somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নৈসর্গ হিমাচল - ২

১২ ই আগস্ট, ২০১১ দুপুর ১২:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যানজট ছুটতেই ফিরতি পথে চলতে শুরু করলো আমাদের গাড়ি। পথে দু’জায়গায় গাড়ি দাঁড় করালাম প্যারা-গ্লাইডিং ও হেলিকপ্টার রাইডিং দেখার জন্যে। প্যারা গ্লাইডিং এ দুই আসনের একটিতে আরোহী ট্যুরিস্ট ও অন্যটিতে ইনস্ট্রাকটর, একপাল্লা বিশিষ্ট প্যারাসুট মেলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পর্বত চূড়া থেকে হাজার ফুট নিচে। ধীরে ধীরে অনেকটা চিলের মতো ভেসে ভেসে মর্ত্যে নেমে আসা। রোমাঞ্চকর এই গ্লাইডিং ও সীমিত বাজেটের কারণে বাদ দিতে হলো। অদ্ভুত মাউটিং বাইকিং করতে দেখলাম সাদা চামড়ার কিছু পর্যটকদের। ডাবল পেডেল সাইকেল দিয়ে খাড়া পাহাড়ে ওঠার প্রাণান্তকর ও হাস্যকর চেষ্টা।
পথে একটি হিল হলটিং-এ লাঞ্চের নামে বালি ও পাথর মিশ্রিত ভাত ও ডিমের তরকারী খেলাম। মানালী শহরে যখন নেমে এলাম তখন বিকেল প্রায় শেষ।
দেশের সাথে যোগাযোগ নেই অনেকদিন। তাই মেরাজ ভাইকে ফোন করলাম। ফাঁকে শেয়ার বাজারের খবরা-খবরও নিলাম। সিম কার্ডটি কলকাতা থেকেই কেনা তাই আইএসডি ও মানালীর রোমিং চার্জ সহ ব্যাপক বিল উঠে গেল; বাংলাদেশের তুলনায় যা কল্পনাতীত। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করলাম। তারপর মেলের উদ্দেশ্যে বেরুলাম ডলার ভাঙাতে। যেতে যেতে বিনোদ জানালো এখানকার রেড ওয়াইন নাকি বিখ্যাত। তাকে বললাম লিকার শপে নিয়ে যেতে। চোখে দেখলাম, সুদৃশ্য বোতল ভরা হালকা লাল রঙের পানীয়টি সত্যিই সুস্বাদু। নেমে আসা সেই শীতল-ধূসর সন্ধ্যাকে দারুণ উপভোগ্য করে তুলল। এর মধ্যেই নোমান জানালো আজ তার ছোট মেয়ে আরিনার জন্মদিন এবং এখানে, মানালীতেই তা উদযাপন করার প্ল্যান আছে তার। বেশ বেশ, ডলার এক্সচেঞ্জারকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো বার্থ-ডে কেক কোথায় পাওয়া যায়। পরে হোটেলে ফিরে নোমান আবার বেরুল ফারহানা ভাবীকে সাথে করে; উদ্দেশ্য মেল দেখা; স্যুভেনিয়র হাটিং বা শপিং, বার্থডে সরঞ্জাম ইত্যাদি কেনাকাটা। আমি গেলাম হোটেলের খোলা লবিতে। কিছুক্ষণ আগে পান করা ওয়াইনের আমেজ শারীরিক ক্লান্তি দূর করে মেজাজকে ফুরফুরে করে দিয়েছে।
ধীরে ধীরে রাত নামছে। উত্তর পশ্চিমে বাতাস বইছে মন্থর। সেই সাথে নামছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। শেষে শীতের কামড় থেকে বাঁচতে রুমে ফিরতে বাধ্য হলাম। বিশাল কাঁচে ঘেরা জানলার পর্দা সরাতেই আবছা আলোয় সামনের পাহাড়টিকে দেখলাম। নিশ্চুপ নিঃস্তব্ধ পরিবেশ। চাঁদ দেখা না গেলেও আকাশটাকে বড্ড প্রাণবন্ত লাগছে, মিটমিট করছে লক্ষ কোটি নক্ষত্র! নির্ভেজাল এই প্রকৃতিতে নিজেকে হারালাম কিছুক্ষণের জন্যে। রাত নয়টার দিকে নোমানরা ফিরলে হোটেলের ডাইনিং -এ ডিনারে গেলাম। প্রথমে কেক কেটে, বেলুন ফুটিয়ে আরিনার জন্মদিন উদযাপন করা হলো। ইসাবা আর কান্তম-ই মজা করলো বেশি। পরে নোমানের সৌজন্যে স্পেশাল ডিনার। বেশিরভাগ আইটেমই চাইনিজ ফুডের। পেটে দানাপানি পড়তেই রোথাং পাসের জার্নির ক্লান্তি শরীর জাঁকিয়ে বসলো। তাই সাড়ে দশটার মধ্যে হোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম যে যার রুমে।
