বাংলাদেশ এখন একটা অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ভালো না খারাপ তা এখন বলা মুস্কিল হয়তো আগামী বছর বা তারও পরের বছর বলতে পারব। কিন্তু দেশের জন্য বিশেষ করে সাধারন মানুষের জন্য soul searching এর সুযোগ যে এসেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। 71 এ স্বাধীন হয়ে 3 বছর গনতন্ত্র তার পর 15 বছর সামরিক শাসন তারপর আবার 15 বছর গনতন্ত্র। বিশ্বের অন্যান্য গনতান্ত্রিক দেশগুলো যেমন অর্থনৈতিক, সামাজিক সাফল্যের মুখ দেখেছে, কোন কারনে আমরা ঠিক অতটা পারিনি। একদম হয় নি তাও না। আসলে এত সমস্যার মধ্যেও গত 15 বছরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশী অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে, আগের 20 বছরে এর ধারে কাছেও হয় নি। কিন্তু 15 বছরে যখন প্রবৃদ্ধি 5 রাখতে আমরা হিমশিম খাচ্ছিলাম তখন পাশের দেশ ভারত 10 ছুই ছুই করছিল। অন্যদিকে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের দ্বিমুখী আক্রমনে জনগন হিসেবে আমরা সন্তষ্ট যে না বলাই বাহুল্য।
যুক্তরাজ্যের চেয়ে আমাদের গনতন্ত্র সাংবিধানিক ভাবে ভীষনভাবে আলাদা নয়, ভারতের সাথেও মিল আছে। আসলে সব গনতান্ত্রিক দেশগুলোর শাসন ব্যবস্থা ঘুরেফিরে কাছাকাছি। কিন্তু তাহলে ফলাফলে এত পার্থক্য কেন? আমাদের জনপপ্রতিনিধি হয় পিন্টু, লালু, ফালু, হাজারী, শামীম ওসমানরা। এরা নিজেরা গনতন্ত্র কতটুকু বুঝে বা বিশ্বাস করে বলা মুস্কিল।
আসলে গনতন্ত্রের সংজ্ঞায় ঠিক পরিস্কার করে বলা নেই গনতন্ত্র কিভাবে implement করতে হবে। হতে পারে সরাসরি মতামত নিয়ে (যেমন ভোট), হতে পারে প্রতিনিধির মাধ্যমে (যেমন সাংসদ একজন প্রতিনিধি)। তার মানে গনতন্ত্রে সাধারন মানুষের মনোভাবের প্রতিফলনটাই ঊদ্দ্যেশ্য হলেও ঠিক কিভাবে সেটা করা হবে তা নিয়ে অনেক টেকনিকাল সমস্যা আছে।
টেকনিকাল সমস্যা নিয়ে আরেকটু গভীরে যাই। যেমন আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গনতান্ত্রিক দেশগুলোর একটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, এখানে 2000 সালের নির্বাচনে আল গোর সবচেয়ে বেশী ভোট পেলেও ইলেকটোরাল কলেজ সিস্টেমের মার প্যাচে বুশকে বিজয়ী ঘোষনা করা হয়। যদিও গনতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী আল গোরেরই নির্বাচিত হওয়া উচিত ছিল। এটা ঠিক নতুন কিছু না বাংলাদেশেও 1991 নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মোট ভোটে সবচেয়ে বেশী পেয়েছিল, কিন্তু আসন ছিল বিএনপির বেশী। অন্যান্য দেশের ঊদাহরণও টানা যেতে পারে। আবার নির্বাচন ছাড়াও অনেক সময় টেকনিকালিটির কারনে গনতান্ত্রিক দেশে জনগনের মতামতের বিরুদ্ধে শাসক গোষ্ঠী অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারে বৈধ ভাবেই। আমাদের দেশে তো হরহামেশাই সেটা হয়, বা হয়েছে যেমন সাংসদদের কোটায় শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানীর আইন, আইন হিসেবে সম্পুর্ন বৈধ, কিন্তু দেশের মানুষের সমর্থন কি ছিল? মনে হয় না। তাহলে এ ধরনের আইনকে নিশ্চয়ই লিংকনের গনতন্ত্রের মুল চেতনার সাথে সংগতিপুর্ন ধরা যায় না, অথচ সাংবিধানিক ভাবে এসব আইন সম্পুর্ন বৈধ। লিংকনের দেশেও এরকম উদাহরন আছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে বিভিন্ন দেশের সংবিধানে এসব আপাত অগনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগ কেন আছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সরাসরি ভোটে না হয়ে ইলেক্টোরাল কলেজ দিয়ে হচ্ছে। কারণ হচ্ছে টেকনিকাল সমস্যা। আড়াইশ বছর আগে টেলিফোন, ক্যালকুলেটর বা কম্পিঊটার ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের মত বড় দেশে এত রাজ্যের সবার ভোট সরাসরি হিসাব করা কঠিন ছিল। সে জন্য শর্টকাট হিসেবে ইলেক্টোরাল কলেজ। আবার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য জনগনের মতামত বারবার নেয়া কঠিন ছিল, বিশেষ করে টেলিফোন/কম্পিউটারের অনুপস্থিতিতে, সুতরাং গনতন্ত্র কাটছাট করে এমনভাবে implement করা হল যেখানে সরাসরি জন গনের বদলে তাদের প্রতিনিধিরা সিদ্ধান্ত নেবেন (যেমন কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর)।
