১
যে মানুষটির কথা লিখতে যাচ্ছি তার মূল নামটা তেমন জরুরী নয়। তাই, আমরা এখানে তার একটি নাম দিয়ে নিই। ধরা যাক -সুনীল। নাহ্, আরেকটু ঘষে বরং বলি - নীল।
ছোট বেলা থেকেই নীল বড্ড অভিমানী ছিল। ক্ষেত্র বিশেষে তাকে জেদী বলাটাও মানিয়ে যায়। বেশ, একটু খোলাসা করে বলি।
কৈশোরের ঐ বয়সটাতে ওর তখন বিস্তীর্ণ খোলা মাঠে পাগলা ঘোড়ার মত দৌড়াবার সাধ জাগতো কেবল। ওরা যেখানে থাকতো- কাছে ধারে কোন খোলা মাঠ ছিল না। তাই বিকেল হলেই সে ছুটে যেত দূরের পাড়ায়। সেখানকার নরম ঘাসের সবুজ মাঠটুকু তার কাছে জাজিমের মত মনে হতো। সটান করে শুয়ে শুয়ে সে দূরের আকাশের পানে চেয়ে থাকতো চুপটি করে। উড়ে চলা পাখির ডানায় ভর করে তার ছোট্ট মনটাও ঘুরে বেড়াতো মেঘের চাদর মেখে মেখে।
সেইবার স্কুলের পরীক্ষা শেষের ছুটিতে লম্বা সময় পাওয়া গেল। এক বিকেলে নীল ঐ মাঠে যেয়ে দেখে বেশ আয়োজন করে ফুটবল খেলা চলছে সেখানে। খেলোয়ার সবাই বয়সে ওর থেকে ৪-৫ বছরের বড় হবে। প্রথম দিন সাইড লাইনে বসে বসে সে পুরো খেলা দেখলো। পরীক্ষা শেষের সম্পূর্ণ স্বাধীনতাটুকু উপভোগ করে সন্ধ্যা নামলে বাড়ি ফিরে এলো নীল।
খাওয়া সেরে রাতে ঘুমিয়ে পড়লে তার দুচোখে ভর করলো ঐ সবুজ মাঠ - খোলা আকাশ আর ছুটে চলা বল- পা থেকে অন্যের পায়ে। শেষ মেষে গোল পোস্টের সামনে এসে দেখা গেল নীল সজোরে বলে লাথি মারলো। ... লাথির ঝটকায় খাটে ব্যথা পেয়ে উঠে বসলো ও। কপালে জমে ওঠা ঘাম মুছে নিল। তারপর, ছোট ঘরে যেয়ে হাল্কা হয়ে এসেই আবার ঘুমিয়ে গেল বেচারা।
পরদিন, সারাটা দুপুর খুব লম্বা মনে হলো নীলের কাছে। রোদের তাপটুকু কমতে না কমতেই মা’র চোখ বাঁচিয়ে সোজা যেয়ে হাজির হলো ঐ পাড়ার মাঠে। সেখানে তখনও সবাই এসে পৌঁছায় নি। দুজনকে দেখা গেল বল নিয়ে কসরৎরত। নীল ওদের কাছে যেয়ে তার স্বভাবজাত সুরে বললো - ‘আমায় খেলতে নিবে?’
খেলার মাঠে এসে বয়সে বড়দের আপনি করে বলা ওর অভিধানে নেই। আর নীলের স্বরে কোন অনুরোধের অনুনয় ছিল না। বরং অধিকার ফলানোর ঢং ছিল অনেকটা। এহেন প্রশ্নে শূণ্যে ওঠা বলটা খপ করে হাতে ধরে নিয়ে একজন রাগত স্বরে জিজ্ঞেস করলো-‘কে তুমি? আগে তো দেখি নি। তুমি কি এই পাড়ার? ‘
ধারাবাহিক প্রশ্নের উত্তরে ও ছোট করে বললো- নাহ্। দু দিকে মাথা নেড়ে বোঝালো যে সে এই পাড়ায় থাকে না।
এইবার অন্যজন বললো - ‘তাইলে চান্দু ফুটো এইখান থিকা।‘
নীল এবার আরো জোর দিয়ে একে একে জানালো ওর নাম। গত কয়েক দিনে সে প্রায়ই এই মাঠে এসেছে। গতকাল তাদের খেলা দেখে ওর ভাল লেগেছে। আজ তাই খেলতে চায় ওদের সাথে।
ইতিমধ্যে অনেকেই চলে এসেছে। আগন্তুক কে দেখে কেউই তেমন আমল দিল না। ওয়ার্ম আপ শুরু করে দিল তারা। এক পর্যায়ে টীম ক্যাপ্টেন গোছের একজন নীল কে বললো- এই বাবু। যাও। মাঠের বাইরে যাও। খেলা শুরু করবো আমরা। নীল এর উত্তরে আবারো বললো- আমি খেলতে চাই। এবারে স্বরে কিছুটা নমনীয়তা আসলেও তা যথেষ্ঠ ছিল না। তাই টীম ক্যাপ্টেন অধৈর্য হয়ে বললো - আচ্ছা আচ্ছা - খেলো। আরেকটু বড় হয়ে খেলো। এখন বাইরে যাও তো বাপু।
নীল এবারে একটু দমে গেল। মাথা নিচু করে সবুজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে খুব মনোযোগ দিয়ে সে -যেন হারিয়ে যাওয়া দরকারী কিছু একটা খুঁজে খুঁজে ফিরে গেলো সাইড লাইনে। বিরস বদনে খেলা দেখলো পুরাটা। যতক্ষন মাঠে ছিল খেলোয়াড়রা ও দূর থেকেই চেয়ে দেখলো ওদের চলে যাওয়া পর্যন্ত। তারপর ফিরে যেয়ে মেঘ কালো মুখ করে বসে ছিল কোনার ঘরে। খেয়ে দেয়ে তাড়াতাড়ি এই রাতটা পার করে কালকের বিকালটাকে কত দ্রুত সামনে আনা যায়- সময়ের কাছে এই মিনতি করতে করতেই ঘুমিয়ে গেল সে।
পরদিন আরেকটু আগে গেল সে। আজও আগে আসা ক’জন কে প্রথমে প্রস্তাব - পরে অনুরোধ করেও আশাহত হলো সে। পরে, টীম ক্যাপ্টেন আসলে আজ তাকে গত দিনের থেকেও কঠোর ভাবে মাঠে থেকে বের হয়ে যেতে বললো।
সাইড লাইনে বসে বসে ঘাসের ডগা ছিড়তে ছিড়তে খেলা দেখছিল নীল। যতটুকু না খেলা দেখলো সে - তার চেয়ে অনেক বেশী ভাবলো যে-এই ছেলেদেরকে এই অপমানের কড়া একটা জবাব কি ভাবে দেওয়া যায়...?
২
আসছে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