রাতে পর্দা টেনে দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। সকালে তাই ঘুম ভাঙলো কড়া ডোজের একফালি রৌদ্দুর চোখে এসে পড়তেই। দেখি সকাল আটটা বিশ! সবাইকে ডেকে তুললাম; ফ্রেশ হয়ে হোটেলের উপরে নির্মাণাধীন খোলা রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করলাম আলু পরাটা, ছোলা বাটুরা ও সেদ্ধ ডিম দিয়ে। প্রথম দু’টি নতুন আইটেম হলেও বেশ উপাদেয় লাগলো।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল ধর্মশালা। মানালী থেকে দূরত্ব প্রায় ২৫০ কি.মি.। পাহাড়ি পথ, প্রায় ৮/৯ ঘণ্টার জার্নি। পুরোটা দিনই পথে পথে যাবে তাই ড্রাইভার বিনোদের আপত্তি উপেক্ষা করেই সবাই মিলে ক্যামেরা হাতে ঢুকে পড়লাম হোটেলের পেছনের আপেল ও পালাম বাগানে। মাথা সমান ছোট ছোট গাছে শয়ে শয়ে আপেল ধরে রয়েছে। মাঝারি সাইজের সবুজ রঙের এই আপেলগুলোকে দূর থেকে দেখলে পেয়ারা বলেই ভ্রম হয়। সবাই মিলে আপেল বাগানে নানা ঢঙে সমানে ছবি তুলছি। এর মাঝেই আমার স্ত্রী টুম্পা প্রায় সাতটির মতো আপেল ছিঁড়লো চুরি করে, কোথায় লুকাবে! কোথায় লুকাবে!! চিন্তা করতে করতে কয়েকটি নিজের হ্যান্ডব্যাগে, কয়েকটি কান্তমের জামার নীচে, কয়েকটি জিন্সের পকেটে রাখলো। এদিকে ভয়ে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। কারণ এখানে মানালীতে বাগান থেকে আপেল ছেঁড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে বিশ হাজার রুপি জরিমানা। এর কারণটি হচ্ছে আপেলই এখানকার একমাত্র অর্থকরী ফসল। অবশ্য কোন রকম বিব্রতকর পরিস্থিতির মোকাবেলা ছাড়াই মানালী ছাড়লাম আমরা বেলা দশটায়।
উত্তর হিমাচলের আরেকটি জেলা ধর্মশালা। পাইন ও দেবদারুর সবুজে ঘেরা এই শৈলশহরকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে হিমালয়ের তুষার আবৃত সুউচ্চ শৃঙ্গ ধোলাধর। ইতিহাস হিসেবে জানা যায় পাঞ্জাবের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর, ইংরেজ লাট ডেভিড ম্যাকলিয়ড ১৮৪৮ সালে এই শহরের পত্তন করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৭৮০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই শহর নির্মাণের প্রধান কারণ ছিল সমতলের অত্যধিক উষ্ণতা। ম্যাকলিয়ড সাহেবের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবেই এই শহরের নামকরণ হয় ম্যাকলিয়ড গঞ্জ। ১৯০৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে পরিত্যক্ত হয়ে ওঠে এই নগরী। পরে চীন কর্তৃক তিব্বত অধিগৃহীত হওয়ার পর ১৯৫৮ সালে চতুর্দশ দালাইলামা তেনজিন গিয়াৎসো তাঁর কিছু অনুগামীসহ গোপনে দেশত্যাগ করে এখানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। দালাইলামার অনুসারী গাংচেন কিশয়াং, যোগীবাবা, গমরু, হিরু, ভাগসু, ধরমকোট ও নাদি সম্প্রদায়ের লোকজন ক্রমশ ভিড় করতে থাকে এখানে। ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে এই শহর। বর্তমানে দুই থেকে তিন হাজার তিব্বতী উদ্বাস্তু ও সমান সংখ্যক তিব্বতী ভিক্ষুর বাস এখানে। দুটিভাগে বিভক্ত এই শহরের উপরের অংশকে আপার ধর্মশালা এবং নিচের অংশকে লোয়ার ধর্মশালা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটক (মূলত পশ্চিমা দেশীয়) ধর্মশালায় ভিড় করে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে। অনেকে দালাই লামার সাথে সাক্ষাৎ, বৌদ্ধ ধর্মীয় সংস্কৃতি-কৃষ্টি ও শিক্ষা লাভের আশায় এখানে আসেন। আধ্যাত্মিক যোগ-কেন্দ্র (মেডিটেশন) আছে বেশ কয়েকটা এই ধর্মশালায়।
