বৈকুন্ঠ, রবীন্দ্রনাথের রেল গাড়ীর কামরায় হঠ্যাৎ দেখার হওয়ার মত তোমার সাথে দেখা হওয়াটা আমার জন্য অস্বাভাবিক। এতকাল কেন দেখা হয়নি এর কারণ বর্ণনায় বড় কোন যুক্তি নেই। তোমার আমার পৈত্রিক নিবাস খুব দুরেরতো নয়! সেই হিসাবে মাসের এপার ওপার না হয়ে বছরের এপার ওপার আমাদের দেখা হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ সময়ের ব্যবধান আমাদের সপ্তর্শীমন্ডলীর মত দুরে রেখে দিলো। কি করো এখন? কেমন আছো? গ্রামে কম আস কেন?
তোমার কি শুধু প্রশ্ন করার স্বার্থেই দেখা হওয়ায় জন্য এত উদ্বীগ্নতা শব্দিতা?
তোমার উদ্বীগ্নতা ছিলো না?
না। কেননা তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে।
খুব দুঃখ পেয়েছিলে?
পৃথিবীর মানুষ জন্মাবার উৎসের সাথেই তো দুঃখের গল্প জড়িত?
তবে কেন একবার প্রশ্ন করোনি কেন চলে যাই?
যে চলে যেতে চায় তাকে সুখ স্বচ্ছন্দের পাখায় উড়িয়ে দেওয়া প্রকৃত মনুষত্ব, নিখাদ ভালোবাসা। ফেরাতে গেলে অমিমাংসিত বিড়ম্বনা বাড়ে, ফেরানো যায় না। আমি সেই বিড়ম্বনার পাত্র হতে চাইনি।
খুব খারাপ ভেবেছিলে আমাকে?
খারাপ ভাববো কেন? মানুষের জন্ম জৈবিকতার একটি অংশই তো দুটো পেলে ভালোটি বেছে নেয়া। তুমি সেটাকে একটু বিশ্রী করে দিয়েছিলে।
তোমার কথাই ঠিক। তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে যার ঘরে আশ্রয় খুঁজেছি। সে আশ্রয় সাম্যের মত সুন্দর। অর্নিবাণের মত সেখানে সুখ ঘুরাঘুরি করে। আমি রংধনু হয়ে আকাশে উড়ি। শুধু মাঝে মাঝে থমকে যাই তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার গল্পে। যে গল্পে তোমার ভালোমানুষি, সাদাসিধে জীবন, কিছু না চাইবার, কিছু না পাইবার আশ্চর্য ক্ষমতা প্রকৃত অপরাধী। নারীরা ভালোবাসার পাশে একটু খেয়ালী স্পর্শও চায়। যাকে তুমি ভালোমানুসি দিয়ে গোপন কথার মত আড়াল করে রাখতে বলেই আমি ভয় পেয়ে চলে গিয়েছিলাম।
সেখানে স্বাভাবিক আর স্পষ্টতাকে কেন তবে আড়াল করেছিলে? আমি কী খুব বেশি দুর্ভেদ্য ছিলাম যে আমাকে অতিক্রম করা যাবে না? আর ভালোমানুষি নয় আমি কাউকে ঠকাতে চায়নি। সেদিন তোমাকে যদি স্পর্শের ভালোবাসায় জড়াতাম তবে আজ যাকে পাশে রেখেছি তাকে কি ঠকানো হতো না? শরীরবৃত্তিক ভালোবাসায় যারা মজে তারা প্রকৃত ভালোবাসার অগচোরে শরীরটাকেই ভালোবাসে নিজে যা বুঝতে পারেনা। শরীর সরে গেলে যে শুকনো ভালোবাসা টুকু থাকে তা যে কোন বাতাসেই উড়ে যায়।
আমি শুধু স্পর্শ চেয়েছি। এরকম করে তো চাইনি। এতটা খারাপ আমাকে ভোবেছো। তুমি কি কখনো ভাবোনি? শুধু তোমার প্রত্যশায় প্রত্যাহিত সব আনন্দের ভাগ থেকে নিজেকে সরিয়ে দুচোখে চেয়ে থাকতাম। তুমি এসেই চলে যেতে বন্ধুর আড্ডায়। আমার জন্য না বলা আধেক সময়। আমি তোমাকে নিয়ে স্বপ্নলোকের স্বপ্ন দেখি, তুমি মাটিকে আঁকড়ে ধরো। আমি কি নিয়ে ভরসা পাই বলো?
