somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুবাই

০৫ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৩:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[ঘৃণা , ঘৃণা , ঘৃণা - সেই সব পাকিস্তানী আর্মি , রাজাকার, আল বদর , আল শামস , শান্তি কমিটির দোসরদের, বংশধরদের - যাদের পাপ ছাড়েনি কোন নিষ্পাপ শিশুকেও ]

কোন কোন ছেলে খুব সুন্দর কবিতা লেখে । রুবাইয়াত শুধু সুন্দর কবিতা লিখতো না। ও নিজেই ছিলো আপাদমস্তক একটা কবিতা । অপূর্ব সুন্দর কবিতা । চমৎকার আবৃত্তির কন্ঠ নিয়ে ও যখন বলতো , "আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে"- ঝড় বয়ে যেতো পতিত পৃথিবীতে । যখন গুরুগম্ভীর নাদে উচচারিত হতো , " স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের"- আমরা সত্যি সত্যি ফিরে যেতাম একাত্তরে । আমরা যারা কোন দিন মুক্তিযুদ্ধ করতে পারব না, তারা রুবাইয়াতের ধ্বনিত শব্দস্নানে নিতাম রণাঙ্গনের স্বাদ।

রুবাই খুব গর্বিত এক জন বাঙালী ছিলো । ২০শে ফেব্রুয়ারীর রাতে সে জেগে জেগে পোস্টার লিখতো । কবিতায় ভরে দিতো ভাষার কোল। রাস্তায় বসে এঁকে রাখতো আমাদের অশ্রু আর অহংকার । ভোর রাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে ফিস ফিস করে মনে করিয়ে দিতো , "ইমন, যাবি না প্রভাত ফেরীতে !" সাদা শাড়িতে মাড় দেওয়ার কথা আমার মনে না থাকলেও চলতো । কারন রুবাই ভুলতো না।

স্বাধীনতা কিংবা বিজয় দিবসে রুবাইয়ের উল্লাস দেখে মনে হতো বাংলাদেশ বুঝি বিশ্বের সবচেয়ে বিরাট তেলের খনি পেয়ে গেছে । একাই একশ হয়ে একটা দুর্দান্ত অনুষ্ঠান নামিয়ে ফেলতে ওর জুড়ি ছিলো না । ও বাংলাদেশকে বড় ভালোবাসতো । ও মুক্তিযুদ্ধকে বড় ভালোবাসতো । ও ২১শে ফেব্রুয়ারীকে বড় ভালোবাসতো । কেউ কখনো , "এই বাঙালিরে দিয়ে কিছু হবে না" - বললে যুক্তি, প্রমান, ইতিহাসের দিন , ক্ষণ , তারিখ দিয়ে বুঝিয়ে দিতো , বাঙালি এ পর্যন্ত কি কি "হইয়ে" ফেলেছে ।

বড় আবেগী ছিলো রুবাই । টকটকের ফর্সা মুখে গোলাপি ঠোঁট নিয়ে আমরা যখনি ওকে "ভিগা ভিগা পেয়ারা মওসম" বলে খেপাতাম , ও পরের দিনই এসে নালিশ ঠুকতো আমার কাছে । অথবা , জিজ্ঞাসা করতো , আচ্ছা , ঠোঁট কালো হওয়ার জন্য কয়দিন সিগারেট খেলে চলবে ? স্বাভাবিক ভাবেই পরের এক ঘন্টা ওকে আমার হলুদ রঙের স্কেলটা নিয়ে তাড়া করতে হতো। রুবাই মার খেতো । রুবাই হোম ওয়ার্ক লিখে দিতো । রুবাই , এক এক টাকা জমিয়ে বন্ধুদের আমড়া খাওয়াতো । ঢাকার হোস্টেলবাসী রুবাইয়ের বাবা মাকে আমরা কখনো দেখতাম না। মাঝে মাঝে সন্দেহ হতো , রুবাইয়ের বাবা মার কি ঢাকা আসার ভাড়াটাও নেই? রুবাই অবশ্য ওর ফুটো আলা , ঝোল মাখা সাদা পাঞ্জাবীটা ধুয়ে , মাড় দিয়ে , ইস্তিরি করে পরেই চিতকার করে কান ফাটাতো , "এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ।"

রুবাইয়ের সবচেয়ে বড় আফসোস ছিলো , ওর জন্ম ৭১ এর আগে নয় । আগে হলে কি যুদ্ধই না সে করত!