মানালী থেকে মান্ডী হয়ে যখন উপরের ধর্মশালায় পৌঁছলাম তখন রাত দশটা। পথে ঝাটিং গ্রি, যোগীন্দ্রনগর, পালামপুর নামক বিভিন্ন পাহাড়ি জনপদ ও শহর অতিক্রম করলাম আমরা। অতি সংকীর্ণ, খাড়া ও প্যাঁচানো সড়কপথটি যেখানে শেষ হলো তার অদুরেই আমাদের জন্যে বুকিং করে রাখা হোটেল। দীর্ঘ জার্নির ধকলে সবারই মন মেজাজ এমনিতেই তিরিক্ষি হয়েছিল, তা আরও চরমে পৌঁছল হোটেল রুম দেখে। বিদেশ ভূঁইয়ে, তাই আমি ও নোমান দমে গেলেও সতর্কতার সাথে ট্রাভেল এজেন্টের সাথে আলাপ করতে লাগলাম। এদিকে আমাদের স্ত্রীরা ড্রাইভার কাম গাইড বিনোদকে চিটিং বদমাশ বলে সরাসরি বাক্যবানে আক্রমণ করে বসলো। উপায়ন্তর না দেখে হোটেল বদলিয়ে দিতে বাধ্য হলো এজেন্ট। মিনিট তিনেকের দূরত্বের যে হোটেলটিতে আমরা উঠলাম তা মোটামুুটি চলনসই হলেও রাতের বেলা তেমন কিছু লক্ষ্য করলাম না। নোমানরা দোতলায় ও আমরা তিন তলায়। স্নান শেষে নোমানদের রুমের পাশে ডাইনিং এ এসে দেখলাম ডিনারের অর্ডার দেয়া হয়ে গেছে। ভেতো বাঙালি আমি, উপরন্তু মেজাজ ছিল চড়া; তাই ভাতের পরিবর্তে আলুপুরীর অর্ডার দেওয়াতে একচোট নিলাম নোমানকে। পরে অবশ্য বেশ অনুশোচনায় ভুগেছিলাম এর জন্যে।
খুব ভোরে ঘুম ভাঙলে হঠাৎ মনে হলো সময় যেন স্থির হয়ে আছে। বিছানায় শোয়া আমি, শুধু পায়ের ওপরে যে জানালাটা চোখে পড়ছে, সেখানে একটুকরো চারকোণা আকাশ দেখতে পেলাম, ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছে সেখানে। টুম্পাকে না জাগিয়ে নিঃশব্দে হোটেল বারান্দায় এলাম। রাতের অন্ধকারে খেয়ালই করিনি কোথায় এসে উঠেছি। কিন্তু এখন যা দেখলাম তাতে গতরাতের সব তিক্ততা ঘুচে গেল। গাঢ় সবুজ পাইনবন তার ঠিক উপরে বরফ আবৃত এক বিশাল পর্বত দাঁড়িয়ে আছে যেন আমার জন্যে। অভূতপূর্ব এই অনুভূতির কোন ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। ধীরে ধীরে আলো ফুটছে আর উত্তুঙ্গ ধৌলধর পর্বত শৃঙ্গ ক্রমশ রক্তিম থেকে সোনালী বর্ণ ধারণ করছে। প্রাকৃতিক এই নৈসর্গতায় নিজেকে খুব সাদামাটা ও তুচ্ছ মনে হলো। মনে মনে পাহাড়ি এই গভীর অরণ্যের মাঝে গড়ে তোলা এই রিসোর্টের স্থপতির প্রশংসা না করে পারলাম না। এতক্ষণ টের না পেলেও প্রচণ্ড শীতের এক ঝলক হাওয়া হাঁড় কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। রুমে ঢুকে জ্যাকেট চড়িয়ে বেরিয়ে এলাম হোটেল ছেড়ে। দুর্লভ এই প্রকৃতিকে একটু কাছ থেকে অনুভব করা চাই! রিসোর্টের সামনের পায়ে চলা পথটিই ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে নেমে গেছে শহরের দিকে। তার ঠিক উল্টো দিকের পথটি ধরলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা একটি ক্ষীণ স্রোত ঠিক নালার মতো আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করেছে পথটিকে। পারাপারের জন্যে সুদৃশ্য এক কালভার্ট রয়েছে ওখানে। ঘন পাইনবন ক্রমশ খাড়া পাহাড়ের গায়ে মিশেছে এমনভাবে যে মাটির অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সূর্য উঠে এলো শৃঙ্গের মাথায়। আরও প্রায় মাইলখানেক হেঁটেও সুস্পষ্ট কোন ট্র্যাক না পেয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। ইতিমধ্যে হাঁপ ধরে গেছে। তীক্ষ্ম ঢালু সে পথ বেয়ে নেমে আসতেই পেরিয়ে গেল আধঘণ্টা। চল্লিশ মিনিটের মাথায় হোটেলে পৌঁছলাম। এই যাওয়া আসার পথে বেশ কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ যুবক-যুবতী ও তিব্বতী-ভিক্ষুর দেখা পেলাম। এই ভোরেও কারও কোন রূপ কৌতূহল না জাগিয়ে যে যার উদ্দেশ্যে চলছে।
