"দ্যাখ গিট্টু । উঠানে ছাগল বাঁনলে ঘরে লাদি উঠবেই। নিউটনের ৪র্থ সূত্র। আই রেড ইট সামহোয়ার।" গিট্টু রেগে মেগে মুরগী ফোলা হয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে । দুই ইঞ্চি সরে বসি। আমি ওর চেয়ে এক হাত বেশি লম্বা। ওর ধারনাই নেই আমার হাত কোথায় কোথায় পৌঁছাতে পারে। একটা তীব্র তাচ্ছিল্য ওর দিকে ছুড়ে দিয়ে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াই, হাতে চা এর সরঞ্জাম ।
ভেতরে টাইগার মিন মিন করে। "আম্মা রাগ করবে , সেলিনা ( গিট্টুর শুভনাম) । অবলা জীব। ও কি কিছু বোঝে? নেহায়েত বেঁধে রাখা হয়েছে বলেই না উঠোনে আছে । নইলে তোর সাথে ওর কি শত্রুতা !"
গুট্টু তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে খামোখাই চেঁচাতে থাকে। গ্যাঞ্জামটা লাগতো না। বাইরে বৃষ্টি ক’দিন ধরে । আমাদের মনেও বৃষ্টি। কারো কারো শরীরে । বহুদিন ধরে টাকা কামানোর ধান্দায় দেখা সাক্ষাত হয় না। মিস্কল নাই, ই মেইল নাই- গিট্টুর বাড়ি দাওয়াত। হেঁটে , দৌড়ে , গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছি আমরা। পিয়ালীর লাফালাফি সবচেয়ে বেশি । তার হানি বানি হুইস্কির বোতল পাঠিয়েছেন । সেইটার সৎ ও শুদ্ধ ব্যবহারে তিনি মহাপ্রতিজ্ঞ। সভাসদদের কারো আপত্তি আছে বলে মনে হয় না ।
বাড়িটা ঢাকা শহরের কংক্রিট প্রেমের যুগে রীতিমত অশ্লীল ধরনের সবুজ। ১০ কাঠার উপরে সেলির আম্মার জাদু হাতের গাছ গাছালি , ফুলের বাগান। ফলের গাছ গুলো মুখ ব্যাদান করা ইট কাঠের জঞ্জালকে দৃষ্টির সীমানায় আটকে দেয়। ভেতরের লনে বসে মাঝে মাঝে যশোরের মাঠ দুপুর কিংবা দিনাজপুরের দুর্লভ বিকেল গুলোকে ছোঁয়া যায় অবলীলায়। আমি ঘাসের উপর শুয়ে টের পেয়েছি । কত কাল কেটে গেছে ! আদর না পেতে পেতে মরে গেছে কোমল ত্বক! এখন হার বার হার্বাল ফেসিয়াল , হোয়াইটেনিং মাস্ক লাগিয়েও ঠিক বেরিয়ে আসে মৃত শব !
পুকুরটাকে জলজ রাখতে খালাম্মা কম ঝামেলা করেন নাই। তবু, নাড়িবিহীন ফুল কি আর বাঁচে! মাতৃ জরায়ু বিচ্ছিন্ন হয়েছি কত বছর ! বাহিরের বিরুদ্ধ বাতাসে কেবলই নীল । "আজ নীল রঙে মিশে গেছে লাল , আজ রঙ চিনে নেওয়ার আকাল , আর বাতাসেও বেনীল ভেজাল , ভেসে বেড়ায়!" আমার হাত খসে একটা কাপ ভাঙে । ডাইনিং এ ছাগল অপাখ্যানের হট্টগোলে কেউ গা করে না । আসলেই তো! কে জানে , কখন কোথায় ভাঙন নামে কার বুকে , কার মনে। " শেষ হয়ে গেছে কলেজের ক্লাস । ফের পাওয়া গেছে আজ অবকাশ । "
কাবাব বানানোর ভারটা আমার উপরে ছিলো । সাকিফের শ্বশুর বাড়ির পাঠানো ছাগলের মাংস তিন কেজির ফর্দাফাই করে এনেছি । টুকরো টুকরো করে কেটে , জ্বালিয়ে, পিষে ফেলার মধ্যে কেমন যেন একটা জান্তব শ্লাঘা টের পাচ্ছিলাম। গরম তেলে দিতেই কেমন চিটপিট করে তড়পায় গোল গোল পিষে ফেলা মাংশ খন্ড! পুড়ে পুড়ে চিৎকার করে । "সেদিনও ছিলো দুপুর এমন , ঝকঝকে রোদ , অস্থির মন, আর ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রশ্রয়!"
