গত এক দশকে সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও কোমল পানীয় নামের এ ক্ষতিকর বিষের প্রভাব সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য সচেতনতা গড়ে উঠেছে। ইন্টারনেট ও দেশী বিদেশী পত্র-পত্রিকার এসব পানীয়ের স্বাস্থ্য সংহারী প্রভাব নিয়ে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন। কোমল পানীয়ের জগতে আরেকটি নতুন সংযোজন এনার্জি ড্রিংকস। কি আছে এই কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসে? একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই সাম্প্রতিক গবেষনালব্ধ এসব তথ্য জানা থাকা প্রয়োজন। কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকস এ এন্টি ফ্রিজার হিসেবে মেশানো হয় একটি রাসায়নিক উপাদান। যার নাম ইথিলিন গ্লাইকল। মানবদেহের জন্যে মারাত্বক ক্ষতিকর এ বিষাক্ত উপাদানটি ধীরে ধীরে নীরব বিষক্রিয়ার মাধ্যমে কিডনী বৈকল্য ঘটাতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে বিশ্বজুড়ে গত কয়েক দশকে সববয়সী বিশেষত শিশুদের মধ্যে কিডনী রোগ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এ কোমল পানীয়। কিডনী ছাড়াও ব্রেন ও লিভারের ওপর ইথিলিন গ্লাইকলের ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারনা। ইথিলিন গ্লাইকলের পাশাপাশি কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসে মেশানো হয় কিছু কৃত্রিম রঙ। যেমন- টারট্রাজিন, কারমোসিন, ব্রিলিয়ান্ট ব্লু, সালফেট ইয়েলো ইত্যাদি। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এগুলোর বিক্রি নিষিদ্ধ। কারণ বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন এ উপাদানগুলো ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
এছাড়াও কোমল পানীয়তে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয় সোডিয়াম বেনজয়েট বা বেনজয়িক এসিড। এ উপাদানটি অনেকের ক্ষেত্রেই হাঁপানি ও চর্মরোগের কারণ। কোনো তরল কতটা এসিডযুক্ত হবে তা নির্ভর করে তার pH মানের ওপর। যে পানীয়ের যত কম pH হবে সে পানীয় তত এসিডিক হবে। কোনো পানীয়ের pH ৫.৫ বা তার কম হলে সে পানীয় শরীরের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর বলে বিবেচিত। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপারটি হলো ব্রিটিশ কোমল পানীয় সমিতি (British soft drink association) বিভিন্ন ব্রান্ডের কোমল পানীয়ের মাত্রা সনাক্ত করে যে ছক প্রকাশ করেছেন তাতে দেখা যায় এদের প্রত্যেকটির মান ৩ এর কম। তাদের সমীক্ষা অনুযায়ী বাজারের সবচেয়ে জনপ্রিয় কোমল পানীয়টির pH এর মান ২.৪-২.৮ এর মধ্যে। কোমল পানীয় পানের ফলে শরীরে জমা হতে থাকা এসিড দাঁত ও হাঁড়সহ মানব দেহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতিসাধন করে। ঝাঁঝালো স্বাদের জন্যে কোমল পানীয়তে মেশানো হচ্ছে ফসফরিক এসিড। যা ইতিমধ্যেই দাঁতের এনামেল আর শরীরের হাঁড়ের অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোমল পানীয়ের বোতলে একটি দাঁত ফেলে রেখে দিলে তা ১০ দিনের মধ্যে গলে যায়। কোমল পানীয়ের ফসফরাস শরীরে জমে দীর্ঘমেয়াদে এটি হাড়কে ভঙ্গুর করে দেয়। শুধু তাই নয়, শারীরিক পরিশ্রমের পর কোমল পানীয় পান করলে এতে থাকা ক্যাফেইন শরীরের ক্যলসিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে। যার ফলে শরীর থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ ক্যালসিয়াম প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়। এটি হাঁড়ক্ষয় প্রক্রিয়াকে তরাণ্বিত করে।
কোমল পানীয়তে আরো আছে অত্যধিক ক্যাফেইন। এটি একটি আসক্তিকর মাদক যা শরীরের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সাময়িকভাবে উত্তেজিত করে, হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। এ সাময়িক উত্তেজনা শরীরের স্বাভাবিক প্রানশক্তিকে প্রভাবিত করে এবং কিছু সময় পরেই শরীরে অবসন্ন ভাব সৃষ্টি করে। ফলে ধীরে ধীরে দেখা দেয় অনিদ্রা, স্নায়বিক দূর্বলতা বা নার্ভাসনেস এবং উদ্বেগ। ক্যাফেইন শরীরের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দনকে বাঁধাগ্রস্থ করে। গবেষণায় দেখা গেছে মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন মূত্রাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সারসহ কমপক্ষে ৬ ধরণের ক্যান্সার ও উচ্চরক্তচাপের অন্যতম কারণ। ক্যাফেইন শিশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটিও সৃষ্টি করতে পারে। পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালের ওপরও রয়েছে ক্যাফেইনের ক্ষতিকর প্রভাব। কোমল পানীয়ের আরেকটি উপাদান হলো কার্বন-ডাই-অক্সাইড। যা আমরা নিঃশ্বাসের