somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালাঃ অ্যাংকরেজ, আলাস্কা (2)

০১ লা এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাঝরাতে গিয়ে পৌছলাম অ্যাংকরেজে। রেন্টাল কার নিতে গিয়ে দেখি গাড়ি নাই। মিড সাইজ গাড়ি রিজার্ভেশন দিয়েছিলাম, অনেক ঘাটাঘাটি করে বললো এত রাতে 7 সিটের ভ্যান ছাড়া আর কিছু দিতে পারবে না। মডেল ডজ ক্যারাভান। মনে মনে খুশীই হলাম, যদিও মুখে প্রকাশ করলাম না, কারন বড় গাড়িতে একটু আরাম করে ঘোরা যায়। ডজের গাড়ি গাড়িটায় পেছনের সিটে চাইলে একজন শুয়ে ঘুমাতেও পারে। একটা সিদ্ধান্ত আমার প্রায়ই ভুল হতো, সেট হচ্ছে খুজে খুজে একদম সস্তা মোটেলে ওঠা। আসলে সামান্য একটু বেশী খরচ করলে তুলনামুলক ভাবে অনেক ভাল হোটেলে থাকা যায়। যাইহোক অলাস্কায় নির্জন রাতে গাড়ি নিয়ে মোটেলের দিকে রওনা হলাম। বেশ একটু ভয় ভয় করছিল। এয়ারপোর্ট থেকে মোটেল 5-7 মাইল দুরে, রাস্তায় কোন লোকজন থাক দুরের কথা, গাড়িও খুব কম।

মোটেলের রিসেপশনিস্ট বিরক্তভাবে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। বাইরে যেমন ভাঙাচোরা অবস্থা ভিতরে আরও খারাপ। এসব মোটেলে বিছানায় প্রায়ই মানুষের লোম পড়ে থাকে, এজন্য এবার বাসা থেকে চাদর নিয়ে এসেছি। ব্যাগ থেকে ক্যামেরা, ফোন, ল্যাপটপ বের করে চার্জে দিয়ে দিলাম। প্লেনে তোলা অরোরার ছবিগুলো ল্যাপটপে ট্রান্সফার করে দেখার চেষ্টা করলাম, পুরান ল্যাপটপের এলসিডিতে দেখাই যাচ্ছিল না, মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। আলাস্কা GMT-9 টাইম জোনে, রাত দুটার দিকে যখন ঘুমাতে যাচ্ছি তখন আমার বায়োলজিকাল ঘড়িতে প্রায় ভোর হয় হয়।
ফোনের চি্তকারে ঘুম ভাঙ্গলো, আমার বন্ধু তার দল নিয়ে রওনা দিচ্ছে। রওনা দেয়ার খবর এত ঘটা করে জানানোর দরকার ছিল না, কাচা ঘুমটা ভেঙ্গে শরীর খারাপ লাগছিল। বাথরুমে বসে একটু কসরত করলাম, আসলে এত নোংরা মনে হচ্ছিল যে ছেলে হয়েও খুব বেশীক্ষন বসে থাকতে ভাল লাগছিল না। আরেকটু গড়াগড়ি করে গোসল করে ব্যাগট্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলাম।

এই মোটেলে কোন ব্রেকফাস্ট নেই। বিল দিয়ে বের হয়ে আসলাম। একটা বিশাল বড় লিস্ট নিয়ে আসছি আলাস্কায় কি কি করব, আসলে বলতে গেলে 70-80 পৃষ্ঠার চোথা। নানা রকম অল্টারনেট হিসাব করা আছে ওখানে। অ্যাংকরেজ ঠিক সরাসরি প্যাসিফিকের (এক্ষেত্রে গাল্ফ অফ আলাস্কা) পাড়ে না, বরং বাংলাদেশে বরিশাল যেমন কিছুটা ভেতরে অনেকটা ওরকম। ওরা নাম দিয়েছে কুক ইনলেট। এর আবার দুটা শাখা নিক আর টার্নএগেইন আর্ম। একটা দেড় ঘন্টার লঞ্চ (এখানকার ভাষায় ferry) ট্যুর আছে আশে পাশের গ্লেসিয়ার গুলোতে, সকালে দেখি ঐটা ধরা যায় কি না।
প্রচুর ওয়ান ওয়ে রাস্তা এইখানে, এমি্নতেই নতুন জায়গায় আমি পথঘাট চিনতে পারি না। আমার চোথা অনুযায়ী যেখানে লঞ্চঘাট হওয়ার কথা সেখানে এসে দেখি একটা বড় হোটেল, আশে পাশে কোন নদী বা এরকম কিছু নেই। ব্যপার কি। ফোন করার পর টিকেট বিক্রেতা মহিলা বলল আসলে হোটেলটা হচ্ছে টিকেট কাঊন্টার, সত্যিকার লঞ্চঘাট এখান থেকে এক ঘন্টার ড্রাইভ (50 মাইল দুরে)। বলে কি এই মহিলা। ফেরী ছাড়তে আর সময় আছে 15 মিনিট। মনটা খারাপ হয়ে গেল, প্ল্যান করে আসছি কুক ইনলেট ঘুরে দেখব, ধুত্তোর।

