রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাড়াবাড়ি উপেক্ষিত নজরুল
আসাফ্উদ্দৌলাহ্
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জয়ন্তী উদযাপন করতে চলছে বছরব্যাপী উত্সব। রবীন্দ্র উত্সবের ডামাডোলে মনে হচ্ছে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নির্বাসিত, উপেক্ষিত। সরকারও নজরুল থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে। উপেক্ষার সূত্রটা সেখানেই নিহিত। মনে হয়, তাকে রাষ্ট্রের ভেতর থেকে এখন জাতীয় কবি বলে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। চারপাশে রবীন্দ্রসঙ্গীত যেভাবে বাজানো হচ্ছে, তা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া বুঝি আর কোনো সঙ্গীত নেই। অথচ সঙ্গীত রচয়িতা হিসেবে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের তুলনা নেই। মানুষের দুঃখ, নিপীড়ন, বেদনাও যে গানের উপজীব্য হয়, এটা নজরুলের আগে কেউ প্রমাণ করতে পারেননি। তবু তার সঙ্গীত বেতার-টিভিতে উপেক্ষিত।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমরা আসলে পাগলামি করছি কি-না চারপাশের আয়োজন দেখে এ প্রশ্ন আসছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য বেদনাবোধের কারণ, আবার জনগণ এতে বিরক্তিবোধ করছে। বলে রাখা হলো, পাগলামি করার স্বভাব এ জাতির মধ্যে অনেকের আছে। রবীন্দ্রনাথকে আমরা অপছন্দ করি না। তাকে আমাদের ততটা সম্মান দেয়া উচিত, যতটা তার প্রাপ্য। আমেরিকানরা শেক্সপিয়রকে যতটা সম্মান দেয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকে ততটা সম্মান দেখাতে পারি। যেমন, আমেরিকানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবইয়ে শেক্সপিয়রের নাটক, কবিতা বা অন্য লেখা পাঠ্য। তাকে নিয়ে আমেরিকানরা জাতীয় কোনো উত্সব করে না, কারণ শেক্সপিয়র আমেরিকান নন। আমেরিকানরা জাতীয় উত্সব করেন তাদের দেশের উইলিয়াম ফকনার, মার্ক টোয়েনদের নিয়ে।
এবার ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। কলকাতায় ১৯৭৮ সালে পনেরো দিনের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুলের জয়ন্তী উত্সব উদযাপিত হয়। উত্সবটা ছিল দুই কবির রচিত সঙ্গীত নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে ওই উত্সবে অংশগ্রহণ করেছিলেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী এবং আমি। পনেরো দিনের উত্সবের মধ্যে নজরুলের সঙ্গীত ছিল মাত্র দু’দিন। আর বাকি তেরো দিন ছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত। এ থেকে নজরুলের প্রতি উপেক্ষা, অবজ্ঞাটা আমরা বুঝতে পারি।
নজরুলকে উপেক্ষার মূল কারণ বাংলাদেশে একটা নতুন বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর জন্ম হয়েছে, সেটা দুর্বিনীত একটা শ্রেণী। এ শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের নিয়ত লক্ষ্য হলো কলকাতার সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ ও অনুকরণ করা। তারা তা করছেন। অনুসরণ, অনুকরণকারী এবং নতুন এসব বুদ্ধিজীবী সমাজের কাছে নজরুল কবি, লেখক নন। তাদের কাছে তিনি অপাঙেক্তয়। এখানে আরেকটা বিষয় যোগ করতে হবে—তাদের এ অনুকরণে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এখন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গ্রামে গ্রামে এখন ভারতীয় টিভি চ্যানেলের দাপট। ভারতের কোথাও এদেশের একটা চ্যানেলও দেখানো হয় না। এ অসম সহ-অবস্থান মেনে নেয়া যায় না। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঠেকাতে নজরুলচর্চা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কী উদ্যোগ নেয়া দরকার, তা রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বরাই ঠিক করতে পারেন।
নজরুল দরিদ্র মানুষের কবি, হতভাগ্যদের কবি, সাধারণ মানুষের কবি। তিনি বাস্তব জীবনের কবি, কল্পনার রাজ্যে বসে কবিতা লেখেননি। তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ নন। তাকে নিয়ে এত উত্সবের দরকার নেই। তিনি আমাদের হৃদয়ে আছেন, তার অবস্থান এ জাতির অস্তিত্বে। এ কারণেই সাধারণ মানুষ তাকে গ্রহণ করেছেন। তার বসবাস সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। তার প্রচার, প্রসারের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নেই; শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতীর দরকার হয় না। মানুষের মধ্যে যার বসবাস, তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রচারের দরকার হয় কি?
নজরুল যেমন দরিদ্রদের কবি, তেমনি তিনি দারিদ্র্যবিমোচনের কবি। দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য তিনি অনেক কাজ করে গেছেন। তিনি ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সেটি ছিল কৃষি উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচন-বিষয়ক পত্রিকা। তিনি ছিলেন গণমানুষের সাংবাদিক, কালের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক। ‘সওগাত’ থেকে লেখা শুরু করে শেষ পর্যন্ত ‘নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’র মতো পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জার বিষয় হলো, বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে। নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি। অথচ এদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাবে তার একটি ছবিও নেই।
এ কথাগুলো আমি অনেকবার বলেছি। গতবছর দৈনিক আমার দেশ-এর মাধ্যমে বলেছিলাম। দুঃখজনক হলো, এবার এ কথাগুলো আবার বলতে হচ্ছে। কাজী নজরুলের লেখা নাটক আছে দেড়শ’র ওপর। এসব নাটকের মঞ্চায়ন হয় না, সেগুলো নিয়ে আলোচনাও হয় না। নজরুলের ছোটগল্পের বইও বাজারে পাওয়া যায় না। আমার প্রশ্ন, বাংলা একাডেমী তাহলে কী করে? প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের নজরে বিষয়টা পড়ে না কেন? নজরুলের হারিয়ে যাওয়া অনেক গান উদ্ধার করা যাচ্ছে না। এগুলো নাকি উদ্ধার করা ‘সম্ভব’ হচ্ছে না। কেন সম্ভব হচ্ছে না? কতকিছুই তো উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে, তাহলে নজরুলের বেলায় সেটা অসম্ভব থাকছে কেন?
অনুলিখন : হাসান শান্তন
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2011/05/15/81642

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