সাথে শরীর থেকে বর্জ্য হিসেবে বের করে দিই। অথচ এটি কোমল পানীয় পানের মাধ্যমে এটিই আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মিষ্টি স্বাদ আনার জন্যে এক বোতল কোমল পানীয়তে মেশানো হয় গড়ে প্রায় ৬ চামচ চিনি বা গ্লাকোজ। এই বাড়তি চিনি শরীরে সৃষ্টি করে মেদস্থুলতা পরবর্তীতে যার অবধারিত পরিণতি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, রক্তনালীর স্থায়ী সংকোচন, স্ট্রোক ও অকালমৃত্যু। গত কয়েক দশকে সারা বিশ্বে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকে অকালমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় কমন ফ্যাক্টর হিসেবে কোমল পানীয়ের একটি উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য গবেষকরা।
তাই যেসব বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানটির বায়না রাখতে এক বোতল কোমল পানীয় কিনে দিচ্ছেন তিনি আসলে তার সন্তানের অকাল মৃত্যুকেই ডেকে আনছেন। চিনির মাত্রাধিক্যের কারণে সিঙ্গাপুর সরকার ১৯৯২ সালে কোকাকোলা, পেপসিসহ সকল ধরনের কোমল পানীয় স্কুল পর্যায়ে বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কোমল পানীয় প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের মিনারেলস্ বা খনিজ পদার্থ বের করে দেয়। উল্লেখ্য, শরীর থেকে এসব পদার্থ যত বেরিয়ে যাবে তত হাঁড়ের অসুখ অস্টিওপোরোসিস, অস্টিওআর্থারাইটিস, থাইরয়েড গ্লান্ডের জটিলতা, হাইপোথাইরয়োডিজম, হৃদরোগ বা করোনারী আর্টারী ডিজিজ ও উচ্চরক্তচাপসহ অকাল বার্ধক্যের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন অসংখ্য রোগের সম্ভাবনা বাড়তে থাকে।
তথ্যগত বিভ্রান্তির ফলে আমরা অনেক সময় আমাদের আচরণে চূড়ান্ত বোকামীর প্রকাশ ঘটাই। এর মধ্যে সবচেয়ে হাস্যকর বোকামীটি হচ্ছে বিয়ে ও নানা সামাজিক উৎসবে ভরপেট খাওয়ার পর কোমল পানীয় পান। আমাদের অধিকাংশেরই ধারণা হলো তখন কোমল পানীয় পান করলে খাবারটা ভালো হজম হবে। এ ধারণার অসারতা বুঝতে কিছু তথ্য জানা প্রয়োজন। খাবার সবচেয়ে ভালো হজম হয় যখন পাকস্থলীর তাপমাত্রা থাকে ৩৭ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। এ তাপমাত্রায় পাকস্থলীর এনজাইম বা পাচকরস খাবার হজমের জন্যে সবচেয়ে উপযোগী অবস্থায় থাকে। কিন্তু ভরপেট খাওয়ার পরই আপনি যখন আপনার পাকস্থলীতে শূন্য থেকে চার ডিগ্রী তাপমাত্রার কোমল পানীয় ঢেলে দেন তখন স্বাভাবিকভাবেই হজমের পুরো প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। হজমের বদলে তখন পাকস্থলীতে থাকা খাবার গাঁজন প্রক্রিয়ায় পঁচতে শুরু করে। কোমল পানীয় পানের কিছুক্ষন পর খাবার হজমের লক্ষন মনে করে আপনি যে তৃপ্তির ঢেকুরটি তোলেন তা আসলে খাবার পচনের ফলে সৃষ্ট গ্যাস।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেও কোমলপানীয় বর্জনীয়। ব্রিটিশ সানডে টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কোকাকোলায় রয়েছে এলকোহল। এ প্রসঙ্গে ইনসুলিনের আবিস্কারক ডা. চালর্স বেস্ট দাবি করেন যে, কোমল পানীয়ের সাথে অনেকাংশেই হার্ড ড্রিংকস্ বা মদের মিল আছে। যারা অধিক পরিমানে কোমল পানীয় পান করে তাদের ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিস এর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়। নিয়মিত যারা মদ্যপান করেন তাদেরও এ সমস্যাটি দেখা যায়। কোকাকোলায় অ্যালকোহলের অস্তিত্ব থাকার কারণেই হয়তো গত এক শতাব্দী ধরে কোকের ফমূর্লা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে কোকাকোলা কোম্পানী। আর এ ব্যাপারে তারা এ পর্যন্ত দুজন বিচারকের আদেশকেও অমান্য করেছে। প্রখ্যাত গবেষক মার্ক পেন্ডারগ্রাস্ট তার একটি গ্রন্থে কোকের ফর্মূলায় অ্যালকোহলের উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, শিশুরাও মদ খাচ্ছে। কারণ মা-বাবা তাদের হাতে কোকের গ্লাস তুলে দিচ্ছেন।
মিথ্যা প্রচার আর মন মাতানো বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে এ যুগের মানুষ কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসের প্রানঘাতী ফাঁদে পা দিয়েছে। কিন্তু আমাদের সবারই খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে, স্বাস্থ্য আপনার, আর একে সুস্থ রাখার দায়িত্বও আপনার। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসসহ এরকম যত কৃত্রিম ও প্যাকেটজাত পানীয় রয়েছে তাতে কোনো উপকারী উপাদানতো নেই-ই বরং এগুলোতে প্রচুর ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। তাই এসব জঞ্জাল শরীরের জন্যে সত্যিকার অর্থে অপ্রয়োজনীয়। কারণ শরীরে পানির চাহিদা মেটাতে সাধারণ বিশুদ্ধ পানীয় জলই যথেষ্ট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