সদল বলে টাইগার, গিট্টু, বাম্পার , মই মই , বুলবুলি , সিলটি পুরি রান্না ঘরে ঢুকে পড়ে । সবাই অভ্যস্ত কাজে । কয়েক মিনিটের মধ্যে সালাদ , মুরগী তন্দুর , নান রুটি , বাহারি ডাল -একে একে তৈরী হতে থাকে। তার সাথে হেড়ে গলায় সিলটি রবি রক । "এসো নিফো ভনে , চায়া ঘিতি থলে , এসু খরো সিনান নভ দারা ঝলে , দাও আখুলিয়া গোন খালো খেশ , ফরো দ্যাও গেরি ম্যাগ নীল ভেশ ।" অথবা , "আমি ছিনি গো ছিনি তুমারে , ওগো লন্ডনীইইই, থুমি তাখো সোসাল সেন্ঠারে , ওগো বিদেশিনী ।"
একবার কান পেতে বুঝার চেষ্টা করি , ছাগলটা আছে তো ?নাকি ঐটার ভবলীলা সত্যি সত্যি সাঙ্গ হয়েছে ! ঢাকা শহরে ছাগল পোষা একমাত্র গুলশানেই সম্ভব । এখানে ১০ কাঠা বাড়ি আর রইলো কই! সব তো ডেভেলপমেন্টের তোড়ে মুরগীর খোয়াড় হয়ে গেলো । যারা ছাগল পোষে , তারা নিজে বোধ করি আরও বড় "রা........." । কিন্তু , কিছু করার নেই। বড় লোকের শখ! টাকা পয়সা বেশি হলে এমন দু'চারটা অদ্ভুত শখ মানুষের থাকে । ডলারে , ক্রোনারে বেতন পেলে তো কথাই নেই! দীপা আপা স্টাভাঙ্গারে বসে বসে হাঁস , মুরগী পুষতে পারলে গুলশানে ছাগল, কুকুর পোষা ঠিক আছে । বেচারা ছাগল। অন্যের ইচ্ছায়,অন্যের নিয়ন্ত্রনে বাঁধা পড়া জীবন। গিট্টুর ঝাড়ি খেয়ে কষ্ট পেল কি না জানা গেলো না কারন আমরা কেই অবলা নই। আমরা সব বলা । হঠাতই হাসি পায় । এই লাল দালানের সীমানা বন্দি একটা চতুষ্পদী অসহায় ,অক্ষম প্রানী - ওর জীবন নিয়ে কেউ যদি একটা ডকুমেন্টারী বানাতে চায়, তাহলে ইন্টারভিউ নেবে কি ভাবে! একটা ছাগলিক ভাষা কি গবেষনা করে বের করা যায়?
গিট্টু কি কথায় জানি হাসতে গিয়ে থেমে যায় । বাম্পার এই ঈদে হালিম বানাতে বললো আমাকে। আমি মানা করার আগেই কম্ম সারা । গিট্টু কিছু না বলে চুপ চাপ বেরিয়ে যায় । আমি বাম্পারকে একটা অকথ্য অশ্রাব্য গালি দেই ।
"রাজাকারের বাচচা নব্য জামাত । জানিস না গিট্টুর মন খারাপ?"
