সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের গাড়ি কিনতে ১৬ লাখ টাকা ঋণ এবং গাড়ি প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব।
সচিব থেকে যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য বিনা সুদে ঋণ দেবে সরকার। এ গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য মাসে মাসে ভাতাও দেওয়া হবে। গাড়ি কেনার জন্য এককালীন সুদমুক্ত ঋণ ১৬ লাখ এবং মাসিক ভাতার পরিমাণ ৩০ হাজার টাকা। ৩৭৮ জন সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব গত বছর পদোন্নতি পেলেও গাড়ি পাননি। সুদমুক্ত ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা অগ্রাধিকার পাবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংস্থাপনসচিব ইকবাল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেছেন, 'গাড়িসেবা নগদায়ন সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়। এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তবে যেসব কর্মকর্তা গাড়ি পাননি, তাঁদের গাড়ির ব্যবস্থা করা হবে।'
সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার বেগম দিলরুবা গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ ঋণ এবং গাড়িসেবা নগদায়ন বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
সচিব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালার আওতায় সার্বক্ষণিক গাড়ি প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য এ ব্যয় নির্ধারণে সম্মতি দিয়েছে। এর পরই সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং 'গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা ২০১১' অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়।
এর আগেও ২০০৯ সালে সচিব থেকে যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য বিনা সুদে ঋণ এবং মাসিক ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাবে এককালীন ১৫ লাখ এবং মাসিক ভাতা ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা ছিল। কিন্তু আমলাদের বিনা সুদে গাড়ি কেনার ঋণ এবং মাসিক ভাতা দেওয়া হলে সমালোচনার সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী সে সময় ওই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি বলে জানা গেছে। নতুন প্রস্তাবে সরকারের আর্থিক সাশ্রয়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তারা কতখানি উপকৃত হবেন তাও বলা হয়েছে।
যানবাহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুগ্ম সচিব এবং তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের চাকরি সূত্রে গাড়ি পাওয়া অধিকার হলেও ৩৭৮ জন কর্মকর্তাকে গাড়ি দিতে পারছে না সরকার। তাঁদের মধ্যে দুজন করে সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিব রয়েছেন। গাড়ি না পাওয়া দলে রয়েছেন ৫২ জন অতিরিক্ত সচিব। ৩২২ জন যুগ্ম সচিবও গাড়ি পাননি। একটি সিএনজিচালিত গাড়িতে প্রতি মাসে সরকারের ব্যয় হয় ৬১ হাজার ৫৯৩ টাকা। এর মধ্যে জ্বালানি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, অবচয় এবং চালকের বেতন ও সব ধরনের ভাতা রয়েছে। পেট্রল বা অকটেনচালিত গাড়ির পেছনে ব্যয় আরো বেশি। বর্তমানে সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব রয়েছেন ৭৬৯ জন। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবটি অনুমোদন করলে যাঁদের গাড়ি দেওয়া যায়নি, তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হলেও সবাই এ ঋণ পাবেন। এসব কর্মকর্তাকে গাড়ি চালানোর জন্য মাসে ৩০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হলেও সরকারের গাড়িপ্রতি সাশ্রয় হবে (৬১,৫৯৩-৩০,০০০) ৩১ হাজার ৫৯৩ টাকা। এ খাত থেকে বছর শেষে সরকারের সাশ্রয় হবে ২৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