অ্যংকরেজ মিউজিয়ামে গেলাম। চমত্কার করে সাজানো। আলাস্কার আদিবাসীদের মধ্যে আছে এস্কিমো (ইনুইট), আথাবাস্কান আর আলিউট। 15/16 হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে বেরিঙ প্রনালী, আলাস্কা হয়ে মানুষ প্রথম আমেরিকা তে আসে। এদের বংশধররাই এখনো আলাস্কায় আছে, আর যারা আরো দক্ষিনে গিয়েছিল তাদের থেকে কালক্রমে আজটেক, মায়া, বা ইনকাদের জন্ম হয়েছে। যাদুঘরে চমত্কার সব নিদর্শন আছে এই মাইগ্রেশনের। প্রাগৈতিহাসিক সময়ে (10 হাজার বছর বা তার আগে) এসব এলাকায় ম্যামথ, ঊলি রাইনো (লোমশ গন্ডার) ছিল। ইনুইটদের তৈরী ম্যমথের (বরফ যুগের লোমশ হাতি) দাত বা হাড় থেকে বানানো অনেক সরঞ্জাম দেখলাম।

দুপুরে আমাদের দলের বাকীরা এলে আবার এয়ারপোর্ট যেতে হলো। পথে যেতে যেতে দিগন্তে চুগাছ (Chugach) পর্বতমালা দেখা যাচ্ছিল, হঠাত্ কেন যেন ঠিক রাঙামাটির পাহাড়গুলোর মতো মনে হচ্ছিল। এতদিন এখানে পাহাড় বলতে রকি মাউন্টেইন স্টাইলটাই মনে হতো, আলাস্কার পাহাড়গুলো কোনভাবে মেইনল্যান্ডের চেয়ে আলাদা। পরের দিন গুলোতে ডেনালী বা Wrangle-St Elias এও একই ব্যাপার খেয়াল করেছি। যাহোক পুরো দল একসাথে হয়ে পেট ভরে খেয়ে নিলাম, এক ফাকে আমি ওয়ালমার্ট থেকে ব্ল্যাংক সিডি কিনে নিলাম, প্রতিদিনের ছবি প্রতিদিন সিডিতে লিখে রাখব, নাহলে কখন ল্যাপটপের হার্ডড্রাইভ ক্র্যাশ করে কে জানে।

এখন গন্তব্য ডেনালী ন্যাশনাল পার্ক। ডেনালীতে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ঊচু পর্বতের চুড়া আছে (মাউন্ট ম্যাকিনলী 20,320 ফিট, এভারেস্ট 29,000) কিন্তু ম্যাকিনলী দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার, কারন বছরের বেশীরভাগ সময়েই মেঘে ঢাকা থাকে, বিশেষ করে বছরের এই সময়ে তো দেখা আরো কঠিন। আলাস্কাতে ফ্রীওয়ে কম, বা সেভাবে নাই বল্লেই চলে। কে চালাবে এই নিয়ে একটু বিতন্ডা হচ্ছিল, সবাই টায়ার্ড, ঝামেলা কমাতে রাজী হয়ে গেলাম।

বন্ধুদের কারো কারো সাথে বেশ অনেকদিন পরেই দেখা। সবাই সবার ব্যাপারে আপডেট নিচ্ছিল, কে কি করল, কদ্দুর এগোলো ক্যারিয়ার, কেউ কেউ সংখ্যা বাড়নোর চেষ্টায় আছে, কিন্তু এক আর একে ঠিক তিন হচ্ছে না ইত্যাদি। ওয়েবে অনেক ছবি দেখে এসেছি ডেনালীর এবং ডেনালী যাওয়ার পথের। শুরুতে খুব একটা সুবিধা হচ্ছিল না, সেই একই ফার, পাইন গাছের সারি, পার্মা ফ্রস্টে রঙচঙা গুল্মের কোন খোজ নেই।

এ্যাংকরেজ থেকে ডেনালী 400 কিমি, পাচ ঘন্টার রাস্তা। রাতে না ঘুমিয়ে চালাতে একটু খারাপ লাগছিল, আবার রাস্তায় সবজায়গায় ডিভাইডার নেই, বিপরীত দিক থেকে লরী আসতে দেখলে একটু ভয়ই লাগে। আড়াইটা-তিনটার দিকে রওনা দিয়েছিলাম, একসময় দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সেখান থেকে সন্ধ্যা হবার জোগাড়, এখনও না কোন উল্লেখযোগ্য প্রানী না সেই রঙিন বেরী (জাম?) গুল্ম। ঠিক তখনই দেখি একটা Moose(তাড়াহুড়ায় ছবি তোলা হয় নি) রাস্তা পার হচ্ছে। আমাদের দেখে বেচারা দিল দৌড়, দৌড় দিয়েই ভালো করেছে অবশ্য কারন ধাক্কা লাগলে দুর্ঘটনা হতে পারত। একবার হরিনের সাথে ধাক্কা লেগে যে অবস্থা হয়েছিল, এরপর আর কোনদিন এসব বোকারামকে ধাক্কা দিতে চাই না। এরপরই যেন ভাগ্য খুলে গেল আমাদের। পাইন আর ফারের বন পরিষ্কার হয়ে একটু খোলা জায়গায় চলে আসলাম। রাস্তার দুপাশেই বেশ দুরে পাহাড়, তার আগে খোলা মাঠের মতো (meadow), আর মাঠ ভর্তি নানা রঙের বেরী জাতীয় গুল্ম। আলাস্কায় ঠান্ডার জন্য মাটির নিচে একটু গভীরে যে বরফ থাকে সেটা কখনই গলে না। এরা বলে পার্মাফ্রস্ট। বরফের জন্য বড় গাছ জন্মাতে পারে না, সে জন্য জন্মায় ঘাস বা নানা জাতের ছোট উদ্ভিদ।

কি যে অপার্থিব দৃশ্য খালি চোখে না দেখলে বোঝা মুস্কিল। ক্যামেরার সাধ্য নেই এই ছবি তুলে ধরার। ডেনালী পর্বতমালার ব্যাকড্রপে মনে হচ্ছিল আলাস্কা আসার 50% অলরেডি সার্থক।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০০৭ দুপুর ২:৪৯
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×