বাম্পু কি একটা বলতে গিয়েও থেমে যায় । এত নোংরা গালি দেওয়ার মানে আমার সাথে লাগতে এলে ছোবল খাওয়ার সম্ভাবনা । আজ আমরা সবাই খারাপ আছি । কারো মন ভালো নেই। কেউ ভালো নেই।
গিট্টুকে খুঁজে পাই দোতলা উঠতে টেরেসের ছাদে । আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই গিট্টু ঘুরে দাঁড়িয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে , "ইমু , তুই যত ইচ্ছা হালিম বানা । আমি কিছু মনে করবো না । ফায়সালের সাথে হালিম খাওয়া নিয়ে স্মৃতি আছে বলে অন্য কেউ রান্না করবে না, খাবে না - এই সব ছেলে মানুষীর কোন মানে হয় না।" আমি কি করবো বুঝতে পারি না । আবারো ওর মার্কিন ভিসা রিফিউজ হয়েছে । ওর নাকি যথেষ্ট ফ্যামিলি টাই নাই । আরে মর জ্বালা , এখন নতুন করে আন্টি বাচচা নেবে নাকি এই ৫০ বছর বয়সে ? ফ্যামিলি টাই কি মানুষ বাড়াতে পারে? ওর পরিবার ছোট তো ও কি করবে?
বিয়ে হয়েছে দেড় বছর । গিট্টুর বাবা মারা যাওয়ার পরে আমি দেখেছি ফয়সাল কি ভাবে ওকে আগলে রাখতো । মেয়েটাকে একটা ভালোবাসার দেয়াল দিয়ে সমস্ত পৃথিবী থেকে রক্ষা করাই ফয়সালের কাজ ছিলো যেন। কিন্তু আমেরিকায় যাওয়ার পরে কিছুতেই সেলিনাকে নিতে পারছে না । আন্টির ভিসা হয়ে আছে । ফয়সাল যতবার বাংলাদেশে ফিরবে বলে ঠিক করে ফেলে , সেলি বুকে পাথর বেঁধে ওকে মানা করে দেয়। ফয়সালের যেই বিষয়ে পড়ালেখা , সেই বিষয়ে বাংলাদেশে কোন চাকরিই নেই।
কখন বুলি পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ খেয়াল করি নাই । হঠাৎ আলিঙ্গনে বাঁধা পড়ে টের পাই , এক জোড়া চোখ কাঁদে না। আকাশ কাঁদে , আকাশ। বুলি অস্ট্রেলিয়া যাবে বলে সব পরীক্ষা টরীক্ষা দিয়ে রেডি । প্রাইমারী ভিসা হয়ে আছে । কিন্তু , পুরা বছরের টিউশন ফি আর ব্যাংক ব্যালেন্স – টাকার যোগাড় হচ্ছে না । তাই যাওয়াও হচ্ছে না । ছোট খালা বলেছিলেন সাহায্য করবেন । কিন্তু , শর্ত আছে । তার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে তাকে সাথে নিয়ে যেতে হবে। বুলি রাতের পর রাত কেঁদে কেঁদে শুকিয়ে কাঠি হচ্ছে । কি করে বলবে সবাইকে? নাভিদ এখনো বিয়ে করার মত স্টেবল নয় । ওরা গোপনে আংটি বদল করেছে । কিন্তু , নাভিদের পরিবার বুলির পরিবারের সামনে দাঁড়ানোর “সামাজিক” যোগ্যতা রাখে না। অতএব, সব লন্ড ভন্ড! ভেবেছিলো সিডনী গিয়ে দুজনে সামলে নেবে সব কিছু । দেশের বাইরে থাকলে তো আর সামাজিক , পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। বুলি এখন প্রচন্ড ডিপ্রেশনে ।
অথচ আমরা কেউ দেশ ছাড়তে চাইনি । দেশপ্রেমের টানে বিদেশে যাওয়ার ভিসা রিফিউজ করেছি । করেছি এইচ এস সির পরে বাইরে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রত্যাখান। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর! জীবনের পরিকল্পনা গুলো শেষ পর্যন্ত কারোরই ঠিক রইলো না। দেশে থাকার , কাজ করার সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন গুলো একে একে বিভিন্ন সুতোর টানে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো । কারো স্বামীর চাকরী নাই । কারো সামাজিকতার বাঁধা কাটানো চাই। কারো পরিবারের বাকি সবাই অভিবাসী হয়ে গেছে। আর কেউ - থাক। আর ভাবতে ভালো লাগছে না। ৫৬ ঘন্টা পার হয়ে গেলো , ঘুমাইনি।
কাকে দোষ দেব? এক দিকে দেশের প্রতি কর্তব্য। এক দিকে পরিবারের প্রত্যাশা ,জীবনের তাগিদ। আরেক দিকে নিজের ভালোবাসার প্রতি দায়বদ্ধতা । এহেন ত্রিভুজ প্রেমের এমন ত্রিমুখী টান - আমাদের সবাইকে একটা এমন অবস্থানে এনে ফেলেছে। কি নাম দেব? অভিশপ্ত অভিবাসন? নাকি ঈপ্সিত নির্বাসন?