কিভাবে এ টাকা সাশ্রয় হবে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিব কমিটির একজন সদস্য বলেন, সরকারকে চালকদের জন্য পেনশন, গ্র্যাচুইটি, লিভ সেলারি, টাইম স্কেল ও ওভারটাইম দিতে হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত পদ্ধতি চালু করলে এসব ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। সরকারের একটি গাড়ির আয়ুষ্কাল আট বছর। কিন্তু গাড়িটি যখন কর্মকর্তার নিজের হয়ে যাবে, তখন ওই গাড়ির আয়ুষ্কাল হবে গড়ে ১৫ বছর। সরকারকে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য প্রতিবছর গাড়ি কিনতে হবে না। প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তারা যখন গাড়ির মালিক হবেন, তিনি মানসিকভাবে সন্তুষ্ট থাকবেন। গাড়িটি তাঁর প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। এই জব স্যাটিসফেকশন (চাকরি সন্তুষ্টি) সরকারি কাজের গতিশীলতা বাড়াবে। সরকার আট বছরে গাড়ির মূল্য শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য যে অবচয় ব্যয় নির্ধারণ করে, এর দরকার হবে না। প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি দেওয়া না হলে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কাজ কী হবে_এ প্রশ্ন উঠতে পারে। যানবাহন অধিদপ্তর 'দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রিম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেজ) অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ নির্ধারিত ব্যক্তিদের গাড়ি সরবরাহ করে। তারা বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও গাড়ি সরবরাহ করে। এ ছাড়া যেসব প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গাড়ি কেনার জন্য ঋণ নেবেন না, তাঁদের গাড়ি সরবরাহ করবে তারা। এতে যানবাহন অধিদপ্তর গাড়ির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি দিতে বাধ্য সরকার। না দিতে পারলে সরকার আইনগত জটিলতায় পড়তে পারে। এককালীন সুদমুক্ত ঋণ এবং মাসিক ভাতা এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটা ভালো উপায় হতে পারে। তবে লক্ষ রাখা উচিত, কর্মকর্তারা যেন নিজের গাড়ি বাসায় রেখে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার না করেন। তাহলে সরকারের সাশ্রয় তো হবেই না, বরং খরচ বেড়ে যাবে।'
সাবেক মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, 'প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের আগে সরকারকে কিছু বিষয় সতর্কতার সঙ্গে ভাবতে হবে। সুদমুক্ত হলেও ১৬ লাখ টাকা আদায় হবে কিভাবে? যুগ্ম সচিব হওয়ার পর খুব বেশি দিন চাকরি থাকে না। এই অল্প সময়ে টাকাটা আদায় করা ঝুঁকিপূর্ণ। কিস্তি পরিশোধের পর কর্মকর্তাদের সংসার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকতে হবে। আর ১৬ লাখ টাকায় নতুন গাড়ি হবে না। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কিনতে হবে। ঋণের টাকা আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলে কর্মকর্তাদের এ সুবিধা দেওয়া যায়। কারণ এতে কর্মকর্তারা উৎসাহী হবেন। সরকারেরও সাশ্রয় হবে।'
জানা গেছে, গাড়িসেবা নগদায়নের খসড়া বিধিমালায় কারা সুদমুক্ত অগ্রিম পাবেন, বিশেষ অগ্রিম মঞ্জুরের শর্ত, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন খরচ, বীমা, বিশেষ ভাতা_এসব বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। কমপক্ষে এক বছর চাকরি অবশিষ্ট না থাকলে এ ঋণ পাওয়া যাবে না। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ট্যাক্স_এসব খরচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বহন করতে হবে। অগ্রিম নেওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই পরিবহন পুল থেকে গাড়ি পাওয়া যাবে না। কর্মকর্তারা তাঁদের চাকরিজীবনে একবার এই সুবিধা পাবেন। তাঁদেরকে গাড়ির অগি্ন, চুরি ও দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির জন্য ফার্স্ট পার্টি ইনস্যুরেন্স করতে হবে। যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের পিআরএল শুরু হলে ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে সচিবরা পিআরএল চলাকালেও মাসিক ভাতা পাবেন। নির্ধারিত সময়ে কোনো কিস্তি বকেয়া পড়লে তা কর্মকর্তার পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ নানাবিধ পাওনা থেকে কেটে রাখা হবে। ঋণ শতভাগ পরিশোধের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গাড়ির মালিক হবেন।
টাকা লাগবে না, পুলিশের কনস্টেবল থেকে এএসপি পর্যন্ত শুধু ট্যাক্স ফ্রি মোটরসাইকেল কেনার সুজোগ দেয়া হউক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