প্রচণ্ড ভালোলাগার ঘোরে আমি হোটেলে ফিরে সবাইকে জাগালাম। খানিকক্ষণ আগে হওয়া অভিজ্ঞতার কথা জানাতেই সবাই আমাকে দোষারোপ করলো তাদের জাগাইনি বলে। বেশ ঠাণ্ডা এখানে তবুও গিজারের গরম ও ঠাণ্ডা জলে বেশ কিছুক্ষণ স্নান করলাম। বেরিয়ে দেখি সবাই কাপড়-চোপড় পরে ফিটফাট। এরই মধ্যে ব্রেকফাস্ট আসতেই খেয়ে নিলাম। সবাইকে নিয়ে শহরে নেমে এলাম। সংকীর্ণ পরিসরে ছোটখাট একটি বিপনি কেন্দ্র গড়ে উঠেছে এখানে সিকি মাইল আয়তনের জায়গার মধ্যেই। অনেকগুলো দোকানপাট এরই মধ্যে খুলে গেছে আর তা দেখে শপিং স্পেশালিস্ট ফারহানা ভাবি ও আমার বউ আনন্দে আটখানা। কতক্ষণ এই দোকানে, কতক্ষণ ওই দোকানে ছোটাছুটি করছে। বিপনির এক পাশে পথের উপর এক স্থানীয় মহিলাকে দেখলাম ট্যুরিস্টদের গায়ে উল্কি আঁকতে। ইচ্ছে হলেও স্বল্প বাজেটের কথা চিন্তা করে বাদ দিলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম বিভিন্ন প্রকার উল্কির ধরন ও এর প্রয়োগ পদ্ধতি। দু’ঘণ্টার মাথায় বিনোদ এসে জানালো ডালহৌসির উদ্দেশ্যে আমাদের এখনই রওনা দিতে হবে নতুবা পৌঁছতে পৌঁছতে গতকালের মতো রাত হয়ে যাবে। হাতে বেশি টাকা না থাকাতে আমার বউকে ফিরিয়ে আনা সহজ হলেও ফারহানা ভাবীকে ফেরাতে নোমানকে বেশ বেগ পেতে হলো! ধর্মশালা যখন ছাড়ছি তখন বেলা প্রায় সাড়ে দশটা।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মিনি সুইজারল্যান্ড হিসেবে খ্যাত ডালহৌসির খিজিয়ার। ধর্মশালা থেকে বাই পাস রোড ধরে শাহপুর, সেখান থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে নুরপুর। ছোট ছোট জনপদ লাহরু, টুনুহাটি দিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ছেড়ে আয়তনে সংকীর্ণ ও পৃথক পাহাড়ি সড়ক ধরে ডালহৌসি পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা তিনটা।
সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে নয় হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ডালহৌসি পাঁচটি শৈলশিখর নিয়ে গঠিত। চতুর্দিকে তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আক্ষরিক অর্থে স্থানটিকে ভুস্বর্গে পরিণত করেছে। শহরের চারদিকে নয়নাভিরাম সবুজ, তার মাঝে স্কটিশ ও ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যে নির্মিত বাংলো আর গীর্জা স্থানটিকে দিয়েছে মার্জিত লাবণ্য। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শহরটিতে উঠার পথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেখা মিললো। তাদের অধিকাংশই শিখ/জৈন সম্প্রদায়ের। কিছুদুর পেরুতেই নজরে এলো সুশৃংখল পরিবেশের ভারতীয় সেনানিবাস। অনেকগুলো প্রাচীন মন্দিরের চূড়াও দৃষ্টিগোচর হলো যাদের গন্তব্য পথ কঠিনতম পাহাড়ি ঢালে নির্মিত। তীক্ষ্ণ বাঁকগুলো সত্যিই দুর্গম।
মূলতঃ ডালহৌসি প্রাচীন চাম্বা পার্বত্য রাজ্যের (বর্তমান হিমাচল প্রদেশের জেলা) প্রবেশ পথ। খ্রীষ্টিয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে এক সুপ্রাচীন রাজ বংশের শাসনাধীন এই রাজ্য হিন্দু সংস্কৃতি, শিল্পকলা, মন্দির ও হস্তশিল্পের জন্যে বিখ্যাত। চাম্বা এই সংস্কৃতির কেন্দ্র স্থল। এই রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী ভারসৌর গদ্দি ও গুজর উপজাতির বাসভূমি। বেশিরভাগ মন্দিরই খ্রীষ্টিয় সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি খিজিয়ারে গিয়ে পরে ডালহৌসিতে ফিরে কোনো হোটেলে থাকা। কিন্তু খিজিয়াদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের এতটাই বিমোহিত করলো যে ট্রাভেল এজেন্টকে বাধ্য করলাম খিজারিতেই থাকার ব্যবস্থা করতে। হোটেল ভাড়া বেশ চড়া এখানে, তাই শিবমন্দির কর্তৃক পরিচালিত অপেক্ষাকৃত একটি কম ভাড়ার হোটেলে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হলো। নোমানরা এবার দোতলায় আর আমরা নীচতলায়। পাইন ও ফারের সমারোহ তিন দিকের পাহাড়ে, অন্যদিকে চাম্বা ভ্যালির নিচু উপত্যকা। হোটেলের সামনেই পিচঢালা একমাত্র রাস্তাটি সেতুবন্ধন রচনা করেছে অন্যান্য জেলার সাথে।
