কোন কোন ছেলে খুব সুন্দর কবিতা লেখে । রুবাইয়াত শুধু সুন্দর কবিতা লিখতো না। ও নিজেই ছিলো আপাদমস্তক একটা কবিতা । অপূর্ব সুন্দর কবিতা । চমৎকার আবৃত্তির কন্ঠ নিয়ে ও যখন বলতো , "আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে"- ঝড় বয়ে যেতো পতিত পৃথিবীতে । যখন গুরুগম্ভীর নাদে উচচারিত হতো , " স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের"- আমরা সত্যি সত্যি ফিরে যেতাম একাত্তরে । আমরা যারা কোন দিন মুক্তিযুদ্ধ করতে পারব না, তারা রুবাইয়াতের ধ্বনিত শব্দস্নানে নিতাম রণাঙ্গনের স্বাদ।
রুবাই খুব গর্বিত এক জন বাঙালী ছিলো । ২০শে ফেব্রুয়ারীর রাতে সে জেগে জেগে পোস্টার লিখতো । কবিতায় ভরে দিতো ভাষার কোল। রাস্তায় বসে এঁকে রাখতো আমাদের অশ্রু আর অহংকার । ভোর রাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে ফিস ফিস করে মনে করিয়ে দিতো , "ইমন, যাবি না প্রভাত ফেরীতে !" সাদা শাড়িতে মাড় দেওয়ার কথা আমার মনে না থাকলেও চলতো । কারন রুবাই ভুলতো না।
স্বাধীনতা কিংবা বিজয় দিবসে রুবাইয়ের উল্লাস দেখে মনে হতো বাংলাদেশ বুঝি বিশ্বের সবচেয়ে বিরাট তেলের খনি পেয়ে গেছে । একাই একশ হয়ে একটা দুর্দান্ত অনুষ্ঠান নামিয়ে ফেলতে ওর জুড়ি ছিলো না । ও বাংলাদেশকে বড় ভালোবাসতো । ও মুক্তিযুদ্ধকে বড় ভালোবাসতো । ও ২১শে ফেব্রুয়ারীকে বড় ভালোবাসতো । কেউ কখনো , "এই বাঙালিরে দিয়ে কিছু হবে না" - বললে যুক্তি, প্রমান, ইতিহাসের দিন , ক্ষণ , তারিখ দিয়ে বুঝিয়ে দিতো , বাঙালি এ পর্যন্ত কি কি "হইয়ে" ফেলেছে ।
বড় আবেগী ছিলো রুবাই । টকটকের ফর্সা মুখে গোলাপি ঠোঁট নিয়ে আমরা যখনি ওকে "ভিগা ভিগা পেয়ারা মওসম" বলে খেপাতাম , ও পরের দিনই এসে নালিশ ঠুকতো আমার কাছে । অথবা , জিজ্ঞাসা করতো , আচ্ছা , ঠোঁট কালো হওয়ার জন্য কয়দিন সিগারেট খেলে চলবে ? স্বাভাবিক ভাবেই পরের এক ঘন্টা ওকে আমার হলুদ রঙের স্কেলটা নিয়ে তাড়া করতে হতো। রুবাই মার খেতো । রুবাই হোম ওয়ার্ক লিখে দিতো । রুবাই , এক এক টাকা জমিয়ে বন্ধুদের আমড়া খাওয়াতো । ঢাকার হোস্টেলবাসী রুবাইয়ের বাবা মাকে আমরা কখনো দেখতাম না। মাঝে মাঝে সন্দেহ হতো , রুবাইয়ের বাবা মার কি ঢাকা আসার ভাড়াটাও নেই? রুবাই অবশ্য ওর ফুটো আলা , ঝোল মাখা সাদা পাঞ্জাবীটা ধুয়ে , মাড় দিয়ে , ইস্তিরি করে পরেই চিতকার করে কান ফাটাতো , "এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ।"
রুবাইয়ের সবচেয়ে বড় আফসোস ছিলো , ওর জন্ম ৭১ এর আগে নয় । আগে হলে কি যুদ্ধই না সে করত!
