somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু - তৃতীয় পর্ব - হিমুর পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ - হুমায়ূন আহমেদ

০২ রা জুলাই, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হিমু হুমায়ূন আহমেদের এক অসাধারণ সৃষ্টি। হিমুর সৃষ্টি এবং পথচলা সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ নিজেই লিগেছেন ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু। লেখাটি সম্ভবত কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আমি এটা সংগ্রহ করেছি বাংলাদেশ ইনফো ডট কম থেকে। আমার কাছে অবশ্য হিমুর বইগুলো তেমন ভালো লাগে না। হিমুর চেয়ে আমার রবং মিসির আলীকেই বেশি পছন্দ। আমার কাছে ভালো না লাগলেও ব্লগে হয়তো এমন অনেক পাঠকই আছেন, যাদের প্রিয় চরিত্র হিমু। তাদের জন্যই এই লেখাটি দেওয়া হল।

পূর্ববর্তী পর্ব থেকে চলমান ...

কলকাতা থেকে দেশ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশিত হয়| একটা পত্রিকা কতদূর ক্ষমতাধর তা দেশ পত্রিকা না দেখলে আমি জানতাম না| বলা হয়ে থাকে যেকোনো অগা মগা বগা লেখককে এই পত্রিকা আসমানে তুলে দিতে পারে| মহান লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে| আবার সত্যিকারের মহান কোনো লেখককেও ধরাশায়ী করতে পারে|

এই পত্রিকায় কারও লেখা ছাপা হওয়ার মানে (বিশেষ করে শারদীয় সংখ্যায়) লেখক হিসেবে কপালে স্থায়ী সিল পড়ে যাওয়া| এই সিলের কালি অলেপনীয় ধুলেও যাবে না| কপালে জলজল করতে থাকবে| এক সকালে দেশ পত্রিকার এক প্রতিনিধি আমার বাসায় উপস্থিত| তার সঙ্গে নানা গল্প হচ্ছে| গল্প তিনি করছেন আমি শুনছি| আমি ক্লাসে যাব, দেরি হয়ে যাচ্ছে|

ভদ্রতার খাতিরে বলতেও পারছি না| হাজার হলেও বিদেশি মেহমান| এক পর্যায়ে ভদ্রলোক বললেন, আমরা আপনার একটা উপন্যাস শারদীয় সংখ্যায় ছাপাব| তবে দেশে ছাপাব নাকি আনন্দবাজারে ছাপাব, নাকি সানন্দায় ছাপাব তা বলতে পারছি না| সাগরময়দা ঠিক করবেন| ভদ্রলোক হয়তো ধারণা করেছিলেন তার কথা শুনে আনন্দে আমি এমন লাফ দেব যে সিলিংয়ে মাথা ঠেকে যাবে|

আমি তা না করে শুকনো গলায় বললাম, হুঁ| ভেবে দেখি|

কী ভাববেন? পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কত বড় সুযোগ| আমি ঠাণ্ডা মাথায় বললাম, ভাই আমি সুযোগ সন্ধানী মানুষ না| আমি লেখক| লেখক কখনো সুযোগের সন্ধান করে না| সুযোগ লেখকদের সন্ধান করে| তার মানে আপনি লিখবেন না| আমি বললাম, শুধুমাত্র দেশ পত্রিকা যদি তার শারদীয় সংখ্যায় লেখা ছাপে তাহলেই পাণ্ডুলিপি পাঠাব| দেশ পত্রিকা ছাড়া না|

ভদ্রলোক মোটামুটি হতভম্ব অবস্থাতেই উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, যাই| নমস্কার|

আমি ধরেই নিয়েছিলাম এই বিষয়ে আর কিছু শুনব না| আশ্চর্যের ব্যাপার, পনেরো দিনের মাথায় দেশ পত্রিকার সম্পাদক চিঠি দিয়ে জানালেন তারা আমার একটি উপন্যাস শারদীয় দেশ পত্রিকায় ছাপাতে চান| হিমুকে নিয়ে লেখা একটা উপস্যাস পাঠালাম| ছাপা হলো| পরের বছর আবার চিঠি এবারও তারা একটি উপন্যাস ছাপাবেন| পাঠালাম আরেকটা হিমু|

