পাললিক শিলার স্তরের আপেক্ষিক কাল নির্ধারন করার ব্যাপারে ভূত্বত্তে একটি বিধি চালু আছে,একে বলা হয় স্তর আরোপনের (Law of superposition) বিধি।এই অনুসারে কোণ ঘটনায় যদি শিলাস্তরগুলি উল্টে না গিয়ে থাকে তবে,ওপরের স্তরটি হবে নবীন এবং নিচের স্তরটি হবে প্রাচীন।
পৃথিবীর ইতিহাসের সময়কে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে।এর প্রথম ভাগটিকে বলা হয় প্রিক্যামব্রিয়ান যূগ,এর সময় প্রায় 4,000 মিলিয়ন বছর।পৃথিবীর ইতিহাসের শেষ 600 মিলিয়ন বছরকে তিনটি বড় বিভাগে ভাগ করা হয়েছে যেমন- প্যালিওজোয়িক,মেসোজোয়িক ও সেনোজোয়িক।এর প্রত্যেকটিকে আবার ছোট বড় বিভাগে ভাগ করা হয়েছে।প্রাচীন এই শিলার ভিতরে স্তরীভূত জীবাশ্ম পাওয়া যায় এবং এই জীবাশ্ম থেকে বিঞ্জানীরা শিলার আপেক্ষিক বয়স সম্পর্কে একটা ধারনা করতে পারে।কিন্ত প্রিক্যামব্রিয়ান যুগের শিলায় সাধারনত কোন জীবাশ্ম না থাকায় এই শিলার আপেক্ষিক বয়স নির্ধারন করা সম্ভব নয়।তবে শিলার কোন কোন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের অনুপাত থেকে বছরের পরিমাপে শিলার বয়স নির্ধারন করা সম্ভব,এই বয়স সাধারনত মিলিয়ন বছরে প্রকাশ করা হয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে শুধু জীবের পরিবর্তন হয়নি।ভূ-পৃষ্ঠের আলোড়নের ফলে সমুদ্রের সৃস্টি হয়েছে,মহাদেশ গড়ে উঠেছে,কখনও পর্বতমালার সৃস্টি হয়েছে।
সাধারনত মহাদেশের শিল্ড অঞ্চলগুলির নিচের অংশে থাকে প্রিক্যামব্রিয়ান যুগের প্রাচীন রুপান্তরিত শিলা ও গ্রানিট-জাতীয় শিলা।এই শিলার ওপর পরবর্তী যুগের পাললিক শিলা বা লাভা জমতে পারে।প্রাচীন এই শিলার স্তরগুলি ভূগর্ভের প্রচন্ড চাপ এবং তাপে রুপান্তরিত হয়ে যায় যেমন-কাদা পাথর রুপান্তরিত হয়ে স্লেট,ফিলাইট,বা মাইকা শিস্ট তৈরী হয়,বেলে পাথর থেকে তৈরী হয় কোয়ার্টজাইট,চূনাপাথর রুপান্তরিত হয়ে মারবেল তৈরী পাথর হয়।আবার বেসল্ট জাতীয় আগ্নেয়শিলা থেকে তৈরী হয় গ্রীনশিস্ট বা অ্যামফিবোলাইট বা পাইরকসিন্ গ্র্যানুলাইট।
আন্টার্কটিকার ভূ-মানচিএর দিকে তাকালে দেখা যায় একটি দীর্ঘ পর্বতমালা আন্টার্কটিকাকে দূভাগে ভাগ করে দিয়েছে-পূর্ব ও পশ্চিম আন্টার্কটিকা,এই পর্বতমালার নাম ট্রান্স-আন্টার্কটিক।
পূর্ব আন্টার্কটিকার অধিকাংশ এলাকা জুড়ে আছে প্রিক্যামব্রিয়ান যুগের শিলা,এই শিলার 95 শতাংশই বরফের নীচে ঢাকা পড়ে আছে,বাকি 5 শতাংশ উপকুলের বরফের মাঝ দিয়ে মাথা বের করে আছে।
পরিক্ষা করে দেখা গেছে যে 600 মিলিয়ন বছর থেকে 3600 মিলিয়ন বা এর থেকেও প্রাচীন পাথর দিয়ে পূর্ব আন্টার্কটিকার শিলা গঠিত।তবে সম্প্রতি রুশ বিঞ্জানীরা পূর্ব আন্টার্কটিকার নাপিয়ের শিলাস্তর থেকে প্রায় 4000 মিলিয়ন বছরের পুরানো পাথর খুজে পেয়েছেন।
পূর্ব আন্টার্কটিকার অধিকাংশ শিলাই রুপান্তরিত শিলা,গ্রানিট এবং মিশ্র শিলা বা মিগমাটাইট দিয়ে তৈরী।এই শিলার ইতিহাস বেশ জটিল।বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রার শিলারুপান্তরের ছাপ এদের উপর পড়েছে,এবং গ্রানিট জাতীয় শিলা এদের মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং এরা বিরুপিত (Distorted) হয়েছে।এই কারনে শিলাগুলির বর্তমান চরিএ নির্দিস্ট হয়েছে।