ডিনারের টেবিলে বসে সবাই আমরা অভিনয় করি । বেশ একটা গান বাজনা , হই চই ভাব । ডিনারের পরে খালাম্মা উপরে চলে যান । উনি বোঝেন , বড় হয়ে যাওয়া সন্তানদের কিছু ব্যক্তিগত কষ্ট থাকে । ওসব মার সামনে খুলে মেলে ধরা যায় না। সেই সব কষ্ট ভুলে থাকার পদ্ধতিও সব সময় গ্রহনযোগ্য থাকে না। আমি ওদের কাবাব, কোকের ক্যান রেডি করে দিয়ে দোতলায় উঠে আসি । একটা ফোন করতে হবে। এখন জ্বর কত? শেষবার যখন কথা বলেছি তখন একশ তিন ডিগ্রী ফারেনহাইট । ছাদে উঠে ফোন করি ।
ঃ খেয়েছ ?
ঃ কিছু রান্না করা নেই ।
ঃ শুকনো খাবার নেই? সিরিয়াল? দুধ? জুস? কিছু একটা ?
ঃ নাহ। উইক এন্ডে বাজার করতে পারিনি । ফ্রিজে মুরগী থাকতে পারে।
ঃ রান্না করতে পারবে না এখন। ফোনে অর্ডার করো না!
ঃ ইমিন , প্লিজ। আমার বিছানা উঠতে গেলেও মাথা ঘুরে যাচ্ছে । ফোনে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে । জাস্ট তোমার কল বলেই ফোনটা ধরলাম । আমি খাব না। শক্তি নাই খাওয়ার । তুমি প্লিজ এই সব কথা বন্ধ করো ।
ওষুধ গুলো ঠিক মত খাওয়ার কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে , খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া যায় না। এর পরে আর কথা আগায় না । কোন রকমে কান্না চেপে আবার ফোন করার কথা বলে লাইন কেটে দেই । দোতলার ঘর পর্যন্ত না যেতেই টের পাই , নিচে পর্যন্ত যেতে পারবো না। খালাম্মার বাথরুমে ঢুকে বমি করে দেই ডিনারে সামান্য যা কিছু মুখে দিয়েছিলাম। বন বন করে মাথা ঘুরতে থাকে । বমি আর কান্নার শব্দে খালাম্মা ছুটে আসেন। আমি কোলের ভিতর আছড়ে পড়ি !
ঃ কি লাভ , খালাম্মা , কি লাভ হলো ডাক্তার হয়ে? মানুষটা অসুস্থ শরীরে না খেয়ে পড়ে পড়ে ছটফট করছে । আর আমি এখানে বসে ......... আমি কিছুই করতে পারছি না । আমি কিছুই করতে পারছি না। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে । এত অসহায় কেন আমি ? এত কেন অক্ষম!
রাগে দুঃখে নিজেকে উঠোনে বাঁধা ছাগলটার চেয়েও নিকৃষ্ট বলে মনে হয় । আমার কান্নার তোড়ে পৃথিবীর তিনটা বিন্দুতে জমে ওঠা আগুন একটুও নেভে না

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

