বছর পর পরবর্তী সময়ে এখন এদিক দিয়ে আস্থা নিশ্চয়ই আরও খারাপ হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত এই স্মৃতিচারণ জোরেশোরে শুরু হয়েছে যখন বয়স্ক লোকদের স্মৃতিশক্তি আরও দুর্বল হয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ওই সময়ে যাদের অল্পবিস্তর ভূমিকা ছিল তারা কেউ কেউ মতলববাজির কারণে না হলেও স্মৃতি দুর্বল হওয়ার কারণে অনেক কিছুই বলছেন যা ঠিক নয়। এসব ভুলভাল কথার সঙ্গে সত্য ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই এবং নতুন প্রজন্মের লোকেরা এসবের দ্বারা বিভ্রান্ত হচ্ছে।
এটা তো এক সমস্যা। স্মৃতি যখন সবল ও ভালো ছিল তখন স্মৃতিচারণের ব্যাপার ছিল না। কারণ তখন এসব নিয়ে মতলববাজির ও আত্মপ্রচারণার সুযোগ তেমন ছিল না। এখন এই মতলববাজি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ উভয়কে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে হচ্ছে। ফলে 'ভাষাসৈনিক' ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা প্রাকৃতিক নিয়মে কমে আসার পরিবর্তে মতলববাজির নিয়মে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসবের সঙ্গে ইতিহাস ও ইতিহাস চর্চার কোনো সম্পর্ক নেই।
[সূত্রঃ সমকাল, ১৫/০২/১১]
আলোচিত ব্লগ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন
=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।