স্নান শেষে সবাই ফ্রেশ হয়ে মন্দির দর্শনে বেরুলাম। হোটেলের ঠিক পেছনেই মন্দিরের খোলা চাতালে ত্রিশূলধারী ব্রোঞ্জের শিবমূর্তিটি দেখে একাধারে চমৎকৃত ও বিস্মিত হলাম সবাই। প্রায় ১১ তলা সমান উচ্চতার মূর্তিটির নির্মাণশৈলী এত নিখুঁত ও চমৎকার যে এর সঠিক শৈল্পিক মান অনুধাবন করা কঠিন।
আমাদের গাড়ির পরিচিত ভেপু শুনে সবাই হোটেল চত্বরে ফিরে এলাম। ড্রাইভিং সিটে বসা বিনোদ ইশারায় সবাইকে উঠতে বললো। রওনা হলাম খিজারির মূল আকর্ষণ গ্রীন ফিল্ডে। সেখানে আরেক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। চারপাশে ঘন সারিবদ্ধ কার ট্রি মাঝে নয়নাভিরাম সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত সুবিশাল ময়দান। আয়তনে যা চারটি ফুটবল স্টেডিয়ামের সমান। মুহূর্তেই মনে হলো সত্যিই বুঝি সুইজারল্যাণ্ডের মাঠ এটি! জায়গাটি মূলত মালভূমিই। মাঠের একপাশে বাচ্চাদের বিভিন্ন খেলার আয়োজনসহ দু’তিনটি রেস্তোরাঁ চোখে পড়লো। আমার মেয়ে কান্তমকে কোল থেকে নামাতে অতি পরিচিত জায়গার মতোই খোলা মাঠে দৌঁড়তে শুরু করলো। প্রান্তরের বিশালতা যেন খুঁদে এই শিশুর মনকেও আনন্দে বিহ্বল করে তুলেছে। সে ছুটছে তো ছুটছেই। খানিকপর তার সাথে যোগ দিল নোমানের দুই মেয়ে আরিনা ও ইসাবা। বাচ্চাদের এই প্রাণোজ্জ্বল উচ্ছলতা মনকে প্রসন্ন করে তুললো। বৃত্তাকার মাঠের মাঝখানটি ঈষৎ ঢালু, সেখানে বৃষ্টির পানি জমে অস্থায়ী এক ঝিলের সৃষ্টি হয়েছে। ঝিলের উপর স্কটিশ কায়দায় নির্মিত কাঠের ছাউনী ঘেরা মাচায় দর্শনার্থীদের বসবার ব্যবস্থা। পড়ন্ত বিকেলে মিষ্টি রোদ্দুর, খানিকটা শীত-শীত আমেজ, থেকে থেকে দেওয়া ফুরফুরে হাওয়া এসব কিছুই প্রশান্তিতে ভরে তুলছে আমাদের মনকে। গত পাঁচদিনের ক্রমাগত সড়কপথের জার্নিতে বিপর্যস্ত আমাদের এটুকু যেন অবশ্য প্রাপ্য ছিল। সবার জুতো খুলে মাঠের সেই মনোরম সবুজ ঘাসে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। অনেকটা যেন জীবনানন্দ, তারপর সেই নরম ঘাসের উপরই বসে সূর্যাস্তের প্রতীক্ষায় থাকলাম। রক্তিম আভায় দিগন্ত ভাসিয়ে দিয়ে সূর্য পাটে গেলে সবাই মিলে নিকটস্থ রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলাম। টোস্ট ও চা সহকারে বৈকালিক নাস্তা সারলাম সবাই। তারপর গাড়ি থাকা সত্ত্বেও অদ্ভুত সেই সন্ধ্যার আলোয় পায়ে হেঁটে হোটেলের পথ ধরলাম।
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নোমান, আমি, টুম্পা ও ফরহানা ভাবী চারজনে মিলে মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষণের জন্যে। হোটেলের বৈদ্যুতিক আলোয় প্রতিফলিত হয়ে চারপাশের অন্ধকার অরণ্যকে বড্ড রহস্যময় মনে হলো। লিকার শপ থেকে কিনে আনা ঠাণ্ডা বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে গল্প হলো অনেকক্ষণ। তারপর যে যার রুমে গিয়ে ঘুম।
মাঝরাতে প্রচন্ড দুলুনিতে হঠাৎ জেগে উঠলাম। মনে হলো যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। খাট, ড্রেসিং টেবল, রুমসহ পুরো হোটেল দুলছে এপাশ-ওপাশ। বাতাসের শো-শো প্রবল গর্জন, সেই সাথে অন্ধকারকে সম্পূর্ণ চিরে ফেলা মুহূর্মূহ বিজলীর তীব্র আলো। মনে হলো কেয়ামত বুঝি আসন্ন!