পর পর ছয় বছর কিংবা সাত বছর আমি শারদীয় দেশ পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছি| বেশির ভাগই হিমুবিষয়ক রচনা| পশ্চিমবঙ্গের পাঠকরা আমার সাহিত্য প্রতিভা (?) সম্পর্কে কোনো ধারণা পেয়েছেন কি না জানি না| হিমু বিষয়ে ভালোই ধারণা পেয়েছেন| তার প্রমাণও পেলাম|

কলকাতায় গিয়েছি কোনো এক বইমেলায়| সে দেশে চেহারা দেখে আমাকে কেউ চিনবে না, কাজেই লেখকসুলভ নকল গাম্ভীর্য নিয়ে হাঁটাহাঁটি করার প্রয়োজন নেই| আমি মনের সুখে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাত্ আমাকে চমকে দিয়ে একজন আমার পা ছুয়ে বলল, দাদা আমি হিমু|

আমি অবাক হয়ে তাকিযে ধুতি পরা হিমু দেখছি| পাঞ্জাবি হলুদ রঙের| পায়ে জুতা নেই-খালি পা| লক্ষণ বিচারে হিমু তো বটেই|

আপনি কত দিন ধরে হিমু?

দুই বছরের উপর হয়েছে দাদা|

আমি বললাম, পাঞ্জাবির কি পকেট আছে?

পকেট নেই|

টাকা-পয়সা রাখেন কোথায়?

ভদ্রলোক পাঞ্জাবি উঠিয়ে দেখালেন, কেমারের কালো ঘুনসির সঙ্গে কাপড়ের ব্যাগ লাগানো-টাকা-পয়সা সেখানেই থাকে|

দাদা! আমি দুজনের ভক্ত| আপনার এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের| আপনাদের দুজনের ছবি ঠাকুরঘরে আছে|

আমি চমত্কৃত| সাত বছর দেশ পত্রিকায় লেখালেখির কারণে যদি কারও ঠাকুরঘরে ঢুকে যেতে পারি সেটা কম কী? গলায় সুর থাকলে গাইতাম অকত অধম জেনেও তো তুমি কম করে কিছু দাওনি|,

বিদেশে বেশ কিছু হিমুর দেখা পেয়েছি| বিদেশের হিমুরা কঠিন প্রকতির| একশ পার্সেন্ট খাঁটি ভেজালবিহীন হিমু| জার্মানির ফ্রাংকফুর্টের হিমুর কথা বলি| প্রচণ্ড ঠাণ্ডা| বরফ পড়বে পড়বে করছে, এখনো পড়া শুরু করেনি| এই ঠাণ্ডায় খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরে একজন উপস্থিত| গাল ভর্তি হাসি দিয়ে বলল, স্যার আমি হিমু|

কতদিন ধরে?

তিন বছরের বেশি হয়েছে| দেশেও হিমু ছিলাম| ছেলেটা এমনভাবে কথা বলছে যে হিমু একটা ধর্ম| সে ধর্ম পালন করছে| এর বেশি কিছু না| আমি হিমু ধর্ম প্রচারক|

গত বইমেলায় এক কাণ্ড ঘটল| মধ্যবয়স্ক একজন ভিড় ঠেলে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, স্যার, আমি ঠিক করেছি মার্চেও তিন তারিখ থেকে হিমু হব| হিমু হওয়ার নিয়মকানুন কী?

আমি বললাম, মার্চের তিন তারিখ থেকে কেন? আমার জন্মদিন মার্চের তিন| এখন স্যার নিয়মকানুন বলেন|

আমি নিয়মকানুন কী বলব? ভদলোকের দিকে তাকিয়ে আছি| কী বলব ভেবে পাচ্ছি না| আমাকে উদ্ধারের জন্য অন্যপ্রকাশের কমল এগিয়ে এল| সে গম্ভীর গলায় বলল, নিয়মকানুন সব বইয়ে দেওয়া আছে| বই পড়ে জেনে নিন|

হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হাঁটবেন| এইটাই প্রাথমিক বিষয়|

প্রতি পূর্ণিমায় জোছনা দেখতে জঙ্গলে যেতে হবে?

গেলে ভালো হয়, তবে দু-একটা মিস হলেও ক্ষতি হবে না|

চলবে ...
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×