পূর্ব আন্টার্কটিকার শিলাপীঠের অনেকটা অংশই ভূ-পৃস্টের গভীরের শিলা দিয়ে তৈরী হয়েছে।এই শিলার উপরিভাগ ক্ষয়ে যাবার ফলে গভীরের শিলাগুলিকে আজ ভূপৃস্টের উপরে দেখা যায়।পূর্ব আন্টার্কটিকার অনেক জায়গা জুড়ে গ্র্যানুলাইট ফেশিস-এর রুপান্তরিত শিলা দেখতে পাওয়া যায়,এই শিলার সৃস্টি হয় ভূপৃস্টের গভীরে উচ্চ তাপ ও চাপের ফলে।পূর্ব আন্টার্কটিকার শিলার স্তরগুলি এক এক জায়গায় এক এক রকম,কারন এগুলি তৈরী হয়েছিল বিভিন্ন সময়,যেমন পূর্ব আন্টার্কটিকার নাপিয়ের অরোজেনিক প্রায় 4000,এবং রেনার অরোজেনিক মন্ডল তৈরী হয়েছিল প্রায় 3000 হাজার মিলিয়ন বছর আগে।এবং 2000 মিলিয়ন আগে তৈরী হয়েছিল সব শেষ ইনসেল অরোজেনিক মন্ডল।
পূর্ব আন্টার্কটিকার ভূ-ইতিহাস এবং ট্রান্স্-আন্টার্কটিক পর্বত মালার ভূ-ইতিহাস এক নয় পূর্ব আন্টার্কটিকার শিলা বর্তমানে একটি স্স্হিতিশীল শিল্ড তৈরি করেছে,আর ট্রান্স-আন্টার্কটিক পর্বতমালা এই শিল্ড তৈরি হওয়ার অনেক পরে তৈরি হয়েছে, অনেক সময় দেখা যায় ভগ্নিল পর্বতমালার ভিতরের গঠন অনেক প্রাচীন,কিন্ত এর বর্তমান গঠন অনেক পরে হয়েছে।এই পর্বতমালার সৃস্টি হয়েছে প্রিক্যামব্রিয়ান যুগের একবারে শেষের দিকে,1000 থেকে 600 মিলিয়ন বছর আগে।প্যালিওজোয়িক যুগের গোড়ার দিকে এই এলাকার পাথরগুলো ক্ষয়ে যায় এবং ভূ-পৃস্টে অবনমিত হয়,এবং ভূ-পৃস্টের অপেক্ষাকৃ্ত অগভীর এলাকায় চূনের সাথে কিছু কাদা ও বালি মিশে একটি শিলাসমস্টি গঠন করে,একে বলা হয় রস্ কমপ্লেস্ক এই রস্ কমপ্লেস্ক-এর পাথর গুলি আস্তে আস্তে ওপরে উঠে ভগ্নিল পর্বতমালার সৃস্টি করে।আন্টার্কটিকার এই পর্বত সৃস্টির ঘটনাটিকে রস্ অরোজেনি্ক বলে।
বর্তমানে আন্টার্কটিকার সব থেকে গতিশীল অঞ্চলটি হলো পশ্চিম আন্টার্কটিকা অথবা আন্টার্কটিকার উপদ্বিপ অঞ্চল।এখানকার ভূ-ইতিহাস পূর্ব আন্টার্কটিকা ও ট্রান্স-আন্টার্কটিকার ইতিহাস থেকে সম্পূর্ন আলাদা।
আধূনিক কালের ভূতাত্তিক গবেষনায় আন্টার্কটিকার গতিশীলতার কিছু কিছু প্রমান পাওয়া যায়।আন্টার্কটিকার তটভূমি আধূনিকালে কিছুটা উপরে উঠেছে।উপকুলের কাছাকাছি বর্তমান সমুদ্রপৃস্ট থেকে 30,70,80 মিটার উচ্চতায় প্রাচীন সৈকতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে।এর থেকে বলা যায় যে আন্টার্কটিকার উপকূলটি খুব ধীরগতিতে হলেও আস্তে আস্তে উপরে উঠছে।
এই হলো আন্টার্কটিকার সংক্ষিপ্ত ভূ-ইতিহাস।
সহায়ক বইঃ C.Craddock(Ed).Antarctic Geo Science 1982।
R.S.Dietz.Continent and ocean basin evolution by spreading
of the sea floor.1961.
Arthur Holmes.The Principle of Physicel Geology 1957.
ছবি সৌজ্যন্যে:গুগল
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০১২ দুপুর ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