শব্দিতা তুমি ছিলে আমার ফেরার উৎস আর ওরা ছিল বন্ধন। আজ যে টুকু’তে আমি তৈরী তার সবটা ওদের অবদান। ওরাই আমাকে মাটির কাছে থাকতে শিখিয়েছে, মাটিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে বলেই আমি বেঁচে থাকি। তোমাকে আশ্রয় দেবো বলেই প্রথম যে দিন তুমি বৃষ্টির বর্ষণ থেকে নিজের স্কুল বই বাঁচাতে আমার কাছে ছাতার আশ্রয় চেয়েছিলে। আমিতো শুধু বই নয় নিজে ভিজে তোমাকেও আশ্রয় দিয়েছিলাম। আজোও তুমি কিন্তু সে ছাতাটি ফেরত দাওনি।
তোমার ঐ একটাই উপহার আছে আমার কাছে। এছাড়া তো কখনই কিছু দাওনি। অনেক কষ্টে কেঁদে এক টুকরা কাগজ চেয়েছিলাম। বলেছিলে আমি তো আছি, কাগজের মত জড় বস্তুর প্রতি ভালোবাসা কেন। লাজ শরমের মাথা খেয়ে কখনও বলে ফেলতাম আমার জন্য একটি ফুল-কি তোমার হাতে উঠেনা? বলতে ফুলতো সবাই দেয়। আমাকে কি সবার মত ভালোবাসতে বলো। আমিতো পৃথিবীর মানুষ। পৃথিবীর সবার মতই ভালোবাসা চাইব, অন্য গ্রহের কোন কিছু নয়।
আমি মানুষের মত তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। যেখানে আবেগের ডুব সাতারে নিজেকে ডুবিয়ে নেকামি আমি শিখতে পারিনি বলে তোমাকে দেখাতে পারিনি। হয়ত ভালোবাসার ক্ষেত্রে সততার চেয়ে ছেলে মানুষির মূল্যই বেশি যা তুমি চাইতে। মানুষ ইচ্ছা করলেই নিজেকে বদলাতে পারেনা। পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা স্পর্শ দিয়ে তাকে বদলাতে হয়। তুমি সে পরিবেশ তো কখনও তৈরী করনি। একবেলা আমার প্রয়োজনে তোমার রাস্তায় হাটলে তোমার মুখ গম্ভীর হয়ে যেতো। ভাবতে এই বুঝি ধরা পড়ে গেলে।
আমার এই গম্ভীরতা তোমার চিন্তায় হতো। কবে তোমাকে আমার ভালোবাসা গ্রাম ছাড়া করে।
পেরেছিলে রক্ষা করতে, পারোনি। চলেই যেতে হয়েছিলে এ মায়াময় গ্রাম ছেড়ে। আর ফিরে আসতে পারোনি। বিধাতার কি অপূর্ব মিমাংসা দেখো; যে তুমি শহরের প্রত্যাশিত ছিলে প্রতিদিনকার মত কিন্তু রয়ে গেলে গ্রামে। আর আমি গ্রাম্য হতে চেয়েছি জীবন প্রতিটি সময় দিয়ে; হয়ে গেছি পুরোপুরি শহুরে। তারপরও হাজার বাধায়, হাজারো ব্যস্ততার শিশু হয়ে বার বার ফিরে এসেছি তোমার প্রতিটি অবস্থানে। এভাবেই একদিন শুনতে পেয়েছি তুমি আমাতে বিশ্বাস হারিয়ে নতুর বিশ্বাস খুঁজে নিয়েছো । আমি নিশ্চুপ ফিরে গিয়ে শহরের কাছে নিজেকে বিক্রি করেছি। একসময় ভুলে গিয়েছি তোমাকে।
সত্যিই কি ভুলে গিয়েছো?
যারা বিশ্বাস দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণায় মত্ত হয় তাদের মনে রাখাটা খুব কি যুক্তিযুক্ত?
আমার সম্পর্কে তোমার প্রকৃত ধারনাটা অবশেষে প্রকাশ করলে।
তুমি যা করছো তার আক্ষরিক নাম তো প্রতারণাই। সু-মিষ্টি কোন শব্দ থাকলে অবশ্যই সেটা উচ্চারণ করতাম।
তবে কি আমাদের সম্পর্কের কোন নাম নেই তোমার আমার কাছে?
রাস্তা হেঁটে গেলে আমার পাশ দিয়ে তো অনেক মানুষ-ই হেঁটে যায়। তাদের সাথে আমি কি কোন সম্পর্কের মাধ্যম খুঁজি?
বৈকুণ্ঠ, আমার কাছে তোমার আমার সম্পর্কের স্পষ্টতার যে প্রয়োজন ছিল তা আমি পেয়ে গেলাম। চলে যাই। আবার যদি দেখা হয় তবে পরিচয় ছিল এটুকু স্বীকার করো। আর তোমাকে আমি বাচিয়ে রাখব আমার সন্তানের “বৈকুন্ঠ” নামের মাঝে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ বিকাল ৪:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