রুবাই আর আমার যুদ্ধংদেহী ভাবের কারনে , "সেজান" নামের কোন পাকিস্তানী জুস কোন আসরে সরবরাহ করা যেতো না। পাকিস্তানী খাবার , কাপড় বা অন্য কোন পণ্য তীব্র ঘৃণায় বর্জনীয় তালিকায় যুক্ত থাকতো। আমরা রীতিমত প্রচার চালাতাম। পাকিস্তানী কোন জিনিস কেউ যেন ব্যবহার না করে ।

সেই রুবাই প্রেমে পড়লো ঢাকা শহরের সবচেয়ে ভালো মানুষটার । আমরা তো , পাংখা ! রুবাই হাজার হাজার পাতা কবিতা লিখলো । রুবাই মজনু , ফরহাদ , চন্ডীদাস হয়ে প্রেম করলো । রুবাই মেয়েটার জন্য ভালো রেজাল্ট করলো । স্কলারশীপ পেলো। বাইরে পড়তে যাবার আগে সুবোধ সন্তানের মত মেয়ের বাড়িতে এনগেজমেন্টের প্রস্তাব পাঠালো । মেয়ের বাবা মা ছেলের বংশ পরিচয়ের খোঁজ করলেন। আর সাথে সাথে বেজে উঠলো ইস্রাফিলের শিঙা ।

বেরিয়ে এলো রুবাইকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার রহস্য । মেয়ের বাবা-মার সাথে সাথে রুবাই নিজেও জানলো - যে পরিবারকে সে আপন জানে , সেইটি পালক পরিবার । তার নানা পাকিস্তানী । তার বাবা শান্তি কমিটির সাথে সম্পর্কিত ছিলো বলে শোনা যায় । সেই কথা সত্য না মিথ্যা , প্রমানের জন্য লোকটা বেঁচে নেই । মা আবার বিয়ে করে করাচী আছে ।

আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা । আমার মামা, চাচা , নানা মারা গেছেন রাজাকার আর পাকিস্তানী আর্মির সাথে সম্মুখ সমরে । আমি কি করে রুবাইকে আর ভালোবাসি? বন্ধু মহলের সবাই আমরা দিশেহারা হয়ে গেলাম। আমাদের মনে হলো আমরা ভয়ংকর প্রতারিত । কি করে একজন শান্তি কমিটির সহযোগীর ছেলে এতটা বাঙালী , এতটা দেশপ্রেমিক হলো ! কেন সে জানলো না , তার জন্ম কতটা ঘৃণিত পরিবারে ! কেন সে আমাদের সকলের ভালোবাসা জয় করেছিলো? আমি রুবাইকে ঘৃণা করতে চাইলাম , আর সব পাকিস্তানী পন্যের মত । কিন্তু , আমি যে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলাম! আমি যে বড় বেশি ভালো করে জানি - বাংলাদেশ , বাঙালিত্ব আর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আমার চেয়ে রুবাইয়ের প্রেম কোন অংশেই কম ছিলো না! ওর ভালোবাসায় কোন খাঁদ ছিলো না। ওর ঘৃণা বিশুদ্ধ ছিলো ! অথচ আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে । আর রুবাই , রুবাই কি না ......... ছিঃ ! ছিঃ !

আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম , রুবাইয়ের নিজের কোন দোষ নেই। ও কি করে নিয়ন্ত্রন করবে , কার গর্ভে ওর জন্ম! কিন্তু , জেনে ফেলার পরে ওকে আমরা আর আগের মত করে দেখতে পারছিলাম না । প্রচন্ড টানা পোড়েনে আমরা সকলেই পুড়ছিলাম । রুবাই নিজেও । রুবাই আর কিছুতেই নিজেকে সহ্য করতে পারছিলো না । ও বুঝতে পারছিলো , আমরা ভীষন কষ্ট পাচ্ছি । সবচেয়ে ভালো বন্ধু রুবাই । সবচেয়ে ভালো মানুষ রুবাই । সবচেয়ে স্বচ্ছ আত্মা রুবাই । তাই সবকিছু সহজ করে দিলো । দিলো ঐ মানুষটার জন্য যাকে সে সব চাইতে বেশি ভালোবাসে । দিলো আমাদের জন্য যারা ওকে ভীষন ভালোবেসেছিলাম । দিলো , মুক্তিযুদ্ধের জন্য - যা ছিলো ওর সবচেয়ে বড় আর গভীর গর্বের জায়গা !

কোন এক ক্লান্ত , অনুতপ্ত ভোরে , বৃষ্টি ভেজা বিষাক্ত বাতাসে দাঁড়িয়ে , পরিচিত ঢাকা থেকে অনেক অনেক দূরে , একটা ছায়াময় উঠোনের পাশে আমরা ওকে শুইয়ে দিয়ে এলাম । ওর ইচ্ছে মত শামসুর রহমানের কবিতার সাথে । "আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন"- কথা গুলো ওর মাথার কাছে লিখে । জীবদ্দশায় ও ঠিক যতটুকু সাদা মানূষ ছিলো , ঠিক ততখানি সাদা একটা কাপড়ে মুড়ে ।

রুবাই , তোর জন্মকে আমি কোন দিন ক্ষমা করতে পারবো না। তুই কি পারবি ? আমাদের ক্ষমা করতে?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:০৬
২৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×