রুবাই আর আমার যুদ্ধংদেহী ভাবের কারনে , "সেজান" নামের কোন পাকিস্তানী জুস কোন আসরে সরবরাহ করা যেতো না। পাকিস্তানী খাবার , কাপড় বা অন্য কোন পণ্য তীব্র ঘৃণায় বর্জনীয় তালিকায় যুক্ত থাকতো। আমরা রীতিমত প্রচার চালাতাম। পাকিস্তানী কোন জিনিস কেউ যেন ব্যবহার না করে ।
সেই রুবাই প্রেমে পড়লো ঢাকা শহরের সবচেয়ে ভালো মানুষটার । আমরা তো , পাংখা ! রুবাই হাজার হাজার পাতা কবিতা লিখলো । রুবাই মজনু , ফরহাদ , চন্ডীদাস হয়ে প্রেম করলো । রুবাই মেয়েটার জন্য ভালো রেজাল্ট করলো । স্কলারশীপ পেলো। বাইরে পড়তে যাবার আগে সুবোধ সন্তানের মত মেয়ের বাড়িতে এনগেজমেন্টের প্রস্তাব পাঠালো । মেয়ের বাবা মা ছেলের বংশ পরিচয়ের খোঁজ করলেন। আর সাথে সাথে বেজে উঠলো ইস্রাফিলের শিঙা ।
বেরিয়ে এলো রুবাইকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার রহস্য । মেয়ের বাবা-মার সাথে সাথে রুবাই নিজেও জানলো - যে পরিবারকে সে আপন জানে , সেইটি পালক পরিবার । তার নানা পাকিস্তানী । তার বাবা শান্তি কমিটির সাথে সম্পর্কিত ছিলো বলে শোনা যায় । সেই কথা সত্য না মিথ্যা , প্রমানের জন্য লোকটা বেঁচে নেই । মা আবার বিয়ে করে করাচী আছে ।
আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা । আমার মামা, চাচা , নানা মারা গেছেন রাজাকার আর পাকিস্তানী আর্মির সাথে সম্মুখ সমরে । আমি কি করে রুবাইকে আর ভালোবাসি? বন্ধু মহলের সবাই আমরা দিশেহারা হয়ে গেলাম। আমাদের মনে হলো আমরা ভয়ংকর প্রতারিত । কি করে একজন শান্তি কমিটির সহযোগীর ছেলে এতটা বাঙালী , এতটা দেশপ্রেমিক হলো ! কেন সে জানলো না , তার জন্ম কতটা ঘৃণিত পরিবারে ! কেন সে আমাদের সকলের ভালোবাসা জয় করেছিলো? আমি রুবাইকে ঘৃণা করতে চাইলাম , আর সব পাকিস্তানী পন্যের মত । কিন্তু , আমি যে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলাম! আমি যে বড় বেশি ভালো করে জানি - বাংলাদেশ , বাঙালিত্ব আর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আমার চেয়ে রুবাইয়ের প্রেম কোন অংশেই কম ছিলো না! ওর ভালোবাসায় কোন খাঁদ ছিলো না। ওর ঘৃণা বিশুদ্ধ ছিলো ! অথচ আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে । আর রুবাই , রুবাই কি না ......... ছিঃ ! ছিঃ !
আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম , রুবাইয়ের নিজের কোন দোষ নেই। ও কি করে নিয়ন্ত্রন করবে , কার গর্ভে ওর জন্ম! কিন্তু , জেনে ফেলার পরে ওকে আমরা আর আগের মত করে দেখতে পারছিলাম না । প্রচন্ড টানা পোড়েনে আমরা সকলেই পুড়ছিলাম । রুবাই নিজেও । রুবাই আর কিছুতেই নিজেকে সহ্য করতে পারছিলো না । ও বুঝতে পারছিলো , আমরা ভীষন কষ্ট পাচ্ছি । সবচেয়ে ভালো বন্ধু রুবাই । সবচেয়ে ভালো মানুষ রুবাই । সবচেয়ে স্বচ্ছ আত্মা রুবাই । তাই সবকিছু সহজ করে দিলো । দিলো ঐ মানুষটার জন্য যাকে সে সব চাইতে বেশি ভালোবাসে । দিলো আমাদের জন্য যারা ওকে ভীষন ভালোবেসেছিলাম । দিলো , মুক্তিযুদ্ধের জন্য - যা ছিলো ওর সবচেয়ে বড় আর গভীর গর্বের জায়গা !
কোন এক ক্লান্ত , অনুতপ্ত ভোরে , বৃষ্টি ভেজা বিষাক্ত বাতাসে দাঁড়িয়ে , পরিচিত ঢাকা থেকে অনেক অনেক দূরে , একটা ছায়াময় উঠোনের পাশে আমরা ওকে শুইয়ে দিয়ে এলাম । ওর ইচ্ছে মত শামসুর রহমানের কবিতার সাথে । "আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন"- কথা গুলো ওর মাথার কাছে লিখে । জীবদ্দশায় ও ঠিক যতটুকু সাদা মানূষ ছিলো , ঠিক ততখানি সাদা একটা কাপড়ে মুড়ে ।
রুবাই , তোর জন্মকে আমি কোন দিন ক্ষমা করতে পারবো না। তুই কি পারবি ? আমাদের ক্ষমা করতে?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