ভয়ে আমার স্ত্রী ও কন্যা আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। অন্ধকার সেই রুমে আমরা অতি অসহায় তিনটি প্রাণী। বাইরে টর্নেডো তার দোর্দণ্ড দাপটে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে চারপাশ। ৯১’ এর ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে পড়লো আমার। ঝড়ের শুরুতেই বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ লাইন উড়ে গেছে আগেই, তাই বিদ্যুৎহীন পুরো হোটেলটাই অন্ধকার পুরীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এক পর্যায়ে ঝড় এমনই রূপ নিলো যে ভাবলাম হায়! ঘরে বুঝি আর ফেরা হলো না, ভ্রমণ পথের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে জীবন যাত্রাও বুঝি ফুরিয়ে গেল এই বিদেশ বিভূঁইয়ে।
ঈশ্বরকে স্মরণ করতে করতে একসময় ভোরের আলো ফুটলো। এর মধ্যে ঝড় তার তাণ্ডব থামিয়েছে। রুমের দরজা খুলতেই প্রবল ঠাণ্ডা ধাক্কা মারলো-বাইরে যেন হিম-যুগ। দ্রুত মাঙ্কি ক্যাপ ও জেকেট চাপিয়ে বাইরে এলাম। বেরিয়েই চক্ষু চড়ক গাছ! বড় বড় পাইনগাছ মূল শুদ্ধ উপড়ে পড়ে আছে সামনের রাস্তা জুড়ে। ছেঁড়াপাতা ও গাছের ঢাল অবিন্যস্ত চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। গত সন্ধ্যা থেকেই মন্দিরে বাৎসরিক উৎসবের আয়োজন চলছিল। আয়োজকেরা সেই ভোরবেলাতেই খুঁজতে বেরিয়ে গেল ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া লোহার হাঁড়ি পাতিল। কয়েকটির সন্ধান পাওয়া গেল যেগুলো ততক্ষণে পাহাড়ের গভীর খাদে নিমজ্জিত। খানিকটা দুঃখই পেলাম আয়োজকদের বিমর্ষতায়। ঘুমে কুম্ভকর্ণ নোমান ও তার বউ এসবের কিছুই টের পায়নি বলে জানালো আমাদের!
ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নতুন জায়গা দেখতে বেরুলাম। কথা ছিল ভিয়ার হীলে যাবো। কিন্তু সময় ও দূরত্ব বিবেচনা করে তা বাতিল করলাম। পরিবর্তে খিজারির অন্যান্য দ্রষ্টব্য দেখতে বেরুলাম। ছোট থালা আকৃতির ছবির মতো সুন্দর এই পাহাড়ি শহর বিশ্বের ১৬০টি দর্শনীয় দ্রষ্টব্যের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। ঘন পাইন ও দেবদারুর সবুজ চারদিকে পিচ ঢালা কালো রাস্তার দু’পাশে ট্যুরিজম কর্তৃপক্ষ কাঠের ঝোলানো টবে অর্কিডের চাষ করেছে। পশ্চিমা পর্যটকদের ভাষায় এর সৌন্দয “Panoramic & Breathtaking ” সুইস রাষ্ট্রদূত ১৯৯২ সালের ৭ই জুলাই খিজারিকে অফিসিয়ালি মিনি সুইজারল্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সুদূর সুইজারল্যাণ্ড থেকে একখণ্ড পাথর এখানে এনে মূর্তি গড়া হয়েছিল। খিজারির অদূরেই আরেকটি অপেক্ষাকৃত সমতল চূড়া কালাটপ। বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত এই জায়গা থেকে সহজেই হরিণ, ভাল্লুক, চাইকি অনেক সময় হিমালয়ান চিতারও দেখা মিলে যায়।
দুপুর বারোটা নাগাদ হোটেলে ফিরে স্নান সেরে সবাই তৈরি হলাম। একটার মধ্যে লাঞ্চ সারলাম। আধঘণ্টা বিশ্রাম শেষে পৌনে দু’টা নাগাদ গাড়িতে উঠে রওনা হলাম। উদ্দেশ্য পাঞ্জাবের পাঠানকোট রেল স্টেশন। সেখান থেকে রাত দশটায় দিল্লীগামী ট্রেন ধরে নয়াদিল্লী।
আমাদের অরণ্যবাস মোটামুটি শেষ। শরতের এই দুপুর যেন সবার মনের মধ্যে একটা ঘোর ঘোর ভাব সৃষ্টি করেছে। ভুতুরে নিশব্দতায় দেবদারু ও পাইনবন। সবারই মন খারাপ। আমার মনে হলো কী নিষ্ঠুর কি হৃদয়হীন এই অরণ্য। যেন একটুও ব্যথিত বা চিন্তিত নয় আমাদের এই চলে যাওয়াকে নিয়ে!
