সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে এক বন্ধুর সাথে দেখা। সে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে মহুকুমা শহর। বললাম: সাইকেলে কেন, বাসেই তো যেতে পারো।
সে হেসে বলল:-আর বলো না ভাই দুঃখের কথা, সাইকেলটা ছেলের হোস্টেলে পৌঁছে দিতে যাচ্ছি।পায়ে হেঁটে স্কুল যেতে ওর খুব অসুবিধা হচ্ছে।
বললাম:- বেশ তো, তোমার ছেলে নিজেই তো নিয়ে যেতে পারতো সাইকেলটা।
শুনে হো হো শব্দে হেসে উঠলো বন্ধু। বলল:-আজকালকার ছেলেদের ওসব বলা যায় না রে ভাই, কলকাতার ভাল মিশনে ভর্তি
করলাম, থাকতে পারলো না। ২৬ কিমি সাইকেল চালিয়ে যেতে হবে শুনলে ও হয়তো ১০০০ কিমি দূরের বোম্বাই পালাবে।
আমি এবার হাসলাম। বললাম:-জীবনের ২০-২২ টা বছর তো বাবা-মায়ের ফরমাশ খাটলে, এখন বাকী জীবনটা ছেলের ফরমাশ খাটো।
বন্ধু হেসে বলল:-সবই কপাল।
পরে একদিন শুনলাম, সেই ছেলে হোস্টেলেও থাকতে পারেনি। শহরে বাসা ভাড়া নিতে হয়েছে বন্ধুকে। ১৬ বছর বয়সী ছেলে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে স্কুলে যায়। বন্ধু প্রায় প্রতিদিন বাসে চড়ে গ্রামে আসে, পৈত্রিক জমিজমা দেখাশোনা করে, রাতে শহরে ফিরে যায়।
গল্পটা আমার বড়ভাইকে বললাম। সে চাকরী সুত্রে বোলপুর-শান্তিনিকেতনে থাকে। পাল-পার্বনে, আচার-অনুষ্ঠানে গ্রামের বাড়িতে আসে।
সে হেসে বলল:- এ আর এমন কি, শোন তবে মুনের গল্প।
মুনকে আমি দেখেছি। পুতুল-পুতুল চেহারার পুচকে মেয়েটি আমার ভাবীর কাছেই থাকে বেশীর ভাগ সময়। ওর আব্বা আমারই বয়সী তবে নামাজ-রোজার অতিরিক্ত চর্চার হেতু দাড়ি-টাড়ি রেখেছে তাই একটু বেশী বয়সী দেখায়। ব্যবসা করে। মৃদুভাষী এবং ভদ্র। মুনের মা-ও সাদাসিধে টাইপের ।
বড়ভাই বলল:- মুনকে আমি দুটো কথা শিখিয়েছি। এক, কেউ যদি তোকে জিজ্ঞেস করে, মুন কেমন আছো, বলবি, আল্লা যেমন রেখেছে। আর যদি জিজ্ঞেস করে, তোমার আব্বা-মা কেমন আছে, তখন বলবি, আমি যেমন রেখেছি।
বললাম:-তার মানে?
দেখলাম ভাবীও হাসছে। বড়ভাই বলল:-সেটাই গল্প। সেদিন আমি তোর ভাবীকে নিয়ে গেছিলাম পৌষমেলায়। সবার জন্য এটা সেটা কিনলাম। একসময় মনে পড়ে গেল মুনের কথা। তোর ভাবীর পরামর্শ মত কিনলাম একজোড়া ঘুঙুর।
বাসায় ফেরার একটু পরে মুন এল। বসল। বলল:-আমার জন্যে কি এনেছেন বড় আব্বা?
তোর ভাবী ওর পায়ে ঘুঙুর দুটো পরিয়ে দিলো। ঝুমুর-ঝুমুর শব্দ তুলে মেয়ে এঘর-ওঘর হাঁটলো খানিক। তারপর খুশি মনে চলে গেল নিজেদের ঘরে।
সেদিন মাঝরাতে ঘুঙুরের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।তোর ভাবীকে বললাম:-মুনের মা কি মাঝরাতে ঘুঙুর পরে নাচতে শুরু করলো নাকি?
তোর ভাবীও তখন জেগে গেছে। সে বলল:- না, মুনের মা নাচছে না, শুনছো না তার হাসির শব্দ?
ঠিক তাই। তবে কি মুন নাচছে? না তাও নয়, সে-ও হাসছে আর হাততালি দিচ্ছে।
কতক্ষণ নাচ চলেছিল তা জানি না, তবে ঘুঙুরের শব্দে ঘুম আসতে খুব কষ্ট হয়েছিল সেই রাতে। একবার মনে হলো, তবে কি ওদের বাসায় কোন গেস্ট এসেছে?
সকালবেলা মুনের মা আমাদের বাসায় এল এক পেয়ালা হালুয়া নিয়ে।
বললাম:-কে মেহেমান এসেছিল গো তোমাদের বাসায়?
মুনের মা বলল:- কেউ আসেনি ভাইয়া।
--তা হলে সকালবেলা হালুয়া?
--আর বলবেননি ভাইয়া, রাত এগারোটার সময় মেয়ে জেদ ধরল, ডিমের হালুয়া খাব। ভাগ্যিস ফ্রিজে ডিম ছিল। নইলে তো মেয়ের কান্না থামতো না।
তোর ভাবী আর থাকতে না পেরে বলল:-মাঝরাতে ঘুঙুর পরে নাচছিল কে?
এবার আর মুনের মা স্থির থাকতে পারল না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে-হাসতে লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়। তোর ভাবী যত চেষ্টা করে ওকে থামাতে, ও ততই হেসে গড়াগড়ি খায়। আমি তো বিভ্রান্ত হয়ে পাশের ঘরে ঢুকলাম। পরে তোর ভাবীর কাছে শুনলাম,
মেয়ের আব্দারে মাঝ রাতে ঘুঙুর পরে নাচতে হয়েছে মুনের বাবাকে।
এখনকার বাবা-মায়ের অবস্থা এমনই করুণ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