ঠিক এইখানেই সমস্যা। বাংলাদেশের মতো দেশে জনপ্রতিনিধি (সাংসদ) নির্বাচিত হয়ে আসলে বুঝতেই পারেন না তার দ্বায়িত্ব কি? তাদের অনেকের ধারনা তারা এলাকার ইজারা পেয়েছেন 5 বছরের জন্য। সুতরাং জন গনের মতামত সংসদে প্রতিফলিত করার প্রয়োজনও বোধ করেন না। এমনকি আমরা যদি ভাল সব সাংসদ ভবিষ্যতে খুজেও পাই তাহলেও এর সমাধান হবে না। একটা সংসদীয় এলাকায় যদি 5 লাখ লোক থাকে, আইন প্রনয়নের সময় এই 5 লাখ লোকের মতামত নেয়া আসলে কঠিন। সত্ ও যোগ্য সাংসদ থাকলেও যেটা হবে তারা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের যেটা ভাল মনে হবে সেই সিদ্ধান্তই নেবেন, অথবা পার্টি লাইনে ভোট দেবেন (যুক্তরাষ্ট্রে অনেক সময়ই যেটা হয়), সুতরাং জন গনের মতামত সরাসরি প্রতিফলনের সুযোগ আসলে কম।
আসলে ঘটনা হচ্ছে এই জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থার মধ্যেই গন্ডগোল আছে। যেমন লিখেছি আগে, এখানে এমন টেকনিকাল প্রবলেম আছে যেটা সারিয়ে তোলা অসম্ভব, ভালো লোককে সংসদে পাঠালেও। তাহলে কি করা যায়? আমার ধারনা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য যেখানে গনতান্ত্রিক মুল্যবোধ অগভীর, জনগন নিজেই অনেক সময় গনতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, সেখানে হয়তো অন্যভাবে গনতন্ত্রকে implement করতে হবে।
সমস্যাটা আরেক দিক থেকে যদি দেখি। দেশের উন্নতি করা দরকার, lean-meanপাবলিক কম্পানি গুলো যেমন করে। ধরে নেই বাংলাদেশ একটা পাবলিক কম্পানি, এর 14কোটি শেয়ার হোল্ডার। শেয়ার ননট্রান্সফারেবল, দেশের মাটিতে জন্মালে অটোমেটিক একটা শেয়ার পাওয়া যায়, মরলে শেয়ার বাতিল হয়ে যায়, লোকপ্রতি মাত্র একটা শেয়ার। যেহেতু দেশের জনগন এর ইনভেস্টর সুতরাঙ তাদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত। প্রতিনিধি বা এরকম মধ্যসত্ত্বভোগী কোন দালাল গোষ্ঠির দরকার নেই। আরেকটা ব্যাপার, আমরা ধরে নেব এই ব্যবস্থা একবিংশ শতাব্দিতে হচ্ছে, যেখানে টেলিফোন/মোবাইল সুলভ, সবার টেলিভিশন দেখার সুযোগ আছে বা করা যাবে। তাহলে যেটা করা যায়ঃ
1। প্রতি নববর্ষে আমরা দেশের জন্য CEO নিয়োগ দেব, বা hire করব।
2। আগ্রহী প্রাথির্রা তাদের resume জমা দেবে আগেই, টিভিতে লাইভ ইন্টারভিউ হবে। জনগন, সাংবাদিক এরা প্রশ্ন করবে।
3। তারপর ঠিক করা কাকে একবছরের জন্য দ্বায়িত্ব দেয়া যায়।
4। অন্যান্য পোস্টগুলোতেও (এখন যেখানে একজন করে ঊপদেষ্টা আছেন) এভাবে সরাসরি জনগনের সামনে ইন্টারভ্যু দিয়ে নিয়োগ দেয়া হবে।
5। প্রতি দুমাসে পারফর্মেন্স এভাল্যুয়েট করা হবে, খারাপ CEO যেকোন সময় fire করা যাবে। বিশেষ করে যদি দেশ লাভের মুখ না দেখে।
6। যে কোন ব্যাক্তি পরপর 4 বছরের বেশী একই পোস্টে আসতে পারবে না। আর টোটাল 8 বছর হয়ে গেলে অটোমেটিক অযোগ্য হয়ে যাবে।
এসব CEO বা অন্যান্য ঊপদেষ্টারা যেহেতু জনগনের এম্প্লয়ী এবং প্রতি দুমাসে পারফর্মেন্স ঘেটে যেহেতু তাদের সেটা মনে করিয়ে দেয়া হবে, সুতরাং তারা মাথায় চড়ে বসার সুযোগ পাবে না।
ধরা যেতে পারে এটা হচ্ছে ডেমোক্রেসি ভার্সন 2.0 বাংলাদেশের জন্য। আর কোন দালাল সাংসদ চাই না, দেশের মানুষ যেহেতু দেশের মালিক, তারাই সরাসরি তাদের চাকুরেদের নিয়োগ দেবে। রানী মৌমাছি প্রথা বাতিল করা দরকার অবিলম্বে। আরো কিছু আইডিয়া আছে, লিখব, আগে আপনাদের প্রতিক্রিয়া দেখি তারপর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