শুরু হলো ফেরা। পাহাড় থেকে পাহাড় হয়ে ক্রমশ নেমে চলেছি সমতলের উদ্দেশ্যে। খিজারি থেকে লাহরু হয়ে নুরপুর। সেখান থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে চাক্কি, তারপর পাঠানকোট শহর। পাঠানকোট মূলত ভারতীয় সেনানিবাস ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বিকেল ৪টায় অসহ্য গরমের মাঝে রেলস্টেশনে পৌঁছলাম। দুর্ভাগ্য যে এখানে এয়ার কন্ডিশন্ড কোন বিশ্রামাগার নেই। ফলে বেলা চারটা থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত গরমে সেদ্ধ হলাম সবাই। এক ঘণ্টা লেট ছিল ট্রেন তাই সকাল সাড়ে সাতটায় পুরান দিল্লি স্টেশনে পৌঁছলাম। স্টেশনে নেমেই প্রচণ্ড গরমে সবার অবস্থা অথৈবচ। এ যেন ঠিক ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত আগুনে পড়া। সবাইকে এসি ওয়েটিং রুমে বসিয়ে আমি ও নোমান গেলাম রেলওয়ের ডরমেটরীর খোঁজে। কিন্তু বিধিবাম। কোন ডরমেটরী খালি নেই। আমাদের ট্রেন রাত আটটায়। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা দীর্ঘ এই বারো ঘণ্টা সময় দিল্লী শহরের এই ভয়াবহ গরমে কাটানো একেবারেই অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে বেরুলাম হোটেলের খোঁজে। এখানেও অসংখ্য দালাল ছোঁক-ছোঁক করতে লাগলো পেছন পেছন ঘূরে। অবশেষে স্টেশনের অদূরেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি রুম ভাড়া করলাম ৮০০ রুপীর চুক্তিতে। সময় রাত আটটা পর্যন্ত। রুমে ঢুকেই ফুল স্পিডে ফ্যান ও ১৬ ডিগ্রিতে এসি সেট করে চালালাম। তবুও যেন শরীর জ্বলছে। বাথরুম একটাই, তাই একে একে সিরিয়াল ধরে ঢুকলাম। বাইরের প্রচণ্ড গরমে শাওয়ারের জলও অনেকটা আধ-ফুটন্ত। তাই অস্বস্তি নিয়েই স্নান সারলাম। এর মধ্যেই নোমান ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। সামান্য পুরী-ভাজিও ক্ষুধা পেটে অমৃত লাগলো। কতক্ষণ গল্প গুজব করে কতক্ষণ ঘুমিয়ে ও টিভি দেখে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটালাম। গরমের ভয়ে কেউ-ই আমরা হোটেল রুম ছেড়ে না বেরুলেও নোমান ছিল ব্যতিক্রম। দুপুরের রোদের তীব্রতা কিছুটা কমে আসতেই পাতলা টি-শার্ট ও শর্টস পরে বেরুল দিল্লী শহর দেখতে। মনে মনে তার দুঃসাহসীকতায় প্রশংসা করলাম। সন্ধ্যের আগে আগে নোমান ফিরলো একটি নকশীকাঁথা ও দু’টি কারুকার্যময় লেডিস ব্যাগ নিয়ে। ব্যাগ দু’টি টুম্পা ও ফারহানা ভাবীকে উপহার দিয়ে গাইতে বসলো পায়ে হেঁটে তার দিল্লী ঘোরার কাহিনী।
রাত সাড়ে সাতটাতেই হোটেল ছেড়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। জংলী লতাপাতার নক্সা করা দূরন্ত এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে দেখে প্রথমে বেশ সাদামাটাই মনে হলো। কিন্তু ভিতরে ঢুকেই ট্রেনের ঝকঝকে ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখে চমৎকৃত হলাম। একেবারে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় ট্রেন ছাড়লো। মিনিট পনেরর মধ্যেই পরিবেশিত হলো গরম টমেটো স্যুপ, স্টিক-ফিংগার বিস্কুট ও মাখন টোস্ট। প্রতিটি খাবারই অতি সুস্বাদু। রাজধানী এক্সপ্রেস থেকে তুলনামূলক অনেকগুণ ভালো। দারুণ উপভোগ করলাম দূরন্ত এক্সপ্রেসে ভ্রমণ ও তাদের সু-শৃঙ্খল সুবিধাদী ও খাবার দাবার। পরদিন বেলা দেড়টায় কলকাতায় ঢুকলো ট্রেন। শেয়ালদা স্টেশন বেরিয়েই দেখি বৃষ্টি। বৃষ্টি! বৃষ্টির বল্লমের শরশয্যায় কলকাতা। এরই মধ্যে কয়েক জায়গায় পানি জমে গেছে। প্রবল বৃষ্টিতে যেন ভেঙে চুরে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে কলকাতা। একটু বাদেই শুনলাম পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ পুরো পশ্চিমবঙ্গে ২৪ ঘণ্টার জন্যে বন্ধ ডেকেছে সিটু। একে তো বৃষ্টি তার উপর পরিবহন ধর্মঘট। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বৃষ্টি একটু থেমে এলে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে এলো স্টেশন চত্বর ছেড়ে। অথচ সরকারি-বেসরকারি বাস, অটো রিক্সা, যাত্রীবাহী ছোট গাড়ি সব বন্ধ। উদ্বেগ ও দুঃশ্চিন্তায় মাথা খারাপের অবস্থা হলো। সাদা রঙের কয়েকটি প্রাইভেট এম্বোডরকে দেখলাম সুযোগ সন্ধানীর মতো তিন চার কিলোমিটারের ভাড়া হাঁকছে পাঁচশো থেকে সাতশো রুপি। আমাদের এই জায়গায় দাঁড় করিয়ে নোমান গেল এদিক সেদিক ঢুড়তে।
চারদিকে টিভি সাংবাদিক ও পত্রিকা অফিসের ফটোজার্নালিস্টদের ভিড়। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদেরও ফটাফট কয়েকটি ছবি তুলে নিয়ে গেল তাদের কয়েকজন। দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই। সন্তান কোলে দাঁড়িয়ে থেকে একদিকে ব্যথা হয়ে যাচ্ছে পা, অন্যদিকে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে মন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অনেকটা দেবদূতের ভঙ্গিতে নোমান উপস্থিত হয়ে বললো, গাড়ি একখানা পাওয়া গেছে। শুনে ভীষণ খুশি সবাই। প্রত্যেকের চেহারা স্বপ্ন-স্বপ্ন হয়ে গেল খুশিতে। লাগেজ ধরে টানা হেচড়া করতে করতে নোমানের পিছন পিছন গিয়ে দেখি তিন-চাকার মাল টানার একখানা রিক্সা ভ্যান দাঁড়িয়ে। নোমানকে জিজ্ঞেস করলাম গাড়ি কই! সে হাত তুলে ভ্যান গাড়িটিকেই নির্দেশ করে বললো আজকে এটাই আমাদের মার্সিডিস কার। অগত্য মাল পত্তর সব তুলে তার উপরই সবাই বাবু সেজে বসলাম। গন্তব্য মারকিউ স্ট্রিটের আগের হোটেলটিই । মালপত্রের সাথে আমাদেরও মাল হয়ে যেতে দেখে এবারও বেশ কয়েকজন ফটো সাংবাদিক জড়ো হয়ে ফটাফট ছবি তুলতে লাগলো। আমরা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও আমাদের বউরা এহেন জার্নি বাই ভ্যানে লজ্জা পেল।
পুনরায় হোটেল ওরিয়েন্টালে উঠে ফ্রেশ হয়ে সবাই এলাম ধানসিঁড়ি রেস্তোরাঁয়। সবারই পেটে বাঘের মতোই ক্ষুধা। ভরপেট খেয়ে হোটেলে ফিরে ঘুম। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে হালকা নাস্তা সহকারে চা, তারপর কলকাতা নিউ মার্কেট ও তার আশেপাশের মার্কেটে শুরু হলো শপিং অভিযান। নেতৃত্বে যথারীতি ফারহানা ভাবি। শপিং এর জন্যে আমি কোন টাকাই আনি নাই। তাই টুম্পাকে বেশ হতাশই হতে হলো। সামান্যই শপিং করলাম আমরা। অন্যদিকে নোমান-ফারহানা ভাবি পারলে পুরো কলকাতার শপিংমল শুদ্ধ উঠিয়ে নিয়ে আসে! বাংলাদেশি টাকায় প্রায় লাখ টাকার কেনাকাটা শেষে যখন হোটেলে ফিরলো তখন রাত এগারোটা। অতিরিক্ত জিনিসের জন্যে দু’টো নতুন ব্যাগও কিনতে হলো তাদের।
হিসেব মতে আমরা প্রায় ছয় হাজার মাইলেরও বেশি ট্রাভেল করেছি এবারের ট্রিপে। এই সুদীর্ঘ জার্নি কখনও সম্ভব হতো না যদি নোমান দম্পত্তি আমাদের সাথে না থাকতো। তাদের সরলতা, আন্তরিকতা ও হাস্যরসবোধ দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমাকে অনেকটা সহজ করে তুলেছিল। বিশেষ করে নোমানের সময়োচিত পদক্ষেপ, হিসেবী খরচ আমাদের অনাকাঙিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত রেখেছে। ধরতে গেল প্রায় পুরোটা ভ্রমণেই নেতৃত্বে ছিলো সে। ফারহানা ভাবীও ভালোই সামলেছে বাচ্চা-কাচ্চাদের। পরম স্রষ্টার আশীর্বাদে কোনরূপ বিপদ ও ক্ষতির সম্মুখীন না হয়ে পরদিন দুপুর বারোটায় সোহাগ পরিবহনে রওনা হয়ে একদিন পর বাংলাদেশ পৌঁছলাম আমরা।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০১২ দুপুর ১:০০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×